০৮. যুধিষ্ঠিরাদি কর্ত্তৃক মৃত স্বজনগণের শরীর সৎকার

কৃষ্ণের বচনে ধৃতরাষ্ট্র নরপতি।
যুধিষ্ঠিরে ডাকিয়া বলিছে মহামতি।।
মন দিয়া শুন পুত্র আমার বচন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধেতে মরিল যত জন।।
রাজ রাজ্যেশ্বর রাজা কুমার রাজার।
গণনা করিতে নারি কতেক হাজার।।
সুহৃদ বান্ধব কার নাহি সহোদর।
সবাকার প্রেতকর্ম্ম করহ সত্বর।।
অগ্নি কার্য্য সবাকার করহ এখন।
নিমন্ত্রিয়া যতেক আনিল দুর্য্যেধন।
তব আমন্ত্রণে এল যত যত রাজ।
না করিলে প্রেতকার্য্য হইবেক লাজ।।
শ্রীধৌম্য সঞ্জয় আর বিদুর সুমতি।
ইন্দ্রসেন ধর্ম্মসেন যুযুৎসু প্রভৃতি।।
ইহারা সকলে যাক তোমার সহিত।
করুক অন্ত্যেষ্টি কর্ম্ম যে যার উচিত।।
কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে যত এসেছিল প্রাণী।
সবার সৎকার কর ধর্ম্ম নৃপমণি।।
ধৃতরাষ্ট্র আজ্ঞা পেয়ে ধর্ম্মের নন্দন।
চিতাধূমে অন্ধকার করিল গগণ।।
যুযুৎসু দিলেন অগ্নি রাজার আজ্ঞায়।
ভীমার্জ্জুন যুধিষ্ঠির আছেন সহায়।।
জ্ঞাতিগণে অগ্নি দিল ধর্ম্মের নন্দন।
চিতাধূমে অন্ধকার হইল গগন।।
অপর যতেক রাজা মৃত কুরুক্ষেত্রে।
যুযুৎসু দিলেন অগ্নি রাজ আজ্ঞ মাত্রে।।
অষ্টাদশ অক্ষৌহিনী হইল দাহন।
অনুমৃতা হইল যতেক নারীগণ।।
বিষাদ পাইয়া ধর্ম্ম করেন রোদন।
প্রবোধ করেন তাঁরে শ্রীমধুসূদন।।
অপূর্ব্ব কৃষ্ণের লীলা কে বুঝিতে পারে।
এ তিন ভূবন আছে যাঁহার শরীরে।।
বিশ্বাস করয়ে লোক এ সব বচনে।
বিশ্বরূপ যশোদা দেখিল বিদ্যমানে।।
চারি ভাই সঙ্গে লয়ে পান্ডুর কুমার।
গেলেন তর্পণ স্নান হেতু যত আর।।
গঙ্গায় চলিল সব গোবিন্দ সংহতি।
পঞ্চ পান্ডবাদি ধৃতরাষ্ট্র নরপতি।।
গান্ধারী প্রভৃতি আর যতেক রমনী।।
স্নান আদি কৈল সবে জাহ্ববীর জলে।
ধৌম্য পুরোহিত মন্ত্র পড়ায় সকলে।।
দুর্য্যোধন আদি করি শত সহোদর।
সবার তর্পন করিলেন নৃপবর।।
আর যত রাজগণ সংগ্রামে মরিল।
এ‌কে এক সবাকার তর্পন করিল।।
ক্ষত্র মত নিত্যকর্ম্ম ছিল পূর্ব্বাপর।
সেইমত করিল পান্ডুর সহোদর।।
স্ত্রীপুরুষ কৈল যত পারত্রিক কর্ম্ম।
যেমন বিধান ছিল শাস্ত্রমত ধর্ম্ম ।।
হেনকালে কুন্তীদেবী গিয়া সেইখানে।
যুধিষ্ঠিরে কহিলেন মধুর বচনে।।
কর্ণ মহাবীর হয় আমার নন্দন।
সুতপুত্র বলি যারে বলিলা বচন।।
কন্যাকালে জন্ম হয় আমার উদরে।
সূর্য্যের ঔরসে জন্ম জানাই তোমারে।।
অসময় বলি তায়ে করি বিসর্জ্জন।
মঞ্জুষা করিয়া ভাসাইলাম তখন।।
তবে সুত পেয়ে তারে করিল পালন।
প্রসিদ্ধ হইল সেই রাধার নন্দন।।
বলবান দেখি দুর্য্যোধন নিল তারে।
পূর্ব্বের বৃত্তান্ত এই জানাই তোমারে।।
মায়ের বচন শুনি রাজা যুধিষ্ঠির।
বরিষয়ে দুই ধারে নয়নের নীর।।
বিষাদ করিয়া ধর্ম্ম করেন রোদন।
প্রবোধ করেন তাঁরে শ্রীমধুসূদন।।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসেন কুন্তীরে তখন।
পুনশ্চ কহিল কর্ণ জন্ম বিবরণ।।
দুর্ব্বাসার মন্ত্র পায় যেমত প্রকারে।
কহিল সকল কথা রাজা যুধিষ্ঠিরে।।
এতেক শুনিয়া ধর্ম্ম মায়ের বচন।
মলিন বদনে পুনঃ করেন রোদন।।
এতদিনে হেন কথা কহিলে জননী।
কর্ণ মম সহোদর এতদিনে শুনি।।
ভ্রাতৃবধ করি আমি পাপিষ্ঠ চন্ডাল।
কর্ণ মম সহোদর বিক্রমে বিশাল।।
হাহাকার করিয়া কান্দয়ে পঞ্চজন।
পুনশ্চ প্রবোধ দেন দৈবকীনন্দন।।
তবে যুধিষ্ঠির রাজা শোকেতে জর্জ্জর।
যোড়হাতে কহিলেন জননী গোচর।।
শুনগো জননী আমি করি নিবেদন।
জানিলে না হত কভু কর্ণের নিধন।।
গুপ্ত করি রাখিলে না কহিলে আমারে।
বৃথা বধ করিলাম জ্যেষ্ঠ সহোদরে।।
এ সকল কথা যদি কহিতে জননী।
তবে কেন বিনাশিব কর্ণ মহাজ্ঞানী।।
তবে কেন বিনাশিব রাজা দুর্য্যেধন।
দুঃশাসন দুর্ম্মুখাদি ভাই শত জন।।
তবে কেন ভীষ্ম বীর ঈদৃশ হইবে।
অভিমন্যু পুত্র কেন রণেতে পড়িবে।।
তবে কেন হইবেক দ্রোণের নিধন।
পূর্ব্বেতে এ সব যদি কহিতে বচন।।
দৈবে কর্ণ রাজা ছিল হস্তীনানগরে।
দুর্য্যোধন তার বাক্য অন্যথা না করে।।
কর্ণ- আজ্ঞাকারী ছিল যত কুরুগণ।
যুদ্ধ না হইত মাতা জানিলে এমন।।
জ্যেষ্ঠ ভাই পিতৃ তুল্য সর্ব্বশাস্ত্রে বলে।
এ কলঙ্ক রাখিলাম আপনার কুলে।।
এ বড় দারুণ শোক রহিল অন্তরে।
এতদিনে হেন কথা কহিলে আমারে।।
মা হইয়া পুত্র প্রতি এমত তোমার।
শুন গো জননী তাপ বাড়িল অপার।।
শাপ দিব আমি বড় দুঃখ পাই মনে।
গুপ্ত কথা না থাকিবে নারীর বদনে।।
নারীর উদরে কভূ কথা না রহিবে।
অতি গুপ্ত কথা হৈলে প্রকাশ হইবে।।
এত বলি যুধিষ্ঠির অতি শোকাকুল।
পুনঃ প্রবোধেন কৃষ্ণ হয়ে অনুকূল।।
কৃষ্ণবাক্যে প্রীত পেয়ে পান্ডুর নন্দন।
শাস্ত্রমত করিলেন কর্ণের তর্পণ।।
ঘটোৎকচ রাক্ষসের করেন তর্পন।
পুনঃ স্নান করি কূলে উঠেন তখন।।
কূলে রহিলেন ধর্ম্ম হইয়া অসুখী।
ভীমার্জ্জুন সহদেব কেহ নহে সুখী।।
গান্ধারী পুত্রের শোকে বিস্তর কান্দিল।
পতিহীনা নারীগণ যত সঙ্গে ছিল।।
শান্ত করি যুধিষ্ঠির আনেন শিবিরে।
ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি রহিল অনাহারে।।
শিবিরে রহিল সবে বিষাদিত মনে।
গান্ধারী পুত্রের শোকে কান্দে রাত্রিদিনে।।
অনাহারে তিন রাত্রি করিল বঞ্চন।
নিশিযোগে ফলাহার কৈল সর্ব্বজন।।
আজি তিন দিন হৈল পুত্র নাহি দেখি।
কোথা দুর্য্যোধন কোথা দুম্মুখ ধানুকী।।
গান্ধারী কৃষ্ণেরে কন করিয়া রোদন।
আজি শূন্য হৈল মম সকল ভুবন।।
কোথা গেল দুর্য্যোধন কহ যদুমণি।
অকারণে প্রাণ ধরি আমি অভাগিনী।।
সকল সংসার শূন্য পুত্রের বিহনে।
শুন কৃষ্ণ কত দুঃখ উঠে মম মনে।।
শতপুত্র আমার যেমন শশধর।
কি হইল কোথা গেল কহ যদুবর।।
সে হেন সুন্দর মুখ অনলে পুড়িল।
নানা আভরণ অঙ্গে কেবা কাড়ি নিল।।
অগুরু চন্দনে লিপ্ত ছিল নিরন্তরে।
কেমনে অনল দিলা এমন শরীরে।।
স্বপ্নবৎ দেখি এই সকল সংসার।
কহ কোথা গেল মম শতেক কুমার।।
সুবর্ণ রচিত পুরী নিল কোন্ জন।
কহ কৃষ্ণ কোথা গেল আমার নন্দন।।
সকুন্ডল কনক শরীর সুকুমার।
দুঃশাসন আদি পুত্র কোথা সে আমার।।
শোক দুঃখ ভয়ে আমি হৈলাম উম্মনা।
কোথা শত বধূ মোর খঞ্জননয়না।।
স্মরণ করিতে মম বিদরে পরাণ।
হস্তিনা হইল শূন্য শুন ভগবান।।
এ বড় অন্তরে দুঃখ নহিল আমার।
বৃদ্ধকালে কোন গতি হইবে আমার।।
মরিলে পুত্রের হাতে না পাব আগুন।
ইহা ভাবি আরো দুঃখ বাড়ে চতুগুন।।
কি বুঝিয়া এত তাপ দিলেন আমারে।
শুন হে করুণাময় নিবেদি তোমারে।।
এক জ্বালা আগেতে না জানি গদাধর।
পুত্রশোকে আমার দহিছে কলেবর।।
ওহে ভীমসেন শুন আমার বচন।
আর বিষ তোমারে না দিবে দুর্য্যোধন।।
আর কেবা জতুগৃহ করিবে নির্ম্মাণ।
ঘুচাইল সব ভয় প্রভু ভগবান।।
শুকুনি আমার ভাই গেল কোথাকারে।
আর কে মন্ত্রণা দিবে আমার পুত্রেরে।।
ওহে যুধিষ্ঠির তব হৈল শুভ দশা।
আর কে তোমার সঙ্গে খেলাইবে পাশা।।
গান্ধারের নাথ কোথা দুরাত্মা শকুনি।
তোমা সবাকার ভয় ঘুচিল এখনি।।
এত বলি গান্ধারী পড়িল ভূমিতলে।
যুধিষ্ঠির ধরি তুলিলেন সেইকালে।।
সান্ত্বনা করেন কৃষ্ণ বিবিধ প্রকারে।
নানাবিধ শাস্ত্র কথা বুঝাইল তাঁরে।।
শুন গো গান্ধারী শুন পূর্ব্ব বিবরণ।
ভুমিষ্ঠ হইল যবে রাজা দুর্য্যোধন।।
এ শোকে সে সব কথা নহেত বিধান।
বিদ্যুর কহিল যত সকলি প্রমাণ।।
দুর্য্যোধন শোকেতে ক্রন্দন কর বৃথা।
অনিত্য সংসার এই আমি আছি কোথা।।
অদ্য বা পক্ষান্তে হয় অবশ্য মরণ।
শুন গো গান্ধারী শোক কর অকারণ।।
বিস্ময় পান্ডব কথা অমৃত লহরী।
শুনিলে অধর্ম্ম খন্ডে পরলোকে তরি।।
শুন শুন ওহে ভাই হয়ে একমন।
কাশীরাম দাস কহে ভারত কথন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *