২৩১. পুত্রগণ কর্তৃক জননীকে আশ্বাস-প্রদান

একত্রিংশধিকদ্বিশততম অধ্যায়।

বৈশম্পায়ন কহিলেন,—দীনা জরিতা পুত্রগণের এই প্রকার কাতরোক্তি শ্রবণানন্তর তাহাদিগকে কহিলেন, হে বৎসগণ! একদা এই গৰ্ত্ত হইতে সেই মূষিক বহির্গত হইয়াছিল, সেই সময়ে একটা শ্যেনপক্ষী তাহাকে শিকার করিয়া লইয়া গিয়াছে, অতএব তোমরা নিঃশঙ্কচিত্তে গমধ্যে প্রবেশ কর। শাকগণ কহিলেন, মাতঃ! আমরা শ্যেনপক্ষীকে মূষিক লইয়া যাইতে দেখি নাই। আর যদিও সেই মূষিককে লইয়া গিয়া থাকে, তথাপি ঐ গর্ত মধ্যে অন্য মূষিক থাকিবার সম্ভাবনা, তাহাও আমাদের ভয়াবহ! দেখ, বায়ুবেগ ক্রমে নিবৃত্ত হইয়া আসিতেছে, অতএব অগ্নি আমাদিগের সমীপ পর্যন্ত আসিতে পারে কি না পারে, সন্দেহ; কিন্তু আমরা গৰ্তমধ্যে প্রবেশ করিলে মূষিকহস্তে পতিত হইয়া প্রাণত্যাগ করিব, সন্দেহ নাই। এক পক্ষে মৃত্যুর নিশ্চয়, পক্ষান্তরে সংশয়; অতএব সংশয়িত পক্ষ অবলম্বন করাই শ্রেয়। হে মাতঃ! আমাদের মায়া পরিত্যাগ করিয়া উপযুক্ত স্থানে পলায়ন কর; আমরা বিনষ্ট হইলেও তোমার অন্যান্য পরমোৎকৃষ্ট পুত্র হইতে পারিবে।

জরিতা কহিলেন, হে পুত্রগণ! যৎকালে সেই মহাবল পরাক্রান্ত নেন পক্ষী গৰ্ত্ত হইতে মূষিককে লইয়া যায়, আমি তৎকালে সেইস্থানে উপস্থিত থাকিয়া তাহা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি এবং সত্বরে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ, গমন করত এই বলিয়া আশীর্বাদ করিয়াছি, হে শ্যেনরাজ! তুমি আমাদের শত্রু, কিন্তু এই মূষিককে হরণ করিয়া আমাদিগকে নিষ্কণ্টক করিলে,এই পুণ্যফলে তুমি পরলোকে সুবর্ণময় কলেবর প্রাপ্ত হইয়া অক্ষয় স্বর্গ ভোগ করিবে। তৎপরে ঐ নেপী মূষিককে ভক্ষণ করিলে পর আমি তাহার অনুজ্ঞা লইয়া স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলাম। অতএব হে পুত্রগণ! তোমরা স্বচ্ছন্দে গৰ্তমধ্যে প্রবেশ কর, কিছুমাত্র শঙ্কা করিও না; আমার সমক্ষে শ্যেন মূষিককে ভক্ষণ করিয়াছে।

শার্ঙ্গকগণ কহিলেন,-মাতঃ! শ্যেন যে মূষিককে লইয়া গিয়াছে, আমরা তাহার কিছুমাত্রই জানি না; অতএব কি প্রকারে গর্তে প্রবেশ করি।

জরিতা কহিলেন, আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছি, শ্যেন মূষিককে ভক্ষণ করিয়াছে; তোমাদের কিছুমাত্র ভয় নাই, আমার বচনানুসারে কাৰ্য্য কর। শার্ঙ্গকগণ কহিলেন, মাতঃ! তুমি কেন মিথ্যা প্রবোধ বাক্যদ্বারা আমাদের ভয় ভঞ্জন করিবার চেষ্টা পাইতেছ? ঐ গমধ্যে যখন শত্রু থাকিবার সম্ভাবনা, তখন আমাদের কোন ক্রমেই উহাতে প্রবেশ করা বিধেয় নহে। দেখ, আমরা তোমার কখন কোন উপকার করি নাই; অধিক কি, আমরা যে কে, তাহাও তুমি বিশেষরূপে জান না, তবে কি নিমিত্ত তুমি এত কষ্ট সহ করিয়াও আমাদিগকে লালন পালন করিতেছ। তুমি আমাদের কে? আর আমরাই বা তোমার কে? আরও দেখ, তুমি অল্পবয়স্কা এবং দর্শনীয়াও বটে, অতএব হে মাতঃ! তুমি আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া স্বামীর নিকট গমন করিয়া সুন্দর পুত্র প্রাপ্ত হও, আমরা এইখানে থাকিয়া হুতাশনে প্রাণ পরিত্যাগপূর্বক সদগতি লাভ করি। হে মাতঃ! যদি আমরা কোন ক্রমে অগ্নি হইতে পরিত্রাণ পাইতে পারি, তাহা হইলে তুমি পুনরায় আমাদের নিকটে আসিও।

শার্ঙ্গী শাবকগণের এই প্রকার বাক্য পুনঃ পুনঃ শ্রবণ করিয়া অগ্নিশূন্য প্রদেশে পলায়ন করিলেন। শাঙ্গী প্রস্থান করিলে অগ্নি দ্রুতবেগে মন্দপাল মহর্ষির পুত্র শার্ঙ্গকগণের সমীপবর্তী হইলেন।