১৯. শ্রীকৃষ্ণের হস্তিনায় আগমণ সংবাদে কৌরবগণের পরামর্শ

মুনি বলে, শুন কুরুবংশ চূড়ামণি।
বিদুর আসিয়া অন্ধে কহেন কাহিনী।।
হস্তিনায় আসিবেন আপনি শ্রীপতি।
দুর্য্যোধনে বুঝাইতে ধর্মশাস্ত্র নীতি।।
সকল মঙ্গল রাজা হইবে তোমার।
সে কারণে শ্রীগোবিন্দ করে আগুসার।।
তোমার পূর্ব্বের ধর্ম্ম হইল উদয়।
সম্প্রীতি করিল কৃষ্ণ, হেন মনে লয়।।
সাবধানে মহারাজ পূজিবে কৃষ্ণেরে।
ত্যজিয়া কাপট্য শাঠ্য না করি অন্তরে।।
ভক্তের অধীন কৃষ্ণ, জানহ আপনে।
ভক্তিভাবে কৃষ্ণপূজা করহ যতনে।।
উভয় কুলের হিত চিন্তে নারায়ণ।
তোমার সভায় আসিবেন সে কারণ।।
সুমেরু সমান রত্ন অসংখ্য কাঞ্চন।
অশ্রদ্ধায় যদি কৃষ্ণে কর নিবেদন।।
তাহাতে নহেন প্রীত দেব দামোদর।
শ্রদ্ধায় অত্যল্প দিলে মানেন বিস্তর।।
শ্রদ্ধান্বিত হয়ে যেবা কৃষ্ণপূজা করে।
বিষম সঙ্কটে কৃষ্ণ উদ্ধারেন তারে।।
নররূপে পূর্ণব্রহ্ম আদি নারায়ণ।
সাবধান হয়ে তাঁরে পূজিবে রাজন।।
ইহা শুনি ধৃতরাষ্ট্র সানন্দ হৃদয়।
পুলকে পূর্ণিত তনু হৈল অতিশয়।।
বিদুরে চাহিয়া তবে বলিল বচন।
মনোবাঞ্ছা পূর্ণ মম হইল এখন।।
কুলক্ষয় হবে বলি জানি জগন্নাথ।
সে কারণে আসিবেন আমার সাক্ষাৎ।।
আমার ভাগ্যের কথা বলিতে না পারি।
প্রীতি করিবারে হেথা আসিবেন হরি।।
শ্রীকৃষ্ণের মতি হয় কুমতি নাশিনী।
দুর্য্যোধনে শান্তি বুঝাইবেন আপনি।।
ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ কৃপ আর দুর্য্যোধনে।
ডাক দিয়া আন শীঘ্র আমার সদনে।।
দেখি তারা কিবা বলে করিয়া বিচার।
কিরূপে পূজিতে যুক্তি দেয় সে আবার।।
শুনিয়া বিদুর তবে গেল সেইক্ষণ।
ডাক দিয়া আনাইল যত বিজ্ঞজন।।
ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কর্ণ সুবল-নন্দন।
আজ্ঞামাত্রে আনাইল যত সভাজন।।
সভাতে বসিল সবে সিংহ অবতার।
কহিতে লাগিল তবে অম্বিকা-কুমার।।
মম মনস্কাম পূর্ণ হৈল এতদিনে।
উভয় কুলের হিত চিন্তা করি মনে।।
রাজা দুর্য্যোধনে ধর্ম্মনীতি বুঝাইতে।
কৃষ্ণ আসিছেন এই হস্তিনা পুরীতে।।
কিরূপে পূজিব কৃষ্ণে, বলহ আমারে।
ইহার বিধান কিবা বলহ বিস্তারে।।
ইহা শুনি কহে ভীষ্ম গঙ্গার তনয়।
তোমার পূন্যের বলে হইল উদয়।।
অকপটে পূজা কর আনন্দে তাঁহারে।
বিভব বিস্তর দিয়া রাজ ব্যবহারে।।
যাহে প্রীত হন কৃষ্ণ, কহি শুন নীত।
বিচিত্র মন্দির এক করহ রচিত।।
ইন্দ্রের নগর তুল্য নগর প্রধান।
নানা রত্ন মাণিক্যেতে করহ নির্ম্মাণ।।
পথে পথে দেহ রাজা জলচ্ছত্র দান।
স্থানে স্থানে রত্নবেদী করহ নির্ম্মাণ।।
অগুরু চন্দন ছড়া দেহ ত নগরে।
করুক মঙ্গল বাদ্য প্রতি ঘরে ঘরে।।
গুবাক কদলী আনি রোপ সারি সারি।
স্থানে স্থানে নানা যজ্ঞ মহোৎসব করি।।
নটনটীগণ আর নর্ত্তকী গায়ন।
গোবিন্দ গুণানুবাদ করুক কীর্ত্তন।।
চারি জাতি প্রজা বন্দিবারে হৃষীকেশ।
দিব্য বস্ত্র অলঙ্কারে করুক সুবেশ।।
আগুসরি আন গিয়া দেবকী নন্দনে।
পূজা কর গোবিন্দেরে এমত বিধানে।।
তবে সুখ নরপতি হইবে তোমার।
মম চিত্তে লয় রাজা এইত বিচার।।
এতেক বলিল যদি ভীষ্ম মহামতি।
দ্রোণ কৃপ আদি সবে দিল অনুমতি।।
এইরূপে পূজা কৃষ্ণে হয় ত উচিত।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, মম এই লয় চিত।।
দুর্য্যোধন বলে, মম নাহি রুচে মন।
এইরূপে কৃষ্ণপূজা কোন প্রয়োজন।।
ক্ষত্রমধ্যে পৃথিবীতে কে করে বাখান।
কোন রাজগণ কৃষ্ণে করিল সম্মান।।
শিশুপাল রাজা ছিল বিখ্যাত ভুবনে।
কদাচিৎ মান্য নাহি করে নারায়ণে।।
কপট করিয়া কৃষ্ণ সংহারিল তারে।
জরাসন্ধ রাজা নিন্দা কলি তাহারে।।
গোবিন্দেরে সে বলিল গোয়ালা নন্দন।
ক্ষত্রিয় অধম বলি করিত গণন।।
ক্ষত্রসভা মধ্যে কভু বসিতে না দিল।
তেঁই সে ভীমের হাতে তাহারে মারিল।।
বড়ই কপট ক্রূর রুক্মিণীর পতি।
তারে মান্য কদাচ না করি নরপতি।।
মান্য কৈলে উপহাস করিবে সংসার।
ক্ষত্র রাজগণ যত, কৃষ্ণ মান্য কার।।
উপহাস হৈতে মৃত্যু বরং শ্রেষ্ঠ কর্ম্ম।
মান্য না করিল কেহ দেখি তার ধর্ম্ম।।
ইতর জনের প্রায় পূজি নারায়ণে।
যত বুঝাইবে, তাহা না শুনিব কানে।।
মোর মনে লয় রাজা এইত যুকতি।
ইহা শুনি কহে তবে ভীষ্ম মহামতি।।
ভাবে বুঝি, দুর্য্যোধন হারাইলে জ্ঞান।
না জানহ নারায়ণ পুরুষ-প্রধান।।
অমান্য করিতে তাঁরে চাহ অহঙ্কারে।
নারায়ণ মুহূর্ত্তেকে মারিবে সবারে।।
বাতি দিতে না রাখিবে কৌরব বংশেতে।
এত বলি ভীষ্ম বীর উঠে সভা হৈতে।।
আপন মন্দিরে গেল হয়ে ক্রুদ্ধমন।
যার যে শিবিরে গেল যত সভাজন।।
তবে দুর্য্যোধনে অন্ধ বলিল বচন।
যা বলিল ভীষ্ম, তাহা না কর হেলন।।
মান্য করি পূজ কৃষ্ণে, সবার নমস্য।
দুই কুল হিত কৃষ্ণ করিবে অবশ্য।।
তোমারে ভেটিতে আসে দেবকী কুমার।
তোমার ভাগ্যের সীমা কিবা আছে আর।।
শ্রদ্ধান্বিত হয়ে বৎস পূজ নারায়ণ।
শ্রদ্ধায় সকল কার্য্য হইবে সাধন।।
অল্প বা বিস্তর দেয় শ্রদ্ধা সহকারে।
অকপট হয়ে যেবা কৃষ্ণপূজা করে।।
আপনাকে দিয়া তাঁর বশ হন হরি।
সে কারণে কহি শুন কুরু অধিকারী।।
অকপট হয়ে তুমি পূজ নারায়ণ।
মম বাক্য কদাচিৎ না কর হেলন।।
দুর্য্যোধন বলে, তাত কহিলে যেমত।
তব আজ্ঞা হেতু আমি করিব সেমত।।
শিল্পকারগণে ডাকি বলে দুর্য্যোধন।
দিব্য রত্ন সিংহাসন করহ রচন।।
রত্নের মন্দির কর বিচিত্র আবাস।
বসিবে তাহাতে আসি দেব শ্রীনিবাস।।
নগরে নগরে কর পুষ্পের মন্দির।
পথে পথে স্থানে স্থানে রচহ শিবির।।
উৎসব করুক সদা সুখে সর্ব্বজনে।
নট নটী নৃত্য যেন করে স্থানে স্থানে।।
রাজ আজ্ঞা পেয়ে যত অনুচরগণ।
যে কহিল ততোধিক করিল গঠন।।
নগরে নগরে কবে রত্ন বাস ঘর।
স্থানে স্থানে যজ্ঞারম্ভ করিল বিস্তর।।
নানাবিধ বৃক্ষ রোপিলেক সারি সারি।
বিচিত্র শোভন যেন ইন্দ্রের নগরী।।
নগরেতে চারি জাতি যত প্রজাগণ।
সবাকারে চরগণ বলিল তখন।।
আসিবেন কৃষ্ণ আজি নৃপে ভেটিবারে।
আগু হৈয়া সবে গিয়া আনিবে তাঁহারে।।
শুনিয়া আনন্দে মগ্ন নগরের জন।
সুসজ্জ হইল ভেটিবারে নারায়ণ।।
মহাভারতের কথা অমৃতের ধার।
কাশী কহে, শ্রবণে ভবেতে হয় পার।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *