০৯. জরাসন্ধ বধ ও রাজগণের কারামোচন

অহর্নিশি চতুর্দ্দশ দিবস সংগ্রাম।
নিশ্বাস ছাড়িতে দোঁহে না পায় বিশ্রাম।।
অনাহারে পীড়িত দোঁহার কলেবর।
নিস্তেজ হইল বৃহদ্রথের কোঙর।।
অচল হইল অঙ্গ, হরিলেক জ্ঞান।
তথাপিহ দাণ্ডাইয়া আছে বিদ্যমান।।
পবন-নন্দন ভীম মহাপরাক্রম।
এত যুদ্ধে শরীরে তিলেক নাহি শ্রম।।
ডাকিয়া বলেন কৃষ্ণ, কি দেখহ আর।
এইকালে শত্রু কেন না কর সংহার।।
কৃষ্ণের বচনে ক্রোধ করি বৃকোদর।
দুই পায়ে ধরি ফেলে ভূমির উপর।।
পুনরপি ধরে তারে কুন্তীর কুমার।
দুই পায়ে ধরিয়া ভ্রমায় চক্রাকার।।
শতবার ভ্রমাইয়া ফেলে ভূমিতলে।
বক্ষঃস্থল চাপিয়া বসিল মহাবলে।।
কণ্ঠে জানু দিয়া বুকে বজ্র-মুষ্টি মারে।
গুরুতর গর্জ্জনে কম্পয়ে ধরাধরে।।
রাজ্যের যতেক লোক হৈল মূর্চ্ছা প্রায়।
কাহার বচন কেহ শুনিতে না পায়।।
গর্ভবতী স্ত্রী গর্ভ পড়িল খসিয়া।
হস্তী অশ্ব আদি পশু যায় পলাইয়া।।
যথাশক্তি বৃকোদর করেন প্রহার।
তথাপি না হয় জরাসন্ধের সংহার।।
আর্শ্চর্য্য দেখিয়া ভীম বলেন কৃষ্ণেরে।
যথাশক্তি করিলাম প্রহার ইহারে।।
ইহার মরণে আমি, না দেখি উপায়।
এত শুনি ডাকিয়া বলেন যদুরায়।।
পূর্ব্বে সন্ধি কহিয়াছি কেন বিস্মরণ।
সেইরূপে জরাসন্ধ হইবে নিধন।।
বৃকোদরে দেখাইয়া দিলেন শ্রীনাথ।
দুই করে ধরি চিরিলেন বেণাপাত।।
দেখিয়া হৈলেন হৃষ্ট কুন্তীর নন্দন।
পুনরপি ধেয়ে যান করিয়া গর্জ্জন।।
বজ্রমুষ্টি প্রহারিয়া ফেলেন ভূতলে।
সিংহ যেন মৃগ ধরি ফেলে অবহেলে।।
একপদ পদে চাপি আর পদে কর।
হুঙ্কারিয়া টানিলেন বীর বৃকোদর।।
মধ্যখানে চিরিয়া করেন দুইখান।
জন্মকাল অঙ্গ প্রাপ্তে হারাইল প্রাণ।।
জরাসন্ধ পড়িল, সহর্ষ নারায়ণ।
আনন্দেতে তিন জনে কৈল আলিঙ্গন।।
রাজ্যের যতেক লোক প্রমাদ গণিল।
জরাসন্ধ-সুত সহদেব নামে ছিল।।
ভয়েতে কম্পিত তনু পাত্র মিত্র লয়ে।
গোবিন্দের চরণেতে পড়িল আসিয়ে।।
তবে কর যুড়ি কহু করিল স্তবন।
তোমার মহিমা প্রভু জানে কোন্ জন।।
তুমি ব্রহ্মা, তুমি বিষ্ণু, তুমি পুরন্দর।
তুমি আদ্যা, তুমি শক্তি, তুমি বৈশ্বানর।।
তুমি চন্দ্র, তুমি সূর্য্য, তুমি জলেশ্বর।
তুমি বায়ু, তুমি বল, তুমি চরাচর।।
আমি অতি মূঢ়মতি, নাহি জানি তোমা।
চারি বেদে নাহি জানে তোমার তুলনা।।
এইরূপে বহু স্তুতি করিল কুমার।
ঈষৎ হাসিল তবে দেব গদাধর।।
আশ্বাসিয়া গোবিন্দ অভয় তারে দিল।
মগধ-রাজ্যেতে তারে দণ্ড ধরাইল।।
বন্দিশালে আছিল যতেক রাজগণ।
একে একে ঘুচাইল সবার বন্ধন।।
নানা রত্নে সবাকারে করিল ভূষণ।
করযোড়ে স্তুতি করি কহে রাজগণ।।
সদয়-হৃদয় তুমি সেবক-রঞ্জন।
দুর্ব্বলের বল, গর্ব্বীর গর্ব্ব-ভঞ্জন।।
অনাথের নাথ ‍তুমি, হিংস্রকের অরি।
ধর্ম্মের পালন হেতু মর্ত্ত্যে অবতরি।।
কে বর্ণিতে পারে গুণ, বেদে অগোচর।
সদা যোগে ধ্যানে যারে না পায় শঙ্কর।।
যুত দুঃখ দিল জরাষন্ধ নৃপবরে।
সকল সফল হৈল ভাবি যে অন্তরে।।
অভয় পঙ্কজ-পদ দেখিনু নয়নে।
বদনে অমৃত ভাষা, শুনিনু শ্রবণে।।
বলে জরাসন্ধ প্রভু করিল বন্ধন।
এত দিনে বলি দিত সব রাজগণ।।
কৃপায় সবারে প্রভু করিলা উদ্ধার।
এ কর্ম্ম তোমার প্রভু কিছু নহে ভার।।
আজ্ঞা কর আমরা করিব কিবা কার্য্য।
গোবিন্দ বলেন, সবে যাহ নিজ রাজ্য।।
রাজসূয় করিবেন ধর্ম্মের নন্দন।
সেই যজ্ঞে সহায় হইবে সর্ব্বজন।।
এত শুনি রাজগণ করে অঙ্গীকার।
প্রণমিয়া দেশে সবে গেল যে যাহার।।
তবে জরাসন্ধ-রথ আনি নারায়ণ।
তিন জনে আরোহণ করেন তখন।।
অপূর্ব্ব সুন্দর রথ লোকে অগোচর।
সেই রথে চড়ি পূর্ব্বে দেব পুরন্দর।।
দলিল দানবগণ ঊনশত বার।
যোজন পর্য্যন্ত দৃষ্টি হয় ধ্বজা যার।।
ঈন্দ্র হৈতে পাইল বসু মগধ-ঈশ্বরে।
বসু হৈতে বৃহদ্রথ, সে দিল কুমারে।।
সেই রথে আরোহিয়া যান তিন জন।
গোবিন্দ গরুড়ে তবে করিলা স্মরণ।।
আজ্ঞা করিলেন বসিবারে ধ্বজোপরে।
খগপতি-ধ্বজ-রথ ঘোষে চরাচরে।।
শঙ্খনাদ করিয়া চলিল শীঘ্রগতি।
ইন্দ্রপ্রস্থে উপনীত তিন মহামতি।।
যুধিষ্ঠির-চরণে করিয়া নমস্কার।
একে একে কহেন সকল সমাচার।।
আনন্দেতে যুধিষ্ঠির করি আলিঙ্গন।
গোবিন্দে অনেক পূজা করেন তখন।।
জরাসন্ধ-রথ আর অমূল্য রতন।
কৃষ্ণেরে দিলেন রাজা হৈয়া হৃষ্টমন।।
সেই রথে আরোহিয়া দেব দামোদর।
মেলানি মাগিয়া যান দ্বারকা-নগর।।
পুণ্যকথা ভারতের শুনিলে পবিত্র।
গোবিন্দের লীলা-রস পাণ্ডব-চরিত্র।।
সভাপর্ব্বে সুধারস জরাসন্ধ বধে।
কাশীরাম দাস কহে গোবিন্দের পদে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *