১০. অভিমন্যু বধ

মুনি বলে অপূর্ব্ব শুনহ জন্মেজয়।
করিল অদ্ভূত যুদ্ধ অর্জ্জুন তনয়।।
রথে পড়ে তিন কোটি রথীবৃন্দবর।
ছয়বৃন্দ মদমত্ত পড়িল কুঞ্জর।।
সপ্ত পদ্ম অশ্ব পড়ে রণে আসোয়ার।
পদাতিক সৈন্য পড়ে সংখ্যা নাহিতার।।
শোণিতে হইল নদী ভাসে কত সেনা।
তরঙ্গে আতঙ্ক হয় রাশি রাশি ফেণা।।
কবন্ধ উঠিয়া কেলি করে তার রসে।
শোণিত সাগর মাঝে সাঁতারিয়া ভাসে।।
ঝন্ঝনি রণভূমি অস্ত্র অগ্নিবাণে।
প্রাণপণে যুঝে কৌরবের সেনাগণে।।
এড়িল গন্ধর্ব্ব অস্ত্র অর্জ্জুন তনয়।
কৌরবের ঠাট কাটি করিলেক ক্ষয়।।
পড়িল অনেক সেনা লেখা জোখা নাই।
তরঙ্গে ঢাকিয়া অঙ্গ ভাসিয়া বেড়াই।।
শোণিত হইল নীর নৌকা করিবর।
রথচয় ভাসে যেন রাজহংসবর।।
অশ্ব সব ভাসি বুলে কচ্ছপের প্রায়।
মানের সদৃশ নর ভাসিয়া বেড়ায়।।
তৃণের সমান ভাসে ধনু অস্ত্রগণ।
দেখিয়া শোণিত নদী ভীত সর্ব্বজন।।

এতেক দেখিয়া তবে শকুনি নন্দন।
রথেতে চড়িয়া গেল করিবারে রণ।।
দেখিয়া আর্জ্জুনি ক্রোধে অনল সমান।
ধনুক কাটিয়া তার করে খান খান।।
চারি বাণে কাটিল রথের হয় চারি।
আর দুই বাণে তার সারথি সংহারি।।
সারথি পড়িল, রথ হইল অচল।
বিস্ময় মানিয়া চাহে কৌরবের দল।।
পুনরপি অভিমন্যু এড়ে দুই বাণ।
কর্ণ নাসা কাটিয়া করেন খান খান।।
শ্রবণ নাসিকা গেল দেখিতে কুৎসিত।
কাটিয়া পাড়িল মুণ্ড কুণ্ডল সহিত।।
শকুনি দেখিল যুদ্ধে পড়িল নন্দন।
হাহাকার করি বহু করিল রোদন।।
আর্জ্জুনিরে দেখি কাল শমন সমান।
ভয়ে আর ‍কোন বীর নহে আগুয়ান।।
সংগ্রাম করয়ে বীর অর্জ্জুন কোঙর।
কোটি কোটি রথীকে পাঠান যমঘর।।
সন্ধান পূরিয়া বীর এড়ে দিব্যবাণ।
শোণিতে বহিছে নদী অতি খরশান।।
দেখিয়া ব্যকুল বড় রাজা দুর্য্যোধন।
দ্রোণ চাহি বলিতে লাগিল সেইক্ষণ।।
কুমারের তুষ্ট তুমি বুঝিনু বিধানে।
তাই দুষ্ট যুদ্ধ করে তব বিদ্যমানে।।
বালক হইয়া করে এত অপমান।
তামা সব মহারথী আছ বিদ্যমান।।
বুঝিলাম জয় নাহি আমার সমরে।
একেলা মারিয়া আজি যাইবে সবারে।।

এতেক শুনিয়া দুর্য্যোধনের উত্তর।
ক্রোধমুখে বলিলেন দ্রোণ মহাবীর।।
তব কর্ম্ম প্রাণপণে করি অনুক্ষণ।
তথাপিও হেন ভাষা কহ দুর্য্যোধন।।
অভিমন্যু জিনে হেন নাহি কোন জন।
তার ভয়ে পলাইলে লইয়া জীবন।।
বাপের সদৃশ বীর যমের সমান।
বজ্রের সমান যার অব্যর্থ সন্ধান।।
কর্ণ হেন যোদ্ধা, যারে নারিল সমরে।
আর কে আছয়ে হেন জিনিবে তাহারে।।

রাজা বলে বৃথা গুরু গঞ্জহ আমারে।
না বলিয়া তোমারে বলিব আর কারে।।
না জান জয়ন্তে আমি হইয়াছি মরা।
শোক দুঃখ অনুতাপে বিধি কৈল জরা।।
সংশয়ে আশ্রয়ী গিরি সেহনহে সার।
তবে কি উপায় এতে হইবেক আর।।
বিপক্ষের এক শিশু বধে নানা সেনা।
নিবারিতে ইহারে নাহিক এক জনা।।
এতকাল আশ্বাসে বিশ্বাস যাই যার।
আজি কেন হৈল হীন ভরসা তাহার।।
নামেতে বিখ্যাত যারা বড় বড় বীর।
বিষাদে হইল সব দেখি নতশির।।

করুণা বিষাদ বাক্য নৃপতির শুনি।
কহিতে লাগিল দ্রোণ শুন কুরুমণি।।
ন্যায়যুদ্ধে অভিমুন্যে জিনিতে যে পারে।
কহিলাম হেন জন নাহিক সংসারে।।
ভাগিনেয় শ্রীকৃষ্ণের অর্জ্জুনের সুত।
দেখিলে সাক্ষাতে যার সমর অদ্ভূত।।
ন্যায়যুদ্ধে তাহারে নারিবে কদাচন।
কহিনু জানিও মম স্বরূপ বচন।।

দুর্য্যোধন বলে, শুন আমার বচন।
সপ্তরথী এককালে কর গিয়া রণ।।
এতেক শুনিয়া গুরু বিরস বদন।
এমত অন্যায় নাহি করে কোন জন।।
কৃপাচার্য্য বলে ইহা অদ্ভূত কথন।
কিমত প্রকারে ইহা হয় দুর্য্যোধন।।
এমত অন্যায় যুদ্ধ কভু নাহি করি।
এত বলি কৃপাচার্য্য স্মরিল শ্রীহরি।।
দুর্য্যোধন বলে যদি ইহা না করিবে।
সবারে মারিয়া আজি আর্জ্জুনি যাইবে।।
প্রধানের সর্ব্বদোষ অন্যায়ে কি ভয়।
বধিতে রিপুকে মম এই বিধি হয়।।
ইহাতে করিলে হেলা বড় হবে দোষ।
বধিয়া বালকে কর আমারে সন্তোষ।।
মজিল সকল সৃষ্টি ব্যাজ নাহি সয়।
সর্ব্বনাশ কৈল শিশু শমন উদয়।।
মম বাক্যে তোমা সবা কর এই মতি।
এককালে অভিমুন্যে বেড় সপ্তরথী।।
দুঃশাসন শকুনি রাধেয় মম মামা।
দ্রোণাচার্য্য কৃপাচার্য্য আর অশ্বথামা।।
আমিও যাইব তথা তোমার পশ্চাৎ।
এইরূপ করি তারে করহ নিপাত।।

এত শুনি কৃপাচার্য্য নিশ্বাস ছাড়িল।
দুর্নীতি রাজার হস্তে বিধ্যানয়োজিল।।
আমা সবাকার ইথে কি করে বিলাপে।
মরিবেক দুর্য্যোধন এই মহাপাপে।।
অমঙ্গল হৈল তার নাহিক অবধি।
শুকাইল সরোবর স্রোত এড়ে নদী।।
আহার এড়িল সব পক্ষী যে প্রমাদে।
আকুল হইয়া যত গ্রাম্যসিংহ কাঁদে।।
অনাচার কর্ম্ম বড় অরণ্যে হইল।
মুহুর্মূহুঃ বসুমতী কাঁপিতে লাগিল।।
রাজলক্ষ্মী রাজারে ছাড়িল অনুতাপে।
অচিরে হইবে নষ্ট এই মহাপাপে।।
অঙ্গ হৈল বিবর্ণ বদন হৈল কালি।
সামর্থ্য বিহীন অঙ্গ কর্ণে লাগে তালি।।
দেবমায়া দেখে রাজা হইতে গগন।
উদয় হইল যেন দ্বাদশ তপন।।
আচম্বিতে মাথার মুকুট গেল খসি।
অন্ধকার দেখি সদা মনে ভয় বাসি।।
তথাপি বিষয় মদে না জানি মরণ।
আজ্ঞা দিল বধ ঝাট পার্থের নন্দন।।
সপ্তরথী রথে চড়ে ভাবিয়া বিষাদ।
ভদ্র নাহি নৃপতির হইল প্রমাদ।।

বেড়িল বালকে গিয়া সপ্ত মহারথী।
হানাহানি মহাযুদ্ধ হয় অবিরতি।।
এককালে সপ্তরথী করে অস্ত্রময়।
রবি আচ্ছাদিল বাণে অন্ধকার হয়।।
ভূষণ্ডী তোমর শক্তি বাণ জাঠাজাঠি।
ত্রিশূল পট্টিশ মহা অস্ত্র কোটি কোটি।।
সূচীমুখ শেলমুখ অর্দ্ধচন্দ্রবাণ।
বিকট সঙ্কট শক্তি অনল সমান।।
কপালী কৌশিকী বাণ, বাণ ব্রহ্মজাল।
রুদ্রদ্যুতি রিপুচণ্ড অত্যন্ত বিশাল।।
শ্রাবণের মেঘ যেন বৃষ্টি বার বার।
তপন ঢাকিল যেন তিমির আকার।।
একযোগে সপ্তরথী অস্ত্র বরষিল।
অমর ভুজঙ্গ নর চমকিত হৈল।।
যেন সৃষ্টি মজাইতে ইচ্ছা বিধাতার।
বাণবৃষ্টি হয় যেন মুষলের ধার।।
হইল পাবক তুল্য আর্জ্জুনি কুপিয়া।
কৌরবদলের এত অন্যায় দেখিয়া।।
হাহাকার আকাশে অমরগণ করে।
সপ্ত মহারথী বেড়ে এক বালকেরে।।
বিধি বিড়ম্বিল দুর্য্যোধন দুরাচারে।
এমত অন্যায় যুদ্ধ সে কারণে করে।।
কতু হেন বিপরীত না দেখি না শুনি।
মরিবে নিশ্চয় পাপী গরাসিল ফণী।।
মহাবীর্য্য তনুজ, তুলনা নাহি মহী।
সাধু সাধু শব্দ শুনি ইহা বই নাহি।।

অভিমন্যু মহাবীর অবসাদ নাই।
প্রশংসা করিয়া গুণ দেবতারা গাই।।
বন্ধনে সন্ধান পুরি শিশু এড়ে বাণ।
নিমিষে সকাল অস্ত্র করে খান খান।।
কাটিয়া সবার অস্ত্র অর্জ্জুন তনয়।
দশ দশ বাণে বিন্ধে সবার হৃদয়।।
বাণাঘাতে সপ্তরথী হতজ্ঞান হয়।
শিশুর শমন বাণ হেন মনে লয়।।
মূর্চ্ছা দেখি রথীর সারথি লয় রথ।
পলাইল রথী লয়ে যোজনেক পথ।।
সপ্তরথী এইরূপে যুঝে সাতবার।
সবাকারে পরাজিল অর্জ্জুন কুমার।।
অবসাদ নাহি, অস্ত্র এড়ে শিশু যত।
কোটি কোটি সেনা হয় সমরেতে হত।।
হয় পড়ে নাহি সীমা কুঞ্জরের দল।
রথে পথ ঢাকিল চলিতে নাহি স্থল।।
মড়ায় ধোড়ার ক্ষিতি পদাতিক গদা।
রুধিরে হইল হোড় বরিষার কাদা।।
কতক্ষণে সপ্তরথী পাইল চেতন।
লজ্জায় সবার যেন হইল মরণ।।
কার মুখ কেহ নাহি চাহে অভিরোষে।
রথ এড়ি মহীতলে মাথা ধরি বসে।।
কি হৈল কি হইরে কুমার নহে যম।
পলাইল অবসাদে বলে হয়ে কম।।
চিন্তিয়া আকুল হয়ে কূল নাহি দেখি।
মজিলাম অবোধ রাজার হাতে ঠেকি।।
বালকের ক্লান্তি নাহি আর বাড়ে বল।
পতঙ্গের প্রায় দেখে কুরুসৈন্য দল।।
নলবন দলে যেন মদমত্ত হাতী।
নিপাতে নিমিষে লক্ষ লক্ষ সেনাপতি।।
দুর্নীতি দেখিয়া তবে দুর্য্যোধন ভূপ।
ছাড়িল জীবন আশা শুকাইল মুখ।।
অধোমুখ বীরগণ বুক নাহি বান্ধে।
নৃপতির চরণযুগল ধরি কান্দে।।
কেশরী সমান শিশু মৃগ যেন পেয়ে।
সংহারে সকল সৈন্য দেখ কিবা চেয়ে।।
আকুল হইয়া রাজা রথী সপ্ত জনে।
কহিতে লাগিল অতি বিনয় বচনে।।
দেখ গুরু মহাশয় কর্ণ প্রাণসখা।
বিনাশিল সর্ব্বসৈন্য অভিমন্যু একা।।
শুন শুন সপ্তরথী আমার বচন।
সুনরপি অভিমন্যু বেড় সাত জন।।
সাহসে না হও হীন সতর্ক হইয়া।
মোরে রক্ষা কর এই বালকে বধিয়া।।
জয় করি সমরে পুরাও যদি আশ।
কিনিয়া করিবে তবে মোরে নিজ দাস।।
রাজার বিনয় শুনি বল করে রথী।
পুনরপি যায় রণে সপ্ত সেনাপতি।।
রথে বসে বিক্রমে বাসব তেজ ধরি।
সারথি চালায় রথ শিশু বরাবরি।।
বালকে বেড়িয়া বাণ বরিষয়ে তারা।
বৃষ্টি যেন বরিষয়ে মুষলের ধারা।।
প্রাণপণে করে রন প্রাণে ছাড়ি আশা।
সাহসে বান্ধিয়া বুক করিল ভরসা।।
নিবারণ করি অস্ত্র অভিমন্যু বীর।
বাণে বিন্ধি খণ্ড খণ্ড করিল শরীর।।
ধারায় রুধির বহে অবিরত গায়।
তথাপি তিলেক শ্রম নাহি করে তায়।।

তবে কর্ণ মহাবীর মানিয়া বিস্ময়।
প্রমাদ দেখিয়া ডাকি ছয় জনে কয়।।
অর্জ্জুন হইতে শিশু মহা পরাক্রম।
অবসাদ নাহিক তিলেক নাহি শ্রম।।
সাবধান হইয়া সবাই কর রণ।
এককালে সন্ধান করহ সপ্তজন।।
কেহ কাট ধনুখান কেহ কাট গুণ।
কেহ কাট রথ কেহ কাট অস্ত্র তূণ।।
এ উপায় বিনা কিছু নাহি দেখি আর।
কাল অগ্নি সম শিশু দেখ চমৎকার।।

তবে সপ্তরথী পুনঃ বেড়িল কুমারে।
এককালে সন্ধান করিল সাত বীরে।।
তবে কর্ণ মহাবীর কোপে কম্পে তনু।
অনেক সন্ধানে কাটি ফেলাইল ধনু।।
আর ধনু নিল বীর চক্ষু পালটিতে।
সে ধনু কাটেন কর্ণ গুণ নাহি দিতে।।
যতবার ধরিয় ধনুক হাতে লয়।
খণ্ড খণ্ড করি কাটে সূর্য্যের তনয়।।
পুনর্ব্বার আর ধনু লয়ে গুণ দিল।
দ্রোণের নন্দন তাহা কাটিয়া পাড়িল।।
কবচ কাটিল দ্রোণ আর কাটে ধনু।
দুঃশাসন কাটে রথ সারথির তনু।।
কৃপাচার্য্য বাণেতে কাটিল শরাসন।
দুর্য্যোধন কাটে অশ্ব মারি অস্ত্রগণ।।
অস্ত্র ধনু কাটা গেল রথের সারথি।
শূন্যহস্ত হৈল যেন মদমত্ত হাতী।।
খড়গ লয়ে চর্ম্ম এড়ি রণ করে বীর।
তাহাতে কাটিল সৈন্য কেহ নহে স্থির।।
বড় বড় রথী মারে পর্ব্বতের চূড়া।
খান খান করে রথ হয়ে যায় গুঁড়া।।
শত শত হস্তী মারে পর্ব্বতের প্রায়।
পদাতি পাইক মারে ধরণী লুটায়।।
যোড়া যোড়া ঘোড়া মারে পক্ষীরাজ নাম।
বিষম বালক বড় শমনের সম।।

আকর্ণ সন্ধানে তবে কর্ণ এড়ে শর।
সেই বাণে চর্ম্ম কাটি ফেলায় সত্বর।।
কাটা চর্ম্ম আচ্ছাদন নাহি তাহা উড়ে।
চতুর্দ্দিক হৈতে বাণ গায়ে আসি পড়ে।।
শুধু অসি লইয়া সমর করে বীর।
আসে পাশে সম্মূখে সৈন্যের কাটে শির।।
বড় বড় বীর মারে বড় বড় রথী।
নিবারণে অসক্ত হইল সেনাপতি।।
হস্তী মারে সহস্রেক অতি তড়বড়ি।
অসংখ্য পদাতি পড়ে যায় গড়াগড়ি।।
শিশুর সমর দেখি অগ্নি হৈল কোপে।
অশ্বথামা মহাবীর বাণ যোড়ে চাপে।।
তিন বাণে কাটিয়া ফেলিল খাণ্ডাখান।
অস্ত্রশূণ্য হইলেক না দেখি বিধান।।
চর্ম্ম কাটা গেল, অস্ত্র অবশেষ খাণ্ডা।
তাহা যদি কাটা গেল, ফুরাইল ভাণ্ডা।।
কাহার বিরাম নাহি বলবান অরি।
অসংখ্য রাজার সেনা গণিতে না পারি।।
পঙ্গপাল পাতে জাল চারিদিকে ঢাকা।
পলাইতে পথ নাহি কি করিবে একা।।
নৃপতি অধর্ম্মী বড় অন্যায় সমর।
ধরিয়া বালক মারে পাপিষ্ঠ পামর।।
তবেত অর্জ্জুন সুতে ভয় হৈল মনে।
বিপক্ষের হাতে আর রক্ষা নাহি রণে।।
মুকুটীতে সেনা মারে, কর পদ ঘায়।
চড় চাপড়েতে সবে দেয় যমালয়।।
অস্ত্র রথ দুই হীন একেলা কুমার।
চারিদিক হৈতে হয় অস্ত্র অবতার।।
অবসাদ পেয়ে বীর ছাড়িল নিশ্বাস।
আজি রক্ষা নাহি আর অবশ্য বিনাশ।।
আচরিয়া অধর্ম্ম অন্যায় কৈল রণ।
কেমনে ইহাতে রক্ষা পাইবে জীবন।।
পিতা রণ করে সেনা নারায়ণী যথা।
তিনি মাত্র না জানেন এতেঁক বারতা।।
কৃষ্ণ মম মাতুল অর্জ্জুন মম বাপ।
মৃত্যুকালে না দেখিনু এই মনস্তাপ।।
আমার বৃত্তান্ত তাত গোবিন্দ মাতুল।
শুনিলে অবশ্য হইতেন অনুকূল।।
এতেক চিন্তিয়া শিশু হইল নিরাশ।
উল্কার সমান যেন পড়িল নিশ্বাস।।

হাতে করি লইল রথের চক্রদণ্ড।
যমচক্র সম সেই বড়ই প্রচণ্ড।।
হেন চক্রদণ্ড বীর হাতে করি লৈয়া।
সর্ব্ব সৈন্যগণে বীর মারিলেন গিয়া।।
চূর্ণ করে হয় হস্তী হাজারে হাজার।
তুরঙ্গ মারিল কত সংখ্যা নাহি তার।।
সহস্র সহস্র বীর বধিল বালক।
নিবারিতে নাহি শক্তি জ্বলন্ত পাবক।।
তবে কর্ণ পাঁচ বাণ পূরিয়া সন্ধান।
চক্রদণ্ড কাটিয়া করিল খান খান।।
চক্রদণ্ড গেল যদি চক্র নিল হাতে।
দানবের যুদ্ধ যেন সহ জগন্নাথে।।
তাহাতে অনেক সৈন্য শোয়াইল ক্ষিতি।
লেখা জোখা নাহিক মারিল ঘোড়া হাতী।।
চক্রহস্ত বিষ্ণু যেন অতি জ্যোতির্ম্ময়।
তাহার সমান শোভা অবিমন্যু হয়।।

তবে কর্ণ মহাবীর ধরিয়া ধনুক।
তিন বাণ প্রহারিল যেন হুতভুক।।
অভিমন্যু করে রণ রথচক্র হাতে।
কাটিলেন কর্ণ তাহা তিন বাণাঘাতে।।
শূণ্যহস্ত ব্যস্ত শিশু তাহে রথহীন।
ভরসায় তবু যুঝে সংগ্রামে প্রবীণ।।
পদাঘাত করাঘাত প্রহারেণ যারে।
সেইক্ষণে তাহারে পাঠান যমঘরে।।
মদমত্ত হস্তী যেন মহাভয়ঙ্কর।
মুষ্ট্যাঘাতে রথ রথী বিনাশে বিস্তর।।
হয় পড়ে নাহি হয় পরিমাণ যূথে।
বড় বড় রথী পড়ে অযুতে অযুতে।।
চারিদিকে বীরগণ বরিষয়ে বাণ।
বাণে অঙ্গ হৈল যেন সজারু সমান।।
রক্তে তনু তোলবোল বিকল শরীর।
পড়িয়া ধরণী ধারা কহিছে রুধির।।
অস্ত্রাঘাতে অভিমন্যু হৈল অচেতন।
পুনঃ সপ্তরথী করে অস্ত্র বরিষণ।।
হেনকালে আসে দুঃশাসনের নন্দন।
গদা হাতে করি ধায় মহাক্রুদ্ধ মন।।
অরুণ জিনিয়া রক্ত ঘূর্ণিত নয়ন।
দৈবে যাহা করে তাহা কে করে খণ্ডন।।
আর্জ্জুনি উপরে করে গদার প্রহার।
দেখিয়া অমরগণ করে হাহাকার।।
এমত অন্যায় করে দুষ্ট দুর্য্যোধন।
এই পাপে হইবেক সবংশে নিধন।।
গদার প্রহারে বীর পায় বড় মোহ।
অভিমানে নয়নযুগলে বহে লোহ।।
না দেখিল জনকে মাতুল কৃষ্ণরূপে।
মৃত্যুকালে সেই নাম মনে মনে জপে।।
সম্মূখ সমরে বীর ছাড়িল জীবন।
চন্দ্রলোকে গমন করিল সেইক্ষণ।।

রোদন করয়ে পাণ্ডবের সেনাগণ।
শোকাকুল হইলেন ধর্ম্মের নন্দন।।
দুর্য্যোধন হইলেন আনন্দিত মন।
বাজাইল রণবাদ্য শত শত জন।।
দামামা দগড় বাজে শত শত বাঁশী।
রঙ্গ মোহরী বাজে শত শত কাঁসি।।
শত শত জয়ঢাক বাজে জয়ঢোল।
পৃথিবী যুড়িয়া যেন হৈল গণ্ডগোল।।
বাজে শঙ্খ দুন্দুভি যে সুমধুর বীণা।
ভেউরি ঝাঁঝরি বাজে নাহিক গণনা।।
কুরুসৈন্যে হৈল মহাবাদ্য কোলাহল।
ক্রন্দন করয়ে যত পাণ্ডবের দল।।
যুধিষ্ঠির রাজা হইলেন অচেতন।
রোদন করয়ে ভীম আদি যোদ্ধাগণ।।
হেনকালে অস্তগত হৈল দিবাকর।
কৌরব পাণ্ডব গেল যে যাহার ঘর।।
দ্রোণপর্ব্ব সুধারস অভিমন্যু বধে।
কাশীরাম দাস কহে গোবিন্দের পদে।।

2 thoughts on “১০. অভিমন্যু বধ

  1. আমরা যে চক্রবূহ্যে আছি সেই চক্রবূহ্য ভেদ করার জন্য কোন অভিমন্যু কী নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *