আঠারো
আরেকজন লোক জীপের পিছনটা ঘুরে এগিয়ে আসছে। হাতে ছোৱা। লাফ দিয়ে নিচে পড়েই সিধে হয়ে দাঁড়াল রানা। লোকটা নামতে দেখেনি রানাকে, এক ছুটে ওর গায়ের উপর এসে পড়ল সে। হাঁটু দিয়ে প্রচণ্ড এক গুঁতো মারল রানা লোকটার তলপেটে। ভাঁজ হয়ে গেল লোকটা, পড়ে গেল কাত হয়ে, কাটা মুরগীর মত লাফাচ্ছে দম নেবার জন্যে। আধ পাক ঘুরে জঙ্গলের দিকে ছুটল রানা। চিৎকার আর বুট জুতোর ছুটন্ত পদশব্দ ওর বিশ হাত পিছনে।
রানার চেয়ে কম যায় না লোক দুজন, পাঁচ মিনিট প্রাণপণে দৌড়েও মধ্যবর্তী দূরত্ব একহাত বাড়াতে পারল না রানা। কিন্তু দৌড়ের সাথে সাথে চেঁচিয়ে জঙ্গল মাথায় করছে বলে লোক দুজন হাঁপিয়ে উঠল দ্রুত। মুখ বুজে প্রাণপণে ছুটছে রানা, কাজেই পিছিয়ে পড়তে শুরু করল লোক দু‘জন।
এই প্রথম ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে তাকাল রানা। কাউকে দেখতে না পেলেও চেঁচামেচি আর ধুপধাপ বুটের আওয়াজ এগিয়ে আসছে। সামনের একটা নাদুসসুদুস গাণ্ডু বেছে নিয়ে সেটার আড়ালে গা ঢাকা দিল রানা। একটু জিরিয়ে নেয়া দরকার। উত্তেজিত কণ্ঠস্বর কাছে এগিয়ে আসছে। ঝোপ জঙ্গলের শাখা ভাঙার মট মট শব্দ পাচ্ছে রানা। প্রথম লোকটা আকাশের দিকে মুখ তুলে ছুটে গেল পাশ ঘেঁষে। কিছু বলল না রানা তাকে। লোকটার পিঠের দিকে চোখ রেখে ঝুঁকে পড়ল ও, তুলে নিল দেড় সের ওজনের একটা পাথর। দ্বিতীয় লোকটা আসছে। এসে পড়েছে। ধীরেসুস্থে গাছটার আড়াল থেকে বেরুল রানা। দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে ও। থমকে দাঁড়াল লোকটা। ঠিক নাকের সামনে দেখতে পেল রানার হাতের পাথরটা। হাত তুলে আত্মরক্ষার সুযোগও পেল না, বিস্ময়ে মুখ খুলে গেছে তার। আসন্ন চিৎকারটা বন্ধ করে দিল রানা লোকটার কপাল বরাবর পাথরের ঘা মেরে।
ঠাঁটু মুড়ে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। পাথরটা আবার লোকটার চাঁদির ওপর নামিয়ে আনতে যাবে রানা, হঠাৎ সামলে নিল। নড়ছে না লোকটা, জ্ঞান হারিয়েছে। অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাথরটা ফেলে দিল।
এক মিনিট নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশের শব্দ শোনার চেষ্টা করল রানা। প্রথম লোকটা সামনে এগিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে, তবে দূর থেকে তার চিৎকার শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। আরও লোকজনের আওয়াজ পাচ্ছে রানা। রাস্তার দিক থেকে আসছে সেগুলো। মোটামুটি আন্দাজ করল রানা, কমপক্ষে ষোলোজন লোক রয়েছে রাস্তার উপর।
দিক না বদলেই আবার দ্রুত হাঁটতে শুরু করল রানা। নিঃশব্দে। লোকগুলোকে লেলিয়ে দিয়েছে বয়েড, এবং সম্ভবত বিগ প্যাটের নেতৃত্বে রানাকে খুজেঁ বের করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। এই মুহূর্তে একমাত্র জরুরী কাজ, ভাবছে রানা, ওদের চোখকে ফাঁকি দেয়া। কিছুতেই ধরা দেয়া চলবে না।
কিন্তু কাজটা সহজ নয়। লোকগুলো কাঠুরে, এসব জঙ্গলের প্রতিটি ইঞ্চি তাদের নখদর্পণে। তারা কৌশলে ওকে জঙ্গলের বিশেষ একটা এলাকায় তাড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইবে যেখানে ঘেরাও করে ওকে ধরাটা সহজ হবে। এই ফাঁদ থেকে দূরে সরে থাকতে হবে ওকে।
শহরের কাছাকাছি এদিকের জঙ্গল তেমন ঘন নয় বলেই ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এখান থেকে গাছ কাটা হয়নি, শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্যে ডালপালাই কাটা হয়েছে৷ যে-কোন জায়গা থেকে সাধারণত জঙ্গলের বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। গা ঢাকা দেয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার বলে মনে হলো রানা। তার উপর, গায়ে রয়েছে লাল রঙের শার্ট।
আধ ঘণ্টা পর মনে হলো কাঠুরেদের চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছে ও। কিন্তু হঠাৎ বেশ কাছাকাছিই গলার আওয়াজ পেয়ে বুঝতে পারল, পারেনি।
শব্দ না করে এগোতে হচ্ছে বলে গতি বাড়াতে পারছে না। সিদ্ধান্ত পাল্টে শব্দের তোয়াক্কা না করেই দ্রুততর বেগে ছুটতে শুরু করল এবার ও। এদিকের জঙ্গল ক্রমশ উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে।
দশ মিনিট পর মাথায় উঠে পড়ল রানা। উপত্যকার দিকে তাকিয়ে মহীরুহে ভরাট সত্যিকার গভীর বনভূমিকে দেখতে পেল ও। ওখানে একবার পৌঁছুতে পারলে পিছনের লোকগুলোকে ফাঁকি দেবার একটা সুযোগ পেতেও পারে।
নামতে শুরু করল রানা। যদিও কাজটা উচিত হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। গভীর জঙ্গল নিজেই একটা ফাঁদ, সেখানে প্রবেশ করা না করা নিজের ইচ্ছা, কিন্তু বেরিয়ে আসাটা অনেক সময় ভাগ্যের ব্যাপার।
পিছনের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারছে রানা, দূরত্ব বজায় রাখতে পারছে এখনও ও! তবে, এটা খুব একটা শুভ লক্ষণ নয়। এক ডজনের উপর বেপরোয়া লোক দীর্ঘ দৌড় প্রতিযোগিতায় নিঃসঙ্গ একজনকে শেষপর্যন্ত হারিয়ে দেবেই। লোকগুলো ওর সাথে খোশ-আলাপ করার জন্যে এত পরিশ্রম করে পিছু ধাওয়া করছে না, এ ব্যাপারে রানার মনে কোন সংশয় নেই।
প্রতিবাদ জানাচ্ছে পা দুটোর পেশী, কিন্তু গ্রাহ্য করছে না রানা। নিক্ষিপ্ত তীরের মত নিচের গভীর জঙ্গলের দিকে নেমে যাচ্ছে। সামনের মাটির দিকে চোখ রেখে সহজতম পথ বেছে নিয়ে মোটামুটি একটা সরলরেখা ধরে ছুটছে সে।
কিন্তু কান সজাগ আছে, পিছন থেকে ভেসে আসা আওয়াজ এখনও শুনতে পাচ্ছে রানা। কাছ থেকে ভরাট, দূর থেকে দুর্বোধ্য, আরও দূর থেকে ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে। সহজে হাল ছাড়বে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে যেন ওরা।
আকাশ ছোঁয়া গাছগুলো দ্রুত কাছে চলে আসছে। একশো মাইল বিস্তৃত জঙ্গলে একবার হারিয়ে যেতে পারলে খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, ভাবছে রানা। হেমলক, ডগলাস ফার আর রেড সিডারের আড়ালে সাতটনী একখানা প্রকাণ্ড ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকলেও দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। সূর্যের আলো পাতা আর ডালের ফাঁক গলে নিচে পড়ে আলোছায়ার অদ্ভুত এক মায়া তৈরি করে রেখেছে। ঝড়ে পড়া গাছের নিচে পাতার ভিতর ভাল মত লুকালে একজন মানুষকে খুঁজে বের করা অসম্ভব। গাছের গায়ে যে-সব গহ্বর আছে তাতে ঢুকেও অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়।
প্রথম বড় ফার গাছটার কাছে পৌঁছে পিছন দিকে তাকাল একবার রানা। প্রথম লোকটা ওর কাছ থেকে দুশো গজ দূরে, বাকি সবাই তার পিছনে লম্বা একটা লাইনের মধ্যে রয়েছে। দু‘চারটে গাছকে পাশ কাটিয়ে দিক পরিবর্তন করল রানা। কিনারার দিকে জঙ্গল এখানে খুব ঘন নয়। শব্দ করা উচিত নয় মনে করে গতি কমিয়ে দিল। খানিক পরপরই দিক বদলাচ্ছে, এঁকেবেঁকে ছুটছে সামনের দিকে ওদের চোখে পড়ে যাচ্ছে কিনা দেখার জন্যে ঘন ঘন তাকাতে হচ্ছে এখন পিছনে।
দৌড়ের গতি কমিয়ে আনার পর খানিকটা দম ফিরে পেলেও হৃৎপিণ্ডটা বুকের পাশে এমন লাফাচ্ছে, মনে হচ্ছে ফেটে বেরিয়ে যাবে। অনুসরণকারীদের অবস্থাও যে ওর চেয়ে ভাল নয় সে-কথা ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করল রানা। আরও গভীর অঞ্চলে ঢুকছে এখন ও। পিছনের সমস্ত শব্দ কখন যেন থেমে গেছে। স্বস্তির একটা ঠাণ্ডা আরাম অনুভূতি হাওয়া দিচ্ছে শরীরে। বাঁ দিক থেকে হাঁকটা ভেসে এল তখুনি, আরেকজন উত্তর দিল ডান দিক থেকে। মুহূর্তে গতি বাড়ল রানার। একটা আশঙ্কা মনে জাগতে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারা, তিন দিক থেকে চেপে রেখেছে ওকে, এক সময় ঘিরে ফেলবে গোল হয়ে। খোলা শুধু সামনেটা।
সূর্য ডুবতে এখনও চার ঘণ্টা দেরি আছে। ওঁদের মধ্যে অভিজ্ঞ কোনও গাইড আছে কিনা জানে না রানা। ভাবছে, বয়েডের বাহিনী সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নিষ্ঠা বজায় রাখতে পারবে কি?
দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিল রানা। গা ঢাকা দিয়ে মূর্তিমান শত্রুতার ঢেউটাকে ওর ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দেবে ও। গভীর হবার সাথে সাথে ঘন, প্রায় কালচে সবুজ হয়ে উঠেছে সামনের জঙ্গল। চোখ খোলা রেখেছে রানা, বেছে বের করতে চাইছে জুতসই একটা জায়গা। পঞ্চাশ গজ লম্বা আর বিশ গজ চওড়া জায়গা জুড়ে নুড়ি পাথরের একটা স্তূপ দেখল রানা, মাঝখানে খুদে একটা পাহাড়, তোবড়ানো গা নিয়ে উঠে গেছে চল্লিশ গজের মত। লুকাবার মত গর্ত অনেকগুলোই দেখতে পেল রানা পাহাড়টার গায়ে, কিন্তু প্রলুব্ধ হলো না মোটেও। শত্রুপক্ষ ওটার প্রতি ইঞ্চি পাথরে সন্ধানী দৃষ্টি না ফেলে সামনে এগোবে না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত ও।
ক্রমশ দূরত্ব কমছে ওদের মধ্যে। মাটিতে পড়া গাছ, গাছের গায়ের গর্ত, ঝোপ আর গাছে ঢাকা পাথরের স্তূপে লুকাবার জায়গা খুঁজতে গিয়ে প্রচুর সময় অপব্যয় 2.চ্ছে রানার। জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকতে সায় দিচ্ছে না মন। লংফেলোর কথা ভেবে অস্থিরতা মনের মধ্যে বাড়ছে ক্রমশ। শীলা সার্জেন্ট হ্যামিলটনের কাছে গেছে ঠিকই, কিন্তু যখন সে রওনা হয় তখনকার পরিস্থিতি তেমন গুরুতর ছিল না। তাই গে সাথে করে হ্যামিলটনকে নিয়ে লংফেলোর কেবিনে ফেরার কথা নাও ভাবতে পারে। বয়েড এবং পুসি লংফেলোর কোন ভুলের সুযোগ নিতে ছাড়বে না, সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেবিনে ফিরতে চায় ও। তার মানে যে ক’ইঞ্চি সামনে এগোবে সেই ক’ইঞ্চি পিছিয়ে আসতে হবে ওকে আবার কেবিনে ফিরতে হলে।
ওর চারদিকে ফার গাছের বেড়া, প্রতিটি শাখাহীন কাণ্ডের দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ ফিটের কম নয়। যা খুঁজছিল কপালগুণে পেয়ে গেল রানা। অপ্রাপ্ত-বয়স্ক একটা সিডার গাছ, যথেষ্ট নিচের দিকে রয়েছে শাখাগুলো। সহজেই উপরে উঠে পড়ল রানা। দুটো শাখা ছাড়িয়ে চলে গেল আরও উপরে। তৃতীয় শাখার উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল উপুড় হয়ে। গাছের পাতা আর প্রশাখাগুলো মাটি থেকে ওকে আড়াল করে রাখবে বলে আশা করছে ও। সাবধানের মার নেই ভেবে গায়ের লাল শার্টটা খুলে গোল পাকিয়ে বুকের নিচে চেপে রাখল। এবার অপেক্ষা।
দশ মিনিট পেরিয়ে যেতেও ঘটল না কিছু। তারপর এমন নিঃশব্দ পায়ে এল ওরা যে কোন শব্দ শুনতে পাবার আগে মৃদু নড়ে উঠতে দেখল রানা এটা ঝোপকে। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে রানা দেখল লোকটাকে, খোলা জায়গাটার কিনারায় পৌঁছেচে সে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে চারদিক। শক্ত হয়ে আছে পেশী। ঠিক সিডার গাছটার দিকে সরাসরি তাকাল একবার। আপনা-আপনি নিঃশ্বাস আটকে গেল রানার। এখন যদি উপরে তাকায়, পরিষ্কার দেখতে পাবে রানার চোখ দুটো। মুখটা সরিয়ে নেবার ঝুঁকি নিতে পারছে না রান্ন। একটু নড়লেই দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে এদিকে।
বিশ গজ দূরে লোকটা। তার সামনে ফাঁকা জায়গা, তারপর ফার আর সিডার গাছের উঁচু বেড়া। একই জায়গায় পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা সন্দেহ করেছে, বোঝা গেল একচুল একচুল করে মাথা ঘুরিয়ে গাছগুলোর প্রতিটি ইঞ্চি তীক্ষ্ণ সন্ধানী চোখে যাচাই করছে দেখে। হঠাৎ মাথা ঝাঁকাল লোকটা। পরিষ্কার বুঝল রানা, কাউকে ইশারা করল। পরমুহূর্তে তার পিছনের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে পাশে দাঁড়াল আর একজন লোক।
দু‘জন ফাঁকা জায়গাটার উপর দিয়ে হেঁটে আসছে অনেকটা নিশ্চিন্ত ভাবে। প্রথম লোকটার মনে কিছু একটা সন্দেহ জেগে থাকলেও, এখন আর তা অবশিষ্ট নেই বলে মনে হলো রানার।
ঠিক সিডার গাছটার নিচে দাঁড়াল তারা।
‘এর নাম ঘোড়ার ডিম!’
‘চুপ। হয়তো কাছে পিঠেই আছে ব্যাটা।
‘দূর! দেখোগে যাও, পাঁচ মাইল এগিয়ে গেছে সে। গাছ থেকে ডুমুর পেড়ে খাচ্ছে। আমরা যখন ওখানে পৌঁছাব যে তখন সাত মাইল এগিয়ে গেছে। মোটকথা অযথা পা দুটোকে কষ্ট দেয়াই সার হবে।’
‘বিগ প্যাটকে অসন্তুষ্ট করার চেয়ে পা দুটোকে একটু কষ্ট দেয়া তবু ভাল।’
‘শালার ডাঁট বড় বেশি। ধরাকে সরা জ্ঞান করছে আজকাল। যাই বলো, এই ব্যাপারে ওর এত লম্ফঝম্পের কারণ ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘সহজ। বয়েড এই লোকটাকে দু‘হাতের নাগালে পেতে চায়। আর বিগ প্যাট উচ্চাভিলাষী। বুঝলে?’
‘দরকার নেই বুঝে। পাওয়া গেল না-বলে দিলেই তো হয়ে যায়, তোর শালা এত কুদ পাড়ার দরকার কি?’
‘বয়েড শুনবে না। পেতেই হবে ওকে আমাদের।’
লোক দু‘জন বেরিয়ে গেল ফাঁকা জায়গা ছেড়ে, জঙ্গল গ্রাস করল তাদের। দূর থেকে একটা হাঁক ভেসে এল। এছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। আরও পনেরো মিনিট অপেক্ষা করল রানা। তারপর নিচে নামল। শার্টটা উপরেই লুকানো থাকল।
সোজা ফিরতি পথ না ধরে তির্যক একটা দিক ঠিক করে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল রানা লংফেলোর কেবিনের দিকে। ওখানে পৌঁছে কি দেখবে ভাবতে বুক কাঁপছে ওর। কিন্তু পৌঁছে যদি দেখে পরিস্থিতি এখনও লংফেলোর আয়ত্তে, তাহলে—এরকম ইঁদুর তাড়া করবার জন্যে সত্যিই দুঃখ আছে বয়েডের কপালে। কিন্তু পরিস্থিতি কি এখনও তাই আছে, না থাকার কথা?
প্রতিটি ফাঁকা জায়গায় পা দেবার আগে সন্দিহান, সতর্ক চোখে তিনটে দিক দেখে নিচ্ছে রানা। প্রচুর সময় লাগল ঠিকই, কিন্তু কারও সামনাসামনি না হয়ে কনভূমির কিনারায় পৌছে গেল ও।
মানুষের যে কোন দলে এক-আধজন অলস লোক সবসময়ই থাকে. উঁকি দিয়ে সামনে তাকিয়ে লোকটাকে পা ছড়িয়ে বসে থাকতে দেখে ভাবল রানা। একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে সিগারেট ফুঁকছে পরম নিশ্চিন্তে। পায়ে ব্যথা পেয়েছে লোকটা, এক পাটি জুতো পাশে পড়ে থাকতে দেখে ভাবল রানা -এবার ঘাড়ে ব্যথা না পেলে চলছে না ব্যাটার,
জঙ্গলের এমন একটা কিনারা বেছে বসে আছে, যাতে লংফেলোর কেবিনে যেতে হলে যে আড়াআড়ি তেপান্তরটা পেরোতে হবে ওকে, সেটার পুরোটা তার দৃষ্টি সীমার মধ্যে পড়ে। লোকটার ওখানে বসে থাকার মধ্যে যদি বিগ প্যাটের নির্দেশ কাজ করে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যথেষ্ট বুদ্ধি খরচ করেই জায়গাটা বাছাই করেছে লোকটা। কেবিনের দিকে ও ফিরে যায় কিনা তা দেখার জন্যে এর চেয়ে ভাল জায়গা আর হতে পারে না।
নিঃশব্দে পিছিয়ে এল রানা। একটা হাতিয়ার দরকার। আক্রমণটা হতে হবে অকস্মাৎ এবং দ্রুত। একবার যদি লোকটা গলা ছেড়ে চিৎকার করার সুযোগ পায়, ফের দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করতে হবে ওকে। মোটাসোটা দেখে একটা শুকনো ডাল কুড়িয়ে নিল রানা। জঙ্গল থেকে আবার যখন উঁকি দিল ও, নতুন একটা সিগারেট ধরাচ্ছে লোকটা।
বেশ অনেকটা ঘুরে অতি সাবধানে গাছটার পিছনে পৌঁছুল রানা। গাছটার দিকে এগোবার সময় ডান হাতে ধরা ভারি ডালটা তুলল মাথার উপর। কিসের আঘাতে ধরাশায়ী হলো জানার কোন সুযোগই পেল না লোকটা। ঘাড়ের পিছনে পড়ল ডালটা, কাত হয়ে পড়ে যাবার সময় একটা টু শব্দও করল না, আঙুলের ফাঁক থেকে পড়ে গেল জ্বলন্ত সিগারেট। ডালটা ফেলে দিয়ে লোকটার সামনে চলে এল রানা, একটা পা পড়ল সিগারেটের উপর। ঝুঁকে পড়ে দু‘হাত দিয়ে লোকটাকে ধরে টেনে নিয়ে গেল একটা ঝোপের মধ্যে, যেখানে সহজে চোখ পড়বে না কারও।
লোকটার পাল্স দেখে নিয়ে গাঢ় খয়েরী রঙের শার্টটা ওর গা থেকে খুলে নিল রানা। ট্রাউজারের পকেটে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। একটা জ্যাক-নাইফ, এগারোটা ডলার, সিগারেটের প্যাকেট, দিয়াশলাই আর কিছু খুচরো পয়সা। দিয়াশলাই আর ছুরিটা বাদে আর সব ফেলে দিল রানা। তারপর শার্টটা গায়ে চড়িয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়ল ফাঁকা মাঠে।
হিসেব মত মাইলচারেক হাঁটতে হবে লংফেলোর কেবিনে পৌঁছুতে। আধাআধি পথ পেরোবার পর একজন লোক থামিয়ে দিল ওকে। অনেক দূর থেকে দেখছে বলে ওর মুখটা দিন শেষের ম্লান আলোয় চিনতে পারল না সে। ‘ওহে! খবর কি?’
মুখের কাছে চোঙের মত করল হাত দুটো রানা। ‘ব্যাটা ফাঁকি দিয়েছে!’
‘সবাইকে লংফেলোর কেবিনে যেতে বলা হয়েছে,’ চিৎকার করে জানাল লোকটা ‘বি. পারকিনসন সবাইকে ডেকেছে।
বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ডপটা লাফ দিয়ে উঠল রানার। কি ঘটেছে লংফেলোর কপালে? হাত নাড়ল ও, চেঁচিয়ে বলল, ‘ওখানেই যাচ্ছি আমি।’
আবার এগোতে শুরু করল রানা। মুখটা একটু ফিরিয়ে রেখে তির্যকভাবে কেবিনের উদ্দেশ্যে হাঁটছে। প্রায় পঞ্চাশ গজ দূর দিয়ে পাশ কাটাল ওরা পরস্পরকে। পিছন ফিরে দেখছে রানা বারবার। লোকটা চোখের আড়াল হতেই দৌড়ুতে শুরু করল।
আবছা অন্ধকারে আলোর ঝলক দেখে থামল রানা। কি করা উচিত এখন ভাবতে চেষ্টা করল। লংফেলোর অবস্থা কি হয়েছে সেটা জানতে হবে সবচেয়ে আগে, তারপর ঠিক করতে যাবে পরবর্তী কর্তব্য। কেরিনটাকে ঘুরে পিছন দিকে চলে এল রানা। নিঃশব্দ পায়ে দ্রুত কাছে এগোচ্ছে। ক্রমশ বাড়ছে লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ। একজন লোককে দেখল রানা, হাতে একটা হ্যাজাক লাইট। সেটা উঁচু বারান্দায় রেখে কেবিনের ভিতর ফিরে গেল সে। সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছে রানা। ঝর্ণাটার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর এগোনো উচিত হবে না। কেবিনের সামনে পঁচিশ ত্রিশজন লোককে দেখতে পাচ্ছে ও এখন। ঘুরঘুর করছে সবাই উঠানে। দু‘একজন করে বাড়ছে ওরা সংখ্যায়। জঙ্গল থেকে ফিরে আসছে সবাই এক এক করে। তার মানে, সংখ্যায় ওরা পঞ্চাশ জনের কম হবে না। গম্ভীর হয়ে উঠল রানা। রীতিমত বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করছে বয়েড ওর বিরুদ্ধে।
উপুড় হয়ে অনেকক্ষণ শুয়ে রইল রানা। আঁধার বাড়ছে চারপাশে। পুরো একটা ঘণ্টা কেটে গেল। কি ঘটছে কেবিনের ভিতর অনুমান করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো ও। লংফেলো, শীলা বা হ্যামিলটনের কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই কোথাও। উঠানে দু‘একবার দেখা গেল বিগ প্যাটকে। অত্যন্ত ব্যস্ত সে। একে তাকে ডেকে ধমক মারছে। দ্রুত ফিরে যাচ্ছে কেবিনের ভিতর।
অবশেষে বয়েডকে নিয়ে বেরিয়ে এল রিগ প্যাট বারান্দায়। দুহাত উপরে তুলে সকলকে চুপ করার নির্দেশ দিল বয়েড। মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল উঠানটা।
রানার চারপাশে শুধু ঝর্ণার কুলকুল আর মাঝে মধ্যে ব্যাঙের ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
‘ভায়েরা আমার,’ ভাষণ দেবার ভঙ্গিতে জোরাল কণ্ঠে শুরু করল বয়েড। ‘এখানে আজ তোমরা কেন জমায়েত হয়েছ তা সবাই জানো। একজন বহিরাগত লোককে খুঁজে বের করতে হবে তোমাদের—লোকটার নাম মাসুদ রানা। তোমরা প্রায় সবাই তাকে দেখেছ ফোর্ট ফ্যারেলে বা তার আশপাশে তার মানে তাকে তোমরা দেখলেই চিনতে পারবে। এবং তাকে আমরা কেন খুঁজছি তাও তোমরা জানো, ঠিক কিনা?’
একটা শোরগোল জাগল বয়েডের কথার সমর্থনে। আবার শুরু করল বয়েড। ‘যারা দেরি করে এসেছ, তাদেরকে জানাবার জন্যে সংক্ষেপে বলছি কি ঘটেছে। এই মাসুদ রানা লোকটা আমার বুড়ো বাবাকে নির্মম ভাবে মারধোর করেছে। যার ফলে আমার বাবাকে নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি শুরু হয়েছে, তিনি বাঁচবেন কিনা সন্দেহ। একজন বহিরাগত লোক, ফোর্ট ফ্যারেলে পা দেবার তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আমাদের কাজে অকারণে বাধা সৃষ্টি করে কিছু নগদ লাভ হয় কিনা পরীক্ষা করে দেখা। সে আমার বাবার কাছ থেকে অসঙ্গতভাবে মোটা টাকা দাবি করে, কিন্তু আমার বাবা তার দাবি মেটাতে অস্বীকৃতি জানালে সে বুড়ো মানুষটার গায়ে হাত তোলে, যার বয়স তার নিজের বয়সের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। আমার বাবার বয়স আটাত্তর বছর। মাসুদ রানার বয়স কত হবে বলে মনে করো তোমরা?’
বারান্দার সামনে থেকে ভিড়টা এমন শোরগোল তুলল, শুনতে শুনতে ভয়ের একটা ঢেউ উঠতে শুরু করল রানার শিরদাঁড়া বেয়ে। হাত তুলে থামাল ওদের বয়েড।
‘কেন তাকে আমি খুঁজছি তা এখন তোমরা সবাই জানলে, তাকে যতক্ষণ না পাওয়া যায় পুরো বেতন পাবে তোমরা, এবং প্রথম তাকে যে দেখবে সে পাবে নগদ এক হাজার ডলার।’
উল্লাসে চিৎকার করে উঠল লোকজন। আবার হাত উঁচু করে থামতে নির্দেশ দিল বয়েড়। সবাই চুপ করতে সে বলল, ‘এছাড়া যে লোক তাকে ধরতে পারবে, সে আমার কাছ থেকে পাবে পাঁচ হাজার ডলার। নগদ।’
আনন্দে কেউ কেউ ভিড় থেকে লাফিয়ে উঠল শূন্যে। উপর দিকে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঠতে দেখল রানা। উত্তেজনায় কে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না যেন। কান ফাটানো হৈ-চৈটাকে থামাবার কোন চেষ্টা করল না এবার বয়েড। হ্যাজাক বাতির আলোয় তার মুখের বাঁকা হাসিটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে রানা। বুক টান করে দেখছে সে লোকজনের উল্লাস। অদ্ভুত একটা সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠেছে তার চোখেমুখে। আবার সে তার হাত তুলল।
ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে গেল শোরগোলটা। ‘এখন, সাময়িক ভাবে তাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমরা জানি, জঙ্গলের ভিতরই আছে সে। তার সঙ্গে খাবার নেই, এবং আমি বাজি রেখে বলতে পারি ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছে সে—হয়তো নিজের দোষে এ কি হলো ভেবে, কোনও গাছের নিচে একা দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে ও এখন। কিন্তু সাবধান, তার কাছে অস্ত্র আছে, আবার বাবাকে মেরেছে শুনে এখানে তাকে শায়েস্তা করার জন্যে আসি আমি, কিন্তু সে আমার দিকে রাইফেল তাক করে খুন করার হুমকি দেয়। সুতরাং, খুব সাবধানে এগোবে।’
বিগ প্যাট বয়েডের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু বলতে শুরু করতেই ভাষণ বন্ধ করল বয়েড। দশ সেকেণ্ড কথা শুনল সে। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘আমার ভুল হয়েছে, প্রিয় ভায়েরা। তোমাদের বিগ প্যাট আমাকে এইমাত্র জানাল, বদমাশটা যখন জঙ্গলে প্রবেশ করে তখন তার কাছে রাইফেলটা ছিল না। তারমানে তোমাদের কাজটা এবার একেবারেই পানির মত সহজ হয়ে যাচ্ছে। তোমাদেরকে কয়েকটা দলে ভাগ করে দিচ্ছি আমি, তারপরই তোমরা রওনা হয়ে যাবে। তাকে যেখানে ধরবে তোমরা সেখানেই আটকে রেখে তাড়াতাড়ি খবর পাঠাবে আমার কাছে। এই ব্যাপারটা সবাই ভাল করে বুঝে নাও—ফোর্ট ফ্যারেলে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কোরো না। এই লোক ভয়ঙ্কর ধরনের ধুরন্ধর, ফস্কে বেরিয়ে যাবার হাজারটা কৌশল জানা আছে তার। তাই পালিয়ে যাবার কোন সুযোগ তাকে আমি দিতে চাই না। ফোর্ট ফ্যারেল থেকে সে যদি একবার ছুটে যেতে পারে, কখনোই তাকে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ওইখানেই বেঁধে রাখবে তাকে, যতক্ষণ না সেখানে আমি পৌঁছাই। সাথে যদি তোমাদের দড়ি না থাকে তার পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখবে, যাতে পালাতে না পারে। খানিক উত্তম মধ্যম দিলে আমি তার জন্যে চোখের পানি ফেলতে যাব না।’
সমবেত হাসিটা নির্মম আর বীভৎস শোনাল রানার কানে।
বয়েড় বলল, ‘ঠিক আছে, এবার দলের নেতৃত্ব ভাগ করে দিচ্ছি আমি। আমি চাই চারটে ভাগে ভাগ হয়ে যাও তোমরা—বিগ প্যাট, সোভাক, এণ্ডারসন আর ম্যাকগলের নেতৃত্বে। কেবিনের ভিতর এসো তোমরা চারজন, নকশা এঁকে দেখিয়ে দিচ্ছি আমি কিভাবে কি করতে হবে তাকে খুঁজে বের করতে হলে।
কেবিনে গিয়ে ঢুকল বয়েড। তাকে অনুসরণ করল চার নেতা।
দু‘মিনিট নড়ল না রানা। কেবিনের ভিতর কি হচ্ছে জানার ইচ্ছা প্রবল, কিন্তু কোন উপায়েই তা সম্ভব নয় বুঝতে পেরে হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে এল সে তারপর উঠে দাঁড়াল কেবিনের দিকে পিছন ফিরে
নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের ভিতর প্রবেশ করল রানা। বয়েড তার গোঁয়ার, অশিক্ষিত কাঠুরেদের ভাল করেই চেনে, ভাবছে রানা, কি বললে তাদেরকে খেপিয়ে তোলা যাবে তা সে আগে থেকেই ভেবে ঠিক করে রেখেছিল। ফোর্ট ফ্যারেল বা তার আশপাশটা ওর জন্যে এখন আর নিরাপদ নয়, যেহেতু মাথার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ডলার। সারা বছরে একজন কাঠুরে নগদ রোজগার করে বড়জোর পাঁচশো ডলার। ওদের কাছে পাঁচ হাজার ডলার অনেক বেশি টাকা; বিনিময়ে একজন মানুষকে খুন করতেও পিছপা হবে না ওরা। খুনটা করার ব্যাপারে বিবেকের দংশনও পোহাতে হবে না তাদের, কারণ মিথ্যে কথাগুলো বয়েড আশ্চর্য বিশ্বাস্য ভঙ্গিতে ওদেরকে শুনিয়ে প্রমাণ করে ছেড়েছে রানা আসলেই একটা অমার্জনীয় অপরাধ করে গা ঢাকা দিয়েছে জঙ্গলে।
কাউকে ধরে কিছু ব্যাখ্যা করে শোনালেও কোন ফল হবে না, বুঝতে পারছে রানা। ওকে একবিন্দু বিশ্বাস করবে না কেউ।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে মনটা খুশি হয়ে উঠল রানার। গতরাতে যেখানে তাঁবু গেড়েছিল সেখান থেকে বিছানাপত্র কেবিনে নিয়ে যায়নি সে। ওদিকেই এগোল সে সাবধানে।
তিন মিনিট হাঁটার পর ব্যাগটা নির্দিষ্ট জায়গাতেই দেখতে পেল রানা, দু‘চারটে জিনিস যা ও ব্যাগে ভরে রেখে যায়নি, কুড়িয়ে নিয়ে যথাস্থানে রাখল এক এক করে। জঙ্গলে যদি দু‘চারদিন থাকতেই হয়, ব্যাগের জিনিসগুলো একান্ত প্রয়োজন মেটাতে কাজে লাগতে পারে৷ সবই আছে এতে, তিক্ত হেসে ভাবল রানা, খাবার আর অস্ত্র ছাড়া।
কেবিনের দিক থেকে ক্ষীণ হট্টগোলের নতুন আওয়াজ ভেসে এল। এঞ্জিন স্টার্ট নেবার শব্দ হলো ক’টা!
ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল রানা। কি করবে এখন ও? কোথায় যাবে?
ভাবতে গিয়ে এগোতে পারছে না রানা। ঢুকছে না কিছু মাথায়।
‘বুদ্ধি খাটাও!’ নিজেকে পরামর্শ দিল রানা, ‘নিরাপদ একটা জায়গার কথা ভাব।’
হাজত! ওটাই একমাত্র নিরাপদ জায়গা এখন ওর জন্যে। ভাবল রানা। অবশ্য, সম্মানীয় অতিথি হিসেবে হ্যামিলটন, যদি ওকে বরণ করতে রাজি হয় তবেই।
ঝুঁকি নিয়ে শহরের দিকে অর্থাৎ বিপদের দিকে রওনা হব? ভাবতে ভাবতে কাধ ঝাঁজিয়ে বিপদের ভয়টাকে ঝেড়ে ফেলে দিল রানা। রওনা হলো। শহরটাকে পাশ কাটিয়ে এগোনো সম্ভব নয়, আবার মাঝখান দিয়ে যাওয়াটাও উচিত হবে না। ভেবেচিন্তে একটা পথ ঠিক করল রানা, সেটা ধরেই পুলিস স্টেশনে পৌছুতে চেষ্টা করবে ও। রাস্তাটা ফোর্ট ফ্যারেলের ভিতর দিয়ে গেলেও লোকজনের যাতায়াত খুবই কম।
দিগন্তরেখায় আধখানা চাঁদ দেখে বিরূপ হলো রানা। যতটা সম্ভব ছায়ার মধ্যে থেকে গলিপথ ধরে এগোচ্ছে ও, এখনও কোন পথিক পড়েনি ওর চোখে। পুলিস স্টেশনে পৌঁছানো সম্ভব হবে বুঝতে পেরে মনে মনে একটু অবাকই লাগছে ওর। পলিস স্টেশনের দিকে এগোবার পথে বয়েড তার কোন দলকে পাঠায়নি নাকি? আশ্চর্য লাগছে। এখন, হ্যামিলটন যদি স্টেশনে থাকে, ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে। আর মাত্র একশো গজ এগোলেই পৌঁছে যাবে ও।
চোখ ঝলসানো উজ্জ্বল আলোর চোখে অন্ধকার দেখল রানা। ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ও। টর্চটা জ্বলে উঠতেই একটা চিৎকার ঢুকল ওর কানে।
‘এই লোকই!’