২০৭. রাজ্যলাভ পর্বাধ্যায়

২০৭. রাজ্যলাভ পর্বাধ্যায়

সপ্তাধিকদ্বিশততম অধ্যায়।

দ্রুপদ কহিলেন, হে মহাপ্রাজ্ঞ বিদুর! তুমি যাহা কহিলে ইহা যথার্থ, কৌরবগুণের সহিত বৈবাহিক সম্বন্ধ হওয়াতে আমারও যথেষ্ট পরিতোষ জন্মিয়াছে। আর মহাত্ম। পাণ্ডবগণেরও স্বদেশে গমন করা আমার মতে উচিত। কিন্তু আমি স্বয়ং ইহাদিগকে এ স্থান হইতে বিদায় করিতে পারি না। যাহা হউক, যদি মহাত্মা যুধিষ্ঠির, ভীমসেন, অর্জুন, পুরুষশ্রেষ্ঠ নকুল ও সহদেব তথায় গমন করিতে মানস করেন এবং ইহাদের পরম প্রিয়কারী ধর্মাত্মা বলদেব ও বাসুদেবের ইহাতে সম্মতি থাকে, তাহা হইলে স্বরাজ্যে গমন করুন; তাহাতে আমার কিছুমাত্র আপত্তি নাই।

তখন যুধিষ্ঠির কহিলেন, হে রাজন! আমি এবং আমার অনুজগণ আপনারই অধীন, অতএব আপনি যাহা আজ্ঞা করিবেন, তাহা আমাদের শিরোধাৰ্য্য ও অবশ্য কর্তব্য কাৰ্য। কৃষ্ণ কহিলেন,—পাণ্ডবগণের স্বদেশগমনে আমার সম্পূর্ণ মত আছে; অথবা সর্ব-ধর্মবিৎ মহারাজ দ্রুপদের যে মত, আমারও সেই মত।

দ্রুপদ কহিলেন,মহাবাহু পুরুষশ্রেষ্ঠ বাসুদেব যাহা কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করিতেছেন, তদ্বিষয়ে আমার ও সম্পূর্ণ মত আছে। মহাভাগ গণ্ডিবগণ আমার ও কৃষ্ণের উভয়েরই সুহৃৎ, বিশেষতঃ পুরুষোত্তম বাসুদেব পাণ্ডবগণের যেরূপ মঙ্গচিন্তা করেন, মহাত্মা যুধিষ্ঠির স্বয়ং সেরূপ করিতে পারেন না।

পাণ্ডবগণ এইরূপে পদকর্তৃক স্বরাষ্ট্র গমনে সমনুজ্ঞাত হইয়া কৃষ্ণা ও যশস্বিনী কুন্তীকে সঙ্গে লইয়া কৃষ্ণ ও বিদুরের সমভিব্যাহারে পরমসুখে হস্তিনা নগরে গমন করিলেন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুনন্দনগণ আগমন করিতেছেন শুনিয়া তাহাদের প্রত্যুমনের নিমিত্ত কৌরবগণ এবং ধনুর্ধর বিকর্ণ,চিত্ৰসেন, দ্রোণ ও কৃপাচার্যকে পাঠাইলেন। মহাবলপরাক্রান্ত পাণ্ডবগণ সেই সমুদায় জনগণকর্তৃক পরিবৃত হইয়া ক্রমে ক্রমে হস্তিনাপুরমধ্যে প্রবেশ করিলেন। তাঁহারা নগরে প্রবেশ করিবামাত্র নগরের সমস্ত লোক সাতিশয় কৌতূহলক্রান্ত হইল। তখন সমাগত যাবতীয় প্রিয়চিকীষু পুরবাসিগণ মহাত্মা পাণ্ডুতনয়দিগকে নানাপ্রকার স্তব করিতে লাগিল। তাহারা কহিল, এই সেই ধর্মজ্ঞ পুরুষশ্রেষ্ঠ পুনর্বার আগমন করিতেছেন, যিনি আমাদিগকে স্বীয় পুত্রের ন্যায় ধর্মানুসারে প্রতিপালন করেন। এই ধৰ্মাত্মা এখানে আসাতে বোধ হইতেছে, যেন সেই লোকপ্রিয় মহারাজ পাণ্ডু আমাদের হিতসাধনার্থে বন হইতে প্রত্যাগত হইলেন। আহা! আজি পণ্ডিতনয়গণ নগরে পুনরাগত হওয়াতে আমাদের কি পৰ্য্যন্ত আহ্লাদ হইতেছে। আমরা যদি কখন দান করিয়া থাকি, যদি হোম করিয়া থাকি এবং যদি তপস্যা করিয়া থাকি, তবে সেই পুণ্যফলে পাণ্ডুনন্দনগণ শতায়ু হইয়া এই নগরে বাস করুন।

তদনন্তর পাণ্ডুতনয়গণ জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্র, ও পিতামহ ভীষ্ম এবং অন্যান্য গুরুজনের পদবন্দন করিলেন। পৌরগণ তাহাদিগকে কুশল জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। পরিশেষে তাঁহারা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অজ্ঞানুসারে গৃহঁমধ্যে প্রবেশ করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন।

পাণ্ডুনন্দনগুণ কিয়ৎক্ষণ বিশ্রাম করিলে পর, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও ভীষ্ম তাঁহাদিগকে আহ্বান করিয়া আনিলেন। ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, বৎস কৌন্তেয়! তুমি ভ্রাতৃগণের সহিত আমার বাক্য শ্রবণ ও তাহার মর্ম বিবেচনা কর। তোমরা রাজ্যের অর্ধাংশ গ্রহণ করিয়া খাণ্ডবপ্রস্থে গিয়া বাস কর, তাহা হইলে দুৰ্য্যোধনাদির সহিত তোমাদিগের পুনরায় বিবাদ হইবার আর সম্ভাবনা নাই। যেমন সুরপতি দেবগণকে রক্ষা করেন, অর্জুন খাণ্ডবপ্রস্থে তোমাদিগকে সেইরূপ রক্ষা করিলে আর কেহই তোমাদের অনিষ্ট করিতে পারিবে না।

পাণ্ডবগণ অর্ধরাজ্য প্রাপ্তির অনুমতি পাইয়া রাজাজ্ঞা স্বীকার ও তদীয় চরণে প্রণিপাতপূর্বক কৃষ্ণ সমভিব্যাহারে অরণ্যপথে খাণ্ডবপ্রস্থে প্রবেশ করিলেন। তাঁহাদিগের আগমনে খাণ্ডবপ্রস্থ অলঙ্কত ও সুরনগরীর ন্যায় সুশোভিত হইল। তৎপরে তাঁহারা কোন পবিত্র স্থানে শান্তিকাৰ্য্য সমাধা করিয়া নগরের পরিমাণ করিতে লাগিলেন। ঐ নগর সমুদ্রসদৃশ পরিখাদ্বারা অলঙ্কত; পাণ্ডুবর্ণ মেঘমালা ও হিমরশ্মির ন্যায় গগনস্পর্শী প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত; শ্বেতনাগ সমাবৃত পাতাল-গঙ্গা ভোগবতীর ন্যায় সুশোভিত; গরুড়ের ন্যায় দ্বিপক্ষ দ্বারসমূহ ও পরম রমণীয় সৌধসমূহে সমাকীর্ণ; মন্দর ভূধরের ন্যায় অত্যুন্নত; অস্ত্রসস্ত্র-সুরক্ষিত গোপুরসদায়ে সুশোভিত; ভীষণ ভুজঙ্গমাকার শক্তি, তীক্ষ্ণ অঙ্কুশ, শতী, লৌহচক্র প্রভৃতি অস্ত্রকলাপ, যন্ত্র সমুদায় ও তল্পসমূহদ্বারা অলঙ্কৃত এবং যোধগণ কর্তৃক সুরক্ষিত। ঐ নগরমধ্যে সুবিস্তৃত রাজপথ সকল সুবিভক্ত রহিয়াছে। কোন প্রকার দৈবী পীড়া নাই; সুধাধবলিত বিবিধ পরমোৎকৃষ্ণ ভবন সমুদায় চতুর্দিকে শোভা পাইতেছে। ফলতঃ ইন্দ্রপ্রস্থনগর তৎকালে নভোমণ্ডলস্থ বিদ্যুৎ-সমাবৃত মেঘবৃন্দের ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। উহার মধ্যে পরম রমণীয় প্রদেশে কুবের-গৃহতুল্য ধনসম্পন্ন কৌরবগৃহ বিরাজিত রহিয়াছে। নগরের চতুর্দিকে আত্ম, আম্ৰাতক, নীপ, অশোক, চম্পক, পুন্নাগ, নাগপুষ্প, লুকুচ, পনস, শাল, তাল, তমাল, বকুল, কেতক, প্রাচীনামলক, লোখ্র, অঙ্কোল, জন্তু, পাটল, কুজক, অতিমুক্তক, করবীর, পারিজাতপ্রভৃতি ফলপুষ্পভরানমিত সুমনোহর বৃক্ষ সমুদায়ে পরিপূর্ণ উদ্যান সকল শোভা পাইতেছে। ঐ সমস্ত উদ্যানে মত্ত ময়ূর, কোকিল প্রভৃতি বিবিধ সুকণ্ঠ পক্ষিগণ সর্বদা মধুরস্বরে গান করিতেছে। আদর্শের ন্যায় স্বচ্ছ বহুবিধ গৃহ, মনোহর লতাগৃহ ও বিচিত্র চিত্ৰগৃহ সকল উহার মনোহারিণী শোভা সম্পাদন করিতেছে। হংস, বক, চক্রবাক, কারণ্ডব প্রভৃতি নানাজাতীয় জলচর পক্ষিগণে শোভিত, স্বচ্ছজলপরিপূর্ণ, পদ্মরেণু সুবাসিত, বৃহৎ বৃহৎ বাপৗ, সরোবর, পুষ্করিণী ও তড়াগ সমুদায় উহাতে শোভা পাইতেছে। ঐ নগর মধ্যে ক্রমে ক্রমে সর্ববেদবো ব্রাহ্মণগণ সর্বভাষাবিশারদ ব্যক্তিগণ, ধনাকাঙক্ষী বণিকগণ এবং শিল্পোপজীবী সুনিপুণ জনগণ আসিয়া বাস করিতে লাগিল।

পাণ্ডবগণ খাণ্ডবপ্রস্থের পরম রমণীয় শোভা নিরীক্ষণ করিয়া অতিমাত্র প্রীত হইলেন এবং পিতামহ ভীষ্ম ও জ্যেষ্ঠতাত ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে তথায় বাস করিতে লাগিলেন। ইন্দ্রতুল্য মহাধনুর্ধর পঞ্চপাণ্ডব বাস করাতে খাণ্ডবপ্রস্থের পূর্বাপেক্ষা অধিকতর রমণীয়তা পরিবর্ধিত হইল। মহাবীর বাসুদেব ও বলদেব পাণ্ডবদিগকে খাণ্ডববনগরে রাখিয়া তাহাদিগের অনুমতি গ্রহণপূর্বক দ্বারবতী প্রস্থান করিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *