০৬. জরাসন্ধের জন্মবৃত্তান্ত

ধর্ম্মরাজ বলেন, বলহ নারায়ণ।
জরাসন্ধ নাম তার কিসের কারণ।।
কত বল ধরে সে, কাহার পাইল বর।
তোমা হিংসি রক্ষা পাইল, বিস্ময় অন্তর।।
গোবিন্দ বলেন, রাজা কর অবধান।
জরাসন্ধ-বিবরণ কহি তব স্থান।।
মগধ দেশের রাজা নাম বৃহদ্রথ।
অগণিত সৈন্যগণ গজ বাজী রথ।।
তেজে সূর্য্য, ক্রোধে যম, ধনে যক্ষপতি।
রূপে কামদেব রাজা ক্ষমাগুণে ক্ষিতি।।
নিরন্তর যজ্ঞ করে, অন্যে নাহি মন।
দুই কন্যা দিল তারে কাশীর রাজন।।
পুত্রার্থী পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করে মহীপাল।
না হইল বংশ তার গেল যুবাকাল।।
আপনারে ধিক্কার করিয়া নরপতি।
রাজ্য ত্যজি বনে গেল ভার্য্যার সংহতি।।
গৌতম-নন্দন চণ্ডকৌশিক যে ঋষি।
পরম তপস্বী তিনি সদা বনবাসী।।
বহু দেশ ভ্রমিয়া মগধে উপনীত।
বৃক্ষতলে রাজা তাঁরে দেখে আচম্বিত।।
ভার্য্যা সহ প্রণমিল মুনির চরণ।
মুনি জিজ্ঞাসিল রাজা কোথায় গমন।।
করযোড়ে বলে রাজা বিনয় বচন।
মম দুঃখ অবধান কর তপোধন।।
বহু কর্ম্ম করিলাম রাজ্যে হৈয়া রাজা।
সমুচিত বিধানেতে পালিলাম প্রজা।।
ধনে জনে প্রয়োজন নাহি তপোধন।
সর্ব্ব শূন্য দেখি মুনি বিনা পুত্রধন।।
এই হেতু রাজ্য ত্যজি যাই বনবাস।
তপস্যা করিব গিয়া লইয়া সন্ন্যাস।।
রাজার বিনয় শুনি গৌতম নন্দন।
ধ্যানেতে বসিয়া মুনি চিন্তে ততক্ষণ।।
হেনকালে দৈবে সেই আম্রবৃক্ষ হৈতে।
আচম্বিতে এক আম্র পড়িল ভূমিতে।।
আম্র লয়ে মুনিবর হৃদে লাগাইল।
হরিষে রাজার করে অর্পিয়া কহিল।।
এ ফল খাইতে দেহ প্রধান ভার্য্যারে।
গুণবান পুত্র হবে তাহার উদরে।।
বাঞ্ছাপূর্ণ হৈল রাজা, যাহ নিজ ঘর।
এত শুনি আনন্দিত হৈল নরবর।।
মুনি প্রণমিয়া রাজা নিজালয়ে গেল।
দুই ভার্য্যা সমান দোঁহারে বাঁটি দিল।।
দুই ভাগ করি দোঁহে করিল ভক্ষণ।
এককালে গর্ভবতী হৈল দুই জন।।
একই সময়ে দুই রাণী প্রসবিল।
বিস্ময়ে এককালে দোঁহে নিরখিল।।
এক চক্ষু নাসা কর্ণ এক পদ কর।
অর্দ্ধ অর্দ্ধ অঙ্গ দেখি বিস্ময় অন্তর।।
হৃদয়ে হানিয়া কর বিষাদে বলিল।
দশ মাস গর্ভব্যথা বৃথা বহি গেল।।
নিরাশ হইয়া দোঁহে ঘৃণা করি মনে।
ফেলাইয়া দিতে আজ্ঞা কৈলা দাসীগণে।।
চতুষ্পথে ফেলাইয়া দিল ততক্ষণে।
জরা নামে রাক্ষসী আইল সেইস্থানে ।।
সদাই শোণিত মাংস আহার তাহার।
সংসারের গর্ভপাতে তার অধিকার।।
রাজগৃহে গর্ভপাত শুনিয়া ধাইল।
অর্দ্ধ অর্দ্ধ অঙ্গ দেখি বিস্ময় মানিল।।
আপন নয়নে ইহা কখন না দেখে।
দুই হাতে দুই খান ধরিয়া নিরখে।।
রহস্য দেখিয়া দুই সংযোগ করিল।
আচম্বিতে দুই অঙ্গ একত্র হইল।।
উঙা উঙা করি কান্দে মুখে হাত ভরি।
আশ্চর্য্য দেখিয়া চিত্তে ভাবে নিশাচরী।।
না হবে উদর পূর্ণে ইহারে খাইলে।
নৃপতি হইবে তুষ্ট এ পুত্র পাইলে।।
এত চিন্তি কোলে করি লইল নন্দন।
মেঘের গর্জ্জন জিনি শিশুর নিঃস্বন।।
মুনষ্যের মূর্ত্তি ধরি জরা নিশাচরী।
রাজার সম্মুখে গেল পুত্রে কোলে করি।।
নৃপতিরে কহিল সকল বিবরণ।
হের নৃপ, নহ এই আপন নন্দন।।
পুত্র পেয়ে উল্লাসিত হইল নৃপতি।
তবে জিজ্ঞাসিল রাজা রাক্ষসীর প্রতি।।
কে তুমি, কোথায় বাস, কি তোমার নাম।
কার কন্যা, কার ভার্য্যা, কোথা তম ধাম।।
এত স্নেহ মম প্রতি কিসের কারণে।
আমারে এমত করে নাহি ত্রিভুবনে।।
রাজার বচন শুনি বলে নিশাচরী।
গৃহদেবী দিলা নাম সৃষ্টি-অধিকারী।।
দানব বিনাশে মোর হইল সৃজন।
সর্ব্ব গৃহে থাকি রাজা করহ শ্রবণ।।
আমারে সপুত্রা নবযৌবনা করিয়া।
যে জন রাখিবে গৃহ ভিত্তিতে আঁকিয়া।।
জায়া সুত ধন ধান্যে সদা তার ঘর।
পরিপূর্ণ থাকিবেক, শুন রাজ্যেশ্বর।।
তব গৃহে পূজা রাজা পাই অনূক্ষণ।
তেঁই রক্ষা করিলাম তোমার নন্দন।।
সমুদ্র শোষয় রাজা মোর এই পেটে।
সুমেরু সদৃশ মাংস খাইলে না আঁটে।।
তব গৃহে পূজা লভি সন্তোষ আমার।
এই হেতু রাখিলাম তোমার কুমার।।
এই বলি রাক্ষসী চলিল নিজ স্থান।
পুত্র পেয়ে নরপতি মহা হর্ষবান।।
জাত কর্ম্ম বিধিমত করিল রাজন।
অনুমান করি নাম দিল দ্বিজগণ।।
জরায় সন্ধিত হেতু নাম জরাসন্ধু।
দিনে দিনে বাড়ে যেন শুক্লপক্ষ-চন্দ্র।।
কতদিনে বৃহদ্রথ পুত্রে রাজ্য দিয়া।
ভার্য্যা সহ বনে গেল ব্রহ্মচারী হৈয়া।।
জরাসন্ধ রাজা হৈল, বলে মহাবল।
নিজ ভুজ-পরাক্রমে শাসে ভূমণ্ডল।।
দুই সেনাপতি হংস ডিম্ভক তাহার।
সর্ব্বত্র বিজয়ী অস্ত্রে, অভেদ আকার।।
তিন জন মহাবীর, অজেয় সংসারে।
চতুর্থ জামাতা কংস মহাবল ধরে।।
আমা হৈতে ভোজপতি যবে হৈল হত।
তথা হৈতে গদা প্রহারিল বার্হদ্রথ।।
শতেক যোজন গদা এল আচম্বিতে।
মথুরা কম্পিত যেন গিরি বজ্রাঘাতে।।
সংগ্রামে সাজিয়া এল অষ্টাদশ বার।
এয়োদ্শ অক্ষৌহিণী সহ পরিবার।।
হংস নামে এক রাজা ছিল সঙ্গ তার।
বলভদ্র হাতে সেই হইল সংহার।।
মরিল মরিল হংস, হৈল এই শব্দ।
শুনি মগধের লোক হইলেক স্তব্ধ।।
ডিম্ভক করিত সেই রাজ্যের রক্ষণ।
শুনিল সংগ্রামে হৈল ভ্রাতার মরণ।।
সহিতে নারিল শোক হইল অস্থির।
ডুবিয়া যমুনা জলে ত্যজিল শরীর।।
জরাসন্ধ সহ তবে হংস গেল ঘর।
শুনিল, মরিল শোকে ডুবিয়া সোদর।।
ভ্রাতৃশোকে হংস আর ক্ষণে না রহিল।
যমুনার জলে সেও ডুবিয়া মরিল।।
হেনমতে ডুবিয়া মরিল দুই জন।
একমাত্র জরাসন্ধ আছয়ে দুর্জ্জন।।
সংগ্রামে জিনিতে তারে নাহিক ভুবনে।
উপায় আছয়ে এক চিন্তিয়াছি মনে।।
মল্লযুদ্ধ বিনা তার না হয় নিধন।
বৃকোদর বাহুবলে করিবে সাধন।।
আমার হৃদয় যদি জান মহাশয়।
আমার বচনে যদি থাকয়ে প্রত্যয়।।
পৌরুষ বৈভব যদি বাঞ্ছ নরপতি।
ভীমার্জ্জুনে দেহ রাজা আমার সংহতি।।
কৃষ্ণের বচন শুনি ধর্ম্মের নন্দন।
একদৃষ্টে চান ভীমার্জ্জুনের বদন।।
হৃষ্টমুখ দুই ভাই দেখি নরপতি।
কহেন মধুর বাক্যে গোবিন্দের প্রতি।।
কি কারণে এমত বলিলা যদুরায়।
তোমা বিনা পাণ্ডবের কি আছে উপায়।।
লক্ষ্মী পরাঙ্মুখ যারে, সে তোমা না জানে।
সহজে পাণ্ডব-বন্ধু খ্যাত ত্রিভুবনে।।
তব নাম নিলে ভয় নাহি ত্রিজগতে।
তার কি আপদ যার থাকিবা সঙ্গেতে।।
এত বলি নরপতি দুই ভাই লয়ে।
গোবিন্দের হাতেতে দিলেন সমর্পিয়ে।।
মহাভারতের কথা ‍অমৃতের ধার।
কাশীরাম দাস কহে, রচিয়া পয়ার।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *