০০৭. কাম্যকবনে পাণ্ডবদিগের নিকট শ্রীকৃষ্ণের আগমন

বনে যদি গেল পঞ্চ পাণ্ডুর নন্দন।
দেশে দেশে এই বার্ত্তা পায় রাজগন।।
ভোজ বৃষ্ণি অন্ধকাদি যত নৃপগণ।
কৃষ্ণের সহিত গেল কাম্যক কানন।।
পাঞ্চাল রাজার পুত্র সহ অনুগত।
ধৃষ্টকেতু ধৃষ্টদ্যুন্ন আর বন্ধু যত।।
যুধিষ্ঠিরে বেড়ি সবে বসে চতুর্ভিত।
পাণ্ডবের বেশ দেখি হইল বিস্মিত।।
আত্মদুঃখ কহিতে লাগিল পঞ্চ জন।
হেন কর্ম্ম করিল পাপিষ্ঠ দুর্য্যোধন।।
সে জন বধের যোগ্য কহে ধর্ম্মনীত।
গোবিন্দ বলেন, এই আমার বিহিত।।
ক্রোধেতে কম্পিত অঙ্গ কমল লোচন।
সবিনয়ে ধনঞ্জয় করে নিবেদন।।
ধর্ম্মেতে ধার্ম্মিক তুমি হও সত্যবাদী।
সদয় হৃদয় তুমি, বিধাতার বিধি।।
অক্রোধী অলোভী তুমি দীনে ক্ষমাবন্ত।
তোমারে এতেক ক্রোধ, না পড়ে তদন্ত।।
নারায়ণ রূপে তুমি হইলো তপস্বী।
করিলা তাপস্যা গন্ধমাদনে নিবসি।।
পুষ্কর তীর্থেতে দশ সহস্র বৎসর।
একপদ বাতাহার, ঊ‌র্দ্ধ দুই কর।।
বদরিকাশ্রমে তুমি শতেক বৎসর।
দেবমানে তপশ্চর্য্যা কৈলা দামোদর।।
দয়ায় করহ তুমি সবার পালন।
ইঙ্গিতে করহ ক্ষয়, ইঙ্গিতে সৃজন।।
তুমি ত নিগুণ, কিন্তু গুণেতে পূরিত।
তোমারে যে না ভজে সে ভাগ্যেতে বঞ্চিত।।
এতেক বলেন যদি বীর ধনঞ্জয়।
তাঁহারে কহেন তবে দৈবকী তনয়।।
তোমায় আমায় কিছু নাহিক অন্তর।
আমি নারায়ণ ঋষি, তুমি হও নর।।
পাণ্ডবে আমায় আর নাহি ভেদ লেশ।
সহিতে না পারি আমি পাণ্ডবের ক্লেশ।।
যে তোমারে দ্বেষ করে, সে করে আমারে।
তোমারে যে স্নেহ করে, সে আমারে করে।।
তুমি হও আমার হে, আ যে তোমার।
সে জন তোমার পার্থ, সে জন আমার।।
এতেক বলেন কৃষ্ণ কমল লোচন।
ভাল ভাল বলিয়া বলিল রাজগণ।।
হেনকালে উপনীত দ্রুপদ নন্দিনী।
কৃষ্ণের অগ্রেতে বলে যোড় করি পাণি।।
অসিত দেবল মুখে শুনিয়াছি আমি।
নাভি কমলেতে স্রষ্টা সৃজিয়াছ তুমি।।
আকাশ তোমার শির, পাতাল চরণ।
পৃথিবী তোমার কটি, অঙ্ঘি গিরিগণ।।
শিব আদি যত যোগী তোমারে ধেয়ায়।
তপস্বী করিয়া তপ সমর্পে তোমায়।।
সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় ইঙ্গিতে তব হয়।
সবার ঈশ্বর তুমি, মুনিগণে কয়।।
অনাথার নাথ তুমি, নির্ধনের ধন।
সে কারণে তব পাশে, করি নিবেদন।।
সুখ দুঃখ কহিতে সবার তুমি স্থান।
মম দুঃখ কহি কিছু, কর অবধান।।
পাণ্ডবের ভার্য্যা আমি দ্রুপদ নন্দিনী।
তব প্রিয়সখী আমি বলহ আপনি।।
এই নারী কেশে ধরি লইল সভায়।
দুর্ভাষা কহিল যত, কহনে না যায়।।
স্ত্রীধর্ম্মে ছিলাম আমি এক বস্ত্র পরি।
অনাথার প্রায় বলে নিল কেশে ধরি।।
বীরবংশ পাঞ্চাল পাণ্ডবগণ জীতে।
দাস্যকর্ম্ম বিধিমতে বলিল করিতে।।
ভীষ্ম দ্রোণ, ধৃতরাষ্ট্র ছিল বিদ্যমান।
সবে বসি দেখিলেন মোর অপমান।।
সবে বলে পাণ্ডুপুত্র বড় বলবন্ত।
এত দিনে তা সবার পাইলাম অন্ত।।
ধর্ম্মপত্নী আমি, হেন কহে সর্ব্বলোক।
এই পঞ্চ জন সভামধ্যে বসি দেখে।।
ধিক্ ধিক্ ভীম বীর, ধিক্ ধনঞ্জয়।
অকারণে গাণ্ডীব ধনুক কেন বয়।।
পূর্ব্বেতে এমন আমি শুনেছি বিধান।
স্ত্রী কষ্ট না দেখে কভু থাকি বিদ্যমান।।
হীনবল হইলে ভার্য্যায় রাখে স্বামী।
সে কারণে এ সবার নিন্দা করি আমি।।
পুত্ররূপে জন্মে লোক ভার্য্যার উদরে।
সেই হেতু জায়া বলি বলয়ে ভার্য্যারে।।
ভার্য্যা ভীতা হলে লয় স্বামীর শরণ।
শরণ যে লয়, তারে করয়ে রক্ষণ।।
নিলাম শরণ আমি এ পঞ্চ জনারে।
কেন এরা রক্ষা নাহি করিল আমারে।।
বন্ধ্যা নহি দেব আমি, ইহা পত্রবতী।
পুত্রমুখ চাহি না করিল অব্যাহতি।।
হীনবীর্য্য নহে মোর সব পুত্রগণ।
মহাতেজা তব পুত্র প্রদ্যুন্ন যেমন।।
তবে কোন দুষ্টের সহিল হেন কর্ম্ম।
কপটে জিনিল মিথ্যা করিয়া অধর্ম্ম।।
দাসরূপে সভাতলে বসি সবে দেখে।
মম অপমান করে যত দুষ্টলোকে।।
গাণ্ডীব বলিয়া ধনু ধনঞ্জয় ধরে।
পৃথিবীতে গুন দিতে কেহ নাহি পারে।।
ধনঞ্জয় কিম্বা ভীম আর পার তুমি।
তবে কেন এত সহি, না জানিনু আমি।।
ধিক্ ধিক্ মম নাথ পাণ্ডু পুত্রগণ।
এত করি অদ্যাবধি জীয়ে দুর্য্যোধন।।
বাল্যকাল হতে যত করে সেইজন।
অগোচরে নহে সব, জান নারায়ণ।।
কপটে বিষের লাড়ু ভীমে খাওয়াইল।
হস্ত পদ বান্ধি গঙ্গাজলে ফেলি দিল।।
জতুগৃহ করিয়া রহিতে দিল স্থান।
ধর্ম্মবল অগ্নিতে পাইল পরিত্রাণ।।
রাজ্যধন লয়ে তবে পাঠাইল বনে।
এতেক সহিল কষ্ট কিসের কারণে।।
সভায় বসিয়া নাথ দেখে পঞ্চ জন।
দুঃশাসন হরে মম পিন্ধন বসন।।
এতেক বলিয়া কৃষ্ণা বলে সর্ব্বজনে।
তোমরা আমার নহ, জানিনু এক্ষণে।।
থাকিলে কি হবে নাথ সভার গোচরে।
এতেক দুর্গতি মম ক্ষুদ্রলোকে করে।।
এতেক বলিয়া কৃষ্ণা কান্দে উচ্চৈঃস্বরে।
বারিধারা নয়নেতে অনিবার ঝরে।।
পুনঃ গদগদ বাক্যে বলয়ে পার্ষতী।
নাহি মোর তাত ভ্রাতা, নাহি মোর পতি।।
তুমি অনাথের নাথ, বলে সর্ব্বজনে।
চরি কর্ম্মে আমি নাথ তোমার রক্ষণে।।
সম্বন্ধে গৌরবে স্নেহে আর প্রভুপণে।
দাসীজ্ঞানে মোরে প্রভু রাখিবা চরণে।।
গোবিন্দ বলেন, সখি না কর ক্রন্দন।
তোমার ক্রন্দনে মোর স্থির নহে মন।।
যখন বিবস্ত্রা তোমা করে দুঃশাসন।
গোবিন্দ বলিয়া তুমি ডাকিলে যখন।।
অঙ্গেতে হয়েছে মম সেই মহাঘাত।
যাবৎ কপটী দুষ্ট না হয় নিপাত।।
যেইমত কৃষ্ণা তুমি করিছ রোদন।
সেইমত কান্দিবে সে সবার স্ত্রীগণ।।
তোমার সাক্ষাতে আমি কহি সত্য করি।
না করিলে, বৃথা বাসুদেব নাম ধরি।।
আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে, শিলা জলে ভাসে।
অনল শীতল হয়, সপ্ত সিন্ধু শোষে।।
তথাপি আমার বাক্য না হইবে আন।
দিন কত ক্রন্দন করহ সমাধান।।
এতেক শুনিয়া কহিলেন ধনঞ্জয়।
কৃষ্ণের বচন দেবী কভু মিথ্যা নয়।।
যত কহিলেন কৃষ্ণ হবে সেই মত।
অকারণে কান্দ কেন অজ্ঞানের মত।।
অগিনী রোদন শুন ধৃষ্টদ্যুন্ন বীর।
সজল নয়নে ক্রোধে কম্পিত শরীর।।
এতেক লাঞ্ছনা কেবা ক্ষত্র হয়ে সয়।
নিকটে না ছিনু আমি, কুরু ভাগ্যোদয়।।
তথাপি কৌরবগণে করিব সংহার।
শুন সর্ব্ব রাজগণ প্রতিজ্ঞা আমার।।
যেই দ্রোণ গুরু বলি গর্ব্ব করে মনে।
মম ভার রৈল, তারে সংহারিব রণে।।
ভীষ্ম পিতামহ যে অজেয় তিন লোকে।
তাঁহাকে মারিতে ভার রৈল শিখণ্ডীকে।।
অর্জ্জুনেরে সূতপুত্র না ধরিবে টান।
ভীমহস্তে শত ভাই ত্যজিবে পরাণ।।
জগতে গোবিন্দাশ্রিত আমরা যে সব।
ইন্দ্রকে জিনিতে পারি, কি ছার কৌরব।।
এত বলি করে কর কচালে পাঞ্চাল।
প্রতিজ্ঞা করয়ে সবে যত মহীপাল।।
অরণ্যপর্ব্বের কথা শ্রবণে অমৃত।
কাশীদাস কহে, সাধু পিয়ে অনুব্রত।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *