১৮১. আগ্নেয়গিরি-বিবরণ

১৮১. আগ্নেয়গিরি-বিবরণ

একাশীত্যধিকশততম অধ্যায়

গন্ধর্বরাজ কহিলেন, হে অর্জুন! ভগবান্ পরাশর মহর্ষি বশিষ্ঠকর্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া সৰ্বজন পরাভব হইতে আত্মক্রোধ সম্বরণ করিলেন। কিন্তু পিতৃবধরূপ মহাপরাধ স্মরণপূর্বক অতি বিস্তীর্ণ এক রাক্ষসপত্রানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। ঐ যজ্ঞে কি বালক, কি বৃদ্ধ, কি যুব, সমুদায় রাক্ষস দগ্ধ হইতে লাগিল। মহর্ষি বশিষ্ঠ পৌত্রের দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞা অন্যথা করা উচিত নহে ভাবিয়া তাঁহাকে রাক্ষসবধস্বরূপ অধ্যবসায় হইতে নিবারণ করিলেন না। পরাশর সেই রাক্ষসযজ্ঞে প্রদীপ্ত বহ্রিত্ৰমধ্যে চতুর্থ বহ্রির ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন। শরৎকালে দিবাকর নভোমণ্ডলকে যাদৃশ প্রকাশিত কবেন, সেইরূপ সেই নির্মল যজ্ঞ অস্থিতি প্রদত্ত হইলে নভোমণ্ডল উদ্ভাসিত হইল। বশিষ্ঠ প্রভৃতি মহর্ষিগণ শক্তি নন্দন পরাশরকে তেজঃপ্রভাবে দীপ্যমান দ্বিতীয় ভাস্কর বলিয়া মনে করিতে লাগিলেন।

অনন্তর সেই অনন্যসুলভ সত্ৰ সমাপন করিবার নিমিত্ত উদারবুদ্ধিসম্পন্ন মহর্ষি অত্রি তথায় আগমন করিলেন। আর রাক্ষসদিগের প্রাণরক্ষাৰ্থ তথায় পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও মহাক্রুতু উপনীত হইলেন। তন্মধ্যে পুলস্ত্য রাক্ষসবধবিষয়ে পরাশরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন,-বৎস! তোমার তপস্যার কুশল ত? নির্দোষ ও অপরিজ্ঞাত রাক্ষসদিগকে সংহার করিয়া তোমার মনে কি আনন্দ সঞ্চার হইতেছে? তুমি আমাদিগের প্রজার উচ্ছেদ করি ও না। দ্বিজাতি তপস্বিদিগের এরূপ ধর্ম নহে। হে পরাশর! শান্তিগুণই আমাদিগের পরম ধর্ম, তুমি সেই ধর্ম অবলম্বন কর। শ্রেষ্ঠ হইয়া তুমি কেন ধর্মবিগর্হিত কর্ম অনুষ্ঠান করিতেছ? তোমার পিতা শক্তি পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁহাকে অতিক্রম করা ও মদীয় প্রজাসকল নির্মল করা তোমার উচিত নহে। শক্তির নিজ শাপপ্রভাবে তৎকালে বিষম বিপদ উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি আত্মদোষেই দেহ পরিত্যাগপূর্বক স্বর্গলাভ করিয়াছেন। তাঁহাকে ভক্ষণ করিতে কোন রাক্ষসেরই সাহস হইত না। তিনি আপনিই আপনার মৃত্যুপথ পরিষ্কার করিয়াছিলেন। কেবল মহর্ষি বিশ্বামিত্র তদ্বিযয়ে নিমিত্তমাত্র হইয়া দোষভাগী হইলেন। এক্ষণে মহারাজ কল্মাষপাদ স্বর্গে আরোহণ করিয়া মহানন্দে কালযাপন করিতেছেন। আর তোমার পিতৃব্যদিগেরও সুরগণসমভিব্যাহারে মহার্হর্ষে কালক্ষেপ হইতেছে। হে বৎস! মহর্ষি বশিষ্ঠ এ সকল বিষয় ও নির্দোষ রাক্ষসদিগের উচ্ছেদ ব্যাপার অবগত আছেন। তুমি কেবল এই সলের কারণমাত্র। অতএব এক্ষণে আর যজ্ঞ করিও না। তোমার যজ্ঞসমাপ্তি ফল লাভ হউক, তুমি কুশলে থাক। গন্ধর্ব কহিলেন, শক্তি নন্দন পরাশর পুলস্ত্য ও মহর্ষি বশিষ্ঠ কর্তৃক এইরূপ অভিহিত হইয়া সেই রাক্ষসসত্ৰ সমাপন করিলেন এবং যজ্ঞৰ্থসঞ্চিত অগ্নিকে হিমালয়ের উত্তর পার্শ্বে এক মহাবনে নিক্ষেপ করিলেন। অদ্যাবধি সেই অগ্নিকে প্রতিপৰ্ব্বে রাক্ষস, বৃক্ষ ও প্রস্তর সহিত পৰ্বত দগ্ধ করিতে দেখা যায় এবং ঐ অগ্নিধারী গিরি অদ্যাপি লোকে আগ্নেয় পৰ্বত বলিয়া প্রসিদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *