০৯. কর্ণ বধ

হিতে খান্ডব বন, মম মায়ে বিনাশন,
করিলেন পাণ্ডুর নন্দন।
বাজি বৈরী উদ্ধারিব, অর্জ্জুনের সংহারিব,
কর্ণ সনে করিব মিলন।।
এতেক ভাবিয়া নাগ, মনেতে করিয়া রাগ,
আকাশে উঠিল সেইক্ষণ।
জননীর বৈরি শোধি, কিরূপে অর্জ্জুন বধি,
এই যুক্তি ভাবে মনে মন।।
আপনি সুবুদ্ধি বীর, সঙ্কুচিয়া স্বশরীর,
রণ মধ্যে করিল প্রবেশ।
মুখেতে অনল জ্বলে, উল্কা যেন ভূমিতলে,
যোগবলে হৈল বাণ বেশ।।
হেনকালে দিব্যবাণ, কর্ণ পূরিল সন্ধান,
অর্জ্জুনের বধ মনে করি।
সুবিখ্যাত কর্ণবীর, কোপভরে নহে স্থির,
রুদ্র বাণ নিল করে ধরি।।
রুদ্র বাণ লয়ে হাতে, মহাবীর অঙ্গনাথে,
অধিষ্ঠাতা তাহে হৈল সর্প।
সন্ধান করিল বীর, বিনাশিতে পার্থ বীর,
পরশুরামের যত দর্প ।।
বুঝিয়া বিশেষ কার্য, নিষেধিল শল্যরাজ,
ভাগিনীরে করিবারে ত্রাণ।
শুন কর্ণ বীরবর, পুনশ্চ সন্ধান কর,
শরাসন নহে পরিমাণ।।
ক্রোধমুখে বীর কর্ণ, নয়ন অরুণ বর্ণ,
না করিব সেই শরবৃষ্টি।
মারে আর দুই শর, বিন্ধি করে জর জর,
উপদেশ না করে অনিষ্টি।।
মারিব অর্জ্জুন তোকে, দেখিবে সকললোকে,
এত বলি এড়ে কর্ণ শর।
আকাশে আইসে বাণ, অগ্নি যেন দীপ্তমান,
ব্যস্ত হইলেন দামোদর।।
পায়ে চাপি রথবর, বসায়েন ভূমিপর,
হাঁটু গাড়ি তুরঙ্গ পশিল।
প্রশংসয়ে দেবগণ, সুশিক্ষিত জনার্দ্দন,
এত হস্তে পৃথিবী ধরিল।।
পার্থ মহাবীরবর, নাশিতে নারেন শর,
মাথার কিরীট কাটা গেল।
বিশ্বকর্ম্মা নির্ম্মাইল, নানারত্ন শোভা ছিল,
যে কিরীট ইন্দ্র দিয়াছিল।।
যেন অস্ত গিরিবর, একা রহে দিনকর,
গিরি হৈতে চূড়া পড়ে খসি।
সে হেন কিরীট পড়ি, ভূমে যায় গড়াগড়ি,
প্রভা উঠে গগন পরশি।।
পুনঃ গেল শর্প বাণ, কর্ণবীর বিদ্যমান,
বিনয়ে কহিল বহুতর।
না পাই সন্ধান যোগ, বিফল হইল ভোগ,
এড় পুনঃ উল্কা সম শর।।
পুছে কর্ণ মহাশয়, সর্প দিল পরিচয়,
পুনঃ রণে কর্ণ মহাশয়।
পূর্ব্বের সংগ্রাম যত, সকলি হইল হত,
এবে করি অর্জ্জুনের ক্ষয়।।
জানিয়া কর্ণের দর্প, পুনঃ গেল কালসর্প,
অর্জ্জুনেরে করিতে সংহার।
মুখেতে অনল বৃষ্টি, ধাইলেন ঊর্দ্ধদৃষ্টি,
সর্ব্বলোকে দেখে ভয়ঙ্কর।।
জানিয়া সর্পের তত্ত্ব, শ্রীকৃষ্ণ কহেন সত্য,
সন্ধান করহ ধনঞ্জয়।
সত্বরে আইলে সর্প, অগ্নি সম মহাদর্প,
শীঘ্র তারে কর পরাজয়।।
ছয় বাণ যুড়ি বীর, কাটিল সর্পের শির,
খণ্ড খণ্ড হইয়া পড়িল।
দর্পে পরাজয় করি, কৃষ্ণ দুই হাতে ধরি,
ভূমি হত রথ উদ্ধারিল।।
পুনঃ কর্ণ ধরি ধনু, বিন্ধিল অর্জ্জুন তনু,
বাছিয়া বাছিয়া এড়ে বাণ।
বাণে নিবারিয়া বাণ, ধনঞ্জয় ধনুর্ব্বাণ,
নিজ বাণ করেন সন্ধান।।
কর্ণের শরীর ভেদি, রক্তে যেন বহে নদী,
সর্ব্ব গাত্রে বহিছে রুধির।
কর্ণবীর অস্ত্র মারি, সর্ব্ব অস্ত্র নাশ করি,
পুনঃ অস্ত্র এড়ে মহাবীর।।
ভেদিল দ্বাদশ শরে, দামোদর কলেবরে,
আর বাণ মারে শীঘ্রগতি।
সন্ধান করিয়া শরে, বিন্ধিলেক পার্থবীরে,
হাসিলেন কর্ণ যোদ্ধাপতি।।
অর্জ্জুন যে সুসন্ধানে, কবচ কাটেন বাণে,
নিবারিতে নারে কর্ণবীর।
বাছিয়া মারেন শর, ধনঞ্জয় ধনুর্দ্ধর,
পুনঃ পুনঃ মারিছেন তীর।।
হৈল যেন বজ্রাঘাত. কম্পে যেন দীনাথ,
কর্ণবীর সহিতে না পারে।
বাছিয়া মারিলা শর, ধনঞ্জয় ধনুর্দ্ধর,
সত্বরে বিন্ধেন কর্ণবীরে।।
অবশ হইল তনু, খসিল হস্তের ধনু,
মুর্চ্ছিত হইল কর্ণবীর।
কর্ণকে মুর্চ্ছিত দেখি, শ্রীকৃষ্ণ কহেন ডাকি,
শুন ধনঞ্জয় মহাবীর।।
সাবধানে কর রণ, আজি কর নিপাতন,
শীঘ্র বিন্ধ কর্ণের শরীর।
প্রকাশিয়া নিজ শৌর্য্য, কর কর্ণ বধকার্য্য,
যাহা কহিলেন যুধিষ্ঠির।।
শুনয়া কৃষ্ণের বাক্য, নাশিতে বিপক্ষ পক্ষ
পার্থ মারিলেন বহু বাণ।
মহা অস্ত্র যত ছিল, সে সকল পাসরিলম
গুরুশাপে হইয়া অজ্ঞান।।
মহাসত্ব কর্ণবীরম চৈতন্য পাইয়া ধীর
নানা অস্ত্র করে বরিষণ।
তিন বাণে জনার্দ্দনে, বিন্ধিলেন সেইক্ষণে,
ধনঞ্জয় মারে সাত বাণ।।
কাটা গেল ধনুগুণ, লজ্জিত হইল পুন,
আর গুন দিয়া যুড়ি শরে।
অর্জ্জুন মারেন শর, কাটে কর্ণ ধনুর্দ্ধর,
হাসি পুনঃ বাণ নিল করে।।
ধরিয়া বিজয় ধনু, বিন্ধিল অর্জ্জুনত,
শরে কর্ণ করে অন্ধকার।
অর্জ্জুনে ফাঁপর দেখি, শ্রীকৃষ্ণ কহেন ডাকি,
শীঘ্র কর কর্ণেরে সংহার।।
কৃষ্ণবাক্যে রুদ্র বাণ, পার্থ করি সুগদ্ধ,
বজ্র যেন হাতে লৈল শত্রু।
ব্যর্থ, হ্য় ব্রহ্মপাপ, কর্ণ পায় অনুত,
পৃথিবী গ্রাসিল রথচক্র।।
ক্রন্দন করয়ে বীর, নয়নেতে বহে
অর্জ্জুনে কহিলা উচ্চৈঃস্বরে।
মুহুর্ত্তেক ক্ষমা কর, ওহে পার্থ ধনুর্দ্ধর,
রথচক্র উদ্ধারিব করে।।
যেই জন মুক্তকেশ, প্রহারে বিকল বেশ,
শরণ মাগয়ে যদি রণে।
কবচ রহিত জনে, নাহি ধরে অস্ত্রগণে,
তারে মারে কাপুরুষ জনে।।
তুমি লোকে নরোত্তম, তব কীর্ত্তি অনুপম,
ধর্ম্মজ্ঞানে তোমারে বাখানি।
রথের উপরে তুমি, অভাগ্যেতে আমি ভূমি,
মুহূর্ত্তেক ক্ষমা কর জানি।।
কৃষ্ণ হৈতে নাহি ভয়, তোমাতে সংশয় হয়,
সে কারণে সাধি হে তোমাকে।
বিধি মোরে হৈল বক্র, পৃথিবী গিলিল চক্র,
ক্ষমা করি উদ্ধার আমাকে।।
শুনিয়া কর্ণের বাণী, ক্রোধে কন চক্রপাণি,
বিপদ কালেতে স্মর ধর্ম্ম।
একবস্ত্রা রজঃস্বলা, দ্রুপদনন্দিনী বালা,
সভামধ্যে কৈলা কোন কর্ম্ম।।
শকুনি সৌবল সনে, দুর্য্যোধন নরাধমে,
কপটে রচিল পাশা সারি।
ক্ষত্রধর্ম্ম ছাড়ি কার্য্য, কপটে লইল রাজ্য,
কোন শাস্ত্রে পাইলা বিচারি।।
সন্দেশ মিশ্রিত বিষে ভীমে খাওয়ালে শেষে,
বান্ধিয়া সকল কলেবর।
ফেলাইয়া দিলে জলে, রক্ষা পায় ধর্ম্মবলে,
সেই কথা কহিতে বিস্তর।।
জৌগৃহ নির্ম্মাণ করি, তাহাতে পাণ্ডব ভরি,
অগ্নি দিলে কি বিচার করি।
কোন শাস্ত্রে হেন ধর্ম্ম, বিচারিয়া কর কর্ম্ম,
দৈবে তাহা আনিল উদ্ধারি।।
দ্বাদশ বৎসর বনে, বঞ্চিলেন পঞ্চজনে,
বৎসরেক রহে অজ্ঞাতেতে।
সভাতে মাগিল যবে, রাজ্য নাহি দিলে তবে,
হেন ধর্ম্ম বুঝাও কিমতে।।
অভিমন্যু গেল রণে, যেড়ি মারো সপ্তজনে,
দুগ্ধপোষ্য শিশুত কুমার।
কোনধর্ম্মে মার তারে, স্বরূপ কহিবা মোরে,
কোথা ছিল ধর্ম্মের বিচার।।
শুনিয়া কৃষ্ণের কথা, অর্জ্জুনের বাড়ে ব্যথা,
পূর্ব্ব পূর্ব্ব কথা মনে হয়।
বাড়িল পার্থের ক্রোধ, না মানেন উপরোধ,
রত্তচক্ষু ওষ্ঠ কম্প হয়।।
তবে কর্ণ মহাক্রোধে, নিতান্ত মরিব বোধে,
ব্রহ্ম অস্ত্র এড়ে সেইক্ষণ।
অর্জ্জুন ব্রহ্মান্ত্র মারি, কর্ণ বাণ ব্যর্থ করি,
দিব্যাস্ত্র যুড়িল শরাসন।।
পার্থ যুড়ি অগ্নিবাণ, যেন অগ্নি দীপ্তিমান,
কর্ণ পানে চান একদৃষ্টি।
বরুণ বাণেতে কর্ণ, জলে করি পরিপূর্ণ,
অনল নিভায় করি বৃষ্টি।।
অর্জ্জুনের বায়ু বাণ, মেঘ করে খান খান,
পুনঃ কর্ণ যোড়ে মহাশর।
হাহাকার দেবগণে, ভূমিকম্প ক্ষণে ক্ষণে,
বাণ ‍এড়ে কর্ণ ধনুর্দ্ধর।।
হৃদয়ে বিন্ধিল শর, রক্ত পড়ে নিরন্তর,
আপনা বিস্মৃত ধনঞ্জয়।
খসিল হাতের ধনু, স্তদ্ধ হৈল সর্ব্ব তনু,
অতি ব্যগ্র কৃষ্ণ মহাশয়।।
এই পেয়ে অবসর, কর্ণ মহা ধনুর্দ্ধর,
রথ উদ্ধারিতে বীর চলেন।
না পারিল দুই হাতে, শ্রম হৈল অঙ্গনাথে,
পুনঃ রথ পশিল ভূতলে।।
সচেতন ধনঞ্জয়, দেখি কৃষ্ণ মহাশয়,
অর্জ্জুনে কহেন কুতূহলে।
আমার বচন ধর, ধনঞ্জয় ধনুর্দ্ধর,
কাটি পাড় কর্ণ মহাবলে।।
কৃষ্ণের বচন শুনি, অর্জ্জুন হৃদয়ে গণি,
গাণ্ডীবে যুড়েন ক্ষুরবাণ।
ক্ষুর প্রবেশিল চণ্ড, কাটিয়া পড়িল দণ্ড,
শঙ্কা পায় কর্ণ বলবান।।
ঝাঁকে ঝাঁকে সূর্য্যবাণ, পার্থ ছাড়িলেন বাণ,
বজ্র যেন ছাড়ে পুরন্দর।
সর্ব্বভূতে ভয়ঙ্কর, দেখি দিব্য মহাশর,
বেগে ধায় শব্দ ঘোরতর।।
নিক্ষেপিয়া মহাশর, ভাবিলেন ধনুর্দ্ধর,
পূর্ব্ব কথা আছয়ে স্মরণে।
যদি হই পার্থ বীর, কাটি পাড়ি কর্ণশির,
নাশিব কর্ণেরে আজি রণে।।
ছেদিব কর্ণের শির, এত বলি পার্থ বীর,
মহাশর মারেন কর্ণেরে।
সর্ব্বলোকে ভয়ঙ্কর, দেখি যেন রুদ্র শর,
বেগে পড়ে কর্ণের শরীরে।।
সন্ধ্যাকালে পড়ে কর্ণ, গগন লোহিত বর্ণ,
সর্ব্বলোকে চাহিয়া বিস্ময়।
উঠিয়া গগনোপরে, প্রবেশিল দিনকরে,
কর্ণের যতেক তেজচয়।।
কর্ণ হৈল অপচয়, পৃথিবী কম্পিত হয়,
রথ লয়ে গেল মদ্রপতি।
কুরুদলে হাহাকার, সব হৈল অন্ধকার,
কর্ণ বিনা কি হইবে গতি।।
হাহা কর্ণ মহাবীর, মোর প্রাণের দোসর,
হারাইলা ভুব্ন দুর্জ্জয়ে।
এত বলি দুর্য্যোধন, শ্বাস ছাড়ে ঘনে ঘন,
কুরুবল ভঙ্গ দিল ভয়ে।।
ভীম করে সিংহনাদ, শুনি জয় জয় বাদ,
বিজয় দুন্দভি বাজে দলে।
সর্ব্ব সেনাপতিগণ, আশ্বাসিয়া ঘনে ঘন,
নাচে গায় সবে কুতূহলে।।
কোপে রাজা দুর্য্যোধন, আদেশিল সৈন্যগণ,
কর দিয়া পাণ্ডবসংহার।
যুদ্ধ করি সর্ব্বজন, কৃষ্ণার্জ্জুন দুইজন,
বিনাশিতে করহ বিচার।।
রাজার আদেশ পেয়ে, সৈন্যগণ গেল ধেয়ে,
সাগর কল্লোল শব্দ করে।
গদাঘাতে বৃকোদর, ক্রোধে অতি ভয়ঙ্কর,
ক্ষণমাত্রে বহু সৈন্যে মারে।।
আপনি নৃপতি সাজে, নিষেধিল শল্যরাজে,
আজি ক্ষমা কর নরবর।
পড়ে মহাবীর কর্ণ, সৈন্য হৈল ছিন্ন ভিন্ন,
নাহি হয় যুদ্ধ অবসর।।
আকুলিত কর্ণশোকে, সান্তাইল রাজলোকে,
শিবিরে চলিল দুর্য্যোধন।
দেব ঋষি গেল ঘর, হরিষত পাণ্ডুবর,
শিবিরে গেলেন সর্ব্বজন।।
অর্জ্জুনেরে দিয়া কোল, গোবিন্দ বলেন বোল,
তোমারে সদয় পুরন্দর।
কাটিয়া কর্ণের শির, ত্রিভুবন মধ্যে বীর,
ধন্য তুমি ভুবন ভিতর।।
শিবিরেতে গেল সব, কর্ণ হৈল পরাভব,
সবাই কহিল যুধিষ্ঠিরে।
কর্ণের মরণ শুনি, আনন্দিত নৃপমণি,
প্রশংসা করিল অর্জ্জুনেরে।।
রথে চড়ি যুধিষ্ঠির, দেখিলেন কর্ণবীর,
পুত্র সনে পড়িয়াছে রণে।
চন্দ্রসনে যেন ভানু, তেজে যেন বৃহদ্ভানু,
বার বার দেখেন নয়নে।।
কৃষ্ণেরে করেন স্তুতি, যুধিষ্ঠির নরপতি,
আজি মম সুখী হৈল মন।
তুমি যার সুসারথি, ভাগ্যবান সেই রথী,
জিনিতে পারয়ে ত্রিভুবন।।
আজি আমি রাজ্য পাব, আজি নরপতি হব,
আজি সে সফল পরিশ্রম।
কর্ণবীর মহাবল, পড়িল অবনীতল,
সংগ্রামে সাক্ষাৎ ছিল যম।।
হেনমতে মনোরঙ্গে, রাজা যুধিষ্ঠির সঙ্গে,
সর্ব্বলোক শিবিরে আইল।
আনন্দিত পাণ্ডুদলে, নৃত্যগীত কুতূহলে,
যে যার শিবিরে প্রবেশিল।।
ইহকালে শুভযোগ, পরকালে স্বর্গভোগ,
ভরতের পুণ্যকথা শুনি।
শ্রবণেতে পাপক্ষয়, সংগ্রামে বিজয় হয়,
কাশীরাম বিরচিল গণি।।

কর্ণপর্ব্ব সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *