১২. পাণ্ডবদিগের অন্বেয়ণার্থ দুর্য্যোধনের চর প্রেরণ

অজ্ঞাতে বঞ্চেন হেথা পাণ্ডুর নন্দন।
হস্তিনাপুরেতে তথা রাজা দুর্য্যোধন।।
লক্ষ লক্ষ চরগণে ‍পাঠান ত্বরিত।
পাণ্ডবের অন্বেয়ণে যায় চতুর্ভিত।।
দুর্য্যোধন বলে, যেই পাণ্ডবে দেখিভে।
পাণ্ডবে দেখেছি বলি যে আসি বলিবে।।
ধন জন রাজ্য দিব,বহুত ভাণ্ডার।
রাজ্যভোগ ভুঞ্জিবেক সহিত আমার।।
এত বলি দূতগণে দিল বহু ধন।
পাঠাইল অষ্টদিকে লক্ষ লক্ষ জন।।
এক বর্ষ পাণ্ডবেরে খুঁজে সর্ব্বজন।
ভ্রমিয়া সকল দেশ আসে দূতগণ।।
নমস্কার করি নৃপে করযোড়ে কয়।
বহু খুঁজিলাম রাজা পাণ্ডুর তনয়।।
গ্রাম দেশ নগরাদি যত জনপদ।
তড়াগ নির্ঝর নদ নদী আর হ্রদ।।
পর্ব্বত কানন বৃক্ষ লতার ভিতর।
গহ্বর কন্দর গুহা অরণ্য সাগর।।
মুনিমধ্যে মুনি হই ব্যাধমধ্যে ব্যাধ।
হস্তী সিংহ ব্যাঘ্র মধ্যে না গণি প্রমাদ।।
রাজগৃহে ধরিলাম সারথির বেশ।
উদাসীন হয়ে ভ্রমিলাম সর্ব্বদেশ।।
অযোধ্যা পাঞ্চাল কাশী দ্বারকা নগর।
ভ্রমিলাম চারি স্থানে গিয়া ঘর ঘর।।
কোথাও না দেখিলাম পাণ্ডুর নন্দন।
জীয়ন্তে থাকিলে হৈত অবশ্য দর্শন।।
জীবিত যদ্যপি থাকে, আছে সিন্ধুপার।
কিন্তু পৃথিবীর মধ্যে নাহি তারা আর।।
নিশ্চয় নৃপতি এই কহিনু তোমায়।
যদি আজ্ঞা হয়, তবে যাই পুনরায়।।
এত বলি চরগণ নিবৃত্ত হইল।
দক্ষিণের দূত হবে কহিতে লাগিল।।
অদ্ভূত কথন এক শুন মহারাজ।
এক দিন ছিনু মোরা মৎস্যদেশ মাঝ।।
বিরাট শ্যালক জান কেকয়-কুমার।
কীচক নামেতে সহোদর শত তার।।
স্ত্রীর হেতু শত ভায়ে গন্ধর্ব্বে মারিল।
ত্রিগর্ত্তের রাজ্য যেই বলে লয়েছিল।।
দেখিনু শুনিনু যথা কহি মহারাজ।
আজ্ঞা কর, এবে মোরা করি কোন্ কাজ।।
চরগণ-বচনান্তে কহে দুর্য্যোধন।
আমার যে বাঞ্ছা, তাহা শুন সর্ব্বজন।।
ত্রয়োদশ বৎসর হৈল আসি শেষ।
আসিবে পাণ্ডবগণ পেয়ে বহু ক্লেশ।।
ক্রোধে মহাভয় দেখাইবে কুরুগণে।
ইহার উপায় এক লইতেছে মনে।।
পুনর্ব্বার চরগণ যাক খুঁজিবারে।
বহু ধন পাবে যদি দেখে পাণ্ডবেরে।।
শুনিয়া বলিছে কর্ণ সূর্য্যের নন্দন।
এ সকল থাক, যাক্ অন্য চরগণ।।
ছদ্মবেশে যাক্, যেই হয় বিচক্ষণ।
পণ্ডিত সুবুদ্ধি যেই অনুগত জন।।
দুঃশাসন বলে, ভাল কহ মহামতি।
পুনরপি দূতগণ যাক্ শীঘ্রগতি।।
পশুগণে ঘ্রাণে জানে বেদে দ্বিজবরে।
অন্য জন দৃষ্টে জানে, রাজা জানে চরে।।
ইহা বিনা অন্য কর্ম্ম ‍নাহিক রাজন।
আপন হিতের চর যাউক এখন।।
মরিলে তথাপি বার্ত্তা চাহি জানিবারে।
ব্যাঘ্রে সিংহে মারিল কি অরণ্য ভিতরে।।
অনাহারে কষ্টে ভীমসেন কি মরিল।
তাহার মরণ-শোকে সবে প্রাণ দিল।।
নিরন্তর বৃকোদর রাক্ষসেতে বাদী।
যার তার সহ দ্বন্দ্ব করে নিরবধি।।
বেড়িয়া রাক্ষস কিবা মারিল পাণ্ডবে।
নিশ্চয় মরিল তারা, চরে কোথা পাবে।।
এত শুনি বলিলেন, দ্রোণ মহামতি।
কুরু-পাণ্ডবের গুরু বুদ্ধে বৃহস্পতি।।
এরূপে পাণ্ডব যদি হইবে নিধন।
তবে লোকে ধর্ম্ম করে কিসের কারণ।।
অশক্ত অরণ্য মধ্যে ধর্ম্ম বলবান।
ধর্ম্ম যার আছে, তার সর্ব্বত্র কল্যাণ।।
পাণ্ডুপুত্রে পরাভব করিবেক রণে।
তিনলোক মধ্যে হেন না দেখি নয়নে।।
শুচি সত্যবাদী কৃতকর্ম্মা জিতেন্দ্রিয়।
ধর্ম্মজ্ঞ শাস্ত্রজ্ঞ গুরু-দেব-দ্বিজ প্রিয়।।
ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির ধর্ম্ম-অবতার।
আর চারি সহোদর অনুগত তার।।
তাহার আপনদ হবে, নাহি দেখি আমি।
ছদ্মবেশে আছে তারা কাল অনুক্রমি।।
যে বিচার করিতেছ, করহ ত্বরিত।
পুনশ্চ যাউক চরগণ চতুর্ভিত।।
দ্রোণের বচন শুনি কহে ভীষ্মবীর।
সজল জলদ তুল্য বচন গম্ভীর।।
অকারণে চরেরে পাঠাবে আরবার।
ইহারা চিনিবে কোথা পাণ্ডুর কুমার।।
বেদবিজ্ঞ দ্বিজ হবে, সর্ব্বশাস্ত্র জানে।
সত্যবৃত্তি তপঃপর হবে যেই জনে।।
সেই সে চিনিতে পারে পাণ্ডপুত্রগণে।
মরিল বলিয়া কেন বল অকারণে।।
তের বর্ষ সুদারুণ তপস্যা করিল।
তার ফল ফলিবারে সময় হইল।।
যেই দেশে থাকিবেক পাণ্ডুর নন্দন।
তার চিহ্ন কহি এবে, শুন চরগণ।।
না ব্যাধি, না দুঃখ শোক, যে দেশের জনে।
দুষ্টের নিগ্রহ, শিষ্ট পালন যতনে।।
দানশীল দয়াশীল ক্ষমাশীল ধীর।
সেই দেশে থাকিবেক রাজা যুধিষ্ঠির।।
ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির যথায় থাকিবে।
সুগন্ধি শীতল বায়ু তথায় বহিবে।।
উত্তম হইবে শস্য মেঘের পালন।
বহু ক্ষীরবতী হৈবে যত গবীগণ।।
শরীরে জন্ময়ে ব্যাধি, সে করে বিপদ।
বন্ধু হয়ে হিত করে বনের ঔষধ।।
পর হয়ে বন্ধু হয়, যদি হিত করে।
জ্ঞাতি হয়ে শত্রু হয়, অধর্ম্ম আচরে।।
সেইমত দেখি দুর্য্যোধনের আচার।
পাণ্ডবের হাতে হবে সবংশে সংহার।।
আমার এতেক বলা নাহি প্রয়োজন।
সমান আমার কুরু পাণ্ডুর নন্দন।।
কিন্তু আর চর পাঠাইবে কি কারণ।
শীঘ্রই নিকটে আসিবেক পঞ্চ জন।।
ত্রয়োদশ বর্ষ এই হৈল আসি শেষ।
নিজ রাজ্যে না আসিয়া যাবে কোন্ দেশ।।
আসি মহাভয় দেখাইবে সর্ব্বজনে।
যেরূপে বাহির কৈলে, সবে জানে মনে।।
বিস্তর কহিয়া আর নাহি প্রয়োজন।
যথা ধর্ম্ম তথা জয়, বেদের বচন।।
ভীষ্মনীতি বুঝিয়া সাধহ হিতকার্য্য।।
দ্রোণ ভীষ্ম যে কহিল, নাহি হবে ‍আন।
গুপ্তবেশে রহিয়াছে পাণ্ডব ধীমান।।
হইল সময় শেষ, কাল দেখা দিল।
আপায় করহ শীঘ্র, কর্ণ যা কহিল।।
চরগণে খুঁজিতে পাঠাও দেশাদেশ।
হেথায় করহ শীঘ্র সৈন্য সমাবেশ।।
ভাণ্ডারের ধন দেখ, দেখ নিজ বল।
পরাপর প্রীতি কর নৃপতি সকল।।
তোমার অহিত কভু পাণ্ডুপুত্র নয়।
এক এক পাণ্ডব যে ইন্দ্রে করে জয়।।
শরদ্বান্-মুনিপুত্র কহি নিবর্ত্তিল।
সভাতে সুশর্ম্মা রাজা বসিয়া আছিল।।
কহিব বলিয়া পূর্ব্বে বিচারিয়া ছিল।
কর্ণ বীর কৈল, তাই কহিতে নারিল।।
সভায় কহিল এবে ত্রিগর্ত্ত রাজন।
মোর এক নিবেদন, শুন সভাজন।।
বিরাটের সেনাপতি কীচক প্রবল।
সসৈন্যে আসিয়া মম রাজ্য আক্রমিল।।
বলেতে আমার রাজ্য নিলেক সকল।
কীচক মরিল এবে হইল মঙ্গল।।
সবান্ধবে মোরে জিনি করেছিল গর্ব্ব।
এখন শুনি যে তারে মারিল গন্ধর্ব্ব।।
কীচক মরিল যবে, হৈল বড় কার্য্য।
বিরাটে বান্ধিয়া এবে লব নিজ রাজ্য।।
ধন রত্ন পূর্ণ, তার গবী অপ্রমিত।
এ সময়ে তাতে তব হবে বড় হিত।।
হীনবীর্য্য বিরাটেরে জিনিব কৌতুকে।
বিচারে আইসে যাহা, আজ্ঞা দেহ মোকে।।
কর্ণ বলে, ভাল বলে সুশর্ম্মা নৃপতি।
মৎস্যদেশে যাব, সৈন্য সাজ শীঘ্রগতি।।
পাণ্ডবের হেতু চিন্তা কর অকারণ।
কোথায় মরিয়া গেল বৃথা অন্বেষণ।।
জীয়ন্তে থাকিলে তবে,আসিবে হেথায়।
ধনহীন বন্ধুহীন ক্লেশে ক্লিষ্ট কায়।।
মম বল বীর্য্য তারা ভালমতে জানে।
পুনঃ হেথা পাণ্ডব না আসিবে কখনে।।
এক্ষণে চলহ সবে, যাব মৎস্যরাজ্য।
ধন রত্ন পাব বহু, হবে বড় কার্য্য।।
কর্ণের বচন শুনি বলেন বিদুর।
নিশ্চয় সবার চিত্ত যেতে মৎস্যপুর।।
সবাকার মন হৈল নিষেধিতে দোষে।
রত্ন গাভী উপার্জ্জন হ বড় ক্লেশে।।
কহিলেক চর মৎস্যদেশ-সমাচার।
দুর্জ্জয় কীচক গেল স্ত্রীর হেতু মার।।
অদ্যাপি নাহি দেখি, নাহি শুনি কানে।
গন্ধর্ব্ব নিবাস করে মনুষ্য ভবনে।।
গন্ধের্ব্বর স্ত্রীর সহ কীচকের কথা।
অনুমানে বুঝিতেছি সকল বারতা।।
বুঝিয়া করিবে কার্য্য, যাইবে নিশ্চয়।
গন্ধর্ব্ব সহিত যেন বিবাদ না হয়।।
বিদুর বচন শুনি হাসে দুর্য্যোধন।
শক্তিমত কহে যুক্তি যাহার যেমন।।
যত শক্তি আপনার, ততেক মন্ত্রণা।
না বুঝি আমার শত্রু আছে কোন্ জনা।।
গন্ধর্ব্ব কি গণি, যদি আসে দেবগণ।
ইন্দ্রসহ সাজি আসে তিন ‍ভুবন।।
কার শক্তি আসি মোর সম্মুখীন হয়।
তোমারে না ডাকি সঙ্গে, কেন কর ভয়।।
এত বলি সৈন্যে আজ্ঞা দিল কুরুপতি।
চতুরঙ্গ দল সজ্জা কর শীঘ্রগতি।।
সুশর্ম্মা নৃপতি যাক পুনঃ কহে আগে।
আপনার রাজ্য গিয়া নিক যাম্যভাগে।।
সৈন্য সহ যাব আমি করিবারে রণ।
শূন্যরাজ্যে গিয়া আমি হরিব গোধন।।
একদিন আগে যাও সুশর্ম্মা রাজন।
পশ্চাৎ সসৈন্যে আমি করিব গমন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *