০৬. শঙ্করযাত্রা ও ভীমের মল্লযুদ্ধ

পূর্ব্বাপার কুলরীতি আছে মৎস্যদেশে।
শঙ্কর নামেতে যাত্রা আরাধে মহেশে।।
কলির শঙ্করযাত্রা বিরাট রাজন।
নানা দেশ হৈতে আসে বহুসংখ্য জন।।
দ্বিজ আদি চারি জাতি নরনারীগণ।
নৃত্যগীত মহোৎসব করে জনে জন।।
পণ্ডিতে পণ্ডিতে কথা শাস্ত্রের বিবাদ।
হস্তী হস্তী যুদ্ধ হয় ছাড়ে ঘোর নাদ।।
কৌতুক দেখেন তথা বিরাট-রাজন।
পর্ব্বত আকার লক্ষ লক্ষ মল্লগণ।।
মল্লগণমধ্যে এক মল্ল বলবান।
সর্ব্ব মল্লগণ করে যাহা বাখান।।
সর্ব্ব মল্লগণ মধ্যে ছাড়ে সিংহনাদ।
কে আছ, আমার সঙ্গে করহ বিবাদ।।
লাখে লাখে বড় বড় যত মল্ল ছিল।
অধোমুখে হয়ে কেহ উত্তর না দিল।।
ডাকিয়া বলয়ে মল্ল নৃপতির প্রতি।
মোর সঙ্গে যুঝে হেন দেহ নরপতি।।
যদি মল্ল দেহ রাজা,গুণ গেয়ে যাব।
নাহি দিলে দেশে দেশে অখ্যাতি করিব।।
চিন্তিয়া বিরাট তবে করিয়া স্মরণ।
সূপকার বল্লবেরে ডাকেন তখন।।
বিরাট বলেন, তুমি কহিয়াছ পূর্ব্বে।
এ মল্ল সহিত রণ কর তুমি এবে।।
এ মল্ল সহিত যদি পার যুঝিবারে।
তোমারে তুষিব আমি রাজ-ব্যবহারে।।
ভীম বরে নরপতি জানহ আপনে।
যতেক কহিনু পূর্ব্বে উদয়-ভরণে।।
সে সব স্মরিয়া যদি ‍চাহ বধিবারে।
এ মল্ল সহিত তবে যুঝাহ আমারে।।
মহাবলবান মল্ল পর্ব্বতআকার।
পেটার্থী ব্রাহ্মণ জাতি হই সূপকার।।
এ মল্ল সহিত যদি করাও সংগ্রাম।
দ্বিজবধ ভয় নাহি, কর পরিণাম।।
শুনিয়া নিঃশব্দ হন মৎস্যের ঈশ্বর।
কতক্ষণে কঙ্ক তবে করেন উত্তর।।
যার যে আশ্রয়ে থাকে পণ্ডিত সুজন।
যথাশক্তি তার আজ্ঞা না করে হেলন।।
পুনঃ পুনঃ মল্ল বলিতেছে নৃপবরে।
রাজার হয়েছে ইচ্ছা যুদ্ধ দেখিবারে।।
রাজারে সন্তোষ কর, দেখুক সকলে।
একবার মল্ল সহ যুঝ কুতূহলে।।
যুধিষ্ঠির বাক্য শুনি বীর বৃকোদর।
পুনরপি নৃপতিরে করেন উত্তর।।
তোমার প্রসাদে আর কঙ্কের প্রসাদে।
না জীবেক মল্ল আজি, পড়িল প্রমাদে।।
এত বলি রঙ্গসভা মধ্যে দাণ্ডাইল।
ডাক দিয়া বৃকোদর মল্লেরে কহিল।।
যদি মৃত্যু ইচ্ছা থাকে, যুদ্ধ কর আসি।
প্রাণ ইচ্ছা থাকে যদি, পলাহ প্রবাসী।।
ভীমের বচন শুনি সে মল্ল কুপিল।
মহাপরাক্রম করি ভীমেরে ধরিল।।
পর্ব্বত নাড়িতে কোথা বায়ুর শকতি।
না পারিল চালিবারে ভীম মহামতি।।
ঈষৎ হাসিয়া ভীম ধরে দুই পায়।
অন্তরীক্ষে তুলিলেক ভ্রমাইয়া তায়।।
ক্ষুদ্র মীনে ধরি যথা গ্রাস করে নক্র।
আকাশে ঘুরায় যেন কুম্ভকার-চক্র।।
ঘুরাতে ঘুরাতে ত্যজে মল্ল নিজ প্রাণ।
ফেলাইয়া দিল ভীম যেন লতাখান।।
দেখিয়া অদ্ভূত সবে, মনে চমৎকার।
বিরাট-নৃপতি পান আনন্দ অপার।।
অনেক রতন ভীমে দিল নরপতি।
যাত্রা নিবর্ত্তিয়া গেল যে যার বসতি।।
বার্ত্তা পেয়ে রাজ্যে যত ছিল মল্লগণ।
বৃকোদর সহ আনি সবে করে রণ।।
অনেক মরিল শুনি কেহ না আসিল।
বল্লবের পরাক্রমে রাজা বশ হৈল।।
বড় বড় সিংহ ব্যাঘ্র মত্ত হস্তিগণ।
কৌতুকে ভীমের সহ করাইল রণ।।
নিমেষেতে অনায়াসে মারে বৃকোদর।
কৌতুকে দেখেন রাজা স্ত্রীবৃন্দ ভিতর।।
এইরূপে তথা একাদশ মাস গেল।
সানন্দে পাণ্ডব পঞ্চ অজ্ঞাতে রহিল।।
মহাভারতের কথা অমৃত-লহরী।
কাহার শকতি তাহা বর্ণিবারে পারি।।
শ্রুতমাত্র কহি আমি রচিয়া পয়ার।
অবহেলে শুনে তাহা সকল সংসার।।
ভারত শ্রবণে সর্ব্ব পাপের বিনাশ।
কাশীরাম দাস কহে, কহিলেন ব্যাস।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *