০১. যুধিষ্ঠিরের উদ্বেগ ও ব্যাসদেবের উপদেশ প্রদান

জিজ্ঞাসেন জন্মেজয় কহ তপোধন।
কি কি কর্ম্ম করিলেন পিতামহগণ।।
মুনি বলে শুন তবে শ্রীজনমেজয়।
রাজ্যে রাজা হইলেন ধর্ম্মের তনয়।।
কিন্তু উপরোধে রাজ্য নিয়া যুধিষ্ঠির।
প্রজাগণ পালন করেন ধর্ম্মবীর।।
রামের পালনে যেন অযোধ্যার প্রজা।
সেইমত প্রজার পালক মহাতেজা।।
রাজ্যভোগ যুধিষ্ঠির না চাহেন মনে।
সদাই থাকেন ধর্ম্ম বিরস বদনে।।
ভীমার্জ্জুন সহদেব নকুল সুমতি।
লইয়া করেন যুক্তি ধর্ম্ম নরপতি।।
শুনহ অর্জ্জুন তুমি আমার বচন।
স্থির নহে চিত্ত মম কিসের কারণ।।
রাজ্য ধন দেখিয়া আমার নহে প্রীত।
সতত চঞ্চল চিত্ত সদা হয় ভীত।।
কি বুদ্ধি করিব আমি জিজ্ঞাসিব কায়।
সর্ব্বদা ব্যাকুল চিত্ত না দেখি উপায়।।
না হেরি নয়নে মোর কৃষ্ণ কালাচাঁদে।
চঞ্চল চকোর চিত্ত প্রাণ সদা কাঁদে।।
দ্বারকানগরে তিনি গেলেন সম্প্রতি।
কে আর করিবে দয়া পাণ্ডবের প্রতি।।
অতএব উঠে চিত্তে অনেক জঞ্জাল।
সর্ব্ব শূন্য দেখি সখে না হেরি গোপাল।।
অর্জ্জুন কৃষ্ণ তুমি করিলে স্মরণ।
যুধিষ্ঠির স্থির হইলেন সেই বোলে।।
ব্যাসদেব তথা আইলেন হেনকালে।
তাঁরে দেখি উঠিলেন ধর্ম্মের নন্দন।।
ভূমিষ্ঠ হইয়া তাঁর বন্দেন চরণ।
আশীর্ব্বাদ করিলেন রাজা যুধিষ্ঠিরে।।
জানিয়া সকল তত্ত্ব জিজ্ঞাসেন তাঁরে।
কহ রাজা কি কারণে বিরস বদন।।
তোমায় দেখিয়া মম বিচলিত মন।
অকৌরবা পৃথিবী করিলে বাহুবলে।।
তোমা সম রাজা নাহি এ মহীমগুলে।
অনুজ অর্জ্জুন তব ভীম মহাবলী।।
আর তাহে সহায় আপনি বনমালী।
তোমা বিষাদিত আমি দেখি কি কারণ।।

এত যদি কহিলেন ব্যাস তপোধন।
বিনয়ে কহেন তবে ধর্ম্মের নন্দন।।
শুন মুনি আমারে না করিও প্রশংসা।
বড়ই নিন্দিত আমি মন্দ মম দশা।।
লোভের কারণে ধর্ম্মপথ পরিহরি।
করিলাম অন্যায় যে কহিতে না পারি।।
পিতামহ ভীষ্মেরে করিলাম সংহার।
আমার সমান কোন পাপী আছে আর।।
গুরু দ্রোণাচার্য্য তিনি হয়েন ব্রাহ্মণ।
নাশ করিলাম তাঁরে শুন তপোধন।।
সহাদর কর্ণবীরে অর্পিনু শমনে।
বধিলাম শত ভ্রাতৃ সহ দুর্য্যোধনে।।
আর যত সুহৃদ বান্ধবগণ ছিল।
রাজ্যলোভে আমা হৈতে যমদ্বারে গেল।।
অভিমন্যু দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্রগণ।
রাজ্য হেতু নাশিলাম শুন তপোধন।।
এমন নিন্দিত কর্ম্ম কেহ নাহি করে।
না বুঝিয়া মহামুনি প্রশংস আমারে।।

ব্যাস বলিলেন শুন ধর্ম্মের নন্দন।
শুনিলাম আমি যত তোমার কথন।।
জ্ঞাতি গুরু ভ্রাতৃ বন্ধু মারিয়াছ তুমি।
কিন্তু ক্ষন্ত্রিয়র ধর্ম্ম শুন নৃপমণি।।
ব্রাহ্মণ ক্ষন্ত্রিয় বৈশ্য আর শূদ্র জাতি।
এ সব ব্রহ্মার দেহে হৈল উৎপত্তি।।
যথাযোগ্য ধর্ম্মে নিয়োজিল চারিজনে।
সংগ্রাম ক্ষত্রিয় ধর্ম্ম লিখিত পুরাণে।।
তুমি বল নিন্দা কর্ম্ম করিলাম আমি।
কিন্তু ইহা স্মরণেতে মুক্ত হয় প্রাণী।।

যুধিষ্ঠির পুনশ্ছ কহেন মতিমান।
শুন প্রভু ক্ষন্ত্রধর্ম্ম কহিলা প্রমাণ।।
জ্ঞাতিবধ পাপে মম কাঁদিতেছে প্রাণ।
কি করিব কহ মুনি ইহার বিধান।।
কি কর্ম্ম করিলে পাপ যাইবেক দূরে।
অনুকূল হয়ে মুনি কহিবে আমারে।।
কোন্ মন্ত্র জপিব করিব কোন্ ধ্যান।
কোন্ যজ্ঞ করি কহ মুনি মতিমান।।
দ্রোণ জিজ্ঞাসিল করি আমাতে বিশ্বাস।
শুনি মুনি তাঁরে আমি কহি মিথ্যা ভাষ।।
কিমতে এ সব পাপে পাব পরিত্রাণ।
এ নহে ক্ষত্রিয় ধর্ম্ম শুন মতিমান।।

ব্যাস বলিলেন রাজা দুঃখ ভাব কেনে।
ক্ষন্ত্রিয় প্রধান ধর্ম্ম বিদিত পুরাণে।।
যুধিষ্ঠির বলিলেন শুন মহাশয়।
পুণ্যকর্ম্ম ব্যতিরেকে পাপ নহে ক্ষয়।।
জ্ঞাতিবধে পাপভয় হয় নিরন্তর।
কি উপায় করিব বলহ মুনিবর।।

তবে ব্যাস কহিলেন শুনহ রাজন।
অশ্বমেধ যজ্ঞ কর ধর্ম্মের নন্দন।।
অশ্বমেধ যজ্ঞে হয় পাপের বিনাশ।
মন দিয়া শুন রাজা কহি ইতিহাস।।
মহাবীর ছিল জমদগ্নির কুমার।
নিঃক্ষত্রা করিল ক্ষিতি তিন সপ্তবার।।
পিতায় আজ্ঞায় তেঁই বধিল জননী।
বনপর্ব্বে সেই কথা শুনিয়াছ তুমি।।
অশ্বমেধ যজ্ঞে তাঁর পাপ গেল দূরে।
এ সব শাস্ত্রের কথা কহি যে তোমারে।।
ত্রেতাযুগে প্রভু হইলেন অবতার।
আপনি শ্রীধাম দশরথের কুমার।।
পালিতে পিতার সত্য চলিলেন বনে।
বনে ভ্রমিলেন সতী লক্ষণের সনে।।
আদ্যোপান্ত রামায়ণ শুনিয়াছ তুমি।
অশ্বমেধ করিলেন শ্রীরাম আপনি।।
আর অশ্বমেধ করিলেন পুরন্দর।
ব্রহ্মবধ পাপে মুক্ত তাঁর কলেবর।।
তুমিও করহ রঙ্গ অশ্বমেধ ক্রতু।
জ্ঞতিবধ মহাপাপ এড়াবার হেতু।।

এত যদি কহিলেন ব্যাস তপোধন।
যোড়হস্তে বলিলেন ধর্ম্মের নন্দন।।
অশ্বমেধে পাপ দূর কহলা আপনি।
যজ্ঞ কৈল যত জন শুনিলাম আমি।।
তা সবার সম নহে আমার ক্ষমতা।
শুন মহামুনি ইহা না হয় সর্ব্বথা।।
নির্দ্ধন নৃপতি আমি নাহি এত ধন।
কিমতে হইবে মুনি যজ্ঞ সমাপন।।
দুর্য্যোধন বিবাদেতে অর্থ হৈল ক্ষয়।
কিমতে হইবে যজ্ঞ মুনি মহাশয়।।
অশ্বমেধ হবে হেন না দেখি উপায়।
বিবরিয়া মহামুনি কহিবা আমায়।।
ফলহীন বৃক্ষ যেন ত্যজে পক্ষিগণ।
অর্থহীন পুরুষেরে ছাড়ে সর্ব্বজন।।
ধনহীন পুরুষের ধর্ম্ম নাহি হয়।
ধন হৈতে ধর্ম্ম হয় মুনিগণ কয়।।
হেন ধন নাহি মম কিসে হবে যজ্ঞ।
কিমতে তরিব পাপে কহ মহাবিজ্ঞ।।

ব্যাস বলিলেন শুন ধর্ম্মের নন্দন।
কার্য্যে কর্ম্মে বদ্ধ হৈলে ধনে প্রয়োজন।।
তবে ধনে ধর্ম্ম হয় ইথে নাহি আন।
শুন রাজা কহি তোমা ধনের সন্ধান।।
মরুত নামেতে এক ছিল নরবর।
তার যজ্ঞ কথা কহি তোমার গোচর।।
অশ্বমেধ করিল মরুত নরপতি।
অদ্যপি তাঁহার যশ ঘোষে বসুমতী।।
বিংশতি সহস্র বিপ্রে যজ্ঞেতে বরিল।
সুবর্ণ আসন সব দ্বিজগণে দিল।।
স্বর্ণ বাটি স্বর্ণ থালা স্বর্ণময় ঝারি।
কাঞ্চন নির্ম্মাণ পাত্রে অন্নজল পূরি।।
হেনমতে মরুত ব্রাহ্মণ সেবা করে।
প্রত্যহ নূতন পাত্র দিল দ্বিজবরে।।
হেনমতে যজ্ঞ কৈল শতেক বৎসর।
মরুত সমান ধনী নাহি নৃপবর।।
বহু ধন নিতে না পারিয়া দ্বিজগণ।
হিমালয় পার্শ্বেতে রাখিল সর্ব্বধন।।
তথা হৈত সেই ধন আনহ সত্বর।
অশ্বমেধ হইবেক শুন নৃপবর।।
ব্যাসের বচন শুনি ধর্ম্মের নন্দন।
যোড়হস্ত করিয়া করিল নিবেদন।।
শুন মহাশয় আমি যজ্ঞ না করিব।
সে ধন ব্রহ্মস্ব, আমি কেমনে আনিব।।
পাপ বিনাশিতে চাহি যজ্ঞ করিবারে।
আনিতে বিপ্রের ধন বল কি প্রকারে।।
শুন মহামতি মম যজ্ঞে নাহি কায।
শুনিলে হাসিবে সব নৃপতি সমাজ।।
ব্রহ্মস্বতে বংশ রক্ষা হইবে কেমনে।
কিমতে সে দ্রব্য আমি করিব গ্রহণে।।

হাসিয়া বলেন ব্যাস শুনহ রাজন।
দোষ নাহি নৃপতি আনিতে সেই ধন।।
সে ধন ব্রাহ্মণগণ করিলেন ত্যাগ।
ইথে দোষ না পরশে শুন মহাভাগ।।
ভয় না করিহ তুমি ধর্ম্মের তনয়।
অগ্নি জল পৃথিবী, এ ধন কার নয়।।
শত শত রাজা পূর্ব্বে পৃথিবীতে ছিল।
অনন্তরে কত কত আরো রাজা হৈল।।
বাহুবরে পৃথিবীর করিল পালন।
নানা যজ্ঞ করিলেক পেয়ে নানা ধন।।
সেই ধন জল অগ্নি হ্রাস নাহি হয়।
ইথে কেন কর ভয় ধর্ম্মের তনয়।।
পূর্ব্বেতে দেবতাসুর ছিল দুই ভাই।
এ ধন ধরণী যত অসুরেতে পাই।।
তবে দেব, অসুরে মারিল বাহুবলে।
এই ধন নিতে আজ্ঞা কৈল কুতূহলে।।
সাবর্ণি নামেতে হৈল সূর্য্যের নন্দন।
পৃথিবী পাইল রাজা তপের কারণ।।
বশ করি বসুমতী পালিলেক প্রজা।
হেনমতে সূর্য্যবংশে হৈল কত রাজা।।
তা সবার দান যজ্ঞ বিদিত সংসারে।
এ সব তপের তেজ জানাই তোমারে।।

হরিশ্চন্দ্র মহারাজ খ্যাত ত্রিভুবনে।
সকল পৃথিবী দান দিলেন ব্রাহ্মণে।।
ব্রহ্মস্ব হইল তবে যেই বসুমতী।
তবে কেন লইবেক ক্ষত্র নরপতি।।
ব্রহ্মস্ব বলিয়া তার ভয় নাহি ছিল।
ইহার কারণে কেবা রাজ্য না করিল।।

তবে বিরোচন সুত বলি হৈল রাজা।
ব্রাহ্মণেরে সপ্তদ্বীপ দিয়া করে পূজা।।
আপনি পাতালে গেল না পাইয়া স্থান।
দুষ্ট দেখি তারে বিড়ম্বিল ভগবান।।

তবে যমদগ্নিসুত ভৃগু বংশপতি।
শুনেছ তাঁহার কথা ধর্ম্ম নরপতি।।
পৃথিবী জিনিয়া তিনি আনন্দিত মনে।
পৃথিবী দিলেন দান মরীচি নন্দনে।।
কশ্যপ পাইল তবে সব বসুমতী।
আপন নন্দনে দিল করিয়া পীরিতি।।
ধন ধরা অগ্নি জল ইহা কারো নয়।
শুন যুধিষ্ঠির রাজা শাস্ত্রে হেন কয়।।
পৃথিবী পালিয়া তার হয় নানা ধন।
ভয় না করিহ তুমি ধর্ম্মের নন্দন।।
সে ধন আনিয়া রাজা যজ্ঞ কর সুখে।
ইথে দোষ নাহি আমি কহিনু তোমাকে।।

আনন্দ পাইয়া রাজা ব্যাসের বচনে।
পুনরপি জিজ্ঞাসেন আনন্দিত মনে।।
হইল ধনের তত্ত্ব শুন মহামুনি।
যজ্ঞ হেতু অশ্ববর কোথা পাব শুনি।।
মুনি বলে অশ্ব আছে যুবনাশ্বপুরে।
আনিতে করহ যত্ন সেই অশ্ববরে।।
যজ্ঞ হেতু অশ্ব পালিতেছে নরপতি।
শত কোটি সেনা আছে তাহার সংহতি।।
যতনে পালয়ে অশ্ব যজ্ঞ নাহি করে।
সেই ঘোড়া আন রাজা জানাই তোমারে।।
পরাজিয়া যুবনাশ্বে হয় আন তুমি।
তবে যজ্ঞ সিদ্ধি হবে কহিলাম আমি।।

যুধিষ্ঠির বলিলেন শুন দিয়া মন।
হয় হেতু হবে সে রাজার সঙ্গে রণ।।
কে আর করিবে যুদ্ধ নৃপতির সাথে।
মহারাজ যুবনাশ্ব খ্যাত পৃথিবীতে।।

ব্যাস বলিলেন রাজা চিন্তা কর কেনে।
হয় আনিবারে আজ্ঞা কর ভীমসেনে।।
বক হিড়িম্বক আর কির্ম্মীর দুর্ব্বার।
কৈলাস মর্দ্দিয়া কৈল যক্ষের সংহার।।
কীচকে মারিল বীর বিরাটনরে।
শত ‍ভাই দুর্য্যোধনে বধিল সমরে।।
ভীম হৈতে হবে তোমা সিদ্ধ প্রয়োজন।
ভীম আনিবেক ঘোড়া করিয়া যতন।।
আমি জানি ভীমের অসাধ্য নহে কর্ম্ম ।
হয় হেতু চিন্তা না করিহ তুমি ধর্ম্ম্।।

যুধিষ্ঠির বলেন করহ অবধান।
বড় দুঃখী আছে ভীম করিয়া সংগ্রাম।।
জর্জ্জর ভীমের দেহ কৌরবের বাণে।
তুরঙ্গ আনিতে তারে কহিব কেমনে।।
বৃষকেতু মেঘবর্ণ দুই ত বালক।
বিশেষ বাপের শোকে দহিছে পাবক।।
কিমতে বলিব তারে তুরঙ্গ আনিতে।
শুন মহামুনি বড় ভয় পাই চিতে।।

এত যদি বলিলেন ধর্ম্ম নৃপবর।
তাহা শুনি আনন্দিত বীর বৃকোদর।।
ভীম বলে মহারাজ করহ শ্রবণ।
তুরগ আনিতে কহিলেন তপোধন।।
আনিব তুরগ আমি এ নহে আশ্চর্য্য।
পরাজিব যুবনাশ্বে কত বড় কার্য্য।।
ধন আনিবারে তুমি পাঠাও অর্জ্জুনে।
আমি আনি গিয়া অশ্ব জিনিয়া রাজনে।।
একেশ্বর যাব আমি ভদ্রাবতীপুরে।
আনিব যজ্ঞের অশ্ব জিনিয়া রাজারে।।
সবান্ধবে রাজারে পাঠাব যমঘরে।
অবশ্য আনিব ঘোড়া কারে ভীম ডরে।।
ইহা ভিন্ন আর নাহি আমার বিশ্রাম।
শতেক বৎসর পারি করিতে সংগ্রাম।।

কহিলেন যুধিষ্ঠির ভীমের বচনে।
একাকী দুর্গমে তুমিযাইবে কেমনে।।
বৃষকেতু বদন চাহেন যুধিষ্ঠির।
রাজার ইঙ্গিতে তার পুলক শরীর।।
যোড়হাতে কহিলেক ধর্ম্মের গোচরে।
ভীম সঙ্গে যাই আমি আজ্ঞা দেহ মোরে।।

যুধিষ্ঠির বলেন শুনহ প্রিয়তর।
আছিল তোমার পিতা মহা ধনুর্দ্ধর।।
অর্জ্জুন বধিল তারে করিয়া বিক্রম।
তার বধে আমি পাইয়াছি মনোভ্রম।।
পরিচয় নাহি ছিল কর্ণের সংহতি।
সবাই বলিল তারে রাধার সন্ততি।।
সূতপুত্র বলি তারে বলে সর্ব্বজনে।
না চিনিয়া সহোদর বধিলাম রণে।।
বিনাশিল কর্ণবীর অর্জ্জুন দুর্জ্জয়।
চাহিতে তোমার মুখ মনে পাই ভয়।।

বৃষকেতু বলে শুন পাণ্ডুর ঈশ্বর।
ক্ষত্রিয়প্রধান ধর্ম্ম করিতে সমর।।
বিপক্ষ হইল পিতা ত্যজি সহোদর।
কৌরব সহিত কৈল মন্ত্রণা বিস্তর।।
দ্রৌপদীরে উপহাসি হিংসিল তোমারে।
সেই পাপে মম পিতা গেল যমঘরে।।
আজ্ঞা দেহ যাব আমি খুড়ার সংহতি।
আনিব যজ্ঞের ঘোড়া শুন নরপতি।।

বৃষকেতু কথা শুনি ভীম হরষিত।
আলিঙ্গন দিল তবে মনের বাঞ্ছিত।।
তবে ঘটোৎকচ সুত মেঘবর্ণ নাম।
যুধিষ্ঠির অগ্রে কহে করিয়া প্রণাম।।
যদি আজ্ঞা কর তুমি ধর্ম্ম নরপতি।
পিতামহ সঙ্গে যাব পুরী ভদ্রাবতী।।
আনিব তুরঙ্গ আমি শুনহ রাজন।
অন্তরীক্ষে গতি মম ধর্ম্মের নন্দন।।
বুঝিতে আমার মায়া অমর না পারে।
আনিব তুরঙ্গ আমি হস্তিনানগরে।।
বৃষকেতু পিতামহে করিবে সমর।
ঘোড়াকে আনিব আমি শুন নরবর।।

এত যদি মেঘবর্ণ বলিল বচন।
অনুমতি করিলেন ধর্ম্মের নন্দন।।
যাও পুত্র ঘোড়ারে আনহ বাহুবলে।
মম আশীর্ব্বাদে ঘোড়া আনিবে কুশলে।।
তিনজন মিলিয়া করিবে মহারণ।
তবে সে জিনিবে তারে শুনহ নন্দন।।
সাজিলেন তিন বীর তুরঙ্গ আনিতে।
ব্যাস কহিলেন কথা রাজার সাক্ষাতে।।
অর্জ্জুনে পাঠাও রাজা আনিবারে ধন।
তবে সে কহিব আমি যজ্ঞ বিবরণ।।
মুনি বাক্যে অর্জ্জুনে কহেন নরপতি।
আজ্ঞা পেয়ে পার্থ রথে যান শীঘ্রগতি।।
হিমালয় পার্শ্বে যান পাণ্ডুর নন্দন।
রথেতে তুলিয়া আনিলেন সব ধন।।

ধন দেখি যুধিষ্ঠির সানন্দ বিস্তর।
জিজ্ঞাসা করেন পুনঃ মুনির গোচর।।
যজ্ঞ-বিবরণ তবে কহ মহামুনি।
আয়োজন কত চাহি কহ দেখি শুনি।।
কতেক ব্রাহ্মণ যজ্ঞে করিব বরণ।
সে সকল কথা শীঘ্র কহ তপোধন।
গব্য হব্য কত চাহি কহ মহামুনি।
ঘোড়ার কিমত রূপ, কহ দেখি শুনি।।
আদ্যেপান্ত যজ্ঞ কথা জানাও আমারে।
স্থির নহে চিত্ত মম, কহিনু তোমারে।।

ব্যাস বলিলেন, শুন ধর্ম্মের নন্দন।
অশ্বমেধ যজ্ঞ কৈলে স্থির হবে মন।
যজ্ঞ বিবরণ রাজা কহি যে তোমারে।
আদ্যোপান্ত অন্ন জল দিবে সবাকারে।।
বিংশতি সহস্র বিপ্রে যজ্ঞেতে বরিবে।
নানা আভরণ দিয়া সবারে তুষিবে।।
লক্ষ কুম্ভ ঘৃত নিত্য ঢালিবে আগুনে।
করিবে দেবতা পূজা কুসুম চন্দনে।।
পাঁচ কুম্ভ ঘৃত এক ব্রাহ্মণে ঢালিবে।
হেনমতে লক্ষ কুম্ভ প্রতি দন দিবে।।

ঘোড়ার লক্ষণ শুন ধর্ম্ম নরপতি।
চন্দ্রিমা জিনিয়া ঘোড়া দেহের মুরতি।।
পীতপুচ্ছ শ্যামবর্ণ অশ্ব মনোহর।
সর্ব্ব সুলক্ষণ হয় শুন নরবর।।
ভূষিত করিবে ঘোড়া দিয়া আভরণ।
আপনার নাম তাহে করিবে লিখন।।
জয়পত্র আশ্বভালে করিয়া বন্ধন।
আপনার নাম তাহে করিবে লিখন।।
তাহাতে লিখিবে পত্র যেই ঘোড়া ধরে।
নিজ বাহুবলে আমি জিনিব তাহারে।।
তুরঙ্গ ছাড়িয়া মধু পূর্ণিমা দিবসে।
পৃথিবী ভ্রমিবে ঘোড়া মনের হরিষে।।
আপনি থাকিবে যজ্ঞে তুমি হয়ে ব্রতী।
অসিপত্র ব্রত আচরিবে মহামতি।।

যুধিষ্ঠির বলেন যে করি নিবেদন।
অসিপত্র ব্রতের বলহ বিবরণ।।
অসিপত্র ব্রত সেই কেমন প্রকারে।
কি নিয়মে থাকে তাহা বলহ আমারে।।
ব্যাস বলিলেন রাজা কর অবগতি।
অসিপত্র ব্রত কথা শুন নরপতি।।
যাবৎ না আসে ঘোড়া নিবৃত্ত হইয়া।
থাকিবে সে একাসনে দ্রৌপদী লইয়া।।
তার মাঝে খড়গ এক খোবে নরপতি।
কদাচিত অন্য মত না করিবে তথি।।
মদন আবেশে যদি মজে তার মন।
সেই খড়েগ কাটিয়া ফেলিবে সেইক্ষণ।।
সেই ব্রত কর রাজা আমার বচনে।
তোমা বিনা করিতে নারিবে অন্যজনে।।

শুনিয়া কহেন রাজা ধর্ম্মের নন্দন।
আচরিতে না পারিল সহস্রলোচন।।
হেন ব্রত আচরিব আমি কোন্ মতে।
শুন মহামুনি বড় ভয় পাই চিতে।।
ব্যাস কন তোমার সহায় নারায়ণ।
তোমার অসাধ্য ইহা নহেত রাজন্ ।।
এত বলি ব্যাস চলিলেন নিকেতনে।
কৃষ্ণেরে করেন স্তব রাজা দৃঢ়মনে।।
মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *