০০১. পাণ্ডবদিগের বনবাস গমনে প্রজাগণের খেদ

জন্মেজয় বলে, কহ শুনি তপোধন।
পূর্ব্ব-পিতামহ কথা অদ্ভূত কথন।।
কিরূপে জিনিয়া তাঁর নিল রাজ্য ধন।
বহু ক্রোধ করাইল বলি কুচবন।।
কলহের পথ কুরু করিল সৃজন।
কহ শুনি কি করিল পিতামহগণ।।
ইন্দ্রের বৈভব সুখ সকল ত্যজিয়া।
কেমনে সহিল দুঃখ বনেতে রহিয়া।।
পতিব্রতা মহাদেবী দ্রুপদ নন্দিনী।
কিরূপে বঞ্চিল বনে কহ শুনি মুনি।।
কি আহার কি বিহার দ্বাদশ বৎসর।
কোন্ কোন্ গেল, কোন্ গিরিবর।।
বৈশম্পায়ন বলেন, শুনহ রাজন।
কপটে সকল নিল রাজা দুর্য্যোধন।।
ক্ষমা বন্ত দয়াবন্ত রাজা যুধিষ্ঠির।
হস্তিনা নগর হৈতে হলেন বাহির।।
নগর উত্তরমুখে চলেন পাণ্ডব।
চতুর্দ্দিকে ধাইল রাজ্যের প্রজা সব।।
যেই মত ছিল যেই ধাইল ত্বরিতে।
পাণ্ডবে বেড়িয়া সবে রহে চতুর্ভিতে।।
ভীষ্ম দ্রোণ কৃপাচার্য্য সকলের প্রতি।
ধিক্কার ও তিরস্কার করে নানাজাতি।।
ধৃতরাষ্ট্রে ভয় নাহি করে কেহ আর।
ক্রোধে গালিপাড়ে মুখে যা আসে যাহার।।
পাপিষ্ঠ রাজার রাজ্যে কি ছার বসতি।
সবে মেলি যাব মোরা পাণ্ডব সংহতি।।
যে দেশে শকুনি মন্ত্রী, রাজা দুর্য্যোধন।
তথায় বসতি নাহি করে সাধুজন।।
পাপিষ্ঠ হইলে রাজা, প্রজা সুখী নয়।
কুলধর্ম্ম ক্রিয়া তার সব নষ্ট হয়।।
মহাক্রোধী অর্থলোভী মানী কদাচারী।
নির্দ্দয় সুহৃৎ শত্রু মহাপাপকারী।।
হেন দুর্য্যোধন মুখ কভু না দেখিব।
চল সবে পাণ্ডবের সহিত রহিব।।
এত বলি প্রজাগণ কৃতাঞ্জলি করি।
সবিনয়ে বলে ধর্ম্মরাজ বরাবরি।।
আমা সবা ছাড়ি কোথা যাইবে রাজন।
তুমি যথা যাবে তথা যাব সর্ব্বজন।।
তোমায় সর্ব্বস্ব ছলে জিনিল কৌরব।
উদ্বিগ্ন হইয়া হেথা আসি মোরা সব।।
তব হিতে হিত মানি, তব দুঃখে দুঃখী।
তব সুখ হৈলে মোরা সবে হই সুখী।।
আমা সবাকারে নাহি কর নিবারণ।
তোমার সহিত মোরা সবে যাব বন।।
রাজ্যেতে হইল মহাপাপী অধিকারী।
এ কারণে মোরা সব হব বনচারী।।
জল ভূমি বস্ত্র তিল পবন যেমন।
পুষ্প সহবাসে ধরে সুগন্ধ মোহন।।
পাপীর সংসর্গে তেন পাপ বাড়ে নিতি।
পুণ্য বৃদ্ধি হয় পুণ্য জনের সংহতি।।
পুণ্য করিবার শক্তি নাহি মো সবার।
পুণ্যভাগী হব সঙ্গে থাকিলে তোমার।।
বহু পুণ্য করি দুর্য্যোধনের সংহতি।
তথাপি তাহার পাপে নাহি অব্যাহতি।।
রাজ পাপে প্রজাদের নাহিক মুকতি।
যাইব তোমার সঙ্গে, কি হেতু বসতি।।
দরশনে ‍পাপ হয়ে অশনে শয়নে।
ধর্ম্মাচার নষ্ট হয় এ রাজার সনে।।
যেমন সংসর্গ, ফল সেই মত হয়।
তেঁই সে আমরা বনে যাইব নিশ্চয়।।
সমস্ত সদগুণ করে তোমাতে নিবাস।
তেঁই সে আমরা বনে যাইব নিশ্চয়।।
সমস্ত সদগুণ করে তোমাতে নিবাস।
তেঁই তব সহিত থাকিতে করি আশ।।
প্রজাদের হেন বাক্য শুনি যুধিষ্ঠির।
কহিলেন মিষ্টবাক্য কোমল গভীর।।
ভাগ্যবন্ত বলি, মোরে জানিনু এখন।
সে কারণে এত স্নেহ কর সর্ব্বজন।।
আমি যাহা কহি, তাহা অন্য না করিও।
আমার সম্ভ্রম করি সকলে মানিও।।
পিতামহ ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র জ্যেষ্ঠতাত।
কুন্তী মাতা, ইহারা করেন অশ্রুপাত।।
এই সবাকার শোক কর নিবারণ।
দেশে থাকি সবাকারে করহ পালন।।
যুধিষ্ঠির মুখে শুনি এতেক বচন।
হাহাকার করি নিবর্ত্তিল প্রজাগণ।।
অনগ্নি সাগ্নিক শিষ্য সহ দ্বিজগণ।।
পাণ্ডবের পাছু পাছু চলে সর্ব্বজন।।
সশস্ত্র পাণ্ডবগণ রথ আরোহণে।
প্রজাগণে প্রবোধিয়া চলিলেন বনে।।
উত্তর মুখেতে যান জাহ্নবীর তটে।
রম্যস্থান দেখিয়া রেহেন মহাবটে।।
দিনকর অস্ত গেল প্রবেশে শর্ব্বরী।
সেই রাত্রি নির্ব্বাহিল জলস্পর্শ করি।।
চতুর্দ্দিকে দ্বিজগণ অগ্নিহোত্র জ্বালি।
বেদধ্বনি পুণ্যরবে পূরে বনস্থলী।।
রজনী প্রভাব হৈলে উঠি সর্ব্বজন।
ঘোর বনে করিলেন গমন তখন।।
চতুর্দ্দিকে মুনিগণ চলিল সংহতি।
দেখিয়া বলেন তবে ধর্ম্ম নরপতি।।
রাজ্যহীন ধনহীন হইলাম আমি।
ফলমূলাহারী আমি হই বনগামী।।
আমা সনে বহু দুঃখ পাবে দ্বিজগণ।
বিশেষে বনেতে ভয়ঙ্কর পশুগণ।।
হবে যত ‍দুঃখ শুন তোমা সবাকার।
সে পাপে হইবে নষ্ট মম ধর্ম্মাচার।।
দ্বিজ কষ্টে দুঃখ পায় দেব আদি জন।
মনুষ্য কিসেতে গণি আমা আদি জন।।
নিবর্ত্তিয়া দ্বিজগণ চলহ নগরে।
আমার বিনয় এই তোমা সবাকারে।।
দ্বিজগণ বলে, কোথা যাইব নৃপতি।
তোমার যে গতি আমা সবার সে গতি।।
আমা সবা পোষণেতে ত্যজ ভয় মন।
মোরা আনি ফল মূল করিব ভক্ষণ।।
যুধিষ্ঠির বলে, আমি দেখিব কেমনে।
মম সহ রহি দুঃখ পাবে দ্বিজগণে।।
ধিক্ ধৃতরাষ্ট্র রাজা দুষ্ট পুত্রগণ।
এত বলি অধোমুখে রহেন রাজন।।
শৌনক নামেতে ঋষি বুঝান রাজারে।
বহু নীতি শাস্ত্র বলি বিবিধ প্রকারে।।
শোকস্থান সহস্র, শতেক ভয়স্থান।
তাহাতে মূর্চ্ছিত হয় মূর্খ যে অজ্ঞান।।
পণ্ডিত জনের তাহে নহে মুগ্ধ মন।
তুমি হেন লোক শোক কর কি কারণ।।
ধন উপার্জ্জয়ে লোক বন্ধুর কারণে।
বন্ধুতে রহিল ধন, কি কাজ বিমনে।।
অর্থ হেতু উদ্বেগ ত্যজহ নরপতি।
অনর্থের মূল অর্থ কর অবগতি।।
উপার্জ্জনে যত কষ্ট ততেক পালনে।
ব্যয়ে হয় যত ‍দুঃখ, ক্ষয়েতে দ্বিগুণে।।
অর্থ যার থাকে তার সদা ভীত মন।
তার বৈরী রাজা অগ্নি চোর বন্ধুজন।।
অর্থ হৈতে মোহ হয় অহঙ্কার পাপ।
অত্যন্ত উদ্বেগ হয়, সদা মনস্তাপ।।
এ কারণে অর্থচিন্তা ত্যজহ রাজন।
সর্ব্ব পূর্ণ হলে তৃষ্ণা নহে নিবারণ।।
যাবৎ শরীরে প্রাণ, তৃষ্ণা নাহি টুটে।
সাধুজন এই তৃষ্ণা জ্ঞান অস্ত্রে কাটে।।
সন্তোষ সাধুর অস্ত্র তৃষ্ণা নিবারণ।
ইন্দ্রসম অর্থে তুষ্ট নহে জ্ঞানীজন।।
অনিত্য এ ধন জন অনিত্য সংসার।
ইহার মায়াতে ডুবি ক্লেশমাত্র সার।।
এই সব স্নেহেতে মোহিত যত জন।
অচিন্তিত কোথা দেখিয়াছ হে রাজন।।
ধর্ম্ম করিবারে যদি উপার্জ্জয়ে ধন।
বিচলিত হয় মন ধনের কারণ।।
মহারাজ জান ধন পাপ পঙ্কবৎ।
পঙ্কেতে নামিলে তনু হয় পঙ্কাবৃত।।
নিশ্চয় হইবে দুঃখ সে পঙ্ক ধুইতে।
সাধু সেই, যে নাহি যায় সে পঙ্কেতে।।
ধর্ম্মে যদি প্রয়োজন থাকয়ে রাজন।
এ সকল পাপ তৃষ্ণা করা কি কারণ।।
শৌনক বচন শুনি কহে নরপতি।
মম কিছু তৃষ্ণা নাহি রাজ্য ধন প্রতি।।
বিপ্রের ভরণ হেতু চিন্তা করি মনে।
গৃহাশ্রমে অতিথি না পূজিব কেমনে।।
গৃহাশ্রমী হইয়া বঞ্চিবে যেই জন।
অতিথি যা মাগে তাহা দিবে ততক্ষণ।।
তৃষ্ণার্ত্তকে জল দিবে ক্ষুধিতে ভোজন।
নিদ্রার্থীর শয্যা দিবে শ্রান্তকে আসন।।
অতিথি আসিলে দ্বারে করিবে যতন।
কত দূরে উঠিয়া করিবে সম্ভাষণ।।
যে জন না করে ইহা গৃহস্থ হইয়া।
বৃথা হয় দান যজ্ঞ ধর্ম্ম আদি ক্রিয়া।।
আমি হেন লোক ইথে বাঁচিব কেমনে।
এই হেতু মহাতাপ পাই ‍আমি মনে।।
শৌনক বলিল, রাজা চিন্তা দূর কর।
ধর্ম্মকে শরণ লহ শুন নৃপবর।।
ইন্দ্র চন্দ্র আদিত্য অপর দিকপালে।
ত্রৈলোক্য জনেরে তাঁরা ধর্ম্মবলে পালে।।
তুমিহ করহ রাজা তপ আচরণ।
তপোবলে দ্বিজগণে করহ পালন।।
এত ‍শুনি যুধিষ্ঠির চিন্তিত হৃদয়।
ধৌম্য পুরোহিতে ডাকি কহে সবিনয়।।
দ্বিজগণ চলিলেন আমার সংহতি।
কেমনে ভরণ হবে কহ মহামতি।।
ক্ষণেক চিন্তিয়া কহে ধৌম্য তপোধন।
ত্যজ ভয় কর রাজা সূর্য্যের সেবন।।
সংসার পালনকর্ত্তা দেব দিবাকর।
সূর্য্যের প্রসাদে কার্য্য হবে নৃপবর।।
এত বলি দীক্ষা দিয়া ধৌম্য তপোধন।
অষ্টোত্তর শত নাম করান শ্রবণ।।
মহাভারতের কথা অতুল ভূতলে।
শুনিলে আশ্রয় লভে কৃষ্ণ পদতলে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *