রবিন হুড – ১৮

আঠারো  

রবিন হুডের ক্ষমতা দিন-দিন বেড়ে চলল দেখে শেরিফ মহাশয় ভাবনায় অস্থির। একদিন তিনি লন্ডন শহরে রওনা হলেন—রাজার কাছে মুশকিলের কথা জানিয়ে আরও সৈন্য প্রার্থনা করবেন, নচেৎ দস্যুদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছেন না। রাজা রিচার্ড তখনও ক্রুসেড থেকে ফেরেননি। যুবরাজ জন শেরিফের সব কথা শুনলেন। শেরিফের প্রতি তাঁর ঘৃণা হল। বললেন, ‘এসব বাজে কথা নিয়ে আমাকে কেন জ্বালাতে এসেছ? তুমি আমার শেরিফ নও? যেরকম করে পারো, দস্যুদের জব্দ করোগে। যদি এর থেকে ভালো খবর দেওয়ার কিছু থাকে, তবে আবার এসো, তা না হলে খবরদার! তোমার মুখ যেন আমি আর দেখতে না পাই।’

বড়ই দুঃখিত হয়ে শেরিফ মহাশয় ফিরলেন! বাড়ি পৌঁছলে পর, তার চেহারা দেখেই তার কন্যা বুঝতে পারলেন যে, তিনি নিরাশ হয়ে ফিরে আসছেন। তারপর সব কথা শুনে শেরিফ-কন্যার মনে হঠাৎ একটা খেয়াল হল। বাবাকে বললেন,—’ ঠিক হয়েছে বাবা! এবারে আমি একটা ফন্দি বার করেছি। এক কাজ করা যাক, আবার একটা তিরের খেলার আয়োজন করুন। এটা হচ্ছে মেলার বছর। রাজা হেনরি যেমন অভয় দিয়ে তার টুর্নামেন্টে সকলকে ডেকেছিলেন, চলুন আমরাও সেরকম করে একটা টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করি। নিশ্চয়ই তাহলে রবিন হুড তার দল নিয়ে টুর্নামেন্টে আসবে, তারপর—’

শেরিফ উৎসাহে লাফিয়ে উঠে বললেন— তারপর দেখা যাবে, বাছাধনেরা রাতটা শহরের ভেতরেই থাকেন, কী বাইরেই যান।’

কালবিলম্ব না করে শেরিফ ঘোষণা করে দিলেন,–আগামী শরৎকালে নটিংহাম শহরে আবার মেলা বসবে। সেই মেলায় টুর্নামেন্ট হবে। যার ইচ্ছা এই টুর্নামেন্টে যোগ দিতে পারবে, শহরে আসা যাওয়া কোনওই বিঘ্ন ঘটবে না। যে ব্যক্তি তিরের খেলায় প্রথম হবে, সে-ই উত্তর দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ তিরন্দাজ এবং সে একটি সোনার তির পুরস্কার পাবে। তা ছাড়া অন্যান্য উত্তম তিরন্দাজদের জন্যও মূল্যবান পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে।’

রবিন হুড যথা সময়ে এই ঘোষণার কথা শুনতে পেলেন। তাঁর সাহসী বীর হৃদয় উৎসাহে নেচে উঠল। বললেন,–’এসো, সকলে তৈরি হও! এই টুর্নামেন্টে আমরাও যাব।’

দস্যুদলে ডন কেস্টার নামে একজন ছিল, সে রবিন হুডের কথা শুনে বলল,–’আজ্ঞে, এমন কাজ কখনও করবেন না। আমি খুব ভালো লোকের কাছ থেকে শুনেছি, এ টুর্নামেন্টের অর্থ আর কিছু নয়, শুধু আমাদের ফাঁকি দিয়ে নটিংহামে নিয়ে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা। এসব শেরিফের চালাকি।’

রবিন হুড বললেন,–’তা তো বুঝলাম ডন কেস্টার! কিন্তু তোমার কথা আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। এটা ভীরু কাপুরুষের কথা। যাই হোক না কেন, আমি শেরিফের টুর্নামেন্টে যাবই যাব।’

তখন লিটল জন উঠে বলল,–’সে তো বটেই! কিন্তু আমাদের যেতে হবে ছদ্মবেশ ধরে, যাতে কেউ চিনতে না পারে। আমার মনে হয়, লিঙ্কান গ্রিন ছেড়ে আমাদের অন্যরকমের পোশাক পরে যাওয়া উচিত। কেউ সাদা, কেউ লাল, কেউ নীল আবার কেউ-কেউ হলদে–এরকম নানা রঙের পোশাক পরে গেলে, কেউ আমাদের চিনতে পারবে না। তারপর যা হওয়ার তা হবে, তার জন্য আমরা একটুও কেয়ার করি না।‘

লিটল জনের কথা সকলেরই খুব ভালো লাগল। ম্যারিয়ান ও মিসেস ডেল ফ্রায়ার টাকের পরামর্শ নিয়ে নানা রং-এর পোশাক তৈরি করতে শুরু করলেন! মেলার দিন হাজির হলে, একশো চল্লিশ জন দস্যু সাজসজ্জা করে বের হল, সাধ্য নেই যে কেউ তাদেরকে দস্যু বলে চিনতে পারে। তারপর যখন তারা বন থেকে বেরিয়ে ক্রমশ ভিন্ন-ভিন্ন দিক দিয়ে অন্যসব গ্রাম্য দর্শকদলের মধ্যে মিশে গেল, তখন শহরের ভেতর প্রবেশ করতে তাদের কোনওই মুশকিল হল না।

শেরিফের লোকেরা প্রত্যেক দলকে ভেতরে প্রবেশ করবার সময় ভালো করে দেখে নিল, কোনও দলে দস্যুর চেহারার মতো কাউকে দেখতে পেল না।

রবিন হুড, লিটল জন, উইল স্কারলেট, উইল স্টাটলি মাচ্চ এবং এলান-আ-ডেল এই পাঁচজনকে তাঁর সঙ্গে থেকে টুর্নামেন্টে যোগ দিতে বললেন। দলের আর সকলে মেলার জনতার সঙ্গে মিশে রইল, তাদেরকে বলে দিলেন,–’একটু নজর রেখো। যেন শহরের দরজা বন্ধ না করে ফেলে।’

টুর্নামেন্টে তিরের খেলায় অনেকেই আশ্চর্য নিপুণতার পরিচয় দিল। রাজা হেনরির টুর্নামেন্টের সেই গিলবার্টও হাজির ছিল, রবিন হুড ও গিলবার্ট দুজনেই সবচেয়ে বাহাদুরি দেখালেন। এখন সোনার তির কে পাবে সে বিষয়ের মীমাংসার জন্য, এই দুইজনকে নতুন করে পরীক্ষা করা হবে।

শেরিফ হাজির তিরন্দাজদের আশ্চর্য কৌশল দেখে সুখী হলেন বটে, কিন্তু দস্যুদের কাউকে দেখতে না পেয়ে মনে-মনে দুঃখিত হলেন। কেউ-কেউ বলতে লাগল,—’ ‘রবিন হুডেরা যদি থাকত, তাহলে আর এদের সঙ্গে পারতে হত না।’ মাথা চুলকোতে-চুলকোতে শেরিফ মহাশয় বললেন,—’ ‘আমি ভেবেছিলাম, রবিন হুড বড় সাহসী, নিশ্চয়ই এই টুর্নামেন্টে আসবে, কিন্তু এখন দেখছি তার সাহসে কুলায়নি।’ এইসব কথা ডন কেস্টার চুপিচুপি রবিন হুডকে বলল।

রবিন রাগে ঠোঁট কামড়াতে লাগলেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘শেরিফ বাবাজি! ব্যস্ত হোয়ো না, রবিন হুডেরা এখানে এসেছেন কি না সেটা একটু পরেই দেখতে পাবে।’

সর্বশেষ পরীক্ষায় গিলবার্টকে রবিন হুড ভয়ানক হারিয়ে দিলেন। যেন কেউই কাউকে চেনেন না, ঠিক এরকমভাবেই আগাগোড়া রবিন হুডেরা পরস্পর কথাবার্তা বলছিলেন। কিন্তু তাহলে কী হয়, এরকম অত্যাশ্চর্য ধনুর্বিদ্যা দেখিয়ে কি তিরন্দাজ একেবারে অজ্ঞাত থাকতে পারে?

শেরিফ বুঝতে পারলেন, যে, এই ছদ্মবেশধারী বিজয়ী তিরন্দাজ আর কেউ নয়, স্বয়ং রবিন হুড! তিনি তাঁর সৈন্যদেরকে গোপনে বলে পাঠালেন,–’এই ছোট্ট দলটিকে ঘেরাও করে রেখো! রবিন হুডের লোকেরাও শেরিফের এই গোপন আদেশ জানতে পারল।

শেরিফ তখন কোনওরকম বিশৃঙ্খলা না করে, হাজির দর্শকদের সামনে রবিন হুডকে সোনার তির পুরস্কার দিলেন। তির নিয়ে রবিন হুড শেরিফকে সেলাম করে চলে যাচ্ছেন দেখে শেরিফ আর চুপ করে থাকতে পারলেন না, হঠাৎ রবিন হুডের গলা টিপে ধরে সৈন্যদেরকে হুকুম করলেন,—’পাকড়াও এই বিশ্বাসঘাতক দস্যুকে।’

যেই রবিন হুডের গায়ে হাত দেওয়া, অমনিই প্রচণ্ড এক চাপড় এসে শেরিফের মাথায় পড়ল। তিনি চিৎপাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। এ লিটল জনেরই কাজ, তাকে চিনিতে পেরে শেরিফ বললেন, ‘আরে হতভাগা গ্রিনলিফ! এইবার তোকে বাগে পেয়েছি।’ তখন লাফিয়ে উঠে যেই তার দিকে এগোলেন, অমনি তার ভূতপূর্ব ভৃত্য মাচ্চের চাপড় খেয়ে আবার মাটিতে পড়ে গেলেন।

দেখতে-দেখতে একটা হাতাহাতি যুদ্ধ বেধে গেল। জনতার মধ্যে কে দস্যু কে দর্শক চিনে নেওয়া বড়ই কঠিন, শেরিফের লোকেরা দেখল মহা মুশকিল। এদিকে পিছনের দস্যুরাও এসে শেরিফের সৈন্যদলকে আক্রমণ করল। চড়, চাপড়, মুষ্টাঘাত শিলাবৃষ্টির মতো চারদিক থেকে বর্ষণ হতে লাগল। এই গণ্ডগোলের মধ্যে শিঙা বাজিয়ে রবিন হুড দলের লোকদেরকে পিছনে হটে যেতে সংকেত করলেন। কাছের দুইটি দরজার প্রহরী, দরজা বন্ধ করতে গিয়ে তির খেয়ে মরে গেল। দরজা খোলা দস্যুদল তখন শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে শহরের বাইরে এল। তির খেয়ে প্রাণ হারাবার ভয়ে, শেরিফের সৈন্যদল কাছে আসতে সাহস পাচ্ছিল না।

কিছুদিন আগে শেরিফের সৈন্যরা অপদস্থ হয়েছে, আবার হটে গেলে চলবে না, কাজেই মরিয়া হয়ে তারা দস্যুদলের পিছু নিল। এই সময়ে হঠাৎ একটি তির এসে জনের হাঁটুতে বিদ্ধ হওয়ায়, সে যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। রবিন হুড অমানুষিক শক্তিতে তাকে পিঠের ওপর তুলে নিয়ে, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে প্রায় এক মাইল পথ চলে এলেন, এবং ক্রমেই সে দুর্বল হয়ে পড়ছে দেখে, তিনি তাকে মাটিতে নামালেন; জনের ওঠার শক্তি নেই।

মৃদুস্বরে জন রবিন হুডকে বলল,—’মাস্টার রবিন! সেই ঝরনার পোলের ওপর যেদিন প্রথম আপনার সঙ্গে দেখা হয়, তখন থেকে এতদিন মনপ্রাণ দিয়ে আপনার সেবা করিনি?’

‘নিশ্চয়ই করেছ জন। তোমার চেয়ে বিশ্বাসী সহচর কারও আছে কি না সন্দেহ।

তাহলে প্রভু আপনাকে একটি কাজ করতে হবে। এই বিশ্বাসী সেবকের কথা শুনে, আপনার তলোয়ার দিয়ে এখনই আমার মাথাটা কেটে ফেলুন; শেরিফের লোক যেন আমাকে জ্যান্ত না ধরতে পায়।’

‘কিচ্ছু চিন্তা নেই জন! তুমি যা বলছ তার কোনওটাই হবে না।’

‘ঈশ্বর না করুন।’ এই কথা বলতে-বলতে হঠাৎ আর্থার-এ ব্লান্ড সেখানে এসে হাজির! আর ভাবনা কী? তার শরীরে অসুরের বল, লিটল জনকে পিঠে করে একেবারে সারউড বনের আশ্রয়ে এনে হাজির করল। এখন নিশ্চিন্ত, শেরিফের সৈন্যদল সারউডে আসতে কখনও ভরসা পাবে না। তখন ডালপালার সাহায্যে খাটিয়া প্রস্তুত করে, লিটল জন এবং অপর চারজন আহত দস্যুকে বহন করে, ফ্রায়ার টাকের বাড়িতে আনা হল। টাক ওষুধপত্র জানতেন ভালো, তখনই আহত ব্যক্তিদের শুশ্রূষায় লেগে গেলেন।

সেই দিন সন্ধ্যার সময় গণনা করে দেখা গেল যে দস্যুদের সকলেই নিরাপদে ফিরে এসেছে, কেবল উইল স্টাটলিই অনুপস্থিত। আর ম্যারিয়ানকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। রবিন হুডের মনে বড়ই ভাবনা হল। তিনি জানতেন যে, ম্যারিয়ানও মেলায় গেছেন কিন্তু তাঁর যে কোনও বিপদ হতে পারে, সেটা তাঁর ধারণাই হয়নি। এখন ম্যারিয়ানকে অনুপস্থিত দেখে তাঁর মনে ভয় হল যে, নিশ্চয়ই কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং সেই দুর্ঘটনায় উইল স্টাটলিও জড়িত। উইলকে ধরতে পারলে শেরিফ যে তৎক্ষণাৎ তাকে ফাঁসি দেবেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

দলের সকলেরই খুব চিন্তা হল। উইল স্টাটলি ধরা পড়ে থাকলে, যেভাবেই হোক তাকে উদ্ধার করতে হবে—সকলেরই মনে এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা হল।

শেরিফের বাড়িতে সেদিন সন্ধ্যার পর শেরিফ এবং তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে খেতে বসেছেন। শেরিফ খুব অহংকার করে বলতে লাগলেন,–দস্যুব্যাটাকে এবার ফাঁসি দেবই দেব! দেখি কে রুখতে পারে। তখন দেখা যাবে, এ জেলার কর্তা কে। কিন্তু সোনার তিরটি ব্যাটাদের পুরস্কার দিয়ে এখন আমার বড় দুঃখ হচ্ছে। এই কথা বলার সঙ্গে–সঙ্গে জানলার ভেতর দিয়ে, ঠিক তাঁর প্লেটের ওপরে একটা কী এসে ঠং করে পড়ল। শেরিফ ভয়ে লাফিয়ে উঠলেন। তখন দেখা গেল

যে, জিনিসটি একটি সোনার তির এবং তার সঙ্গে ছোট একটি চিঠি বাঁধা।

চিঠিতে লেখা—’মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে পুরস্কার নিতে যে ঘৃণা বোধ করে, তারই এই চিঠি। এখন সে আর তোমাকে খাতির করবে না। শেরিফ! তুমি সাবধান হও।—র. হু।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *