১৮. বীরবাহু রাজার উপাখ্যান

আর এক কথা কহি শুনহ রাজন।
একাদশী ব্রতের শুনহ বিবরণ।।
বীরবাহু রাজা ছিল বড় পুণ্যবান।
জনম অবধি রাজা করে নানা দান।।
বসন ভূষণ দান দেয় ত ব্রাহ্মণে।
যত দান করে তার নাহি পরিমাণে।।
প্রবাল মুকুতা মণি করিয়া ভূষিত।
স্বর্ণশৃঙ্গ রৌপ্যখুর যেই শাস্ত্রনীত।।
নব নব বৎস সহ গাভী দুগ্ধবতী।
লক্ষ লক্ষ গাভী দান কৈল নরপতি।।
বস্ত্র অলঙ্কার আর রথ সহ সাজ।
তুরঙ্গ করিল দান আর গজরাজ।।
যে কিছু আছিল রাজা সব দান কৈল।
সিংহাসন আদি করি দ্বিজে সব দিল।।
খাদ্যপূর্ব্ব দিল ধন ভাণ্ডারে যে ছিল।
কিছু ধন সেই রাজা বক্রী না থুইল।।
থাল ঝারি বাটা বাটী সব কৈল দান।
অনেক করিল দান নাহি পরিমাণ।।
আর কিছু নাহি ঘরে সব দ্বিজে দিল।
রাজা রাণী একবাস হইয়া রহিল।।
সন্ধ্যাতে আইল তবে এক দ্বিজবর।
শীঘ্র করি চলি গেলা রাজার গোচর।।
অসকালে দ্বিজবর গেল রাজ-স্থান।
আমি কিছু নাহি পাই শুনহ রাজন।।
পশ্চাৎ আইনু রাজা আমি নাহি পাই।
তব দান যশ কীর্ত্তি শুনি সর্ব্ব ঠাঁই।।
শুনিয়া দ্বিজের বাক্য রাজা ক্রোধ কৈল।
সকল লইয়া দ্বিজ এবে না ছাড়িল।।
বিষম ব্রাহ্মণজাতি বড়ই জঞ্জালে।
একবার ঘরে থুইয়া আইল সন্ধ্যাকালে।।
সর্ব্বস্ব করিয়া দান কুপিল রাজন।
অশ্ববিষ্ঠা অঞ্জলি করিয়া দিল দান।।
স্বস্তি বলি অশ্ববিষ্ঠা নিল দ্বিজবর।
অঞ্চলে বান্ধিয়া দ্বিজ চলিল সত্বর।।
পরম যতন করি দিল দ্বিজবরে।
অন্তঃপুরে গেল রাজা দ্বিজ গেল ঘরে।।
এই পাপ হৈল যদি রাজার শরীরে।
দান ফলে লক্ষগুণ বাড়ে নিরন্তরে।।
পূর্ব্বের যতেক দান সকল নাশিল।
অশ্ববিষ্ঠা পর্ব্বত প্রমাণ তবে হৈল।।
অশ্ববিষ্ঠা হৈল দুই পর্ব্বত শিখরে।
এত দান নাশ কৈল পাপ দানফলে।।
সেই দেশে বৈসে এক দেবীদাস মালী।
তাহার মালঞ্চেতে গন্ধর্ব্বে ফুল তুলি।।
গন্ধর্ব্বে তোলয়ে পুষ্প মালঞ্চ ভিতরে।
ফুল নাহি পায় মালী মহাশোক করে।।
দৈবযোগে এক দ্বিজ মালঞ্চে বসিয়া।
ত্রিলোচন পূজা কৈল হরষিত হৈয়া।।
দৈবের নির্ব্বন্ধ কিছু খণ্ডন না যায়।
শিবের নির্ম্মাল্য লাগে গন্ধর্ব্বের পায়।।
পাপ হৈল গন্ধর্ব্বের চলিতে না পারে।
রথ নাহি চলে তার স্বর্গের উপরে।।
হইল প্রভাতকাল দেখিল সকল।
চুরি করি নিল ফুল সেই পাপফল।।
মালী আসি গন্ধর্ব্বেরে বহু মন্দ বলি।
নৃপে শীঘ্র জানাইল করিয়া অঞ্জলি।।
রাজার নিকটে কহে সর্ব্ব বিবরণ।
অপূর্ব্ব শুনিয়া রাজা আইল তখন।।
পুছিলেন মহারাজ তুমি কোন জন।
কি নাম তোমার হেথা আইলে কি কারণ।।
গন্ধর্ব্ব বলেন, আমি ইন্দ্রের পালিত।
এই মালঞ্চের পুষ্প তুলি নিত্য নিত্য।।
পুষ্পদন্ত নাম মোর গন্ধর্ব্বের পতি।
কহিনু সকল কথা শুন মহামতি।।
রাজা বলে, স্বর্গে নাহি গেলে কি কারণ।
কোন কার্য্যে মনুষ্য করিলা দরশন।।
গন্ধর্ব্ব বলিল, মোর পাপ হৈল কায়।
তেকারণে মোর রথ স্বর্গে নাহি যায়।।
রাজা বলে, স্বর্গপুরে কোন পুণ্যে যাই।
ইহার কারণ তুমি বল মোর ঠাঁই।।
গন্ধর্ব্ব বলয়ে যেবা করে একাদশী।
সে আসি ছুঁইলে রথ হব স্বর্গবাসী।।
তবে মোর রথ চলে পাপ হৈয়া ক্ষয়।
এত শুনি চিন্তিত হইল মহাশয়।।
কিবা ব্রত একাদশী কেবা করে হেথা।
কেমন বিধান তার কিমত ব্যবস্থা।।
গন্ধর্ব্ব বলয়ে শুন রাজরাজেশ্বর।
তিথি একাদশী সেই হরির বাসর।।
আপনি গোবিন্দ হৈলা তিথি একাদশী।
একাদশী মাহাত্ম্য শুনহ পরকাশি।।
দশমীতে সংযম করিবে একাহার।
সদাচার হবিষ্যাদি বিবিধ প্রকার।।
একাদশী উপবাস নিরম্বু সাধিবে।
ফলমূল জলাহার নাহিক করিবে।।
দ্বাদশী পারণ করিবেক তারপর।
যাহাতে তরয়ে লোক এ ভব সাগর।।
পূর্ব্বে রুক্মাঙ্গদ রাজা ছিল মহীতলে।
রাজ্য সহ স্বর্গে গেল একাদশী ফলে।।
তোমার পুরেতে কেবা করে উপবাস।
তাহারে খুঁজিয়া রাজা আন মোর পাশ।।
শুনিয়া নৃপতি তবে বিচারিল দেশ।
না জানি ব্রতের নাম কহিতে বিশেষ।।
কিমত প্রকার সেই নাম একাদশী।
হেন নাহি জানি ব্রত রহে উপবাসী।।
লীলা নামে এক বেশ্যা ছিল ত নগরে।
মায়ের সহিত দ্বন্দ্ব করিল সত্বরে।।
একাদশী দিনে সেই থাকিল শুইয়া।
না খাইল অন্ন জল কোন্দল করিয়া।।
পুরুষ সহিত সেই না বঞ্চিল রাতি।
সেই বেশ্যা আনে বীরবাহু নরপতি।।
ছুঁইল গন্ধর্ব্বরথ চলিল তখন।
তাহা দেখি গন্ধর্ব্ব হইল হৃষ্টমন।।
অপূর্ব্ব দেখিল তবে বীরবাহু রায়।
করযোড়ে করি বলে গন্ধর্ব্বের পায়।।
মোর নিবেদন কিছু তোমার চরণে।
পাপ-পুণ্য কিবা মোর পুছহ ইন্দ্রস্থান।।
বারেক আসিয়া মোরে দিবে দরশন।
আজি হৈতে মৈত্র মোর করি নিবেদন।।
শুনিয়া গন্ধর্ব্ব তাঁরে কহিলা নিশ্চয়।
অবশ্য করিব কার্য্য নাহিক সংশয়।।
গন্ধর্ব্ব এতেক বলি গেলা স্বর্গপুরে।
কহিল সকল কথা গিয়া সুরেশ্বরে।।
শুনি সুরপতি গন্ধর্ব্বের হাত ধরি।
দেখাইল লৈয়া ইন্দ্র অপূর্ব্ব এক পুরী।।
সুবর্ণ রচিত পুরী অতি মনোহর।
সুবর্ণ পতাকা উড়ে ঘরের উপর।।
মণিময় মাণিক্যেতে করে ঝলমল।
অন্ধকার নাহি তাহে সদাই উজ্জ্বল।।
খাট পাট সিংহাসন আছে থর থরে।
মন্দ মন্দ পবন বহিছে সেই পুরে।।
শীতল সলিল তাহে বহে অনিবার।
পুরের নির্ম্মাণ দেখে চন্দ্রের আকার।।
সুবর্ণ প্রাচীর তার শোভে চারিভিতে।
দেবতার বাসযোগ্য কহিল তোমাতে।।
রতনের সিংহাসন রতন-মন্দির।
দেখিতে আনন্দ বড় দেবের শরীর।।
নানা উপহার দ্রব্য দেবের দুর্লভ।
একে একে গন্ধর্ব্বেরে দেখাইলে সব।।
এক সরোবর জল অমৃত-সমান।
তার মধ্যে পর্ব্বত আছয়ে দুইখান।।
তাহা দেখি গন্ধর্ব্ব জিজ্ঞাসে ইন্দ্রস্থানে।
জলমধ্যে পর্ব্বত আছয়ে কি কারণে।।
ইন্দ্র বলে, বীরবাহু বড় পুণ্যবান।
ত্রিভুবনে পুণ্য নাহি তাহার সমান।।
ধর্ম্মবলে এই পুরী পাইবে বসতি।
ভুঞ্জিবে সকল সুখ রাজা আসি ইথি।।
কিন্তু আগে কীট হৈয়া নরক ভুঞ্জিবে।
নরকপর্ব্বত এই নিশ্চিত পাইবে।।
অশ্ববিষ্ঠা দ্বিজবরে রাজা দিল দান।
দুই লক্ষগুণ হৈল পর্ব্বত-প্রমাণ।।
ইহা ত ভুঞ্জিলে তার পাপ হবে ক্ষয়।
তবে ত ভুঞ্জিবে পুণ্য কহিনু নিশ্চয়।।
শুনিয়া ব্যাকুল হৈল গন্ধর্ব্ব ঈশ্বর।
ইন্দ্রকে প্রণাম করি গেল নিজঘর।।
আর দিন গেলা তবে বাহুর মন্দিরে।
কহিল সকল কথা রাজার গোচরে।।
শুনিয়া ব্যাকুল রাজা পুছে গন্ধর্ব্বেরে।
কিমতে হইবে মোর পাপের উদ্ধারে।।
পুনর্ব্বার যাহ তুমি পুরন্দর স্থান।
এই যে নরক হবে কিসে পরিত্রাণ।।
আর দিন পুষ্পদন্ত সুরপুরে গেল।
ইন্দ্রের অগ্রেতে তবে কহিতে লাগিল।।
রাজা বীরবাহু যে করিল এই কর্ম্ম।
কহিবে কিমতে তার খণ্ডিবে অধর্ম্ম।।
কোন্ পুণ্যে পাপ তার হইবে মোচন।
কহ সুরপতি মোরে ইহার কারণ।।
ইন্দ্র বলে শুন এবে গন্ধর্ব্বের পতি।
দুহিতা লইয়া যদি থাকে নরপতি।।
কন্যা লয়ে গুপ্তে থাকে নহে পাপ মন।
রাজার দুর্ণীতি যদি দোষে সর্ব্বজন।।
তবে ত তাহার পাপ হইবে বিনাশ।
কন্যা লৈয়া নৃপতি নির্জ্জনে করু বাস।।
তবে তার এই পাপ হইবেক ক্ষয়।
আর কোনমতে পাপ দূর নাহি হয়।।
শুনিয়া গন্ধর্ব্ব গেল রাজার সদন।
বীরবাহু নৃপে কহে সব বিবরণ।।
শুনিয়া নৃপতি বড় দুঃখী হৈল মনে।
এমত দুর্ণীত কর্ম্ম করে কোন্ জনে।।
না করিলে পাই আমি নরক দুস্তর।
করিলেও অপকীর্ত্তি হবে চরাচর।।
শুনিয়া গন্ধর্ব্বরাজ দিলেন উত্তর।
কি হেতু আক্ষেপ তুমি কর নৃপবর।।
লোক অপযশ গাবে পরকাল রয়।
অবশ্য করিবে তাহা শুন মহাশয়।।
ধর্ম্মচিন্তা কর রাজা আপন মঙ্গল।
ধর্ম্মেতে বিরাগ যেন নহে তব স্থল।।
এত বলি পুষ্পদন্ত নিজস্থানে গেল।
দুহিতা লইয়া রাজা নির্জ্জনে চলিল।।
নারীগণ ত্যজি রাজা দুহিতা লইয়া।
নির্জ্জনে করিল বাস একত্র হইয়া।।
দুহিতা সঙ্গতি একা রহে নরপতি।
নৃপপাশে রহে কন্যা ষোড়শী যুবতী।।
সকল দেশেতে রাজার হইল অখ্যাতি।
কন্যার সহিত রহে রাজা মহামতি।।
রাজ্যসহ সর্ব্বলোক করে হাহাকার।
রাজা পাপী হৈল করে কন্যা পরদার।।
কেনে দুষ্টমতি হৈল না বুঝি কারণ।
বুঝি রাজা করিবেক নরকে গমন।।
ইহার যে দেখে মুখ সেই হবে পাপী।
এমত রাজ্যেতে আর না রব কদাপি।।
যত দান ধর্ম্ম কৈল সব নষ্ট হৈল।
কন্যারে হরিয়া রাজা নরকে পড়িল।।
কেহ বলে, হেন কর্ম্ম কৈল কোন্ জন।
অধর্ম্ম করিয়া করে দুহিতা গমন।।
এই বাক্য নগরে ঘোষয়ে সর্ব্বজন।
বৃদ্ধ যুবা বাল্য আদি যত নারীগণ।।
যথা তথা বসি লোক এই কুৎসা গায়।
যত কহে তত রাজার পাপ হয় ক্ষয়।।
সর্ব্বদা বলয়ে লোক পথে ঘাটে মাঠে।
যত কহে তত সেই অশ্ববিষ্ঠা টুটে।।
যেই যেই কহে সেইপাপ বাটি লয়।
নগর-বাহিরে তার এক তাঁতি রয়।।
পরম ধর্ম্মিক সেই কৃষ্ণপরায়ণ।
তাঁত বুনে সদা করে হরিসর্ঙ্কীর্ত্তন।।
হরি হরি সদা সেই বলে অনুক্ষণ।
সদাই করেন হরিনাম উচ্চারণ।।
পুরাণ শ্রবণ আর হরি হরি বলে।
ধীরে ধীরে বলে কভু, কভু উচ্চস্বরে।।
সতত বলয়ে তাঁতি হরি হরি হরি।
এই মতে তিনবার বলে উচ্চস্বরী।।
সে তাঁতি রাজার নিন্দা কভু নাহি করে।
হরিনাম বিনা তার নাহিক অন্তরে।।
কতদিনে আইল তবে গন্ধর্ব্বের নাথ।
আসিয়া রাজার সনে করিল সাক্ষাৎ।।
রাজা বলে, কহবন্ধু আপন কুশল।
আমার পাপের ভার গেল কি সকল।।
পুষ্পদন্ত বলে রাজা বলিতে না পারি।
আছে কি গিয়াছে অশ্ববিষ্ঠা স্বর্গপুরী।।
রাজা বলে গন্ধর্ব্বেরে বিনয় বচন।
কৃপা করি কহ মোরে এ সব কথন।।
গন্ধর্ব্ব বলিল, আমি যাই স্বর্গপুরী।
তবেত সে সব কথা কহিব বিস্তারি।।
তদন্তরে পুষ্পদন্ত স্বর্গপুরে গেল।
রাজার দুয়ারে বিষ্ঠামুষ্টিক দেখিল।।
ইহা দেখি পুষ্পদন্ত বিস্ময় হইল।
সত্বর হইয়া তবে ইন্দ্রপাশে গেল।।
এই সব কথা তবে পুছে ইন্দ্রস্থানে।
মুষ্টিক প্রমাণ রহে কিসের কারণে।।
ইন্দ্র বলে, শুন এবে গন্ধর্ব্বের পতি।
তাঁতি বলে, পাপ নাহি করে নরপতি।।
তেকারণে কিছু পাপ রহিল রাজার।
যত দান কৈল তত বিষ্ঠা আছে আর।।
যদি একাদশী ব্রত করিবে রাজন।
তবেত রাজার পাপ হইবে মোচন।।
শুনিয়া কহিল আসি গন্ধর্ব্বের পতি।
তবে একাদশী কৈল নৃপ মহামতি।।
খণ্ডিল সকল পাপ রাজার শরীরে।
মরিয়া ত গেল রাজা ইন্দ্রের নগরে।।
ইহার অধিক ব্রত নাহি যুধিষ্ঠির।
একাদশী কর তুমি মন কর স্থির।।
একাদশী-ব্রতাধিক নাহি ধর্ম্ম রায়।
একাদশী মাহাত্ম্য আমি কহিনু তোমায়।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *