১৮. দেবগণকে নিমন্ত্রণ করিতে অর্জ্জুনের যাত্রা

জন্মেজয় বলে, শুনি যজ্ঞ-বিবরণ।
কোন্ দিক হৈতে এল কোন্ কোন্ জন।।
কত সৈন্য সঙ্গে আসে কত কর লৈয়া।
পিতামহে কোন্ রূপে ভেটিল আসিয়া।।
দেব-নিমন্ত্রিতে পার্থ করিলেন গতি।
কিরূপে আইল তথা দেব পশুপতি।।
বিস্তারিয়া কহ মুনি, ভাঙ্গ মনো-ধন্ধ।
পিতামহগণ-কথা যে মকরন্দ।।
মুনি বলে, নরপতি কর অবধান।
কিছু অল্প কহি, শুন প্রধান প্রধান।।
কপিধ্বজ-রথে পার্থ কৈল আরোহণ।
পবনের বেগ জিনি চলে অশ্বগণ।।
যতেক পর্ব্বত-পৃষ্ঠে যত রাজা বৈসে।
সবা নিমন্ত্রিয়া যান পর্ব্বত কৈলাসে।।
কুবেরেরে কহেন সকল বিবরণ।
ধর্ম্ম-রাজসূয়-যজ্ঞে করিবা গমন।।
যক্ষ রক্ষ গন্ধর্ব্ব কিন্নর আদি করি।
আর যত মহাজন বৈসে এই পুরী।।
প্রত্যক্ষে সবারে আমি কৈনু নিমন্ত্রণ।
সবে লয়ে যজ্ঞস্থানে করিবা গমন।।
কুবের স্বীকার করে অর্জ্জুন-বচনে।
যাইব তোমার যজ্ঞে সহ নিজগণে।।
কুবেরের বাক্যে প্রীত হইয়া অর্জ্জুন।
সবিনয়ে কৃতাঞ্জলি কহিছেন পুন।।
ইন্দ্রলোকে যাব ইন্দ্রে করিতে বরণ।
কোন্ পথে যাব, সঙ্গে দেহ জ্ঞাত জন।।
কুবের করিল আজ্ঞা চিত্রসেন প্রতি।
অর্জ্জুনের সঙ্গে যাহ কথা সুরপতি।।
আজ্ঞামাত্র চিত্রসেন চলে শীঘ্রগতি।
কপিধ্বজ-রথে বৈসে হইয়া সারথি।।
সেখান হইতে যান ইন্দ্রের নন্দন।
কত দূরে দেখিলেন হরের ভবন।।
জিজ্ঞাসেন ধনঞ্জয় এ কাহার পুরী।
চিত্রসেন বলে হেথা বৈসে ত্রিপুরারি।।
যজ্ঞ-হেতু ‍নিমন্ত্রণ কর ত্রিলোচনে।
সর্ব্বকার্য্যে সিদ্ধ হৈবে হরের গমনে।।
এত শুনি ধনঞ্জয় নামি রথ হৈতে।
উপনীত হন গৌরী-শঙ্কর অগ্রেতে।।
গৌরী প্রণমিয়া হরে করেন স্তবন।
হর বলিলেন, বর মাগ যাহে মন।।
অর্জ্জুন বলে, দেব ধর্ম্মের নন্দন।
তাঁর রাজসূয়-যজ্ঞে করিবা গমন।।
হাসিয়া শঙ্কর-গৌরী করেন স্বীকার।
নিশ্চয় যাইব মোরা যজ্ঞেতে তোমার।।
শঙ্কর বলেন, গিয়া হইব সহায়।
নির্ব্বিঘ্নে তোমার যজ্ঞ সাঙ্গ যেন হয়।।
পার্ব্বতী বলেন, যাব যজ্ঞের সদনে।
যজ্ঞেতে আসিবে যত রহে ত্রিভুবনে।।
সবে সুখী হইবেক প্রসাদে আমার।
অন্নপূর্ণা নাম মম বিখ্যাত সংসার।।
এই নাম লৈয়ে তব সূপকারগণ।
অল্প দ্রব্যে সুতৃপ্ত করুক বহু জন।।
অক্ষয় অব্যয় হৈবে অমৃত-সমান।
আর যার যাহে প্রীতি পাবে বিদ্যমান।।
হর-পার্ব্বতীর বর পেয়ে ধনঞ্জয়।
প্রণমিয়া চলিলেন সানন্দ-হৃদয়।।
চিত্রসেন বাহে রথা পবন-গমনে।
ক্ষণমাত্রে উপনীত ইন্দ্রের ভবনে।।
প্রণাম করেন পার্থ ভূমিষ্ঠ হইয়া।
ইন্দ্র পার্থে আলিঙ্গন দিলেন উঠিয়া।।
আপনার কোলে বসাইয়া দেবরাজ।
জিজ্ঞাসেন, কহ তাত কি তোমার কাজ।।
অর্জ্জুন বলেন, দেব তোমাতে গোচর।
রাজসূয় করিছেন ধর্ম্ম-নরবর।।
যেই যজ্ঞে অধিষ্ঠান হইবা আপনি।
আর যত স্বর্গ বৈসে সুর সিদ্ধ মুনি।।
ইন্দ্র কহেন, যজ্ঞে করিব আগুসার।
তুমি না আসিতে পূর্ব্বে করেছি বিচার।।
এই দেখ সুসজ্জিত যত দেবগণ।
চারি মেঘ, অষ্ট হস্তী, সকল পবন।।
স্বর্গের যতেক দ্রব্য পৃথিবী দুর্ল্লভ।
তব যজ্ঞ হেতু দেখ সাজাইল সব।।
এই আমি চলিলাম যজ্ঞের সদন।
তুমি যাহ অন্য জনে কর নিমন্ত্রণ।।
ইন্দ্রমুখে শুনি পার্থ আনন্দিত মন।
প্রণমিয়া অন্য দিকে করেন গমন।।
পৃথিবী দক্ষিণে সূর্য্য-সুতের ভবন।
তথাকারে চলিলেন ইন্দ্রের নন্দন।।
চিত্রসেন বাহে রথ পবনের গতি।
মুহূর্ত্তেকে উত্তরিল যথা প্রেতপতি।।
প্রণমিয়া বসিলেন অর্জ্জুন সভায়।
আশিস্ করিয়া যম জিজ্ঞাসেন তায়।।
কোন্ হেতু হেথা তব হৈল আগমন।
কি করিব প্রিয় কহ ইন্দ্রের নন্দন।।
অর্জ্জুন বলেন, দেব কর অবধান।
রাজসূয়-যজ্ঞস্থলে হৈবে অধিষ্ঠান।।
তোমার পুরীতে নিবসয়ে যত জন।
সবাকারে লৈয়া যজ্ঞে করিবা গমন।।
স্বীকার করেন যম পার্থের বচনে।
পুনরপি জিজ্ঞাসেন অর্জ্জুন শমনে।।
নারদ কহেন তব সভার কথন।
নিবসে এখানে, মর্ত্ত্যে মরে যত জন।।
শুনি দেবঋষি-মুখে পিতৃ-বিবরণ।
সেই বার্ত্তা পেয়ে রাজসূয়-আরম্ভণ।।
এখন সে সবে জনে না করি দর্শন।
কোথায় আছেন বল পিতা আদি জন।।
হাসিয়া বলেন যম তবে অর্জ্জুনেরে।
মৃতজনে দেখিবারে পাবে কি প্রকারে।।
জীয়ন্ত মৃতেতে হেথা নাহি দরশন।
শুনিয়া বিস্ময়াপন্ন পাণ্ডুর নন্দন।।
যমে নিমন্ত্রিয়া বীর মাগিল মেলানি।
বরুণ-আলয়ে যান বীর-চূড়ামণি।।
পশ্চিম-দিকেতে জলপতির আলয়।
তথাকারে চলিলেন বীর ধনঞ্জয়।।
বরুণেরে কহেন যজ্ঞের বিবরণ।
ধর্ম্ম-যজ্ঞ-স্থানে তুমি করিবা গমন।।
তোমার পুরেতে আর যত জন বৈসে।
সবারে লইয়া সঙ্গে যাবে মম বাসে।।
বরুণ বলিল, যজ্ঞে করিব গমন।
যজ্ঞেতে লইব পুরে আছে যত জন।।
কেবল দানব দৈত্যে নাহি অধিকার।
যত যত জন আছে আলয়ে আমার।।
তাহা সবা লইবারে যদি আছে মন।
আপনি তথায় গিয়া কর নিমন্ত্রণ।।
বরুণ-বচনে তবে যান ধনঞ্জয়।
কত দূরে ভেটিল দানব-রাজ ময়।।
ময় জিজ্ঞাসিলে পার্থ কহেন সকল।
পূর্ব্ব-উপকার স্মরি স্বীকার করিল।।
হেথায় নিবসে যত দৈত্যাদি দানব।
বলেন আমার যজ্ঞে লৈয়ে যাবে সব।।
এত শুনি ময় তাঁরে বলিল বচন।
সবারে লইয়া যজ্ঞে করিব গমন।।
তুমি চলি যাহ যথা আছে প্রয়োজন।
শুনিয়া অর্জ্জুন করিলেন আলিঙ্গন।।
তথা হৈতে যান পার্থ পৃথিবী দক্ষিণে।
লঙ্কাপুর নিমন্ত্রিতে রাজা বিভীষণে।।
রথ চালাইয়া দিল তারা যেন ছুটে।
কতক্ষণে উত্তরিল লঙ্কার নিকটে।।
ইন্দ্র-যম-পুরী যেন বিচিত্র নির্ম্মাণ।
রাক্ষসের লঙ্কাপুরী তাহার সমান।।
পুরী দেখি বড় প্রীত বীর ধনঞ্জয়।
চলিলেন যথা বিভীষণের আলয়।।
সিংহাসনে বসেছিল রাক্ষস-ঈশ্বর।
প্রণাম করেন গিয়া ইন্দ্রের কোঙর।।
জিজ্ঞাসেন বিভীষণ, তুমি কোন্ জন।
প্রত্যক্ষে সকল কথা কহেন অর্জ্জুন।।
রাজসূয়-যজ্ঞ করিছেন যুধিষ্ঠির।
তোমা নিমন্ত্রিতে কহিলেন যদুবীর।।
অর্জ্জুনের মুখে শুনি হৃষ্টচিত্ত হৈয়ে।
বসাইল ধনঞ্জয়ে আলিঙ্গন দিয়ে।।
তব যজ্ঞে যাইব, দেখিব নারায়ণ।
সঙ্গেতে লইব পুরে আছে যত জন।।
তুমি যাহ, যথা তব থাকে প্রয়োজন।
এই আমি চলিলাম যজ্ঞের সদন।।
বিভীষণে নিমন্ত্রিয়া ইন্দ্রের কুমার।
ইন্দ্রপ্রস্থে নিজপুরে যান পুনর্ব্বার।।
রাজগণ-নিমন্ত্রণে দূতগণ গেল।
শ্রুতমাত্র নৃপগণ সকলে আসিল।।
দূতবাক্য হেলা করি না আসে যে জন।
অর্জ্জুন আনেন তারে করিয়া বন্ধন।।
সভাপর্ব্ব সুধা-রস রাজসূয়-কথা।
কাশীরাম দাস কহে, সুধাসিন্ধু গাথা।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *