১০. তৃতীয় দিনের যুদ্ধ

মুনি বলে, অবধান কারহ রাজন।
এতেক শুনিয়া কথা অম্বিকা-নন্দন।।
হরিষে পূরিল তনু সানন্দ হৃদয়।
জিজ্ঞাসিল সঞ্জয়েরে করিয়া বিনয়।।
তবে কি করিলা কহ ধর্ম্মের তনয়।
বিস্তার করিয়া মোরে শুনাহ সঞ্জয়।।
সঞ্জয় বলেন রাজা কর অবগতি।
সংগ্রামেতে পরাভব পাইল পাণ্ডুপতি।।
শিবিরে আইল রাজা হৈয়া দুঃখমন।
সভা করি সভাতে বসিল সর্ব্বজন।।
ভীমসেন ধনঞ্জয় মাদ্রীর নন্দন।
আর সবে বসিলেন মহাযোধগণ।।
ঘটোৎকচ বিরাট দ্রুপদ নরপতি।
ধৃষ্টদ্যুন্ন সাত্যকি আদি যদুবংশপতি।।
সভা করি নিভৃতে বসিল সর্ব্বজন।
গোবিন্দে চাহিয়া বলে ধর্ম্মের নন্দন।।
অবধান শুন দেব যাদব-ঈশ্বর।
অকারণে ভীষ্ম সহ বাড়াইলা সমর।।
মহারাজা দুর্য্যোধন অনেক সহায়।
জিনিবারে কার শক্তি আছয়ে তাহায়।।
আপন উপায় কিছু না চিন্তি অন্তরে।
পিপীলিকার পাখা যেন মরিবার তরে।।
ভুবনবিজয়ী বীর গঙ্গার নন্দন।
বাণেতে জর্জ্জর সব কৈল সৈন্যগণ।।
ধৃষ্টদ্যুন্ন আদি মহারথী যত যত।
বাণেতে জর্জ্জর সব কৈল সৈন্যগণ।।
ধৃষ্টদ্যুম্ন আদি মহারথী যত যত।
বাণেতে সবারে ভীষ্ম করিল ব্যথিত।।
মহারথী পদাতিক যত সৈন্যগণ।
কথঞ্চিত প্রাণ লয়ে আছে সর্ব্বজন।।
ভীষ্ম সেনাপতি আর দুর্জ্জয় কৌরব।
কাহার শকতি তারে করে পরাভব।।
আপন উপায় আমি চিত্তে না গণিনু।
আগু পাছু না গণিয়া যুদ্ধে প্রবেশিনু।।
আজ্ঞা কর জগন্নাথ করি পরিহার।
যুদ্ধে কার্য্য নাহি যাব অরণ্য ভিতর।।
হৃদয়ে ভাবিয়া তবে কহে যদুবীর।
কেন এত ভাব ‍তুমি রাজা যুধিষ্ঠির।।
তুমি হেন মহারাজা নৃপতি-প্রধান।
তুমি হেন বল রাজা কি বলিব আন।।
ক্ষত্রধর্ম্ম শাস্ত্রমত জান সর্ব্বনীত।
জানিয়া শুনিয়া কেন রণে হও ভীত।।
পূর্ব্বাপর আছে কহে শাস্ত্রের বিধান।
গুরু লঘু সংগ্রামেতে একই সমান।।
মাতুল শ্বশুর পিতা ভাই বন্ধুজন।
জ্যেষ্ঠতাত পিতামহ আদি গুরুগণ।।
শিক্ষা দীক্ষা দ্বিজ মুনি গুরু যত জন।
যে হউক সংগ্রামেতে করিব নিধন।।
ইহাতে অধর্ম্ম নাহি বেদের বচন।
জানিয়া শুনিয়া কেন হও ভীত মন।।
স্বরূপ কহিল ভীষ্ম গঙ্গার কোঙর।
সংগ্রামে দুর্জ্জয় বীর যমের সোসর।।
কাহার শকতি তারে করিতে নিধন।
তার মৃত্যু পূর্ব্বে আমি করেছি চিন্তন।।
উপায়ে মারিব ভীষ্মে নয়নে দেখিবে।
প্রকারেতে দ্রোণাচার্য্য নিধন হইবে।।
প্রকারেতে সবারে পাঠাব যমালয়।
আমার বচন রাজা কভু অন্য নয়।।
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে ক্ষিতি জলে ভাসে।
তথাপি বচন মোর না হয় বিনাশে।।
চন্দ্র-সূর্য্য-পাত হয় দৃষ্টি নাহি চলে।
তথাপি বচন মোর নহিবে বিফলে।।
এত বলি প্রবোধিল ধর্ম্মের নন্দনে।
ধৃষ্টদ্যুন্ন প্রতিজ্ঞা করিল ততক্ষণে।।
কালিকে সংগ্রামে মোর দেখিবে প্রতাপ।
মত্ত হস্তী প্রহারয়ে হেন ক্ষুদ্র সাপ।।
দ্রোণাচার্য্যে বাণে কালি করিব নিধন।
আমার প্রতিজ্ঞা কভু না হয় খণ্ডন।।
তবে ভীম ধনঞ্জয় আদি বীরগণে।
প্রতিজ্ঞা করিল সবে কৌরব-নিধনে।।
সঞ্জয় বলেন, শুন অম্বিকা-নন্দন।
রজনী প্রভাত কালে কুরু-পাণ্ডুগণ।।
দুই দলে সাজে নানা বাদ্যগণ বাজে।
বাদ্যের শবদে কম্প হৈল সর্ব্বরাজে।।
ডগর ডিণ্ডিমি বাজে কাংস্য করতাল।
অসংখ্যা দুন্দুভি বাজে বাহুক রসাল।।
ভেরী ঝাঝরী আদি বাজে বাদ্যগণ।
দুই দলে বাদ্য বাজে না যায় লিখন।।
রথী মহারথী গজ পদাতি প্রচণ্ড।
আসোয়ার হাতে গদা খড়্গ যমদণ্ড।।
লক্ষ লক্ষ মহারথী সঙ্গে আশোয়ার।
ব্যূহের অগ্রেতে ভীষ্ম গঙ্গার কুমার।।
বাম শৃঙ্গে কৃতবর্ম্মা বীর সোমদত্ত।
দক্ষিণ শৃঙ্গেতে ভগদত্ত মহাসত্ত্ব।।
দ্রোণ অশ্বত্থামা আর প্রতীপ-নন্দন।
ভূরিশ্রবা সুশর্ম্মাদি যত রাজগণ।।
ভীষ্মের রক্ষক পাশে সংগ্রামে নির্ভয়।
মধ্যে দুর্য্যোধন রাজা গান্ধারী তনয়।।
ঊনশত সহোদর সঙ্গে পরিবার।
মহাবীর্য্যবন্ত রণে যম-অবতার।।
ব্যূহ করি সাজিলেন কুরু-নরপতি।
শুনি অর্জ্জুনেরে আজ্ঞা দিল পাণ্ডুপতি।।
শীঘ্রগতি ব্যূহ করি সাজহ সত্বর।
কুরুবীরগণেরে পাঠাও যমঘর।।
আজ্ঞামাত্র ধনঞ্জয় মহাবিচক্ষণ।
রচিল বিচিত্র ব্যূহ না হয় বর্ণন।।
যথাযথ স্থানেতে রহিল বীরগণ।
বিবিধ বাদ্যের শব্দে পূরিল গগন।।
দুই দলে দিব্য অস্ত্র করে বরিষণ।
প্রলয়ের কালে যেন বর্ষে ঘোর ঘন।।
মহাবীর ধনঞ্জয় সংগ্রামে প্রচণ্ড।
হাতেতে গাণ্ডীব ধনু যেন যমদণ্ড।।
দিব্যমূর্ত্তি অঙ্গ শ্যাম রাজীবলোচন।
বিচিত্র কবচ অঙ্গে অরুণ বরণ।।
পূর্ণবিধু-মুখচন্দ্র সুকোমল তনু।
বিচিত্র কুণ্ডল কর্ণে যেন শোভে ভানু।।
ততোধিক রূপ কৃষ্ণ দেবকীনন্দন।
কপিধ্বজ রথখান বিচিত্র শোভন।।
ব্যুহের অগ্রেতে হৈলা বীর ধনঞ্জয়।
প্রভাতে সূর্য্যের যেন হইল উদয়।।
দেখিয়া মোহিত হৈল কুরু-সৈন্যগণ।
আছুক যুদ্ধের কার্য্য হৈল অচেতন।।
দ্রোণের অগ্রেতে হৈল ধৃষ্টদ্যুন্ন বীর।
বিচিত্র কবচ অঙ্গে সংগ্রামে সুধীর।।
ধৃষ্টদ্যুন্নে দেখি বীর সংগ্রামে প্রচণ্ড।
হাতেতে লইল যেন কাল যমদণ্ড।।
আকর্ণ পূরিয়া দিল ধনুকে টঙ্কার।
মহাশব্দ হৈল যেন পর্ব্বত বিদার।।
এক কালে লক্ষ লক্ষ শঙ্খের নিঃস্বন।
দুই দলে প্রবেশিল করিবারে রণ।।
অন্য অন্য সৈন্যেতে হইল হানাহানি।
দুই দলে রনে পড়ে অনেক বাহিনী।।
অনেক পড়িল রথী রথ আশোয়ার।
কোটী কোটী মত্তগজ পদাতি অপার।।
ধ্বজচ্ছত্র পতাকায় মেদিনী পূরিল।
অশোক কিংশুক যেন বসন্তে ফুটিল।।
কনক-কুণ্ডল মণি-মুকুট অপার।
কেয়ূর কনক দিব্য মণি-রত্ন হার।।
কোটী কোটী বীর দুইদলে দিল হানা।
খরস্রোতে বহে নদী রুদিরের ফেণা।।
নর-গজ-মুণ্ড ভাসে রকত-উপর।
অসংখ্য কর্দ্দমে লুঠে হাতে ধনুঃশর।।
তবে দ্রোণ মহাবীর হাতে ধনুঃশর।
হানয়ে পাঞ্চাল সৈন্য সংগ্রাম ভিতর।।
শুষ্ক বন দহে যেন কালাগ্নি অনলে।
ভঙ্গ দিল সৈন্য দেখি দ্রোণ মহাবলে।।
ক্রোধ হৈল ধৃষ্টদ্যুন্ন সংগ্রাম ভিতরে।
নানা অস্ত্র বৃষ্টি করে দ্রোনের উপরে।।
শেল শূল শক্তি জাঠা মুষল মুদগর।
ভৈরব পরিঘ আদি অসংখ্য তোমর।।
অস্ত্রে অস্ত্র কাটি দ্রোণ কৈল নিবারণ।
বায়ুতে উড়ায় যেন মেঘ বরিষণ।।
বাণ কাটি দ্রোণ বীর পূরিল সন্ধান।
বাণেতে কাটিয়া রথ কৈল খান খান।।
কবচ ভেদিয়া বাণ অঙ্গে প্রবেশিল।
বজ্রেতে পর্ব্বত যেন ইন্দ্রে বিদারিল।।
সর্ব্বাঙ্গে রুধির বহে হৈল অচেতন।
রথ লৈয়া সারথি পলায় ততক্ষণ।।
দ্রোণের বিক্রমে স্থির নহে কোনজন।
ভঙ্গ দিল পাঞ্চালের যত সৈন্যগণ।।
হাহাকার শব্দ হৈল পাণ্ডবের দলে।
প্রলয় সময়ে যেন সমুদ্র উথলে।।
আশ্বাসিয়া সর্ব্বসৈন্যে বীর বৃকোদর।
দ্রোণশিষ্য প্রবেশিল করিতে সমর।।
দিব্য দিব্য বাণ বীর করে বরিষণ।
ভয়ঙ্কর মূর্ত্তি বীর পবন-নন্দন।।
নলবন ভাঙ্গে যেন মত্ত করিবর।
কেশরী বিহরে যেন গজেন্দ্র উপর।।
একেশ্বর দ্রোণ সৈন্য কৈল লণ্ডভণ্ড।
ক্ষুদ্র মৃগী মারে যেন কেশরী প্রচণ্ড।।
শত শত গজ বাজি পদাতি অপার।
সংহারিল বৃকোদর পবন কুমার।।
ভয়ঙ্কর মূর্ত্তি ভীম পবন নন্দন।
ভীমে দেখি ভঙ্গ দিল সর্ব্বসৈন্যগণ।।
ভঙ্গ দিল দ্রোণ শল্য কেহ নাহি রয়।
ক্রোধ করি আইল অশ্বত্থামা মহাশয়।।
ডাক দিয়া বৃকোদরে বলিল বচন।
ক্ষণেক রহিয়া যুদ্ধ করহ এখন।।
ক্ষুদ্র জীব মারি তোর এত অহঙ্কার।
আমার হস্তেতে আজি হইব সংহার।।
এত বলি অশ্বত্থামা পূরিল সন্ধান।
বাণে বাণ কাটিয়া করিল খান খান।।
পুনর্ব্বার অশ্বত্থামা পূরিল সন্ধান।
ভীমের উপরে মারিলেক দশ বাণ।।
দশ গোটা বাণ আসে কাল-সহচর।
মহাশব্দ করি আসে ভীমের উপর।।
হাসি বৃকোদর বীর পূরিল সন্ধান।
বাণে বাণ হানিয়া করিল দুইখান।।
বাণ ব্যর্থ গেল বীর হৈল ক্রোধ মন।
পুনরপি দিব্য অস্ত্র করে বরিষণ।।
একেবারে ছাড়ে বীর সহস্র তোমর।
অস্ত্রমুখে বৃষ্টি হয় মুষল মুদগর।।
অস্ত্র দেখি পাণ্ডুসৈন্য বিস্ময় হইল।
হাহাকার করি সবে প্রমাদ গণিল।।
আকাশে আইসে যেন প্রলয়-তপন।
বজ্রের নিঃস্বন শুনি অস্ত্রের গর্জ্জন।।
মহাবীর বৃকোদর সমরে প্রচণ্ড।
ভল্ল বাণে অস্ত্র কাটি কৈল খণ্ড খণ্ড।।
আকাশেতে প্রশংসা করয়ে দেবগণ।
সাধু বৃকোদর বীর পবন নন্দন।।
তবে ভীম মহাবীর পূরিল সন্ধান।
অশ্বত্থামা উপরে মারিল দশ বাণ।।
চারি বাণে ধ্বজচ্ছত্র কাটিয়া পাড়িল।
দুই বাণে সারথিরে যমঘর নিল।।
বিরথ হইয়া বীর ক্রোধিত অন্তরে।
গদা ঘুরাইয়া বীর যায় মারিবারে।।
চারি অশ্ব মারিল মারিয়া গদাবাড়ি।
সারথিরে গদাঘাতে ভূমিতলে পাড়ি।।
সারথি তুরঙ্গ রথ চূর্ণ হৈয়া গেল।
গদা হাতে করি বীর ভূমিতে নামিল।।
অশ্বত্থামা-ভীম দোঁহে হৈল মহারণ।
দোঁহাকার গদাযুদ্ধ না হয় গণন।।
কতক্ষণে দুইজনে গদা প্রহারিল।
মাথে হানি দুই বীর ভূমিতে পড়িল।।
শীঘ্রগতি আনি রথ যোগায় সারথি।
রথে করি নিল অশ্বত্থামা মহারথী।।
সর্ব্বাঙ্গে রুধির বহে পবন নন্দন।
তথাপি অক্ষম বীর নহে কদাচন।।
ভয়ঙ্কর গদা হাতে দুর্জ্জয় শরীর।
মস্তক ভাঙ্গিয়া কারো বুক কৈল চির।।
গদার প্রহারে মারে লক্ষ লক্ষ বীর।
ভীমের বিক্রমে ভঙ্গ দিল কুরুবীর।।
ক্রোধ হৈল দ্রৌণিবীর সমর ভিতরে।
শত শত বাণ মারে ভীমের উপরে।।
গদা ফিরাইয়া অস্ত্র কৈল নিবারণ।
বায়ুতে ভাঙ্গিল যেন মেঘ বরিষণ।।
শীঘ্রগতি রথ আনি যোগায় সারথি।
লাফ দিয়া উঠে তাহে ভীম মহারথী।।
জয়বাদ্য বাজাইল পাণ্ডবের দলে।
নানা অস্ত্রবৃষ্টি তবে করে কুতূহলে।।
ভীমের বিক্রমে কুরুগণ নহে স্থির।
ক্রোধ হৈয়া আগু হৈল ভূরিশ্রবা বীর।।
ভূরিশ্রবা দেখি সহদেব লৈল বাণ।
বৃহন্নল ধেয়ে তার কৈল পরিত্রাণ।।
বৃহন্নল সহদেবে হৈল মহারণ।
দোঁহে দোঁহাপরি কৈল বাণ বরিষণ।।
ক্রোধ হয়ে সহদেব সমর ভিতরে।
অষ্টবাণে বিন্ধে বৃহন্নল-কলেবরে।।
চারি বাণে ধ্বজচ্ছত্র কাটিয়া পাড়িল।
দুই বাণে সারথিরে পরাণে মারিল।।
গদা হাতে করি বীর ভূমেতে পড়িল।
বেগে ধেয়ে সহদেবে মারিতে আইল।।
খুরুপা বাণ সহদেব এড়িল প্রচণ্ড।
বৃহন্নল বীরেরে করিল খণ্ড খণ্ড।।
মহাবীর বৃহন্নল পড়িল সমরে।
তার ভাই বৃহদ্রথ আইল ক্রোধভরে।।
ডাক দিয়া সহদেবে বলয়ে বচন।
তোমার শোণিতে ভায়ের করিব তর্পণ।।
এত বলি আকর্ণ পূরিয়া এড়ে বাণ।
অষ্টক তোমর মারে পূরিয়া সন্ধান।।
শূন্যেতে উঠিল অস্ত্র প্রলয় প্রচণ্ড।
রথধ্বজ কাটিয়া করিল খণ্ড খণ্ড।।
চারি অশ্ব মারিল মারিয়া চারি বাণ।
দুই বাণে সারথিরে কৈল চারিখান।।
অর্দ্ধচন্দ্র বাণে তার শিরশ্চেদ কৈল।
রথ হৈতে বৃহদ্রথ ভূমেতে শোভিল।।
একস্থানে দুইজন সমরে পড়িল।
সুমেরুর শৃঙ্গ যেন ভূমেতে পড়িল।।
হাহাকার শব্দ হৈল কৌরবের দলে।
হাতে বস্ত্র সহদেব নাচে কুতূহলে।।
সহদেবের বিক্রমে ত্রাসিত কুরুগণ।
ক্রোধ হৈল ভীষ্মবীর গঙ্গার নন্দন।।
মহাবীর গঙ্গাপুত্র সমরে প্রচণ্ড।
পাণ্ডবের সৈন্যগণে কৈল খণ্ড খণ্ড।।
দিব্য অস্ত্র মারে বীর পূরিয়া সন্ধান।
একবারে এড়ে বীর শত শত বাণ।।
শত শত মহারথী পড়য়ে সমরে।
শরজালে অন্ধকার করিল অম্বরে।।
দ্বিতীয় প্রহর যুদ্ধ না হয় বর্ণন।
দুই জনে যুদ্ধ করে নহে নিবারণ।।
রথী রথী মহাযুদ্ধ পদাতি পদাতি।
আশোয়ারে আশোয়ারে মত্তে মত্তহাতী।।
দুই দলে কোলাহল কৌরব-পাণ্ডব।
প্রলয়ের কালে যেন উথলে অর্ণব।।
এইরূপ দুই দলে হৈল হানাহানি।
লিখিতে না পারি যত পড়িল বাহিনী।।
বীরের মস্তকেতে ছাইল রণস্থলী।
পড়িল অনেক সৈন্য আথালি পাথালি।।
রথ-ধ্বজ-পতাকায় ছাইল মেদিনী।
মুকুট কুণ্ডল হার নানা রত্ন মণি।।
মহাবল ভীষ্মবীর গঙ্গার কোঙর।
পাণ্ডবের বহু সৈন্য করিল সংহার।।
ভীষ্মের বিক্রম সহে নহি হেন বীর।
ভঙ্গ দিল সৈন্যগণ রণে নহে স্থির।।
কৃষ্ণেরে চাহিয়া পার্থ বলয়ে বচন।
শীঘ্রগতি লহ রথ যাদব-নন্দন।।
কালাগ্নি সমান শিক্ষা ভীষ্ম মহাবল।
তাঁহার সংগ্রামে ভাঙ্গে পাণ্ডবের দল।।
শীঘ্রগতি লহ রথ ভীষ্মের সম্মুখে।
আজি যুদ্ধে তাঁহারে পাঠাব যমলোক।।
এত শুনি শীঘ্র রথ লয় নারায়ণ।
পার্থে দেখি আগে হৈল গঙ্গার নন্দন।।
ভীম্মার্জ্জুনে সমাগম হৈল দুই জন।
দোঁহাকার অস্ত্রবৃষ্টি না হয় বর্ণন।।
শিলীমুখ সূচীমুখ পরিঘ তোমর।
অর্দ্ধচন্দ্র ভল্ল আদি মুষল মুদগর।।
অজমুখ রুদ্রঅস্ত্র যেবা যত জানে।
দোঁহার উপরে দোঁহে বর্ষে অনুক্ষণে।।
তবে ভীষ্ম মহাবীর পূরিল সন্ধান।
অর্জ্জুনের উপরে এড়িল রুদ্রবাণ।।
পঞ্চরুদ্র নাম বাণ মহাভয়ঙ্কর।
ঘোর শব্দে আইসে বাণ অর্জ্জুন-উপর।।
হাসিয়া অর্জ্জুন বীর পূরিল সন্ধান।
ব্রহ্মঅস্ত্র এড়ি অস্ত্র কৈল খান খান।।
তবে পার্থ ইন্দ্রদত্ত ভল্ল দিব্য শর।
আকর্ণ পূরিয়া এড়ে ভীষ্মের উপর।।
মহাশব্দে আইসে অস্ত্র গগন-মণ্ডলে।
প্রলয়ের কালে যেন সমুদ্র উথলে।।
শীঘ্রহস্তে মহাবীর গঙ্গার নন্দন।
ব্রহ্মঅস্ত্রে অস্ত্র কাটি কৈল নিবারণ।।
অস্ত্র ব্যর্থ গেল পার্থ লজ্জা পাইল মনে।
সহস্র তোমর ক্রোধে মারে ততক্ষণে।।
নিমিষেকে হৈল গগনেতে অন্ধকার।
শরে আবরিল ভীষ্মে না দেখি যে আর।।
আকাশেতে প্রশংসা করয়ে দেবগণ।
ধন্য কুন্তী গর্ভে ধরে দুর্জ্জয় অর্জ্জুন।।
তবে ভীষ্ম দিব্য অস্ত্র এড়ে ততক্ষণ।
শরে শর কাটিয়া করিল নিবারণ।।
দিব্য অস্ত্র পুনরপি করিল সন্ধান।
অর্জ্জুনের শরীরে বিন্ধিল দশ বাণ।।
একশত বাণ মারে কৃষ্ণের শরীরে।
পঞ্চ বাণ মারে তার ধ্বজের উপরে।।
চারি বাণে চারি অশ্ব বিন্ধে ততক্ষণ।
দুই বাণে হাতের কাটিল শরাসন।।
ধনঞ্জয় অষ্ট গোটা তোমর এড়িল।
সেই ঘায়ে গঙ্গাপুত্র অচেতন হৈল।।
কবচ ভেদিয়া অস্ত্র ফুটিল শরীরে।
মূর্চ্ছা হৈল ভীষ্ম বীর রক্ত পড়ে ধারে।।
শীঘ্রহস্তে ধনঞ্জয় পাইল অবসর।
নানা অস্ত্র এড়ে কুরুসৈন্যের উপর।।
শেল শূল শক্তি জাঠা মুষল মুদগর।
ভল্ল ভূষণ্ডি গদা পরিঘ তোমর।।
অজমুখ শঙ্খ কঙ্কু বাণ কর্ণিকার।
রুদ্রমুখ ক্ষুদ্রমুখ নারাচ অপার।।
শেল সূচীমুখ আদি নানা অস্ত্রগণে।
জলবৃষ্টি সম এড়ে ইন্দ্রের নন্দনে।।
অক্ষয় যুগল তূণ পূর্ণ বাণময়।
কিছু ক্ষয় নহে যত বিন্ধে তত হয়।।
মারিল যতেক সৈন্য না হয় লিখন।
অশ্ব হস্তী পদাতিক না যায় গণন।।
পড়িল যতেক সৈন্য সমর ভিতরে।
অশ্ব হস্তী পদাতিক ভাসে রক্তোপরে।।
সন্ধ্যাকালে দুই দলে হৈল মহারণ।
দুই দলে বহু সৈন্য হইল নিধন।।
কাটা গেল পদ কারো কারো হাত শির।
মধ্যে মধ্যে কোন বীর হৈল দুই চির।।
ভয়ঙ্কর দেখি রণভূমি লাগে ভয়।
অসংখ্য কবন্ধ উঠে হাতে ধনু লয়।।
শ্মশান সদৃশ হৈল নাচে প্রেতগণ।
শকুনি গৃধিনীগণে ছাইল গগন।।
শতধারে মহানদী বহে রক্তজল।
শৃগাল কুক্কুরগণ করে কোলাহল।।
অস্ত গেল দিবাকর প্রবেশিল রাতি।
দুই দল চলি গেলা যে যার বসতি।।
মুনি বল জন্মেজয় কর অবধান।
তৃতীয় দিবস যুদ্ধ হৈল সমাধান।।
মহাভারতের কথা অমৃত-সমান।
শুনিলে অধর্ম্ম খণ্ডে হয় দিব্য জ্ঞান।।
মস্তকে বন্দিয়া ব্রাহ্মণের পদদ্বন্দ্ব।
কাশীরাম দেব কহে পয়ার প্রবন্ধ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *