১.১৩ যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (৩)

সমকাম

১.১৩ যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (৩)

সমকাম (Homosexuality)

সংজ্ঞা— নারী নারীর এবং পুরুষ পুরুষের দেহ দ্বারা নিজ কামের তৃপ্তি সাধন করিলে উহাকে সমকাম বলে। আমাদের দেশে সাধারণত পুরুষ পুরুষে উপগত হওয়াকে পুংমৈথুন বলা হইয়া থাকে। কিন্তু পুংমৈথুন কথাটি পরিষ্কার অর্থজ্ঞাপক নহে। পুরুষে পুরুষে মৈথুন এই অর্থে পুংমৈথুন বলিলে ভাষাকে নিরর্থক সংকীর্ণ করা হয়। পুংমৈথুনের বিপরীতার্থক শব্দ যদি স্ত্রীমৈথুন হয়, তবে মৈথুনের কর্তা কেবল পুরুষই হয়। কিন্তু তাহা সত্য নহে। স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকেও মৈথুন হইতে পারে ও হইয়া থাকে। কাজেই আমরা সমলিঙ্গ মানবের পরস্পরের দেহ উপভোগকে ‘সমকাম’ বলিব।

প্রকারভেদ— পুংমৈথুন বলিতে সাধারণতঃ যাহা বুঝায়, তাহা ব্যতীত নানা স্থানে পারস্পরিক চুম্বন ও হাত বুলান, আলিঙ্গন, সাথীর হস্তমৈথুন, উরুমৈথুন, মুখমৈথুন প্রভৃতি বহু উপায়ে পুরুষে পুরুষে উপগত হইয়া থাকে। স্ত্রীলোকে স্ত্রীলোকে ঐরকম ভাবে এবং পরস্পরের স্তন ও যোনিদেশে হস্তস্পর্শ, যোনিদেশ ঘর্ষণ, লেহন, একজনের ভগাঙ্কুর অপরের যোনি-মধ্যে স্থাপন ইত্যাদি করিয়া মৈথুন হইয়া থাকে। বস্তুত সমকামের বিশেষত্ব পাত্রে, ক্রিয়ায় নহে। স্বামী তাহার স্ত্রীর গুহ্যদ্বার ব্যবহার করিলেও, উহাকে সমকাম বলা যায় না।

কারণ— এই সমস্ত ক্রিয়া স্বাভাবিক, সহজাত, ব্যাধি কিংবা বিপরীত শ্রেণীর অভাববশত সাময়িক উচ্ছাস-এ বিষয়ে শরীরবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও যৌনবিজ্ঞানের পণ্ডিতগণের মধ্যে দৃঢ় ও সুস্পষ্ট মতভেদ আছে। হ্যাভলক এলিস, হ্যামিলটন ও জকাবম্যানের মত উদ্ধুত করিয়া বিভিন্ন জন্তুর প্রকৃতির ইতিহাস উদঘাটন করিয়া প্রমাণ করিবার চেষ্টা করিয়াছেন যে, সভ্য-মানুষের বিবেচনায় সমমৈথুন দোষণীয় হইতে পারে, কিন্তু ইহা স্বাভাবিক এবং প্রাণি জগতের বিভিন্ন স্তরে আবহমানকাল হইতে বিদ্যমান।

ইতর প্রাণীদের মধ্যে সমমৈথুনের বিস্তর উদাহরণ পাওয়া যায়। পুরুষকবুতরের অভাবে দুইটি মেয়ে-কবুতর একে অন্যে উপগত হয়, অ্যারিষ্টটল ইহা লক্ষ্য করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। বাফন (Buffon) লক্ষ্য করেন যে, একই লিঙ্গের পাখী-মুরগী, ঘুঘু, কবুতর ইত্যাদি একসঙ্গে আবদ্ধ করিয়া রাখিলে কিছুকাল পরেই উহারা পরস্পরে উপগত হয়। পুরুষ পাখী মেয়েপাখী অপেক্ষা অনেক তাড়াতাড়ি এইরূপ করে। ষাড়ে ষাড়ে, গাভীতে গাভীতে, কুকুরে কুকুরে, ইঁদুরে ইঁদুরে (বিষমলিঙ্গের অভাবে) অহরহ সমমৈথুন হইয়া থাকে। ফ্রাঙ্কফোর্ট চিড়িয়াখানার অধ্যক্ষ ডঃ সীটজ (Seitz) ইতর প্রাণীর মধ্যে সমমৈথুনের বহু দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। এইসব ক্ষেত্রে সাধারণতঃ প্রকৃত কামপাত্রের বা পাত্রীর অভাবে উহার সমতুল্য বা কাছাকাছি কিছু দিয়া উত্তেজনার নিবৃত্তি করা হয় মাত্র। বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী পাইলে আর এই সব কার্যকলাপের দরকার হয় না। মানুষের সম্বন্ধেও সাধারণতঃ এই কথা খাটে, তবে খুব কম দুই-এক ক্ষেত্রে এমনও দেখা গিয়াছে যে, এইরূপ আকর্ষণ, ভিন্ন লিঙ্গ প্রাণী সহজ প্রাপ্য হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান থাকে।

প্রসার—ইহা ছাড়া মানুষের মধ্যে সমকাম বিষয়ে ইতিহাসে বহু নজীর আছে। সিরিয়া এবং মিশরের অধিবাসীদের মধ্যে সমমৈথুনের এত বাহুল্য ছিল যে, তাহাদের পূজনীয় দেবতাদেরও ইহাই ছিল শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ। হোরাস ও সেট নামক দুইজন সমমৈথুনক দেবতা মিশরীয়গণের দ্বারা পূজিত হইত। কার্থেজের অধিবাসীদের মধ্যে বীরত্বের লক্ষণ বলিয়া প্রশংসিত হইত। ডরিয়ান, সিদিয়ান ও রোমানদের মধ্যে ইহা বিশেষ কৃতিত্বের নিদর্শন ছিল। গ্রীক জাতির চরম উন্নতির সময়ে ইহাকে যে তাহারা কেবল বীর ও দেবতার গুণ বলিয়াই গণ্য করিত তাহা নহে, ইহা কৃষ্টি, কলা ও সৌন্দর্যজ্ঞানের পরিচায়ক ছিল। সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিষ্টটল প্রভৃতি মনীষিগণের সকলেই সমকামী ছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। মধ্যযুগীয় ইউরোপে এই অভ্যাসের বহুল প্রচলন তো ছিলই, রেনেসাঁর (Renaissance) পরে ইউরোপে ইহার প্রচলন যে বৃদ্ধি পাইয়াছিল, ইউরোপের সাহিত্যই তাহার সাক্ষী। দান্তের পুস্তক পড়িয়া জানা যায় যে, তাহার শিক্ষক ল্যাটিনের মত পণ্ডিত ব্যক্তিরও এই অভ্যাস ছিল। শেক্সপিয়ার, মারে (Maret), মিকেল আঞ্জেলো (Michael Angelo), মার্লো (Marlowe), বেকন (Bacon), অস্কার ওয়াইল্ড (Oscar Wilde) প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিতগণের এই অভ্যাস ছিল বলিয়া জানা যায়।

আরব পারস্য ও আফগানিস্থানে এই অভ্যাসের এত প্রচলন ছিল যে, ইসলামের আবির্ভাবের পর কঠোর হস্তে উহা দমনের চেষ্টা হইতে দেখা গিয়াছে।

ইহা ত গেল ঐতিহাসিক যুগের কথা। বর্তমান সভ্যতার যুগেও পৃথিবীর সর্বত্র এই অভ্যাস বিদ্যমান দেখিতে পাওয়া যায়। সভ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই অভ্যাসের কিছুমাত্র হ্রাস পাইয়াছে বলিয়া মনে হয় না। বরং ইহাই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে ইহা অধিকতর প্রসার লাভ করিয়াছে। ইংলণ্ড, আমেরিকা, ভারতবর্ষ, প্রভৃতি দেশের আইন ইহার বিরুদ্ধে অতীব কঠোর; তথাপি ইহা এই সমস্ত দেশ হইতে দূর হয় নাই।*

[*কতক ব্যক্তি রতিজ রোগের ভয়ে সমমৈথুনে সাময়িক উত্তেজনার নিবৃত্তি করে, কেহ কেহ স্বাভাবিক সঙ্গমের সুবিধা না থাকায় উহা করে। কতক ঐ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, কোনও ক্ষেত্রে তাহাতে তৃপ্ত হয় না বলিয়া, অথবা সঙ্গদোষে কিংবা শুধু বৈচিত্রের অভিলাষে সমমৈথুনে প্রবৃক্ত হয়।]

ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম প্রভৃতি ধর্মে সমমৈথুনকে ঘৃণার চক্ষে দেখা হয়। বাইবেলে ও কোরানে সডম ও গমোরা (Sodom and Gomorah) নামক দুইটি শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার উল্লেখ আছে। ইহাদের অধিবাসীদের এই অভ্যাস নাকি এত বদ্ধমূল ছিল যে, পুরুষেরা নারী উপেক্ষা করিয়া পুরুষের পশ্চাতে ধাবিত হইত। জেহোভা (খোদা) নাকি ক্রুদ্ধ হইয়া এই দুইটি শহর ধংস করে।

আগ্নেয়গিরির উৎপাতে প্রাকৃতিক ভাবেই উহারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল কিন্তু অধিবাসীদের এই প্রবৃত্তির শাস্তিস্বরূপ মানুষ উহার এরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছে। বিহারের ভূমিকম্পে বহু নরনারী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মহাত্মা গান্ধী উহাকে ভগবানের আক্রোশমূলক ব্যবস্থা বলিয়া প্রকাশ করেন। এ রকম উক্তি কুসংস্কারমূলক ও ভগবানের (খোদার) পক্ষে মানহানিজনক।

যাহা হউক, ঐ Sodom নগরীর কথাটা হইতেই Sodomy (পুংমৈথুন) শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে।

সুতরাং সমকাম যে যৌনবৃত্তির একটা নিতান্ত আকস্মিক অঘটন নহে, পরন্তু বহু প্রচলিত একটি সাধারণ অভ্যাস, এ কথা স্বীকার করিতে হইবে। ইহার বহুল প্রচার দেখিয়া বহু বিজ্ঞানী, বিশেষত উলরীকস (Ulrichs) ও হার্সফেল্ড (Hirschfeld) প্রভৃতি জার্মান ডাক্তারগণ ইহাকে অন্যান্য যৌনক্রিয়ার ন্যায় স্বাভাবিক ক্রিয়া বলিয়াছেন। তাঁহাদের মতে সমমৈথুনবৃত্তি মানুষের ব্যাধি নহে, উহা কামনার একটা স্বাভাবিক দিকমাত্র। কিন্তু সুইজারল্যাণ্ডের যৌনবিজ্ঞানবিদ ডাঃ ফোরেল, ইংলণ্ডের ভাঃ মার্শাল, জার্মানীর ডাঃ ক্রাফট এবিং এই অভ্যাসকে দস্তুরমত ব্যাধি আখ্যা দিয়াছেন এবং সমমৈথুনকদিগকে চিকিৎসিত হইতে উপদেশ দিয়াছেন।

এই দুই বিরুদ্ধমতাবলম্বীর মধ্যে একদল মধ্যপন্থী আছেন। এলিস এই দলের মধ্যে প্রধান। তিনি বলেন যে, সমমৈথুনবৃত্তি স্বাভাবিক বৃত্তিও নহে, উহাকে একটা ব্যাধিও বলা যাইতে পারে না। উহা মানুষের একটা বহু-প্রচলিত মানসিক বিশৃঙ্খলা বা ছিট মাত্র।

কিন্তু আমাদের মনে হয়, সমকামীদের প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত করিলে অনায়াসেই এই বিতর্কের অনেকখানি অবসান হইয়া যাইবে। এক শ্রেণীর প্রবৃত্তি নিতান্তই সাময়িক। ইহারা যতদিন বিপরীতলিঙ্গের সংসর্গের সুযোগ না পায়, ততদিনই ইহাতে লিপ্ত থাকে; উহা পাইলেই ইহারা ক্রমে ক্রমে ইহা ত্যাগ করে। এই শ্রেণী সাধারণতঃ বালক, বালিকা, কিশোর, কিশোরী, জেলের কয়েদী, মঠের সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনী, নাবিক ইতাদি দ্বারাই গঠিত।

স্কুল-কলেজের হোষ্টেলের বালক-বালিকার একদিকে যেমন বিষমলিজের লোকের সহিত অধিক মিশিবার সুযোগ পায় না, পক্ষান্তরে তেমনি সমশ্রেণীর সহিত অবাধে ক্ৰীড়াকৌতুক, স্নান ও শয়ন-উপবেশন করিবার সুবিধা পায়। একই প্রকোষ্ঠে শিক্ষক বা অন্য কোনও গুরুজনের দৃষ্টির আড়ালে পাশাপাশি শয্যায় ইহারা রাত্রি যাপন করে বলিয়া ইহাদের মধ্যে এই অভ্যাস প্রসার লাভ করিয়া থাকে।

বিদ্যালয়ের বালক-বালিকাগণের মধ্যে ইহার প্রসার এত বেশী যে, আমেরিকার ডাঃ পেক বোষ্টনের কলেজের শতকরা ২৫ জনকে ইহাতে লিপ্ত দেখিয়াছেন। ডাঃ হামিণ্টন শতকরা ৪৫ জন নারী ও ৩৬ জন পুরুষকে ইহাতে নিযুক্ত দেখিয়াছেন। ক্যাথারিন ডেভিস শতকরা প্রায় ৩২ জন নারীকে এই অভ্যাসের দাসত্ব করিতে দেখিয়াছেন।* কিন্তু তিনি ইহাও বলিয়াছেন যে, শতকরা ৪৮ জন সমকামী নারী যৌবনে এই অভ্যাস ত্যাগ করিয়াছেন।

[*নারীদের মধ্যে সমমৈথুনের প্রসার সম্বন্ধে অনেকেরই সন্দেহ হইতে পারে। এ সম্বন্ধে অধিকাংশ লোকই অজ্ঞ বলিয়া উহাদের একত্র থাকাটা আমাদের ততটা সন্দেহ উদ্রেক করে না। দুইটি মেয়ে একত্র হইলে কাহারও আপত্তি বা সন্দেহ হয় না। দুইটি মেয়ে একঘরে দুয়ার বন্ধ করিয়া স্নান, গল্প-তামাশা করিলেও ততটা সন্দেহ হয় না।]

ডঃ কিন্‌যে ও তাঁহার সহকর্মীদের অনুসন্ধানে

ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানেও সমকাম সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা গিয়াছে। ইহারা সমকাম অর্থে নর নরে ও নারী নারীতে উপগত হইয়া কাম-চরিতার্থ করা বুঝেন—সে যে ভাবেই বা যে প্রক্রিয়াতেই হউক না কেন। সমকামী বলিয়া কোনও ব্যক্তিকে বুঝানো উচিত নয়, কারণ একই ব্যক্তি সময় ও সুযোগ মত সমকামে লিপ্ত হইতে পারে আবার বিপরীত লিঙ্গের সংস্পর্শে তাহার স্বাভাবিক যৌন-ব্যবহার পরিলক্ষিত হইতে পারে।

নানাভাবে ভুল বুঝিবার দরুন পূর্ববর্তী বহু পণ্ডিতের গবেষণায় যে কতটা ভুল রহিয়া গিয়াছে ডঃ কিন্‌যে তাহার উল্লেখ করিয়াছেন। এরূপ সম্পর্ক স্বীকার করার সংকোচের দরুনও তথ্যানুসন্ধানে বিঘ্ন উপস্থিত হয় বলিয়া ইহারা প্রকাশ করিয়াছেন। বিশেষ করিয়া, সৈন্য ও নাবিকদের এরূপ স্বভাব, অভ্যাস বা প্রবণতাকে কর্তৃপক্ষেরা বিষম রোষের সহিত দেখেন বলিয়া তথ্যানুসন্ধানে খুবই অসুবিধা হয়।

একই লিঙ্গের দুই ব্যক্তির মধ্যে আলাপে, আদবে কামভাব জাগ্রত ও আংশিক তৃপ্ত হইলেও ইহারা চরমতৃপ্তি না হইলে আর উহাকে ধর্তব্য মনে করেন নাই, তাই ইহারা যে সংখ্যানুপাত দিয়াছেন প্রকৃতপক্ষে সমকামের প্রসার আরও বেশী ধরিয়া লওয়া যায়।

তাহাদের হিসাবে (অর্থাৎ চরমতৃপ্তি পর্যন্ত ধরিলে), শতকরা কমপক্ষে ৩৭ জন পুরুষ কৈশোর হইতে বার্ধক্য পর্যন্ত সময়ে সময়ে সমকামে লিপ্ত হইয়াছেন। অর্থাৎ আমেরিকায় প্রতি ৩ জনের একজন সমকাম চরিতার্থ করিয়াছে। ৩৫ বৎসর পর্যন্ত অবিবাহিত পুরুষদের মধ্যে এই অনুপাত প্রায় শতকরা পঞ্চাশে উঠিবে। কাহারও এক বা একাধিক অভিজ্ঞতা হইতে কাহারও বহুকাল পর্যন্ত নিয়মিত অভিজ্ঞতা থাকে।

এই সংখ্যানুপাতে ডঃ কিন্‌যেরা বাস্তবিকই স্তম্ভিত হইয়াছিলেন। তাহারা এমন যে হইবে তাহা বিশ্বাসই করেন নাই। তাই তাঁহারা নানা ভাবে, নানা জায়গায়, নানা পরিবেশে এই সংখ্যানুপাত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করিয়াছেন। তাহাতেও ফল প্রায় একইরূপ দাঁড়াইয়াছে।

আমাদের মতেও ইহাতে বিস্মিত হইবার কিছুই নাই। নীতিৰাগিশেরা চোখ বুজিয়া থাকিতে পারেন, কিন্তু নর ও নারীর যৌন-ব্যবহার যে এক অদম্য সহজাত বৃত্তির তাড়নার ফল ইহা ভুলিয়া যান। ডঃ কিন্‌যেরা মন্তব্য করেন যে, এই সংখ্যানুপাত যে পূর্ব পুর্ব যুগের চেয়ে বেশ বা কম ব্যাপক তাহা মনে করিবার কোনই হেতু নাই। অবশ্য সময়, সুযোগ, পাত্র ইত্যাদির অভাবে সমকামচরিতার্থতার পৌনঃপুনিকতা খুব বেশী নয়। সমাজের ভ্রূকুটি, ঘৃণা ইত্যাদি ও উহার গোপন সম্ভাব্যতা পোষণ করে।*

[*ডাঃ ক্লিফফোর্ড এ্যালেন, লন্ডন, বলেন : “Fron the work of Davis, and now from Kiusey’s confirmation, it is possible that as much as a third of the population of America have broken the law by the time adult age is reached and could be imprisoned. It is unlikely that things are any different in England–no matter how much we might wish them to be.”]

ডঃ কিনযেরা সমকামী ও বিপরীতকামী নর ও নারীর অনুপাত শীর্ষক এক সুদীর্ঘ আলোচনা করিয়াছেন। তাহারা বলেন যে, সমকামী ও বিপরীতকামী এই দুই শ্রেণীর লোক আছে বলিয়া সাধারণ লোকও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক ভুল ধারণা চলিয়া আসিয়াছে। এই ধারণায় ব্যক্তিমাত্ৰই হয় এক না হয় অপর শ্রেণীর এবং উহার জন্মের পরে আর পরিবর্তন সম্ভবপর নহে।

এইরূপ অমূলক ভাগাভাগির জের-হিসাবে বহু কথা বলা হইয়া থাকে। সমকামীদের চেহারা, আচরণ ও ভাবভঙ্গি দেখিয়া নাকি বলা যায় ইহারা ঐ শ্রেণীর। সমকামী পুরুষ নাকি সুগঠিত হয় না, আচরণে নাকি ইহার কোমল-পন্থী, ইহাদের গতি ও কর্মপ্রবণতা নাকি নিস্তেজ, খেলাধুলায় নাকি ইহাদের আসক্তি হয় না ইত্যাদি, ইত্যাদি। সমকামী নারীদের সম্পর্কেও বহু বাজে কথা বলা হয়। ডঃ কিনযেরা এ সম্বন্ধে মূল্যবান মন্তব্য করিয়াছেন, “পুরুষ-জাতি-সমকামী ও বিপরীতকামী বলিয়া কোনও দুইটি শ্রেণীবিশেষে বিভক্ত নয়। দুনিয়াকে সাদা ও কালোয় বিভাগ করার কোনও সার্থকতা নাই। প্রকৃতি সীমাবদ্ধ শ্রেণীবিভাগে অভ্যস্ত নয়, মানুষ এই সকল আবিষ্কার করে ও প্রকৃতির উপর চাপায় মাত্র।”

অনেক সময়ে মাত্র একবার চেষ্টায়ই ধরা পড়িয়া বা জানাজানি হইয়া গেলে নর ও নারীকে সমকামী আখ্যা দেওয়া হয় এবং কঠোর শাস্তি পর্যন্ত দেওয়া যাইতে পারে।

সারা দুনিয়ার লোককে দুই শ্রেণীতে ভাগাভাগির করার চেষ্টা বৃথা। তবে মোটামুটি পরবর্তী-চিত্রে প্রদর্শিত হারাহাবি আমেরিকার বেলায় খাটে। অপর অপর দেশেও অনেকটা এই রকমই হইবে। সামাজিক, ধর্মীয়, শিক্ষাগত সংস্কারগত ইত্যাদি কারণ তারতম্যে উনিশ-বিশ হইতে পারে মাত্র।

সমকামী নর ও নারীর শারীরিক কোনও বৈচিত্র্য আছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। মানসিক ছিট বা বৈকল্যের কথাও প্রকাশ পায় নাই। তবে কতক কতক সমকামী নর ও নারী এমন ছিটগ্রস্ত দেখা যায় যে, তাহারা গোলযোগের সৃষ্টি করিয়া ধরা পড়ে। সে কথা মানিয়া লইয়া একথাও বলা যায় যে, ছিটগ্রস্ত বিপরীতকামীও তো দেখা যায়। আমাদের সমাজের অনুশাসন বা ফ্যাশান কাপড়-চোপড়, পোষাক-পরিচ্ছদ, আহার-বিহার, ইত্যাদি অনেক কিছুতেই আছে কিন্তু আবার ব্যক্তিবিশেষে রুচিভেদেও একেবারে কম নয়।

গোল্ডস্মিভ (Goldschmidt) অনেক অনুসন্ধান করিয়া ভুল বুঝিবার ফলে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়াছিলেন যে, সমকামীদের বোধ হয় বংশগত কোনও দোষ আছে। এ কথার কোনও সমর্থন পাওয়া যাইতেছে না।

ডঃ কিন্‌যেদের অভিমতে একেবারে সমকামী বা বিপবীতকামী অল্পসংখ্যক লোক (নর ও নারী) থাকিলেও থাকিতে পারে—বেশীর ভাগই এদিক ওদিক দুই দিকেই ঝুঁকিয়া পড়ে ও পড়িতে পারে। এই সংখ্যানুপাত তাহারা বুঝাইয়াছেন নিম্নের চিত্রে।

বিপরীতকামী এবং সমকামী ব্যক্তিদের অনুপাত

০—একেবারে বিপরীতকামী।

১—বেশীর ভাগেই বিপরীতকামী, অল্পমাত্রায় সমকামী।

২—বেশীর ভাগেই বিপরীতকামী, তবে মাঝে মাঝে সমকামী।

৩—সমানভাবে বিপরীত ও সমকামী।

৪—বেশীর ভাগেই সমকামী, মাঝে মাঝে বিপবীতকামী।

৫—বেশীর ভাগেই সমকামী, অল্পমাত্রায় বিপরীতকামী।

৬—একেবারে সমকামী।

ডঃ কিন্‌যেদের নর ও নারীর সমকামের তুলনামূলক তথ্যাদি হইতে নিম্নলিখিত তথ্য লক্ষ্য করিবার যোগ্যঃ

সমকামাত্মক আকর্ষণ ও আচরণ

শারীরিক ও মানসিক ভিত্তিতে———–—–নারীতে——-নরে

যথোচিত উত্তেজনায় সাড়া দিবার ক্ষমতা ——আছে ——আছে
মানসিক কারণ পরম্পরায় সমলিঙ্গের সম্বন্ধে
কামানুভূতির বিকাশ————————-আছে——-আছে
মানবেতব জন্তুতে সমকামের ব্যাপক প্রকোপ—-আছে——আছে

আদিম মানবসমাজে

সমকাম সম্পর্কীয় তথ্যাদি————-খুব কম———কিছু
বিপরীতকাম সকল সমাজে বেশী গ্রাহ্য—–হাঁ————হাঁ
সমকামে কদাচিৎ অনুমতি দেওয়া হইত—-হা————হাঁ
সমকাম সম্পর্কে সমাজের উৎকণ্ঠা——–কম———-বেশী

প্রকোপ ও প্রসার

সমকামানুভূতি, (৪৫ বৎসর পর্যন্ত)——–২৮%——৫০%
সমকামবিহার, চরমপুলক লাভ পর্যন্ত——১৩%——৩৭%

দাম্পত্য অবস্থা

অবিবাহিত—————-২৬%——–৫০%বিবাহিত——————-৩%——–১০%
পূর্বে বিবাহিত————–১০%——-

সমকামের কলাকৌশল

বিপরীত শ্রেণীর সহিত প্রেমক্রীড়ারই মত—-হাঁ—-হাঁ
চুম্বন ও সাধারণভাবে শারীরিক সংস্পর্শ—-প্রচুর—অল্প
যৌনাঙ্গে উত্তেজনা প্রদান—-কিছুদিন পরে বা কখনও না—প্রারম্ভেই ও বরাবর

       বালকবালিকার সমকামের ধরণ — বাল্যকালে বা যৌবনের প্রারম্ভে সমকামের অভ্যাস দেখিয়াই মানুষকে ব্যাধিগ্রস্ত, যৌন-বিকল্পী বা দুরাত্মা আখ্যা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত হইবে না। সত্য বটে, ছাত্রজীবনে এই প্রবৃত্তিতে স্বাভাবিক বৃত্তির (বিপরীত কামের) সমস্ত বৈশিষ্ট্য এরূপভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়া থাকে যে, তাহাকে উৎকট বিকল্প আখ্যা দেওয়া যায়। এক বালক বালিকা অপর বালক/বালিকার প্রতি আকৃষ্ট হইয়া এমন সব বিচিত্র ব্যবহার করে বা ভাবপ্রবণতা দেখায় যে তাহাকে দস্তুরমত রোমান্টিক ভালবাসা বলা যাইতে পারে। ইহারা দেবতা সাক্ষী করিয়া পরস্পরকে ভালবাসে, ইহাদের একজনের অভাবে অন্যজন অত্যধিক বেদনা বোধ করে। গ্রীষ্ম বা পূজার দীর্ঘ বিদায়ের দিনের বিদায় যে-কোন নাটকীয় দৃশ্যকে পরাভূত করিতে পারে। এই বিচ্ছেদের যাতনার লাঘব করে ইহারা পরস্পরের নিকট দীর্ঘ পত্র লিখিয়া। প্রণয়ে বাধাপ্রাপ্ত হইলে অনেক সময়ে অভিমান, কান্নাকাটি, রাগ, ঈর্ষা, বিবাদ ও রক্তপাত পর্যন্ত হইতে দেখা যায়।

কিন্তু এ সমস্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাময়িক। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, বিবাহ হইয়া গেলে এই সমস্ত তরল চাঞ্চল্য আপনা আপনি বিদুরিত হয়, কাহারও উপদেশ বা পরামর্শের অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং এই সাময়িক বালসুলভ চপলতাকে একটা স্থায়ী মনোবৃত্তি কল্পনা করিয়া ইহাদিগকে যৌনবিকল্পী বলিয়া সিদ্ধান্ত করিবার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে বলিয়া মনে করি না। শৈশবের সাময়িক প্রণয়লীলা অনেক ক্ষেত্রেই বালক-বালিকার বিশেষ কোনও ক্ষতি করিতে পারে না। কারণ, যথাসময়ে ইহা বিনা চেষ্টায় দূর হইয়া যায়। স্নেহমমতা ও সহানুভূতির দ্বারা এবং বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গলাভের সুযোগ দিয়া বালক-বালিকাদের এই দোষ দূর করা সহজ, শাসনের দ্বারা তত নহে।

পাত্র-পাত্রীর অভাব সমকামের কারণসমূহঃ

কতক বয়স্কদের ও সমমৈথুনকদের এই সাময়িক পর্যায়ে ফেলা যায়। যেখানে বিপরীত লিঙ্গের পাত্রপাত্রীর একেবারে অভাব, অথচ বহুদিন ধরিয়া নর বা নারীকে অবস্থান করিতে হয়, সেখানেই সাধারণতঃ সমমৈথুনের বহুল প্রসার পরিলক্ষিত হয়। সৈনিকদের মধ্যে ইহার প্রসারের কারণ তাহাদের মধ্যে স্ত্রীজাতির অভাব। জাহাজের নাবিক, খালাসী, জেলখানার কয়েদী এবং হোস্টেল, কনভেন্ট বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে একই লিঙ্গের লোকের দীর্ঘকাল একত্রে অবস্থান এবং ভিন্ন-লিঙ্গের লোকের অভাবের দরুন এইরূপ সাময়িক সমমৈথুনের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।

নর ও নারীদের এই অভ্যাসের সূচনা হয় পারস্পরিক আলাপ, সম্ভাষণ বা একত্র অবস্থানে। অনুরূপ অবস্থার পরিবর্তনে আবার ঐরূপ অভ্যাস পরিত্যক্ত হয়। তবে কতক ক্ষেত্রে এই সকল অভ্যাস থাকিয়াও যায়।

বয়স্কদের স্থায়ী অভ্যাস

অল্প কতক ক্ষেত্রে এই অভ্যাস বা প্রবৃত্তি বয়সকালেও অটুট থাকে। যৌবনপ্রাপ্ত হইয়াও কেহ কেহ বিষমলিঙ্গের সহবাসে আসক্ত হয় না। বরং বাল্যের দৃঢ়মূল অভ্যাস অনুযায়ী সমলিঙ্গের সহিত সকর্মক বা অকর্মক ভাবে যৌনতৃপ্তি খুঁজে। এমন পুরুষ দেখিতে পাওয়া যায়, নারীসংসর্গে যাহারা অসমর্থ বা অনিচ্ছুক, অথচ সুশ্রী পুরুষ দেখিলেই তাহাদের লালসা ও বাসনা উন্মত্ত হইয়া উঠে। ইহাদিগকে যৌনবিকল্পী এবং ইহাদের মনোবৃত্তিকে অস্বাভাবিক বলা যাইতে পারে।

বালক দেহজীবী

বহু দেশে পুরুষবেশ্যার অস্তিত্বই সমমৈথুনের প্রসারের বড় নিদর্শন। যৌনবিজ্ঞানী ডাঃ হার্সফেল্ড (Dr. Hirschfeld) সমমৈথুন সম্বন্ধে একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলিয়াছেন যে, এক বার্লিন নগরীতেই এক হাজার পুরুষবেশ্যা ব্যবসায় করিত। ওয়ার্নার পিকটনের (Waner Picton) মতও তাহাই। শুধু জার্মানী নহে, পৃথিবীর বহুস্থানে নারীর স্থলাভিষিক্ত পুরুষবেশ্যা বিদ্যমান আছে। তবে জার্মানীতে যেমন উহারা সনদ লইয়া প্রকাশ্যভাবে ব্যবসা করিতে পারে, অন্যান্য সকল দেশে সেরূপ আইনের অনুমোদন পায় না। সেই জন্য আমাদের দেশে এরূপ পুরুষবেশ্যার কোনও সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে ভারতবর্ষের স্থানে স্থানে, বিশেষত উত্তর ভারতের কোনও কোনও শহরে, বিশেষতঃ লক্ষ্ণৌ, বামপুর প্রভৃতি ভূতপূর্ব নবাবদের রাজধানীতে যে বালকবেশ্যারা দক্ষতার সহিত ব্যবসা পরিচালনা করিয়া আসিতেছে, ইহা অবিশ্বাস করিবার কোনও কারণ নাই।* উত্তর প্রদেশে প্রবাদ আছে—’লখনউ শ্যহর গুলদস্তা, লৌণ্ডে ম্যহুঁগে র‍্যণ্ডি স্যস্তা’ অর্থাৎ লখনউ শহর ফুলদানির মত, যেখানে বালক মহার্ঘ কিন্তু গণিকা সস্তা। যে সকল স্থানে পর্দার কড়াকড়ি বশত পুরুষ অতি নিকট-আত্মীয়া ব্যতীত অপর নারীর নয়ন-মনের আনন্দবর্ধক রূপ দেখিতে পায় না, এমন কি কর্ণরসায়ন কামিনী কণ্ঠস্বরও শুনিতে পায় না, তাহাদের ঐসব স্বাভাবিক পিপাসা বঞ্চিৎ নিবারণের জন্য সেখানেই গণিকাবৃত্তি ও বালকদের দেহব্যবসায়ের অধিক প্রসার দেখা যায়।

[*উত্তর-ভারতের তথাকথিত হিজড়ারা (আসলে অধিকাংশই গোঁফ কামানো স্ত্রীবেশী পুরুষ) প্রকাশ্যে বিবাহ, জন্ম, পর্ব ইত্যাদি উপলক্ষে নাচ-গান করিয়া উপার্জন করে, কিন্তু উহাদের মধ্যে অনেকেই গোপনে পুঃমৈথুনে নিষ্ক্রিয় অংশ গ্রহণ করিয়া আরও উপার্জন করে।]

সহজাত না অভ্যাসজাত

এই বৃত্তি সহজাত কি অভ্যাসজাত, ইহা লইয়াও বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশেষ মতভেদ আছে। ডাঃ ক্রাফট এবিং, ডাঃ ফোবেল, ডাঃ উলরীকস প্রভৃতি অধিকাংশ বিজ্ঞানীগণের অভিমত এই যে, সমমৈথুনবৃত্তি অন্যান্য যৌনবিকৃতির ন্যায় সহজাত। পক্ষান্তরে, বহু যৌন-বিজ্ঞানী ইহাকে অভ্যাসজাত বৃত্তি বলি অভিহিত করিয়াছেন। হ্যাভলক এলিস এখানেও ইহাকে দুইভাগে বিভক্ত করিয়া সাময়িক বৃত্তিকে অভ্যাসজাত এবং স্থায়ী বৃত্তিকে সহজাত আখ্যা দিয়াছেন। তবে এ কথা স্বীকার করিতেই হইবে যে, বহু সমকামী সক্রিয় বা নিশ্রিয়-সমমৈথুনে এতদূর অভ্যস্ত হইয়া পড়ে যে, তাহারা পরবর্তী জীবনে বহু চেষ্টা করিয়াও এই কু-অভ্যাসের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিতে পারে না। এরূপ স্থলে অভ্যাসজাত ও সহজাত বৃত্তির মধ্যে সীমারেখা টানা সহজসাধ্য ব্যাপার নহে।

গত মহাযুদ্ধের পূর্বে জার্মানীতে এ সম্পর্কে খুব গবেষণা হইয়া গিয়াছে। নামকরা অভ্যস্তদের আত্মীয়-স্বজনাদির মধ্যে খোজাখুঁজি করিয়াও সহজাত বৃত্তি বলিয়া ওরকম কিছু পাওয়া যায় নাই। যমজ (অভিন্ন) ভাই বোনদের মধ্যে খোঁজাখুঁজি করিয়াও বিশেষ কিছু পাবার সম্ভাবনা কম। তবে বিভিন্ন প্রণালীতে প্রতিপালিত বহু সংখ্যক অভিন্ন যমজদের মধ্যে এই প্রবৃত্তি পাওয়া গেলে উহার সহজাতত্ব সম্পর্কে কতকটা আশ্বস্ত হওয়া যাইত।

অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির প্রভাব

কেহ কেহ মনে করেন, এরকম প্রবৃত্তি অন্তঃস্রাবী গ্রন্থিসমূহের প্রভাবের দরুন জন্মে। অনুসন্ধান করিয়া দেখা গিয়াছে যে, এ কথা ঠিক নহে। প্রস্রাব ইত্যাদি পরীক্ষা করিয়া বিশেষ কোনও তারতম্য পাওয়া যায় নাই। এমন কি, মেয়েদের গ্রন্থিরস ব্যবহাবের ফলে অণ্ডকোষ ও পুরুষাঙ্গের শিথিলতা ও অকর্মকতা আসিতে পারে কিন্তু কাহাকেও সমকামী হইতে দেখা যায় নাই।

রুচিবিকৃতি মাত্র

আমাদের খাদ্যাখাদ্যের রুচি কতকটা জন্মগত–বেশীর ভাগ অনুকরণজনিত বা অভ্যাসগত। বহু কাজ আমরা এভাবে সে-ভাবে ও অপর ভাবে করিতে পারি। এ সব ক্ষেত্রে অপরের দেখাদেখি, অপরের প্রভাবে, বাল্যকালের দুর্ঘটনা বা দুর্বিপাকের দরুন, সুযোগের অভাবে, দুর্যোগের প্রচাপে আমাদের আচরণ বিভিন্নমুখী হইয়া উঠে।

স্থায়ী সমকামের বেলায়ও আমরা রুচি বিকৃতি হইয়াছে বলিতে পারি। হিন্দুর কাছে গোমাংস, মুসলমানের কাছে শূয়োরের মাংস ঘৃণার উদ্রেক করে অথচ মাংসের প্রতি ঝোঁক প্রায় সকলেরই আছে। কিন্তু মুসলমানেরা ও খ্রীষ্টানেরা যথাক্রমে গোমাংস ও শুয়োরের মাংসভক্ষণ করিয়া থাকে।

ছোট বেলাকার ঘটনা, দুর্ঘটনা, বাবা-মার দুর্ব্যবহার বা অজ্ঞানতা কি করিয়া মানুষের রুচি বিকৃতি ঘটায় তাহার একটা করুণ চিত্র ফুটিয়া উঠিয়াছে নিম্নের দৃষ্টান্তটিতে।

একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইরিশ কেমিষ্ট তাহার অকপট লম্বা বিবৃতিতে যে তথ্যপূর্ণ স্বীকারোক্তি করিয়াছেন তাহার সংক্ষিপ্ত সার এ রকম :

ইনি ডাবলিন ইউনিভারসিটি হইতে অঙ্ক ও রসায়ন শাস্ত্রে ডিগ্রীপ্রাপ্ত। স্বাস্থ্য ভাল; ছোটকালে বিশেষ কোনও জটিল রোগ হয় নাই, পরে গনোরিয়া হইয়াছিল তবে পেনিসিলিন ও সালফা ঔষধ প্রয়োগে আয়োগ্য লাভ হয়। বিবাহ করেন নাই। বয়স ৩৬ বছর। ইনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়াছেন।

বাবা-মা ও প্রতিবেশীদের ‘চুপ’, ‘চুপ’ ভাব, পাদ্রীদের উপদেশের ছড়াছড়ি (ইনি রোমান ক্যাথলিক) ও পাপাচারের ভয় ও উৎকণ্ঠায় ইনি যৌনচর্চা দূরে থাকুক, কল্পনাও ‘পাপচিন্তা’ বলিয়া মনে করিতেন। ওঁর বাবামা বলেন, ওঁকে একটি বাঁধাকপির নীচে পাওয়া গিয়াছিল। পরে হাসপাতাল হইতে আনা হইয়াছিল, আবার তারও পরে, ওঁকে একটা ফেরিশতা ওঁর মার নিকট নিয়া আসেন বলিয়া প্রকাশ করেন!! (বলুন ত! তিন রকম বিবৃতিতে ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সততায় আস্থা রাখিতে পারে?)

যৌনবোধের উন্মেষের কথা মনে করিতে গিয়া উনি লিখেন, ওঁর প্রায় নয় বৎসর বয়সে উনি একদিন সন্ধ্যার পরে ২টি বালিকা ও তিন চারটি বালকের সঙ্গে খেলা করিতে থাকেন। ১১-১২ বৎসরের একটি বালক হঠাৎ প্রস্তাব করে, সবাই নিকটস্থ একটা মদের কারখানায় গিয়া খেলা করি। ওখানে গিয়া ও বলে, এস আমরা ‘পেন্সিল’ ‘পেন্সিল’ খেলি। বালিকারা হাসিতে থাকে। পরে দেখেন, বালকেরা সবাই নিজ নিজ প্যান্ট খুলিয়া অঙ্গ প্রদান করে। মেয়েরা স্পর্শ করে, আবার ওদের পীড়াপীডিতে নিজেদের অঙ্গ দেখায়। ওরাও হাত দিয়া স্পর্শ করে কিন্তু এর বেশী আর কিছু ঘটে না।

এর পরে একদিন একটি মেয়েকে ধরিয়া নিয়া উনি খেলাচ্ছলে উপভোগ করিতে চেষ্টা করেন কিন্তু সফল হন না। হঠাৎ ওঁর মা দেখিয়া ফেলেন আর যার পর নাই রাগ করেন। উনি ভয়ে ও উৎকণ্ঠায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়ান। ওঁর বড় ভাই (১১ বৎসরের) ওকে আশ্বাস দিয়া বাড়ী নিয়া যায়, কিন্তু মা ওঁকে কুকুর মারার চামড়ার চাবুক দিয়া এত মারেন যে, ওঁর শরীরে জখম হয় ও শরীর হইতে রক্তপাত হইতে থাকে। তিনি ওঁকে বলেন, ও তার ছেলে নন, ও জারজ সন্তান এবং শয়তানের ঔরসে! ওঁর ভাই বোনেরা বহু অনুরোধ, উপরোধ করায়ও মা নিবৃত্ত হন না এবং বাবাও চুপ করিয়া দেখিতে থাকেন। (এইরূপ কুসংস্কারমূলক অত্যাচার ছেলেমেয়েদের মনে গভীর রেখাপাত করে ও ওদের মানসিক বিকৃতির কারণ হয়।)

ও সব দেখিয়া শুনিয়া ওঁর সামান্য মাত্র যৌনজ্ঞান হয় এবং ১৩ বৎসর বয়সে উনি নানা রকম যৌনশাস্ত্রের বহিপুস্তক পড়িতে থাকেন। তখন ওঁর বন্ধুত্ব ছাড়া আর কোনও ভাব মনে জাগিত না।

অপর কয়েকটি ঘটনা আবার ওঁর বাল্য জীবনে খুব রেখাপাত করে।

প্রত্যেক রবিবার ওঁর বাবা ওঁর ভাইদের ও বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলিতেন। ওঁর যখন বয়স ৫-৬ বৎসর, তখন ওঁব বাবা ওঁকে কোলে বসাইয়া খেলিতেন। ওঁর বাবার শক্ত অঙ্গ ওঁর পেছনে লাগিত এবং তিনি হাত দিয়া ওর উলঙ্গ ঊরু দুটি মলিয়া দিতেন। ওঁর ইহাতে ভাল লাগত। এর উপরে আবার ওর মা ওঁকে শাস্তি দিতে হইলে ওঁর হাফপ্যান্ট খুলিয়া ওঁকে ওঁর ভগ্নীর ফ্রক পরাইয়া দিতেন আর ওঁকে দরজার সিঁড়ির ওপর বসাইয়া রাখিতেন। বাইরে গেলেই সবাই ওঁর যৌনাঙ্গ দেখিতে চাইবে বলিয়া শাসানো হইত। এভাবে সারাদিন বসিয়া থাকিয়া তিনি সন্ধ্যার পর মদের আখড়ায় যাইতেন আর ওখানকার লোকেরা ওঁকে ধরিয়া কোলে বসাইয়া ওঁব অঙ্গ ও পাছা স্পর্শ করিত। ইহাতে ওঁর ভাল লাগিত, আবার উনি ওখানে যাইতেন। এক রাত্রিতে একজন লোক ওঁর প্যান্ট খুলিযা ওঁর ঊরুদ্বয়ের মধ্যে অঙ্গ স্থাপন ও চালনা করে। মাকে ওঁর শরীরে ও কাপড়ে লাগা আঠালো জিনিস দেখাইয়া উনি বলেন যে, বাসে আসিবার সময় কোনও যাত্রীর থুথু লাগিয়া গিয়াছে। মা ওঁকে বাহিরে যাইতে শক্ত নিষেধ করেন কিন্তু ওঁর যাতায়াত চলিতে থাকে। একদিন হঠাৎ মা গিয়া দেখেন, উনি একজন পুরুষের কোলে বসিয়া আছেন। তিনি ওঁকে তৎক্ষণাং মারিতে শুরু করেন আর লোকটিকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করেন। এর পরে ওখানে যাওয়া বন্ধ হয়। কিন্তু বৎসর খানেক পরে একদিন এক মেলায় মেশিনে পয়সা দিয়া খেলিবার সময় ওঁদের একজন ওঁর পেছনে দাঁড়াইয়া ওঁর কোমরে অঙ্গ চালনা করিতে থাকে এবং পুলক লাভ করিবার পর-ওঁকে পয়সাকড়ি দিয়া যায়। তখন ওঁরও কিছু আনন্দ লাভ হইত।

দশ বৎসর বয়সে উনি কোনও পায়খানায় প্রস্রাব করিতে গেলে একজন যুবক ওঁকে তাহার অঙ্গ স্পর্শ ও মর্দন করিতে বলে এবং ওঁর হাতেই শুক্রপাত করিয়া ফেলে। ইহাতে উনি বিরক্তি বোধ করেন।

বার বৎসর বয়স পর্যন্ত এরূপ ব্যবহার পাইতে থাকেন এবং তারপরে কয়েকজন লোক ওঁরই অঙ্গ স্পর্শ, মর্দন, এমন কি চোষণ পর্যন্ত করে এবং একজন ওঁকে মৈথুনে প্রবৃত্ত করায়। উনি অক্ষম হইলেও ওর আনন্দ বোধ হইতে থাকে।

পাঠক-পাঠিকা লক্ষ্য করিবেন, কি করিয়া বাল্যজীবনে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গ একবার মাত্র ইনি পাইয়াছিলেন আর পুরুষ সংসর্গ বহুবার! ওঁর মার প্রহারের ফলে অপর বালিকাদের সংসর্গ একেবারে ছাড়িয়া দেন। এর ফলে ওঁর রুচিবিকৃতি আশ্চর্যের কথা নয়!

বার বৎসর বয়সে উনি স্কুলে উপরের ক্লাসে উঠেন এবং একজন বন্ধুর সাহচর্য পান। ইনি বয়সে এক বৎসরের মাত্র বড় ছিলেন। এরই কাছে উনি জানিতে পারেন যে পুরুষের অঙ্গনিঃসৃত রস জীবের বীজ আর উহাই মেয়েদের শরীরে ঢুকাইয়া দেওয়া হয়, মেয়েদের বীজের সঙ্গে মিশিয়া উহা সন্তানের আকার পাইতে থাকে ও পরে স্ত্রী-অঙ্গ দিয়া ঐ সন্তান বাহির হইয়া আসে (তখনও গুহ্যদ্বার বা যোনিদ্বার কোনটা বুঝিতে পারে নাই)। এই কথা জানিয়া তিনি সারাদিন ঘৃণা ও উদ্বেগ বোধ করেন। (দেখুন ত! কি প্রতিক্রিয়া?)।

ইহার পরে একদিন ধর্মশিক্ষা লইবার কালে ঐ ছেলেটি টেবিলের তলা দিয়া ওঁর অঙ্গ স্পর্শন, ঘর্ষণ করাইয়া পুলক লাভ করাইয়া দেয়।

তখন শুক্রপাত হইল না তবে পুলকলাভের শিহরণ বোঝা গেল। ওঁর ত্বকচ্ছেদ করা ছিল না। এর পর হইতে ঐ বন্ধুর সঙ্গে পারস্পরিক হস্তমৈথুন রোজ রোজ চলিতে লাগিল। (হস্তমৈথুনের প্রক্রিয়া সঙ্গীর প্রভাবে কি করিয়া সূত্রপাত হয় তাহার দৃষ্টান্ত এখানে।)।

উনি বিশ্বাস করিতেন, এসব কাজ পাপজনক এবং ওঁকে এজন্য নরকে যাইতেই হইবে; কারণ, এ রকম ধারণাই ওঁকে দেওয়া হইত কিন্তু উনি তবুও বিরত থাকিতে পারিতেন না। (কুসংস্কারমূলক ভয়ভীতি দেখাইবার রীতি সব দেশেই আছে। ধর্মমতও এজন্য অনেকাংশে দায়ী। ইহাতে ছেলেমেয়েরা বিরত তো হয়ই না বরং মানসিক উদ্বেগের শিকার হইয়া পড়ে।)

ইহার পরে ওঁরা স্কুলের অন্যান্য ছেলেকে ওঁদের দলভুক্ত করেন। একজন ছেলে খুব সুন্দর চেহারার ছিল। ওঁর সঙ্গে সস্তমৈথুনেই উনি বেশী আসক্ত হন। উনি মনে করিতে থাকেন, উনি অস্বাভাবিক বৃত্তিগ্রস্ত! (বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গ না পাইবার ফলেই বোধ হয় ওঁর রুচিবিকার ঘটে!) পরে বইপত্র পড়িয়া নারীদের যৌনাঙ্গ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন কিন্তু বহু পুরুষের সংসর্গ করিয়া করিয়া ওদের দিকে আর আকৃষ্ট হন না।

শুধু তাহাই নহে। উনি বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গলাভ করিবার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেন। স্কুলের ছেলেদের ছাড়াও যুবকদের সঙ্গ কামনা করেন। বার বৎসর বয়সে উনি একজন টাউন আর্কিটেক্টকে দেখিয়া মুগ্ধ হন। এর বয়স প্রায় ৩০ বৎসর; অবিবাহিত; বাপ-মায়ের সঙ্গে থাকিতেন। উনি ওঁকে দেখে মৃদু হাসিতেন। একবার ওঁকে ইনি স্কুল হইতে নিজের মোটরে বাড়ী পৌঁছাইয়া দেন। উনি এঁকে বলেন, আজ সন্ধ্যায় উনি সিনেমায় যাইবেন কিন্তু ইনিও প্রচ্ছন্ন নিমন্ত্রণে সাড়া দেন না। আর একদিন সন্ধ্যায় এর গ্যারেজে গিয়া মোটর পরিষ্কার করিয়া দিবেন বলিয়া প্রস্তাব দিলে ইনি রাজী হইলেন। উনি পরিচ্ছন্ন, পোষাক পরিয়া চুল বাঁধিতে লাগিলে ওঁর মা বলিয়া উঠেন, তুমি যে রকম সাজগোজ করছ তাতে করে মনে হয় তুমি কোনও মেয়ের মনোরঞ্জন করতে যাচ্ছ। উনি কিন্তু ময়লা মোটর পরিষ্কার করিতে যাইতেছিলেন! গ্যারেজে গিয়া গাড়ী ধুইবার ছলে উনিই এঁকে যৌন অভিসারে নিমন্ত্রণ করেন আর ইনি সাড়া দেন। (এ ক্ষেত্রে উত্তরদাতারই বেশী আগ্রহ ছিল।) এর পরে ওঁরা দু’জন অনুরক্ত হইয়া পড়েন আর একত্র বিহার, ভ্রমণ, সিনেমা দেখা, সাঁতরানো, পিকনিক করা পুরোদস্তুর চলে। আরও দু’টি কিশোর বন্ধুকেও উনি এ দলে ভর্তি করেন এবং চারজন মিলিয়া যৌন সম্ভোগে লিপ্ত থাকেন। উনি এঁর প্রতি এতটা আকৃষ্ট হন যে মোটরে একত্রে যাইবার সময়ে উনি স্বেচ্ছায় উলঙ্গ হইয়া পড়িতেন আর ইনি উদ্বিগ্ন হইতেন পাছে কেহ দেখিয়া ফেলে।

ওঁর যৌন আচরণের পূর্ণ বিবৃতিতে আরও বহু আজগুবি ব্যাপার আছে। সবগুলিই ছেলেদের বা যুবকদের নিয়া * কাকেও উনি বহু বৎসর পর্যন্ত ভালবাসেন, কেউ ওঁকে ওরকম করেন। দু’জন মাত্র ওঁর কাছে টাকা পয়সা চায়, অপরগুলির সকলেই শুধু যৌনকামনা প্রকাশ করে।

[* “I suppose I have bad homosexual exepriences with about 250 men and boys, including one priest and one protestant boy preacher….This chronicle could go on for ever!”]

এখন ওঁর বয়স প্রায় চল্লিশের উপরে। উনি সাক্ষাৎ করিয়া আমার পরামর্শ চান, কেন সুন্দরী নারীও ওঁকে আকর্ষণ করিতে পারে না, অথচ অসুন্দর বালক, কিশোর, যুবকও পারে। এ ক্ষেত্রে ওঁর জন্মগত কোনও ব্যাধি নাই, রয়েছে বাল্যকালে বাবা, মা, সঙ্গীদের আচরণের ফলে এক অস্বাভাবিক রুচিবিকৃতি। ওঁর অকপট কথনে সমবেদনা বোধ করি কিন্তু উপায়? ওঁর জীবন বোধ হয় এভাবেই কাটিবে! বেচারা!

এখানকার একজন ধনী ও পদস্থ ব্যক্তির রুচিবিকৃতির কথা শোনা যায়। বার বার বিবাহ করিয়াও নাকি তাহার পুরুষলিপ্সা বজায় রহিয়াছে; ওঁর স্ত্রীরা যৌন অবহেলার বোঝা বহিতে বহিতে সরিয়া পড়েন আর উনি নাকি ঐ আইরিশ কেমিষ্টের মতই পুরুষ সংসর্গেই মশগুল! ওঁর রুচিবিকৃতির পেছনেও হয়ত করুণ কোনও ইতিহাস আছে!

প্রতিষেধ ও প্রতিকার

বাল্যকাল হইতেই বাবা-মায়ের ছেলেদের ও মেয়েদের আচরণ লক্ষ্য করিয়া যাইতে হইবে। স্বাভাবিক পারিবারিক পরিস্থিতিতে লালিত-পালিত শিশুদের রুচিবিকৃতির কারণ থাকে না।

অস্বাভাবিক বাতিকগ্রস্ত চাকর-বাকর, নার্স, মাষ্টার, সঙ্গীদের সাহচর্য হইতে ইহাদের দূরে রাখিতে হইবে। বালক-বালিকাকে একত্র খেলাধূলা করিতে দিতে হইবে। ঐরূপ মেলামেশা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হইলে সমশ্রেণীতে যৌনাকর্ষণ নিবদ্ধ হইয়া যাইতে পারে। স্কুল কলেজে সহ-শিক্ষা প্রবর্তন করা উচিত। পর্দা-প্রথা উভয় লিঙ্গের জন্য ক্ষতিকারক। নারী-পুরুষের মিলিত, পার্টিতে যাতায়াত উভয়ের জন্য ভাল।

সকাল সকাল বিবাহ করা উচিত। জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এখন কার্যকরী তাই বিয়ে করলে পুত্রকন্যা–আসে যেমন প্রবল বন্যা’–এ ভয় আর এখন নাই।

মনোচিকিৎসায় অনেক ক্ষেত্রে ফল পাওয়া গিয়াছে। সুন্দরী নারীর সাহচর্য কতকক্ষেত্রে ভালবাসার সূত্রপাত করাইয়া অভ্যাস ফিরাইতে পারে।

সামাজিক মনোভাব

সমকাম সম্পর্কে প্রায় সকল সমাজেরই জোর বিদ্বেষ। ইহুদী, খ্ৰীষ্টান ও মুসলমানেরা সডম ও গমোরা ধ্বংসের কাল্পনিক আজগুবী কাহিনী হইতে ইহাকে মহাপাপ ও খোদার ক্রোধের কারণ বলিয়া মনে করেন। খোদার ক্রুদ্ধ হইবার কারণ থাকুক বা নাই থাকুক, ইহাতে যে বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হইতে পারে এবং ইহা যে যৌন-আচরণের প্রকৃত পন্থার পরিপন্থী এই সকল কারণ দর্শাইয়াও সমাজ ইহাকে দণ্ডনীয় বলিয়া মনে করে। ইহাতে পারিবারিক জীবনে বিশৃঙ্খলা আসিতে পারে সমাজ তাহাও ভয় করে।

পক্ষান্তরে মানব সমাজের জন্মাবধি ইহা দেখা যায়। বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও ইহার বিপুল প্রকোপ আছে, বংশবৃদ্ধি ধ্বংস পাইবার ভয় খুব কমই আছে বরং জন্মনিয়ন্ত্রণই জগতে এখন বেশী কাম্য, অসংখ্য নর ও নারী উপযুক্ত বয়সেও বিবাহ করিতে পারে না, উপযুক্ত বয়সের দুইটি ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অন্যের অপকার না করিয়া নিজেদের কামনা তৃপ্ত করিতে সমকামের আশ্রয় লইলে অপরের বলিবার কিছুই থাকা উচিত নহে, ইহাতে রতিজ রোগ হইবার আশঙ্কা খুব কম, অবৈধ গর্ভের সম্ভাবনা আদৌ নাই, দুর্নাম, অর্থনাশ, ও দাম্পত্য জীবনে বিপর্যয় ঘটিবার ঝুঁকি, ব্যভিচার ও গণিকাগমন অপেক্ষা অনেক কম ইত্যাদি কথা ভাবিলে সমকামীদের প্রতি মনের ভাব অনুকূল না হইলেও সহানুভূতিপূর্ণ হইতে বাধ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *