১০৫. কুরুবংশরক্ষার্থ ব্যাসের আহ্বান

পঞ্চাধিকশততম অধ্যায়
কুরুবংশরক্ষার্থ ব্যাসের আহ্বান

ভীষ্ম কহিলেন, ”মাতঃ! ভরতবংশ-রক্ষার উপায়ান্তর নিবেদন করি, শ্রবণ করুন। কোন গুণবান্ ব্রাহ্মণকে ধনদান দ্বারা পরিতুষ্ট করিয়া গৃহে আহ্বান করুন। তিনি বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে প্রজা উৎপাদন করিবেন।” সত্যবতী লজ্জাবতী হইয়া সহাস্য-আস্যে গদ্‌গদস্বরে ভীষ্মকে কহিলেন, ”মহাবাহো! তুমি যাহা কহিতেছ, তাহা যথার্থ বটে; কিন্তু বৎস! তোমার বিশ্বাসের নিমিত্ত আমি কোন কথা কহিতেছি, সবিশেষ অবগত হইয়া কার্য্য করিলে, তাহাতে বংশরক্ষা পাইতে পারে । তুমি ধর্ম্মজ্ঞ, তোমার নিকটে তাদৃশ আপদ্ধর্ম্ম কদাচ প্রত্যাখ্যেয় হইবে না। তুমি আমাদের কুলধর্ম্ম [কুলের ধর্ম্মস্বরূপ−কুলধর্ম্মের মর্য্যাদাভিজ্ঞ], তোমাকে সত্যস্বরূপ জ্ঞান করি, তোমা ব্যতীত আমাদের আর কোন গত্যন্তর নাই; অতএব আমার বক্তব্য, সত্যবৃত্তান্ত অগ্রে শ্রবণ কর, অনন্তর যেরূপ বিবেচনা হয়, করিও। আমার পিতার একখানি তরণী ছিল। তিনি ধর্ম্মার্থী হইয়া বিনা শুল্কে [কর−পারিশ্রমিক] সকলকে সেই নৌকা দ্বারা নদী উত্তীর্ণ করিয়া দিতেন। একদা পিতার আদেশক্রমে লোকদিগকে নদী পার করিবার নিমিত্ত আমি তথায় গমন করিয়াছিলাম। তৎকালে আমার যৌবনোদ্ভেদ হইয়াছিল। অনন্তর মহর্ষি পরাশর যমুনানদী উত্তীর্ণ হইবার নিমিত্ত সেই তরীর নিকট আগমন করিলেন; মুনীন্দ্র নৌকারোহণপূর্ব্বক নদী উত্তীর্ণ হইবার সময় আমার রূপলাবণ্যে মোহিত ও কামার্ত্ত হইয়া সান্ত্ব-পূর্ব্ব মধুরবাক্যে আমাকে কত কথাই বলিলেন এবং অতি দুর্লভ বর দান করিবেন বলিয়া আমার নিকট অঙ্গীকার করিলেন। আমি পিতার তিরস্কার ও মহর্ষির শাপভয়ে ভীত হইয়া তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিতে অসমর্থা হইলাম। তিনি তপঃপ্রভাবে আমায় বশীভূত এবং চতুর্দ্দিক্ কুজ্ঝটিকায় আবৃত করিয়া নৌকামধ্যে আপন অভীষ্টসিদ্ধিতৎপর হইলেন। পূর্ব্বে আমার সর্ব্বাঙ্গ হইতে দুর্গন্ধ− মৎস্যগন্ধ নির্গত হইত, তৎকালে মহর্ষি পরাশর সেই জুগুপ্সিত [নিন্দিত−ঘৃণিত] গন্ধের নিরাকরণপুর্ব্বক আমার শরীরে সৌগন্ধ সঞ্চারিত করিয়াছিলেন। অনন্তর সেই মুনি আমাকে আদেশ করিলেন, ‘তুমি যমুনাদ্বীপে গর্ভ মোচন করিয়া পূনর্ব্বার আপন কন্যকাবস্থা প্রাপ্ত হইবে।’ আমি মুনির আজ্ঞাক্রমে যমুনাদ্বীপে এক পুত্র প্রসব করিলাম। সেই মহাযোগী পরাশরাত্মজ দ্বীপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম দ্বৈপায়ন হইল, চতুর্ব্বেদের বিভাগকর্তা বলিয়া তাঁহার নাম দেবব্যাস হইল এবং অসিতবর্ণ [কৃষ্ণবর্ণ] বলিয়া তাঁহার নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন হইল । তিনি ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র পিতার সহিত গমন করিলেন। সেই সত্যবাদী শমপর মহাতাপসকে অনুরোধ করিলে , তিনি অবশ্যই ভ্রাতার ক্ষেত্রে পুৎত্র উৎপাদন করিবেন । তিনি গমনকালে আমাকে কহিয়াছিলেন, ‘ মাতঃ! সঙ্কটে পড়িলে আমাকে স্মরণ করিও।’ অতএব যদি তোমার মত হয়, তাহা হইলে আমি এক্ষণে সেই মহাতপাকে স্মরণ করি। তুমি অনুমতি করিলে তিনি বিচিত্রবীর্য্যের ক্ষেত্রে অপত্যোৎপাদন করিবেন, সন্দেহ নাই।” ভীষ্ম মহর্ষি ব্যাসদেবের নাম শ্রবণ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে নিবেদন করিলেন, ”যে ব্যক্তি ধর্ম্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবর্গের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া এবং বুদ্ধি দ্বারা ধর্ম্ম ও ধর্ম্মানুবদ্ধ, অর্থ ও অর্থানুবদ্ধ এবং কাম ও কামানুবদ্ধ পর্য্যালোচনা করিয়া কার্য্যে প্রবৃত্ত হয়েন, তিনিই যথার্থ বুদ্ধিমান্; আপনি যেরূপ অনুমতি করিতেছেন, ইহা ধর্ম্মযুক্ত, মঙ্গলাস্পদ এবং আমাদিগের কুলের পরম-হিতকর বটে; অতএব এ বিষয়ে আমার সম্পূর্ণ মত আছে।”
তদনন্তর সত্যবতী দ্বৈপায়নকে স্মরণ করিলেন। বেদপ্রণেতা ভগবান্ ব্যাস, জননী স্মরণ করিয়াছেন জানিয়া তৎক্ষণাৎ অবিদিতরূপে [স্বয়ং উদ্বুদ্ধ হইয়া] আবির্ভূত হইলেন। সত্যবতী বহু দিবসের পর পুৎত্রমুখ নিরীক্ষণ করিয়া যথাবিধি সম্মান ও বাহুযুগল দ্বারা আলিঙ্গনপূর্ব্বক স্নেহনিঃসৃত স্তনদুগ্ধ দ্বারা তাঁহাকে অভিষিক্ত করিলেন এবং অবিরল-বিগলিত আনন্দসলিলে তদীয় হৃদয় প্লাবিত হইতে লাগিল। মহর্ষি ব্যাসও দুঃখিত জননীকে নয়নজলে অভিষিক্ত করিয়া প্রণিপাতপুরঃসর নিবেদন করিলেন, ”ভগবতি! আপনার অভিপ্রেত কার্য্য-সাধনের নিমিত্ত আমি আসিয়াছি; এক্ষণে অনুমতি করুন, কি প্রিয়কার্য্য অনুষ্ঠান করিতে হইবে। তদনন্তর পুরোহিত আসিয়া মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক মহর্ষির যথাবিধি সপর্য্যা [সেবা−পরিচর্য্যা] সমাধান করিলেন। ব্যাসদেব পূজিত হইয়া প্রীতমনে আসনে উপবেশন করিলে সত্যবতী তদীয় কুশলবার্ত্তা জিজ্ঞাসা করিয়া কহিলেন, ” বৎস! পুৎত্র, পিতামাতা উভয়েরই সাধারণ ধন; পুৎত্রের প্রতি পিতার যেরূপ প্রভুত্ব, মাতারও তদপেক্ষা ন্যুন নহে। তুমি আমার জ্যেষ্ঠ পুৎত্র , বিচিত্রবীর্য্য কনিষ্ঠ। ভীষ্ম যেমন পিতৃসম্বন্ধে বিচিত্রবীর্য্যের ভ্রাতা, তুমিও তদ্রূপ মাতৃসম্বন্ধে তাঁহার ভ্রাতা। সত্যসন্ধ ভীষ্ম প্রতীজ্ঞা করিয়াছেন, তিনি দারপরিগ্রহ ও রাজ্যশাসন করিবেন না; অতএব হে অনঘ! ভীষ্ম এবং আমি তোমাকে কোন বিষয়ে নিয়োগ করিতেছি; যদি তুমি ভ্রাতার প্রতি অনুকূল ও পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিগণের প্রতি দয়াবান্ হইয়া আমাদিগের বংশরক্ষার্থ সেই নিয়োগবাক্য রক্ষা কর, তাহা হইলে অতীব প্রীত হই। রূপযৌবনবতী তোমার ভ্রাতৃ-জায়ারা সাতিশয় পুৎত্রার্থিনী হইয়াছেন, তুমি তাঁহাদিগের গর্ভে অনুরূপ পুৎত্র উৎপাদন করিয়া তাঁহাদিগের মনোরথ সিদ্ধ কর।” ব্যাসদেব কহিলেন, ”হে প্রাজ্ঞে! তুমি বিশেষরূপে সর্ব্বপ্রকার ধর্ম্ম পরিজ্ঞাত আছ এবং ধর্ম্মের প্রতি তোমার প্রগাঢ় ভক্তি ও একান্ত অনুরাগ আছে, এই নিমিত্ত তোমার অভিলষিত কার্য্য ধর্ম্মমূলক বিবেচনা করিয়া আমি তদনুষ্ঠানে সম্মত হইলাম। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, ভ্রাতার ক্ষেত্রে মিত্রাবরুণ [সূর্য ও বরুণ]-সদৃশ পুৎত্র উৎপাদন করিব। সম্প্রতি দেবীরা সংবৎসরকাল নিয়মবর্ত্তী হইয়া আমার নির্দ্দিষ্ট ব্রতোপাসনা করুন। তাহা হইলে তাঁহারা পবিত্র হইতে পারিবেন। ব্রতবিবর্জ্জিতা অপবিত্রা রমণী কদাপি আমাকে স্পর্শ করিতে পারিবে না ।”
‌সত্যবতী কহিলেন, ” বৎস! যাহাতে দেবীরা অচিরকালমধ্যে গর্ভবতী হয়েন, এরূপ অনুষ্ঠান কর; কারণ জনপদ অরাজক হইলে প্রজামণ্ডলী অনাথ ও উৎসব হইবে, সুতরাং তাহার সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ম্ম্য [ধর্ম্মসম্মত] ক্রিয়াকলাপ বিনষ্ট হইবে। তাহা হইলে যজ্ঞাংশভাগী দেবগণের পরিতৃপ্তি ও পৃথিবীতে পর্য্যাপ্ত পরিমাণে বারিবর্ষণ কিরূপে সম্ভাবিত হইবে? ফলতঃ অরাজক রাজ্যের ভারগ্রহণ করা কাহারও সাধ্য নহে; অতএব হে পুৎত্র! তুমি অবিলম্বে ইহাদের গর্ভাধান কর । অনন্তর ভীষ্ম তাহার রক্ষণবেক্ষণ করিবেন।” ব্যাসদেব কহিলেন, যদি আপনার পুৎত্রবধুরা পরম ব্রতস্বরূপ আমার বিরূপতা সহ্য করিতে পারেন, তাহা হইলে আমি অকালিক [অল্পসময়ের মধ্যে] পুৎত্র প্রদান করিব । যদি কৌশল্যা [বিচিত্র্যবীর্য্যের পত্নী অম্বিকার নামান্তর] আমার বিকটমুর্ত্তি, ভয়ানক বেশ ও অসহ্য গন্ধ সহ্য করিতে পারেন, তাহা হইলে তিনি অদ্যই গর্ভবতী হইবেন।” ভগবান ব্যাস সত্যবতীকে এই প্রকার আদেশ দিয়া এবং কৌশল্যা শুচি বস্ত্র পরিধান ও রমনীয় বেশভুষা সমাধানপূর্ব্বক শয়নাগারে আমার প্রতিক্ষা করুন, ”এই আজ্ঞা করিয়া অন্তর্হিত হইলেন ।
অনন্তর সত্যবতী নির্জ্জননিবাসিনী পুৎত্রবধুর নিকট গমন করিয়া কহিলেন, ”বৎস কৌশল্যে! পরম হিতকর ধর্ম্মোপদেশ প্রদান করি, শ্রবণ কর। আমার দুর্ভাগ্যবশত ভরতকুল উৎসন্ন প্রায় হইল, এজন্য যে আমি কি পর্য্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি, তাহা বলিতে পারি না এবং তোমার পিতৃবংশও সাতিশয় বিষণ্ণ হইয়াছেন, সন্দেহ নাই। মহামতি ভীষ্ম আমাদিগকে দুঃখিত ও বিষাদসাগরে নিমগ্ন দেখিয়া, সেই দুঃসহ দুঃখনিবারণার্থ বংশ রক্ষার যে উপায় স্থির করিয়া দিয়াছেন, তাহা তোমারই অধীন; অতএব এক্ষণে তুমি সেই ভীষ্মনির্দ্দিষ্টযুক্তির অনুবর্ত্তিনী হইয়া বিনাশোন্মুখে ভরতবংশের পুনরুদ্ধার কর। বৎসে! তুমি দেবরাজসদৃশ পুৎত্র প্রসব করিবে, তিনিই আমাদিগের রাজ্যভার গ্রহণ করিবেন। সত্যবতী এবংবিধ নানাপ্রকার অনুনয়বাক্যে বহুপ্রযত্নে সেই ধর্ম্মপরায়ণা ভামিনীর মন প্রবণ [উপদিষ্ট বিষয় পালনে উন্মুখ] করিয়া, ব্রাহ্মণ, অতিথি ও দেবর্ষি প্রভৃতিকে ভোজন করাইতে লাগিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *