১০০. শান্তনুচরিত। ভীষ্মচরিত। ভীষ্মের যৌবরাজ্যে অভিষেক

শততম অধ্যায়
শান্তনুচরিত

বৈশম্পায়ন কহিলেন, রাজা শান্তনু পরম প্রাজ্ঞ, ধার্ম্মিক ও পরম ধীমান ছিলেন। জিতেন্দ্রিয়তা,দয়ালুতা প্রভৃতি সদ্‌গুণ-সকল তাঁহাকে অলঙ্কৃত করিয়াছিল। মহারাজ শান্তনু দেবর্ষি ও রার্ষিগণের সম্মান-ভাজন, ধীরপ্রকৃতি ক্ষমাবান্, দানশীল ও সত্যবাদী বলিয়া বিখ্যাত ছিলেন এবং সেই সর্ব্বগুণাস্পদ, ধর্ম্মার্থ-কুশলী রাজা ভরতবংশের ও অন্যান্য জনগণের পরিরক্ষক ছিলেন। চক্রবর্ত্তীর (সার্ব্বভৌম−সমস্ত পৃথিবীর অধিপতি) সমুদয় লক্ষণ তাঁহার অঙ্গে লক্ষিত হইত। তিনি অদ্বিতীয় ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন। তাঁহার ন্যায় ধার্ম্মিক রাজা কখন কাহারও দৃষ্টিগোচর হয় নাই। তদানীন্তন লোকেরা সেই কীর্ত্তিমানের সদাচার ও সদ্ব্যবহার দর্শন করিয়া অর্থ ও কাম পরিত্যাগ পুর্ব্বক কেবল একমাত্র ধর্ম্মোপাসনাব্রতে ব্রতী হইয়াছিলেন। নৃপগণ শান্তনুর লোকাতিশায়িনী ধার্ম্মিকতা দেখিয়া তাঁহাকে সম্রাট্‌পদে অভিষিক্ত করিলেন এবং তাঁহার দৃষ্টান্তের অনুবর্তী হইয়া চলিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের শোক, ভয় ও গ্রহপীড়া প্রভৃতির আশঙ্কা ছিল না। তাঁহারা সুস্বপ্নে [স্বনিদ্রায়] নিশাবসান করিয়া শয্যা হইতে পরমসুখে গাত্রোত্থান করিতেন। সেই দেবেন্দ্রপ্রতিম রাজেন্দ্রের দৃষ্টান্তে নৃপতিগণ সকলের প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন করিতে লাগিলেন এবং বদান্য ও যাগশীল হইয়া উঠিলেন। শান্তনুপ্রমুখ রাজগণ নিয়মতন্ত্র হইয়া সুশৃঙ্খলাপূর্ব্বক রাজ্যশাসন করিতে আরম্ভ করিলেন। লোকের ধর্ম্মপ্রবৃত্তির ক্রমশঃ উন্নতি হইতে লাগিল; ক্ষৎত্রিয়েরা বিপ্রসেবায় তৎপর হইলেন, বৈশ্যেরা ক্ষৎত্রিয় সেবায় দীক্ষিত হইলেন এবং শূদ্রেরা ব্রাহ্মণ,বৈশ্য ও ক্ষৎত্রিয় তিন বর্ণের সেবায় নিষুক্ত হইলেন। রাজা শান্তনু কৌরবদিগের সুরম্য রাজধানী হস্তিনাপুরে অবস্থানপূর্ব্বক রাজ্যশাসন করিতে লাগিলেন। তিনি ধর্ম্মজ্ঞ, সত্যবাদী, ঋজুস্বভাব, বদান্য, তপোনিরত, রাগদ্বেষশূন্য, পরম সুন্দর ও প্রিয়দর্শন ছিলেন। তিনি প্রতাপে তপনের ন্যায়, বেগে বায়ুর ন্যায়, কোপর যমের ন্যায় এবং সহিষ্ণুতায় পৃথিবীর ন্যায় ছিলেন। সেই সর্ব্বগুণাকর ভূপাল সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলে কোলের জিঘাংসাপ্রবৃত্তি [হিংসাপ্রবৃত্তি−মারণেচ্ছা] সম্যক্‌রূপে নিবৃত্তি পাইয়াছিল এবং বৃথা হিংসা এককালে রহিত হইয়াছিল। তিনি পক্ষপাত-পরিশূন্য ও কামরাগ-পরিবর্জ্জিত হইয়া অতি বিনীতভাবে সেই ধর্ম্মোত্তর [ধর্ম্মই একমাত্র লক্ষ্য যাহার] রাজ্যে সকল প্রাণীকে নির্ব্বশেষে শাসন করিতে লাগিলেন; দেবর্ষি ও পিতৃলোকের তৃপ্ত্যর্থে যাগাদি ক্রিয়াকলাপ করিতে আরম্ভ করিলেন; দীন, দরিদ্র, অনাথ প্রভৃতির ও র্নিকৃষ্ট প্রাণিগণের পিতাস্বরূপ ছিলেন।

ভীষ্মচরিত

সেই কুরুপতি রাজ্যেশ্বর হইলে লোকের মন দানধর্ম্মে প্রবণ হইল এবং বাক্য একমাত্র সত্যকে আশ্রয় করিল। তিনি পত্নী সহবাস পরিত্যাগপূর্ব্বক চত্বারিংশৎ বৎসর বনবাস করিয়াছিলেন। গঙ্গাগর্ভসম্ভূত তৎপুৎত্র দেবব্রত রূপ, গুণ, আচার, ব্যবহার, বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রভৃতি কোন বিষয়েই পিতা অপেক্ষা ন্যুন ছিলেন না। তিনি সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ, মহাবলপরাক্রান্ত, মহাসত্ত্ব ও মহারথ ছিলেন। একদিবস দেবব্রত একটি মৃগকে বাণবিদ্ধ করিয়া তাহার অনুসরণক্রমে ভাগীরথীতীরে উপনিত হইয়া শরজালে নদীর জল শুষ্কপ্রায় করিয়া ফেলিলেন। রাজা শান্তনু সরিদ্বরার এইরূপ অদৃষ্টপূর্ব্ব গতিরোধ দর্শনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, ‘অদ্য গঙ্গা পূর্ব্বের ন্যায় প্রবাহিত হইতেছে না কেন? অনন্তর কারণজিজ্ঞাসু হইয়া অনুসন্ধান করিতে করিতে দেখিলেন, দেবরাজসদৃশ এক পরম রূপবান্ কুমার তীক্ষ্ণধার অসংখ্য দিব্যাস্ত্র দ্বারা গঙ্গাকে আচ্ছন্ন করিয়া দণ্ডায়মান আছেন। এই অলৌকিক ব্যাপার নয়নগোচর করিয়া রাজা বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাঁহাকে অতীব শৈশবাবস্থায় দেখিয়াছিলেন, সুতরাং এক্ষণে আত্মজ বলিয়া চিনিতে পারিলেন না। দেবব্রত পিতাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন, কিন্তু কি জানি, পাছে রাজা তাঁহাকে স্বীয় পুৎত্র বলিয়া জানিতে পারেন, এই আশঙ্কায় তিনি তৎক্ষণাৎ অন্তর্হিতা হইলেন।

রাজা শান্তনু এই অদ্ভুত ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহাকে আপন পুৎত্র-বিবেচনায় গঙ্গাকে দেখাইতে কহিলেন। গঙ্গা মনোহর রূপধারণ করিয়া কুমারের দক্ষিণ হস্ত গ্রহণপূর্ব্বক রাজাকে দর্শন করাইলেন। পরমরমণীয় বেশভুষায় ভূষিতা ও পরিস্কৃত বস্ত্রে সংবৃতাঙ্গী গঙ্গা দৃষ্টপূর্ব্বা হইলেও রাজা তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন না।

গঙ্গা কহিলেন, ”মহারাজ! আপনি পূর্ব্বে আমার নিকট যে অষ্টম পুৎত্র প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, ইনিই সেই মহাপুরুষ। অধুনা ইনি সর্ব্বশস্ত্র-বিশারদ ও সর্ব্বোৎকৃষ্ট হইয়াছেন। আমি ইঁহাকে পরিবর্দ্ধিত করিয়াছি। এক্ষণে পুৎত্রকে গৃহে লইয়া যাউন। ইনি বশিষ্টের নিকট বেদ-বেদাঙ্গ অধ্যয়ন করিয়াছেন।এই মহাবল পরাক্রান্ত কুমার কৃতাস্ত্র, অদ্বিতীয় ধনুর্ন্ধর ও ইন্দ্রের ন্যায় যোদ্ধা হইয়াছেন। ইনি সুরাসুরগণের পরম প্রণয়াস্পদ। দৈত্যকুলগুরু শুক্রাচার্য্য যে সকল শস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছেন, তৎসমুদয়ই ইহার কণ্ঠস্থ। সুরাসুরনমস্কৃত বৃহস্পতি যে-সকল শাস্ত্র পরিজ্ঞাত আছেন, ইনিও তৎসমুদয় অধ্যয়ন করিয়াছেন, শত্রুবর্গের দুরাক্রম্য, মহাবল, প্রবলপ্রতাপ মহর্ষি জামদগ্ন্য যে-সকল অস্ত্র শিক্ষা করিয়াছিলেন, এই পুৎত্র তৎসমুদয়ে সুশিক্ষিত হইয়াছেন এবং রাজধর্ম্মে ও অর্থ চিন্তায় সুনিপুণ হইয়াছেন, অতএব মৎপ্রদত্ত এই অশেষগুণসম্পন্ন পুৎত্র-সমভিব্যাহারে গৃহে গমন করুন।”

রাজা গঙ্গা কর্ত্তৃক এইরূপ আদিষ্ট হইয়া সূর্য্যের ন্যায় দীপ্তিমান পুৎত্রকে লইয়া স্বনগরে প্রত্যাগমন করিলেন। রাজা শান্তনু পুৎত্র-সমভিব্যাহারে অমরাবতীসদৃশ নিজ রাজধানীতে উপনীত হইয়া চরিতার্থ ও কৃতার্থম্মন্য হইলেন।

ভীষ্মের যৌবরাজ্যে অভিষেক

অনন্তর বন্ধুবান্ধবগণকে আহ্বান করিয়া রাজ্যের কুশলের নিমিত্ত সেই সর্ব্বগুণান্বিত পুৎত্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করিলেন। যুবরাজ সদ্ব্যবহার প্রদর্শন দ্বারা পিতাকে, কৌরবদিগকে এবং জনপদস্থ সমস্ত ব্যক্তিকে যৎপরোনাস্তি প্রীত ‌হইলেন। রাজা প্রীতমনে পুৎত্রের সহিত চারি বৎসর পরমসুখে কালযাপন করিয়া পরিশেষে একদিবস যমুনানদীর উভয়পার্শ্বস্থিত এক অরণ্যে গমন করিলেন। তথায় অকস্মাৎ সৌরভের আঘ্রাণ পাইলেন; কিন্তু কোথা হইতে সেই সুরভি গন্ধ সঞ্চারিত হইতেছে, সবিশেষ না জানিতে পারিয়া ইতস্ততঃ অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। অনন্তর অমিত-লোচনা দেবরূপধারিণী এই ধীবরকন্যাকে নিরীক্ষণ করিয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ”ভীরু! তুমি কে, কাহার পত্নী এবং কি নিমিত্তই বা এখানে আসিয়াছ?’ ‘সে কহিল মহাশয়! আমি ধীবরকন্যা, পিতার আদেশে তরণী বাহন করিয়া থাকি।” রাজা শান্তনু ধীবরকন্যার অনুপম রূপমাধুরী সন্দর্শনে ও অঙ্গসৌরভ অঘ্রাণে মোহিত হ‌ইয়া তাঁহাকে বিবাহ করিবার মানসে তাঁহার পিতার নিকট গমনপূর্ব্বক আপন অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন।

দাসরাজ কহোলেন, ”হে প্রজ্ঞানাথ! যখন কন্যা জন্মিয়াছে, অবশ্যই তাহাকে পাত্রসাৎ করিতে হইবে; আপনি সত্যবাদি, যদ্যপি এই কন্যাটি ধর্ম্মপত্নীরূপে প্রার্থনা করেন, তবে আমি আপনাকে সম্পাদন করিব; কিন্তু আমার একটি আভিলাষ আছে, তাহা ‘পূর্ণ করিব’ বলিয়া অগ্রে স্বীকার করিতে হইবে।”

শান্তনু কহিলেন, ”হে ধীরব! তোমার অভিলাষ শ্রবণ না করিয়া কিরূপে তাহাতে সম্মত হইতে পারি? যদি অভিলষিত বিষয় দানযোগ্য হয়, নিশ্চই প্রদান করিব; কিন্তু অদেয় হইলে কোনক্রমেই দিতে পারিব না। ”ধীবর কহিলেন, ”মহারাজ! এই কন্যার গর্ভে যে পুৎত্র জন্মিবে, আপনার অবর্তমানে সেই পুৎত্র রাজ্যে অভিষিক্ত হইবে; অন্য কেহ সিংহাসনে অধিরূঢ় হইতে পারিবে না, এই আমার অভিলাষ।” রাজা প্রদীপ্ত মদনানলে দগ্ধ হইয়াও ধীবরকে বরদান করিতে সম্মত হইলেন না। তিনি অনঙ্গশরে বিচেতনপ্রায় হইয়া ধীবর কুমারীর আনুপম রূপলাবণ্য চিন্তা করিতে করিতে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করিলেন।

অনন্তর একদিবস দেবব্রত পিতার নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে শোকার্ত্ত ও চিন্তাকুল দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তাত! আপনার সর্বত্র কুশল ও সমুদায় রাজমণ্ডল আপনার অধীন, তথাপি কি নিমিত্ত-নিরন্তর আপনাকে এইরূপ শোকার্ত্ত ও দুঃখিত দেখিতেছি? সর্ব্বদাই যান শূন্যহৃদয়ে রহিয়াছেন, আমাকে পুৎত্র বলিয়া সম্ভাষণ করিতেছেন না, অশ্বরোহণপূর্ব্বক ভ্রমণ করেন না, কেবল দিন দিন মলিন, পাণ্ডুবর্ণ ও কৃশ হইতেছেন; অতএব আপনার কি রোগ হইয়াছে, আজ্ঞা করুন, আমি তাহার প্রতিকার করিব।”

পুৎত্রের কথা শ্রবণ করিয়া শান্তনু কহিলেন, ”বৎস ! আমি যে নিমিত্তে এত উৎকণ্ঠিত হইয়াছি, তাহা শ্রবণ কর। আমাদিগের বংশে তুমিই একমাত্র পুৎত্র অস্ত্রশাস্ত্রে সুশিক্ষিত ও পুরুষকার-বিশিষ্ট হইয়াছ। কিন্তু হে পুৎত্র ! মনুয্যের কিছুই চিরস্থায়ী নহে। ইহা বড় আক্ষেপের বিষয়। কারণ, যদি তোমার কোন অনিষ্টঘটনা হয়, তাহা হইলে আমাদিগের কুল নির্ম্মূল হইবে, সন্দেহ নাই। তুমি একশত পুৎত্র অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, অতএব আর বৃথা দারপরিগ্রহ করিতে আমার অভিলাষ নাই; কিন্তু ধর্ম্মবাদীরা কহিয়া থাকেন, যাঁহার এক পুৎত্র, তিনি অপুৎত্রমধ্যেই পরিগণিত। ত্বদীয় অনিষ্ট-শান্তির নিমিত্ত নিরন্তর পরমেশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, তিনি তোমার মঙ্গল বিধান করুন; অগ্নিহোত্র, ত্রয়ী [বেদ] এবং নিখিল শাস্ত্র কিছুই সন্তানের ষোড়শাংশেরও তুল্য নহে। তুমি মহাবলপরাক্রান্ত, সর্বদা সশস্ত্র ও অমর্ষপরিপুরিত [ক্ষৎত্রিয়োচিত তেজদৃপ্ত−তেজীয়ান্]; অতএব রণক্ষেত্র ব্যতিরেকে কুত্রাপি তোমার নিধন হইবে না। কিন্তু বৎস ! অধিক কি বলিব, আমি তোমার নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি সংশয়ারূঢ় হইয়াছি, অন্তঃকরণ কিছুতেই সুস্থির হয় না, তন্নিমিত্ত আমি এই অপার দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইয়াছি।” মহানুভব দেবব্রত রাজার বিষাদ-কারণ সবিশেষ পরিজ্ঞাত হইয়া ক্ষণকাল বিবেচনা করিলেন। অনন্তর পিতার পরমহিতৈষী বৃদ্ধ সচিবের সন্নিধানে সত্বর গমনপূর্ব্বক রাজার শোকবৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। মন্ত্রিবর কৌরবশ্রেষ্ঠ দেবব্রতকে ধীবরকুমারীর বৃত্তান্ত আদ্যোপান্ত নিবেদন করিলেন। দেবব্রত মন্ত্রিপ্রমুখাৎ সমুদয় শ্রবণ করিয়া ক্ষৎত্রিয়গণ-সমভিব্যাহারে ধীবর সমীপে গমনপূর্ব্বক পিতার নিমিত্ত স্বয়ং তদীয় কন্যারত্ন প্রার্থনা করিলেন। দাসরাজ রাজকুমারকে যথোচিত সমাদর ও অভ্যর্থনা করিয়া বসিতে আসন প্রদান করিলেন। রাজপুৎত্র আসনে উপবেশন করিলে ধীবর সমাগত রাজগণ-সমক্ষে কহিলেন, ”হে ভরতর্ষভ! আপনি মহারাজ শান্তনুর কুলপ্রদীপ, আপনার ন্যায় পুৎত্র আর দৃষ্টিগোচর হয় না। আপনি বিবেচনা করিয়া দেখুন, ঈদৃশ শ্লাঘ্য সন্বন্ধ পরিত্যাগ করিলে কোন ব্যক্তি না দুঃখিত হয়? সাক্ষাৎ ইন্দ্রও এ সন্বন্ধ পরিত্যাগ করিতে পারেন না। যিনি আপনার সমান গুণবান্, যাঁহার ঔরসে বরবর্ণিনী সত্যবতীর জন্ম হয়, তিনি বারংবার আমার নিকট ত্বদীয় পিতার গুণকীর্ত্তনপূর্ব্বক কহিয়াছেন যে, সেই ধর্ম্মজ্ঞ রাজাই সত্যবতীর পাণিগ্রহণ করিবার উপযুক্ত পাত্র। মহর্ষি পরাশর সত্যবতীর নিমিত্ত অত্যন্ত উৎসুক হইয়াছিলেন, কিন্তু আমি তাঁহার প্রার্থনায় সম্মত না হইয়া সেই অসিতাঙ্গ [কৃষ্ণবর্ণ] মুনীন্দ্রকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছি। আমি কন্যার পিতা, অতএব একটি কথা বলিব। এ পরন্তপ [শত্রুতাপন−শত্রুর সন্তাপকারী]! বোধ হইতেছে এই পরিণয় সম্পন্ন হইলে অতি ভয়ঙ্কর বৈরানল প্রজ্বলিত হইবে; কিন্তু আপনি ক্রুদ্ধ হইলে কি সুর, কি অসুর, কি গন্ধর্ব্ব, যে কুলসম্ভুত হউক না কেন, সমস্ত শত্রুগণ অচিরকালমধ্যে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইবে, সন্দেহ নাই। হে রাজকুমার! কেবল এইমাত্র দোষ দৃষ্ট হইতেছে, নতুবা এ বিষয়ে আর কোন সংশয় নাই।”

পিতৃভক্ত গাঙ্গেয় ধীবরবাক্য শ্রবণ করিবা সমাগত রাজগণ সমক্ষে যথাযুক্ত প্রত্যুত্তর করিলেন, ”হে সত্যবাদিন্! আমার সত্যব্রত শ্রবণ কর। আমি নিশ্চয় বলিতেছি, তুমি যাহা কহিবে, অবিকল সেইরূপ কার্য্য করিব। যিনি ইঁহার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিবেন, তিনি আমাদিগের রাজা হইবেন।” অনন্তর জালজীবী কহিলেন, ” হে ভরতর্ষভ! আপনি রাজ্যের হিতার্থে অতিশয় দুষ্কর কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, অতএব আপনি কন্যার প্রভু হইলেন, সুতারাং ইহার দানেও আপনারই সম্পূর্ণ অধিকার হইল; কিন্তু আমার আর একটি কথা শ্রবণ এবং তদনুরূপ কার্য্য করিতে হইবে। আপনার নিকট ঈদৃশ প্রস্তাব করাতে আমার নিতান্ত বালকত্ব প্রকাশ পাইবে বটে, তথাপি সন্দিহান হইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি। আপনি সত্যবতীর নিমিত্ত ভূপাতিগণ-সমক্ষে যেরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, তাহা আপনার অননুরূপ নহে; অতএব আমি তদ্বিষয়ে অনুমাত্রও সন্দেহ করি না; কিন্তু যিনি আপনার সন্তান হইবেন তাঁহার প্রতি আমার অত্যন্ত সন্দেহ হইতেছে।” পিতার প্রিয়চিকীর্ষু দেবব্রত ধীবরের অভিসন্ধি জানিয়া তত্রত্য ভূপতিগণ ও ধীবরকে সন্বোধন করিয়া কইলেন, ”আমি ইতিপূর্ব্বেই সাম্রাজ্য পরিত্যাগ করিয়াছি এবং অধুনা প্রতিজ্ঞা করিতেছি, অদ্যাবধি ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিব। আমি অপুৎত্র হইলেও আমার অক্ষয় স্বর্গলাভ হইবে সন্দেহ নাই।” দাসরাজ দেবব্রতের প্রতিজ্ঞাবাক্য শ্রবণ করিয়া হর্যে পুলকিত হইয়া কহিলেন, ”আপনার পিতাকেই কন্যাদান করা কর্ত্তব্য।” অনন্তর দেবতা ও অপ্সরোগণ অন্তরীক্ষ হইতে রাজকুমারের মস্তকে পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে ‘ভীষ্ম’ বলিয়া সন্বোধন করিলেন। পিতৃভক্ত ভীষ্ম সেই যশস্বিনীকে কহিলেন, ” মাতঃ ! রথোপরি আরোহণ করুন, আমরা গৃহে গমন করি।” অনন্তর রথারোহণপুর্ব্বক হস্তিনাপুরে আগমন করিয়া রাজা শান্তনুকে সমস্ত নিবেদন করিলেন। রাজগণ সমবেত ও পৃথক পৃথক্ হইয়া মুক্তকণ্ঠে তাঁহার এই দুরূহ কার্য্যের ভূরি ভূরি প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং তাঁহাকে ভীষ্ম বলিয়া আহ্বান করিতে লাগিলেন। রাজা শান্তনু ভীষ্মের অসাধারণ ক্ষমতা ও কচ্ছ্রসাধ্য ব্যাপারে দৃঢ়তর অধ্যবসায় দর্শনে সাতিশয় আনন্দিত হইয়া তাঁহাকে এই বর প্রদান করিলেন, ”হে মহাত্মন ! স্বেচ্ছা ব্যতিরেকে তোমার মৃত্যু হইবে না।”

0 thoughts on “১০০. শান্তনুচরিত। ভীষ্মচরিত। ভীষ্মের যৌবরাজ্যে অভিষেক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *