১৮০. বাড়ব-বহ্নির উৎপত্তিকথা

১৮০. বাড়ব-বহ্নির উৎপত্তিকথা

অশীত্যধিকশততম অধ্যায়।

ঔর্ব কহিলেন, হে পিতৃগণ! আমি ক্রোধমূর্চ্ছিত হইয়া সৰ্বলোক সংহারের যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, তাহা অন্যথা হইবে না। বৃথা রোষ ও বৃথা প্রতিজ্ঞা করিতে আমার অভিরুচি হয় না। ক্ষত্রিয়দিগের অত্যাচারে যদি প্রতীকার না হয়, তাহা হইলে প্রজ্বলিত অগ্নি যেমন যজ্ঞীয় কাষ্ঠরাশি দাহন করে, সেইরূপ ক্রোধ আমাকে নিরন্তর দগ্ধ করিবে। যিনি কারণবশতঃ উত্তেজিত ক্রোধে ক্ষমা প্রদর্শন করেন, সেই মনুষ্য কদাচ ত্রিবর্ণ রক্ষায় সম্যক্ সমর্থ হয়েন না। অশিষ্টের নিয়ন্ত ও শিষ্টের প্রতিপালয়িতা ক্রোধকে বিজিগীষু রাজার। অবসরক্ৰমে প্রকাশ করিয়া থাকেন। যৎকালে ক্ষত্রিয়গণ ভগবদিগকে বধ করেন, আমি তখন ঊরুস্থ ও গর্ভশয্যাগত হইয়া মাতৃবর্গের অতি করুণ কণ্ঠস্বর শ্রবণগোচর করিয়াছিলাম। যখন ক্ষত্রিয়াপসদের গর্ভস্থ শিশু সন্তান অবধি সমুদায় ভৃগুবংশ উচ্ছেদ করিতে আরম্ভ করে, তদবধি আমি তাহাদের প্রতি বিষম ক্রোধাবিষ্ট হইয়াছি। আমার পিতৃ ও মাতৃবর্গ সম্পূর্ণ উদ্বিগ্ন হইয়া ভয়বিহ্বলচিত্তে ত্রিলোকমধ্যে কুত্রাপি আশ্রয় পাইলেন না। যখন দুরাত্মারা ভৃগুপত্নীদিগের সংহারে পরান্মুখ হইল, তখন মদীয় জননী ঊরুদেশে আমাকে ধারণ করিয়াছিলেন। ইহলোকে পাপের প্রতিষেধকর্তা বিদ্যমান থাকিলে কেহই পাপপঙ্কে লিপ্ত হইতে প্রবৃত্ত হয় না। তাহার অবিদ্যমানে অনেকেই পাপকর্মে আসক্ত হয়। সামর্থ্য থাকিতেও যিনি সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া পাপাচার পরিহার না করেন, নিগ্রহানুগ্রহশক্ত হইয়াও তাঁহাকে মহাপাপে লিপ্ত হইতে হয়। সকল রাজলোক ও অধীশ্বরবর্গ, জীবলোকে জীবন রক্ষা করা শ্রেয়ঃকল্প বিবেচনা করিয়া শক্তিসত্ত্বেও কেহই আমার পিতৃগণকে মরণভয় হইতে পরিত্রাণ করিলেন না। এক্ষণে আমিই সকলের অধীশ্বর হইয়াছি। বিষম রোষানলে আমার অন্তঃকরণ নিরন্তর দগ্ধ হইতেছে। অতএব আপনাদিগের প্রতিষেধবাক্যে অনুমোদন করিতে সমর্থ নহি। আমি ঈশ্বর হইয়াও যদি লোকের পাপভয়ে উপেক্ষা করি, তাহা হইলে আমার যে ফ্রোধানল লোকদিগকে দগ্ধ করিতে উদ্যত হইয়াছে; তাহা নিগৃহীত হইলে নিজ তেজঃপ্রভাবে আমাকেই নিশ্চয় দগ্ধ করিবে। আমি আপনাদিগের সর্বলোকহিতৈষিতা পরিজ্ঞাত হইয়াছি; অতএব সকলের পক্ষে এক্ষণে যাহা শ্রেয়। বোধ হয়, আপনারা তাহার বিধান করুন।

পিতৃগণ কহিলেন, হে বৎস! তোমার যে ক্রোধানল লোকদিগকে ভস্মসাৎ করিতে অভিলাষ করিয়াছে, তাহা জলমধ্যে নিক্ষেপ কর, তোমার মঙ্গল হইবে। সকল লোকই জলে প্রতিষ্ঠিত, রস সমুদায় জলময় এবং জগৎ ও জলস্বরূপ; অতএব তোমার ফ্রোধানল জলমধ্যে নিক্ষেপ করাই উচিত হইতেছে। যদি অভিলাষ হয়, তাহা হইলে জলনিধির জলে ক্রোধানল স্থাপিত করিয়া শীতল হও। জল দগ্ধ করিলে লোকদিগকেও দগ্ধ কর হইবে; কারণ, সমুদায় লোকই জলময়। এইরূপ হইলে তোমার প্রতিজ্ঞ। অন্যথা হইবে না। আর দেবতারা ও মনুণ্যেরা সকলেই অপরাভূত থাকিবেন।

বশিষ্ঠদেব কহিলেন,—ভৃগুনন্দন ঔব বরুণনিলয়স্বরূপ মহাসাগরে ক্রোধানল পরিত্যাগ করিলেন। সেই অনল সমুদ্রজল ভক্ষণ করিতে লাগিল। ঐ ক্রোধানল অগ্ন্যুদগারী মহৎ হয়শিরোরূপে পরিণত হইয়া সমুদ্রজল পান করিয়া থাকে। বেদবিৎ পণ্ডিতেরা ইহাকেই বড়বানল কহেন। অতএব হে পরাশর! পরলোক পরিজ্ঞাত হইয়া লোকের প্রাণসংহারে ক্ষান্ত হও, তোমার মঙ্গল হইবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *