০০৪. ধৃতরাষ্ট্র ও বিদুরের পুনর্মিলন এবং ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি ব্যাসদেবের উপদেশ দান

হস্তিনা ত্যজিয়া ক্ষত্তা গেল বনমাঝ।
শুনিয়া আকুল চিত্ত হৈল অন্ধরাজ।।
নাহি রুচি অন্ন জল অশন শয়ন।
অতিবেগে সভামদ্যে করেন গমন।।
নিকটেতে গিয়া মূর্চ্ছা হইয়া পড়িল।
সঞ্জয় প্রভৃতি সবে ধরিয়া তুলিল।।
চেতন পাইয়া বলে সঞ্জয়ের প্রতি।
বিদুর আছয়ে কোথা আন শীঘ্রগতি।।
পরম ধার্ম্মিক ভাই মম হিতে রত।
তাহার বিচ্ছেদে আমি ‍আছি মৃতবত।।
কুবচন বলিলাম আমি পাপমুখে।
এতক্ষণ প্রাণ সে ত রাখে বা না রাখে।।
শীঘ্রগতি যাও নাহি বিলম্ব করহ।
বিদরে হৃদয় মম ত্বরিত আনহ।।
এত শুনি সঞ্জয় চলিল সেইক্ষণ।
যথা বনে আছে পঞ্চ পাণ্ডুর নন্দন।।
যথোচিত পূজা করি সবাকার প্রতি।
বিদুরে চাহিয়া তবে বলিছে ভারতী।।
শুনহ আমার বাক্য বিদুর সুমতি।
হস্তিনা নগরে তুমি চল শীঘ্রগতি।।
শীঘ্র চল এইক্ষণে বিলম্ব না সয়।
তোমা বিনা অন্ধরাজ জীবন সংশয়।।
এত শুনি যুধিষ্ঠির করেন সম্প্রীত।
রথে চড়ি দুইজন চলিল ত্বরিত।।
বিদুর আইল পুনঃ শুনিল রাজন।
শিরেতে চুম্বন করি দিল আলিঙ্গন।।
বলিল পূর্ব্বের দোষ ক্ষমহ আমার।
এত বলি অনেক করিল পুরষ্কার।।
বিদুর বলেন, রাজা হইলাম ক্ষান্ত।
আপনি আমার গুরু পরম সম্ভ্রান্ত।।
আপনি করিলে ক্ষমা ইহা আমি চাই।
আজ্ঞা ‍ছাড়া হতে কভু মম শক্তি নাই।।
যেমত আমার পুত্র পাণ্ডব তেমন।
কিন্তু এরা দুঃখী মম ইথে পোড়ে মন।।
বিদুর আইল শুনি রাজা দুর্য্যোধন।
ডাকাইয়া আনাইল কর্ণ দুঃশাসন।।
শকুনি সহিত তবে সভায় বসিল।
কতক্ষণে দুর্য্যেধন কথা যে কহিল।।
অন্ধ ভূপতির মন্ত্রী পাণ্ডবের হিত।
বিদুর আইল দেখ মন্ত্রণা পণ্ডিত।।
যাবত বিদুর না আকর্ষে তাঁর মন।
পাণ্ডবে ‍আনিতে আজ্ঞা না দেন রাজন।।
তাবত মন্ত্রণা কর ইহার উপায়।
যে মতে কুন্তীর পুত্র আসিতে না পায়।।
পুনঃ যদি হস্তিনায় দেখিব পাণ্ডব।
নিশ্চিত আমার বাক্য কহি শুন সব।।
গরল খাইব কিম্বা প্রবেশিব জলে।
নিতান্ত ত্যজিব প্রাণ অস্ত্রে বা অনলে।।
শকুনি বলিল, শুন আমার বচন।
কদাচিত না আসিবে পাণ্ডুপুত্রগণ।।
সত্যবাদী যুধিষ্ঠির করেছে সময়।
এয়োদশ বৎসর যাবৎপূর্ণ নয়।।
তাবৎ হস্তিনা না আসিবে কদাচন।
না শুনিবে তারা ধৃতরাষ্ট্রের বচন।।
শুনিয়া বৃদ্ধের বাক্য যদি পুনঃ আইসে।
আমরা করিব পুনঃ সেই পণ শেষে।।
কর্ণ বলে, মম চিত্তে এই যুক্তি আসে।
দুঃখিত পাণ্ডবগণ আছে বনবাসে।।
জটা চীর বন ক্লেশ শোকেতে কাতর।
সহায় সম্পদগণ আছে যে অন্তর।।
চতুরঙ্গ দলে গিয়া বেড়িব পাণ্ডবে।
এ সময় মারিলে সকল রিষ্টি যাবে।।
দুর্য্যোধন বলে, সাধু মন্ত্রণা তোমার।
করিল মন্ত্রণা এক সংসারের সার।।
আজ্ঞা দিল নরপতি সাজিতে সবারে।
রথ গজ তুরঙ্গম চলিল সত্বরে।।
সাজিয়া সকল সৈন্য কৌরব চলিল।
অন্তর্য্যামী ব্যাসের সে গোচর হইল।।
হস্তিনা নগরে মুনি করেন গমন।
পথে দুর্য্যোধন সহ হইল মিলন।।
বাহুড়িয়া চল বলি আজ্ঞা দেন মুনি।
দুর্য্যোধন বাহুড়িল মুনি বাক্য শুনি।।
ধৃতরাষ্ট্র নিকটেতে যান দ্বৈপায়ন।
যথোচিত পূজা তাঁর করিল রাজন।।
মুনি বলে, ধৃতরাষ্ট্র করিলে কি কর্ম্ম।
বৃদ্ধ হইয়া আচর এমত অধর্ম্ম।।
মন্দবুদ্ধি তব পুত্র দুষ্ট দুরচারী।
রাজ্যলোভে হইল সে পাণ্ডবের বৈরী।।
পাণ্ডব সহায় যেই, জান ভাল মতে।
বিধাতার ধাতা হর্ত্তা কর্ত্তা ত্রিজগতে।।
তাঁরে না চিন্তি না ভাবি নিজ হিত চিত্তে।
বনবাসে পাঠাইয়া দিলে পাণ্ডুসুতে।।
আপনার হিত যদি চাহ রাজ মনে।
পাণ্ডবের নিকটে পাঠাও দুর্য্যোধনে।।
একাকী পাণ্ডব সহ ভ্রমুক কাননে।
মন্দ চিন্তা না করুক, না হিংসুক মনে।।
ইহাতে পাণ্ডব যদি হয় প্রীতিমান।
তবে তব শত পুত্রের হৈবে কল্যাণ।।
ধৃতরাষ্ট্র বলে, দেব কহিলে উত্তম।
আমারে না রুচে যত করিল অধম।।
ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর গান্ধারী আদি করি।
কাহারও না শুনে বাক্য দুষ্ট দুরাচারী।।
দুর্য্যোধন স্নেহ আমি না পারি ছাড়িতে।
তেঁই হেন কর্ম্ম করি কালবশ হৈতে।।
মুনি বলে, নহে ইহা ধর্ম্মের আচার।
এরূপ কর্ম্মেতে নহে আমার বিচার।।
পুত্র সম স্নেহ রাজা নাহিক সংসারে।
বিশেষ দুর্ব্বল পুত্রে বড় স্নেহ করে।।
তুমি যেন মম পুত্র, পাণ্ডুও তেমন।
যুধিষ্ঠির যেমন, তেমন দুর্য্যোধন।।
পাণ্ডবের বিশেষতঃ বহু স্নেহ হয়।
পিতৃহীন সদা পায় দুঃখ অতিশয়।।
পূর্ব্বের বৃত্তান্ত কথা শুনহ রাজন।
সুরভি গোমাতা আর সহস্রলোচন।।
সুরভি রোদন করে হইয়া বিহ্বল।
এস্ত হয়ে তারে জিজ্ঞাসিল আখণ্ডল।।
কহ কি কারণে মাতা করহ রোদন।
দেবে নরে কিম্বা নাগে আপন ঘটন।।
সুরভি কহিল নাই আপদ কাহার।
শুন যেই হেতু দুঃখ হইল আমার।।
দুর্ব্বল আমার পুত্রে যুড়ি লাঙ্গলেতে।
হীনশক্তি রুগ্ন বড় না পারে চলিতে।।
মারিছে কৃষক বড় পুচ্ছমূল মোড়ে।
আর গুটি বলিষ্ঠ যাইছে উভরড়ে।।
তার সঙ্গে শক্তি নাহি যাইতে ইহার।
কৃষক পাপিষ্ঠ বড় করিছে প্রহার।।
এই হেতু রোদন যে করি নিরন্তর।
শুনিয়া উত্তর করিলেন পুরন্দর।।
এই হেতু দেবী তুমি করিছ রোদন।
কিন্তু দেখ স্থানে স্থানে লক্ষ বৃষগণ।।
বৃষকে কৃষকগণ করয়ে প্রহার।
তা সবারে স্নেহ কেন না হয় তোমার।।
সুরভি বলেন এই অশক্ত দুর্ব্বল।
ইহা দেখি চিত্ত মোর হইল বিকল।।
এত শুনি দেবরাজ মেঘে আজ্ঞা দিল।
জল বৃষ্টি করি সব পৃথিবী পূরিল।।
কৃষক ত্যজিল কৃষি করিল গমন।
সুরভি বলেন সাধু সহস্রলোচন।।
এইমত পালন করহ সবাকারে।
বনবাসে হইল দুর্ব্বল কলেবরে।।
শুন রাজা পূর্ব্বে হেন হয়েছে বিধান।
তবে ধর্ম্ম রহে সব দেখিলে সমান।।
যদি ধর্ম্ম চাহ, রাখ আমার বচন।
পাণ্ডবেরে সমভাবে করহ পালন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *