১.১২ যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (২)

১.১২ যৌনবোধের বিভিন্নমুখী প্রকাশ (২)

জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন (Day dreaming)

শুধু কল্পনার সাহায্যে যৌনলালসার উদ্রেক ও চরিতার্থও একপ্রকার আত্মরতি। যুবক-যুবতী অনেক ক্ষেত্রে প্রিয়জনের কল্পনা করিয়া তাহার সহিত কল্পনায় মিলন-সুখ ভোগ করিয়া যৌনলালসার নিবৃত্তি লাভ করে। যুবক অপেক্ষা যুবতীদের মধ্যে ইহার প্রসার অধিক।

কৈশোরে বা যৌবনে প্রেমাত্মক নাটক নভেল পড়িয়া অশ্লীল চিত্র বা দৃশ্য দেখিয়া প্রিয়জনের সংস্পর্শে আসিয়া অথবা অন্য কোন উত্তেজনার কারণ হইলেই কেহ কেহ কল্পনারাজ্যে প্রবেশ করিয়া যৌনসুখ উপভোগ করিয়া থাকে। ইহাতে সাময়িক তৃপ্তি এবং এমন কি কদাচিৎ পুরুষদের রেতঃস্খলন এবং মেয়েদের চরমপুলক-লাভও হইতে পারে। ইহাকে দিবাস্বপ্ন (Day Dreams) বা জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন বলা হয়।

অনেক কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতী ঘুমাইবার পূর্বে কতক্ষণ এইরূপ কল্পনা করে এবং অনেকে আবার আকাঙ্ক্ষা করে এমন মন্ত্র বা ব্যবস্থার যাহা দিয়া স্বপ্নে বাঞ্ছিত নায়ক বা নায়িকার সহিত মিলিত হইতে পারে।

কবি, শিল্পী প্রভৃতি যাহারা অধিকাংশ সময়ে কল্পনারাজ্যে বিচরণ করেন, বিশেষত যাহারা রতিক্রিয়ায় বিশেষ লিপ্ত হন না, তাহাদের মধ্যেই ইহার অধিক প্রচলন দৃষ্ট হয়। ইহারা নিজেদের জীবনে কৃত বা দৃষ্ট কোনও অভিজ্ঞতার সূত্র ধরিয়া কল্পনার সাহায্যে একটি মনোরম নাটক সৃষ্টি করেন এবং সেই নাটকে স্বয়ং নায়ক বা নায়িকার ভূমিকা গ্রহণ করেন। ইহাতেই তাহারা রতিজাত আনন্দ ও পুলক লাভ করেন।

[পুরুষের পক্ষে প্রায়ই উত্তেজনা ও রসক্ষরণ হইলেও হস্তমৈথুন বা অন্য কোন উপায়ে শেষ করিতে হয়। কল্পনার সাহায্যে সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ খুব কম ক্ষেত্রে হয়। মেয়েদের পক্ষে কল্পনায় চরমপুলক লাভের অনুপাত বেশী।]

স্কুল-কলেজের বালিকাদের মধ্যেও এই জাগ্রত স্বপ্নের অভ্যাস অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। পাণিমেহন করিবার সময়ে মনে মনে রতিক্রিয়ার কল্পনা করাটাও অনেকের বেলায়ই স্বাভাবিক।

স্বাভাবিক মিলনের কৃত্রিম অনুকরণ

স্বাভাবিক রতিক্রিয়ার কৃত্রিম অনুকরণ করিয়া অনেকে যৌনতৃপ্তি লাভ করে। এইরূপ ক্ষেত্রে নানা জিনিসের সহায়তা গ্রহণ করা হয়। ইহাতে নানারূপ অদ্ভুত প্রণালী আবিষ্কৃত হয়।

পুরুষ বিছানা বা বালিশে ছিদ্র করিয়া লইয়া থাকে; রবারের খাপ, নানা প্রকার ফল, এমন কি রুটি মাখনের ব্যবহারও দেখা যায়। ডাঃ হার্সফেল্ড ও এলিস বহু উদ্ভট প্রক্রিয়ার উল্লেখ করিয়াছেন।

মেয়েদের বেলায় কৃত্রিম রবারের লিঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া শশা, কলা, বেগুন, মোমবাতি, পেন্সিল, টুথব্রাস ইত্যাদির ব্যবহার দেখা যায় বলিয়া পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে।

কৃত্রিম লিঙ্গের ব্যবহার বহু পুরাতন কাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। ব্যাবিলনের পুরাতন চিত্রাদিতে উহার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, বাইবেলে উহার উল্লেখ আছে। অ্যারিষ্টোফেনস মাইলেসিয়ার নারীদের মধ্যে চামড়ার কৃত্রিম লিঙ্গের ক্রয়-বিক্রয়ের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। মধ্যযুগের নানা পুস্তকে নানা দেশে বিধবা, সধবা, সন্ন্যাসিনী প্রভৃতি কর্তৃক ইহার ব্যবহারের উল্লেখ আছে।

রবারের তৈয়ারী জিনিসে আবার গরম জল বা দুধ রাখিয়া পুরুষাঙ্গের অবিকল নকল করিবার এবং কতক ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের মত থলি যোগ করিয়া আরও সাদৃশ্য স্থাপনের প্রচেষ্টাও হইয়াছে। 

ফ্রান্সে রবারের তৈয়ারী স্ত্রী-অঙ্গও পাওয়া যায়। অর্ডার পাইলে পুরুষের পছন্দমত মাপের ও অবয়বের তৈয়ারী করা হয়। অবিবাহিত যুবকেরা বা ভ্রমণ কারী সৌখীন লোকেরা ইহা ব্যবহার করিয়া তৃপ্তি পায়।

স্বপ্নদোষ বা কামস্বপ্ন (Erotic dreams)

স্বপ্নদোষে বিষমলিঙ্গ বা সমলিঙ্গের কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তির সংস্রবের প্রয়োজন হয় না। স্বপ্নে সঙ্গম বা অনুরূপ ক্রিয়া করা এবং তাহার ফলে উত্তেজনা বা শুক্রস্খলন হওয়াকে স্বপ্নদোষ বলে।

নারী অপেক্ষা পুরুষের মধ্যে স্বপ্নদোষের অধিক প্রচলন দৃষ্ট হইয়া থাকে। নারী যে স্বপ্নে মৈথুন করে না, তাহা নয়। তবে উহাতে শুক্রস্খলন হয় না বলিয়া জাগরণে উহার কথা অধিকাংশ স্থলেই মনে থাকে না।

পুরুষ স্বপ্নে কোনও নারী বা পুরুষের সহিত প্রেমক্রীড়া অথবা সহবাস করে এবং তাহাতে পুলক বোধ করে। এই পুলকানুভূতি সম্পূর্ণ কাল্পনিক হইলেও ইহা শরীরের উপর ক্রিয়া করে এবং সত্যসত্যই শুক্রস্খলিত হইয়া যায়। শুক্রস্খলনের সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষ জাগ্রত হইয়া যায়। দুই চারি ক্ষেত্রে স্বপ্নের কথা মনে নাও থাকিতে পারে। সাধারণতঃ পরিচিতার চেয়ে অপরিচিতা নারী সংসর্গই স্বপ্নে বেশী দেখা যায়।

দেহের উপর স্বপ্নের ক্রিয়া আজকাল অধিকাংশ বিজ্ঞানী কর্তৃক স্বীকৃত হইয়াছে। স্বপ্নে ক্রন্দন করিলে আমরা সত্যই ক্রন্দন করি, স্বপ্নে পরিশ্রম করিয়া ঘর্মাক্ত হইলে আমরা সত্যসত্যই ঘর্মাক্ত হইয়া থাকি, স্বপ্নে কথা বলিলে সত্যসত্যই আমাদের বাক্যস্ফুট হয় ইত্যাদি দৈহিক অবস্থা হইতে ইদানীং অধিকাংশ পণ্ডিতই স্বপ্নের দৈহিক ভিত্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

স্বপ্নে শুক্ৰস্খলন হইলে সত্যকারের শুক্র স্খলিত হইবে ইহা একরূপ অবধারিত। কিন্তু শৈশবে আমরা স্বপ্নের যে একটা দৈহিক নিদর্শন দেখিয়া থাকি, যৌবনে তাহা আর দৃষ্টিগোচর হয় না, তাহা এই যে শৈশবে আমরা স্বপ্নে মল বা মূত্র ত্যাগ করিলে তাহার দৈহিক ক্রিয়া হইয়া থাকে। ফলত অনেক সময় শিশুর শয্যামূত্রের কারণ স্বপ্নে মূত্রত্যাগ। কিন্তু যৌবনে যখন আমাদের স্বপ্নে শুক্ৰস্খলনের দৈহিক ক্রিয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, ঠিক সেই সময়ে আমরা স্বপ্নে হাজার মলমূত্র ত্যাগ করিলেও তাহার দৈহিক ক্রিয়া হয় না। ইহার কারণ এই যে, ঐ বয়সে মলমূত্র ত্যাগ নিয়ন্ত্রণ করিতে করিতে আমরা ক্ষমতাবান হইয়া গিয়াছি; তাই মূত্র স্খলিত হইবার পূর্বেই আমরা জাগ্রত হইয়া পড়ি। স্বপ্নের স্বাভাবিকতা ও দৈহিকতা লইয়া বিজ্ঞানীতে বিজ্ঞানীতে যত প্রকার মতভেদই থাকুক না কেন, যৌনবিজ্ঞানের পক্ষে ইহাই যথেষ্ট যে, স্বল্পমৈথুনের সহিত দেহের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রহিয়াছে।

স্বপ্নদোষ হয় কেন—গোঁড়া ধার্মিক ও নীতিবাদীগণের অভিমত এই যে, দুষ্ক্রিয়াসক্ত অপবিত্ৰমনা লোকেরই স্বপ্নদোষ হইয়া থাকে। এই জন্যই হয়ত স্বপ্নে মৈথুনক্রিয়া দর্শন বা উপভোগ করার নাম স্বপ্নদোষ রাখা হইয়াছে। দোষ কথাটার এখন আর কোন অর্থ হয় না। ইহুদিরা স্বপ্নদোষকে অপবিত্র মনে করিতেন, এবং খ্রীষ্টান ও ইসলাম ধর্মেও এই ধারণা (pollution) সংক্রমিত হইয়াছে। ইসলামে বালকদের সাবালকত্বের নিদর্শন স্বপ্নদোষ হওয়া। বালিকাদের বেলায় অবশ্য ঋতুস্রাবের প্রারম্ভ।

লুথার প্রভৃতি মধ্যযুগীয় পণ্ডিতগণ, এমন কি, ডাঃ মোল ও হউলেনবুর্গ প্রভৃতি আধুনিক পণ্ডিতগণও স্বপ্নদোষকে একটি ভয়াবহ রোগ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। আমাদের আয়ুর্বেদ ও ইউনানী চিকিৎসাশাস্ত্রেও স্বপ্নদোষকে একটি ব্যাধি বলিয়া আখ্যাত করা হইয়াছে। ‘

পক্ষান্তরে মিঃ এলিস, প্যাগেট, ব্রানটন, হ্যামণ্ড ও হ্যামিল্টন প্রভৃতি বহু বিজ্ঞানবিদ স্বপ্নদোষকে নিতান্ত স্বাভাবিক দৈহিক ঘটনা বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ‘স্বপ্নদোষ’ শব্দটি’ই ভ্রমাত্মক, যেহেতু (১) নিদ্রাবস্থায় কখনও কখনও বিনাস্বপ্নেই রেতঃস্খলন হইয়া থাকে এবং (২) ইহা আদৌ কোনও দোষ নয়। কেবলমাত্র পুরুষের ক্ষেত্র হইলে ইহাকে ‘সুপ্তিস্খলন’ বলাই ঠিক। কিন্তু নরনারী উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবার, উপযুক্ত শব্দ ‘কামস্বপ্ন’।

পুরুষের কামস্বপ্নের কারণ—পুরুষের যৌন-অঙ্গসমূহে শুক্র তৈয়ারী হইয়া সঞ্চিত হইতে থাকে। উহা ব্যয় হইবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার উহারা নূতন বা আরও শুক্র তৈয়ারীর কাজে লাগিয়া যায়। সুস্থ সবল যুবক প্রতিদিন সঙ্গম করিলেও ঐ যন্ত্রসমূহ আবার শুক্র উৎপাদন করিয়া পূর্ণ করিয়া রাখে। প্রতিদিন সঙ্গম না করিয়া সপ্তাহে দুই-তিন বার করিলে শুক্ৰস্খলনের পরিমাণ ঐ অনুপাতে বেশী হইবে। স্বাভাবিক রতিক্রিয়ায় শুক্রস্খলন না হইলে যুবকের এপিডিডাইমিসে এবং শুক্রকোষে শুক্র সঞ্চিত হইয়া উহারা একেবারে ভরপুর হইয়া থাকিবে। তাহা সত্ত্বেও কতক কতক যৌনগ্রন্থি আরও রসঙ্খলন করিতে থাকে। ইহারই প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ নিদ্রিতাবস্থায় স্বপ্নদোষ হইয়া গিয়া শুক্রভার লাঘব হয়। ইহা না হইলে জাগ্রত অবস্থায়ও সাময়িক উত্তেজনা আসিয়া শুক্র বাহির হইয়া যাইতে পারে। প্রস্রাবের সহিতও ঐরূপ হওয়া বিচিত্র নহে।

ডঃ কিনযেরা এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবতারণা করিয়াছেন। তাঁহারা বলেন যে, শুক্রকীট যোগানই অণ্ডকোষের কাজ, শুক্রের বেশীর ভাগ প্রোষ্টেটগ্রন্থি ও শুক্রকোষের রসের সমষ্টি। স্বপ্নদোষে অণ্ডকোষের বেশী প্রভাব আছে বলিয়া মনে হয় না; প্রোষ্টেট বা শুক্রকোষের প্রচাপের ফলে ইহা হইলেও এ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পাওয়া যায় নাই। তাঁহাদের মতে এখন নির্ভুল অভিমত দেওয়া যায় না।

আত্মরতিতে অভ্যস্থ লোকদের বেশী স্বপ্নদোষ হইবে এ কথা ঠিক নহে। বরং কম হইবার কথা,–কারণ, শুক্রভাণ্ডারের ভরপুর হইয়া উপচাইয়া পড়িবার মত ব্যবস্থা হয় না।

[ডাক্তার বন্ধু লিখিয়াছেন—“হস্তমৈথুনকারীদের স্বপ্নদোষ কম হইতে বাধ্য। যাহারা বাল্যকাল হইতে নিয়মিতভাবে স্বল্পকাল ব্যবধানে হস্তমৈথুন করিয়া থাকে, তাহারা অনেক সময় কোনদিনই স্বপ্নদোষের অভিজ্ঞতা লাভ করে না। আমার এক হস্তমৈথুনকারী রোগী তাহার জীবনে (১৪/১৫ বৎসরে হস্তমৈথুন আরম্ভ হয়, বর্তমানে ২৯ বৎসর বয়স–২ বৎসর হইল বিবাহ হইয়াছে, হস্তমৈথুনের অভ্যাস অল্পবিত্তর এখনও বর্তমান আছে) মাত্র দুইবার স্বপ্নদোষের অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছে। স্বপ্নে শুক্রস্খলন খুবই পুলকপ্রদ বোধ হওয়াতে পুনরায় এই পুলকলাভের জন্য অনেক চেষ্টা (শয়নের পূর্বে রতিচিন্তা, কামোত্তেজক পুস্তক পাঠ বা চিত্রদর্শন) সত্বেও আর কোনদিন স্বপ্নদোষ হয় নাই। কারণ, হস্তমৈথুন না করিয়া সে কিছুতেই একাদিক্রমে দুই-তিন দিনের বেশী থাকিতে পারিত না, প্রত্যহ এক একাধিকবার হস্তমৈথুন করিত। বিবাহের পর অবশ্য এ অভ্যাস অনেক কমিয়াছে।]

স্বপ্নদোষের পৌনঃপুনিকতার দ্বারা ইহার স্বাভাবিকতার পরিমাপ করিলে উহা সঠিক হইবে না। কারণ, এক ব্যক্তির পক্ষে যেমন সপ্তাহে তিন-চার বার স্বাভাবিক হইতে পারে, অপর ব্যক্তির পক্ষে আবার উহা স্বাস্থ্যহানিকর হইতে পারে। সুতরাং স্বপ্নদোষেও বার দেখিয়া উহার স্বাভাবিকতা বিচার করিলে চলিবে না। স্বপ্নদোষের স্বাভাবিকতা বিচার করিবার একমাত্র মাপকাঠি ব্যক্তির দেহে ও মনে ইহার ফলাফল। ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানে ইহার স্বাভাবিকতা, পৌনঃপুনিকতা, তারতম্য ইত্যাদি নানা বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা আছে।

যাহারা স্বভাবত একটু সংযমী, কিংবা যাহারা বিবাহিত বা রতিক্রিয়াসক্ত হইয়াও সাময়িক ভাবে স্ত্রীসংসর্গ হইতে দূরে আছে, কিংবা যাহারা রতিশক্তি সম্পন্ন যুবক হইয়াও এ পর্যন্ত বিবাহ করে নাই, সপ্তাহে একাধিকবার স্বপ্নে শুক্ৰস্খলন হওয়া তাহাদের পক্ষে স্বাভাবিক, তেমনই উপকারী। এমন কি যদি উপর্যুপরি প্রত্যহ কয়েক দিন স্বপ্নদোষ হইয়া গিয়া কয়েক দিন বিরতির পর আবার ঐরূপ হইতে থাকে এবং তাহাতে যদি শারীরিক কোনও অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ না হয়, তাহা হইলেও দুশ্চিন্তা করিবার কোন কারণ নাই।

ডাঃ প্যাগেটের অভিমত এই যে, পুরুষের সপ্তাহে ঊর্ধ্ব সংখ্যায় দুইবার এবং তিন মাসে কমপক্ষে একবার সুপ্তিস্খলন হওয়া স্বাস্থ্যের লক্ষণ। আত্মরতি বা রতিক্রিয়া ব্যতিরেকে কোনও ব্যক্তির যদি তিন মাসের মধ্যে একবারও না হয়, তবে তাহার রতিশক্তি খুব কম ইহা অনুমান করিয়া লইতে হইবে। অনেকের আবার দুই-তিন মাস পরে একেবারে উপর্যুপরি দুই-তিন রাত্রি হইয়া আবার দুই-তিন মাস বন্ধ থাকে। ডাঃ ব্রানটন ও রোহেলডার এই অবস্থাকেও স্বাভাবিক বলিয়াছেন। আবার এরূপও দেখা যায় যে, কাহারও সারা জীবনে মোটেই স্বপ্নদোষ হয় নাই। অবশ্য এরূপ লোক সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। ডাঃ হ্যামিল্টন গবেষণা করিয়া বলিয়াছেন যে, শতকরা মাত্র দুইজন লোক এমন দৃষ্ট হয়, যাহাদের স্বাভাবিক রতিশক্তি থাকা সত্ত্বেও ইহা হয় না। তবে যৌবনের প্রাক্কালেই বিবাহ হইয়া থাকিলে এবং স্বাভাবিক মিলন হইতে থাকায় ইহা না হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নহে।

ইটালীর ডাঃ গোয়ালিনো এই সম্বন্ধে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও গভীর গবেষণা করিয়াছেন। তাঁহার গবেষণার পাত্র ছিলেন ডাক্তার, উকিল, শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী প্রভৃতি সকল শ্রেণীর লোক। ডাঃ মারেও অনুরূপ গবেষণা করিয়াছেন। উভয়ের অভিমত এই যে, যৌবনাগমের দুই-এক মাস আগে হইতেই স্বপ্নদোষ আরম্ভ হয়। যাহারা জাগ্রত অবস্থায় আত্মরতি, সহবাস বা অন্য কোনও রূপে শুক্রস্খলন করিয়াছে, কেবল তাহাদেরই যে স্বপ্নদোষ হয় তাহা নহে, সঙ্গম বা অন্য কোনও রূপ শুক্রস্খলনের যাহাদের কোনও অভিজ্ঞতা নাই, তাহাদেরও হইতে পারে। কিন্তু তাহাদের স্বপ্নের বিষয়বস্তুতে পার্থক্য দৃষ্ট হয়। যে ব্যক্তি নারীদেহের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত নহে, সে কদাচ স্বপ্নে ঘনিষ্ঠভাবে নারীসংসর্গ করিতে পারে না। দর্শন, স্পৰ্শন প্রভৃতির স্বপ্নেই তাহার স্খলিত হইয়া থাকে।

ইহা আরম্ভ হইবার পূর্বেই বালকেরা অন্যান্য উপায়ে যৌনতৃপ্তি লাভ করিয়া থাকে। খুব কম ক্ষেত্রে স্বপ্নদোষেই প্রথম তৃপ্তি হয়।

কামস্বপ্নের বিশেষত্ব–সচরাচর অপরিচিত নারী বা পুরুষের সহিত সংসর্গের দ্বারা শুক্রঙ্খলন হইয়া থাকে, প্রিয়জনের সহিত কদাচিৎ স্বল্পমৈথুন হইয়া থাকে। এমন কি প্রেমিকার কথা চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রিত হইলেও অথবা স্ত্রীর সহিত জাগ্রত অবস্থায় চুম্বনাদি শৃঙ্গার করিবার পর যৌন-উত্তেজনাসহ নিদ্রিত হইলেও যাহার সঙ্গে স্বল্পমৈথুন হইবে, যে প্রেমিকা নহে—সম্পূর্ণ অপরিচিতা, এমন কি সময় সময় এক কুৎসিত নারী। ডাঃ গোয়ালিনো, লাওয়েনফেল্ড প্রভৃতির মত এই যে, আমাদের জাগ্রত জীবনে ভাবাবেশসমূহ অনুসন্ধানেও মোটামুটি এইরূপ পাওয়া গিয়াছে। যাহারা জাগ্রত অবস্থায় বিপরীত লিঙ্গের সংস্পর্শ বা প্রভাবই বেশী পায় তাহারা স্বপ্নাবেশে বিপরীত লিঙ্গ মৈথুন আর সমলিঙ্গ-ভাবাপন্ন লোকেরা সমমৈথুন বেশী দেখিতে পায়।

পুরুষ ও নারী উভয়েরই প্রতি কামভাবাপন্ন লোকের একবার একটি আর একবার অপরটি বা একই স্বপ্নে দুই রকম ক্রিয়াই দেখিতে পায়। কেহ কেহ পুরুষাঙ্গ-ভূষিতা নারীর সংসর্গ করে। স্বপ্নে হস্তমৈথুন করা দেখিবারও কিছু কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। কেহ কেহ শুক্রস্খলন হইবার সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়া পড়ে, কেহ কেহ স্বপ্নের মধ্যে শুক্রস্খলন করে।

নারীদের কামস্বপ্ন

এতক্ষণ আমরা স্বপ্নদোষ সম্বন্ধে যে সব তথ্যের উল্লেখ করিয়াছি তাহা পূর্ব পূর্ব গবেষকদের অভিমত। সম্প্রতি (১৯৫৩ সালে) ডঃ কিন্‌যে ও সহকর্মীরা এ সম্পর্কে আরও আলোকপাত করিয়াছেন।

ইহাদের অনুসন্ধানের ফল এই যে, পুরুষের মধ্যে সুপ্তিস্খলন প্রায় সার্বজনীন বলিয়া এবং পুরুষই প্রায় সমস্ত যৌনশাস্ত্র প্রণেতা বলিয়া তাহারা ধরিয়া লইয়াছেন যে নারীদেরও একই প্রকার স্বপ্নদোষ হয়। তাই অ্যারিষ্টটল, গ্যালেন, হ্যাভলক এলিস, রোহেলডার, মল, কেলী প্রমুখ বহু লেখকই এ সম্পর্কে আলোচনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের অনুসন্ধান ক্ষেত্রে নারীদের কামমূলক স্বপ্নে চরমতৃপ্তি লাভের দৃষ্টান্ত খুব কম পাওয়া গিয়াছে।

কেন এরকম হইয়াছে তাহা লইয়া ডঃ কিন্‌যে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কারণ, এ সম্পর্কে তথ্যাহরণ ততটা শক্ত নয়। নারীরা অনেকটা পুরুষের মতই স্বপ্নের কথা স্মরণ করিতে পারে এবং গোপনীয়তার সম্পূর্ণ আশ্বাস পাইলে আধুনিকাদের এ সম্পর্কে স্বীকার করিতেও বিশেষ সঙ্কোচ নাই। পুরুষদের শুক্রস্খলনজনিত পুলকাবেগের মত নারীরা চরমপুলক লাভের আবেগে অনেক সময়ে জাগিয়ে পড়ে—ইহাদের যোনি তেমনই রসসিক্ত হয়। অনেক সময়ে নারীর স্বপ্নদোষে দৈহিক আবেগ ও কম্পন পার্শ্বে শায়িত স্বামী বা অপর কেহ লক্ষ্য করিতে পারে।

ডঃ কিনযেদের মতে নারীরা স্বমেহন বা কামস্বপ্ন— এই দুই প্রকারেই যৌন আনন্দ বেশী লাভ করে। কারণ ইহা ছাড়া অপর সকল প্রক্রিয়াই অপর ব্যক্তি ও সুযোগ, ইচ্ছা, সামর্থ্য ইত্যাদি সাপেক্ষ। ডঃ কিনযেদের জিজ্ঞাসিত নারীদের মধ্যে প্রায় ২/৩ অংশ (বা ৬৫%) স্বপ্নদোষের কথা স্বীকার করিয়াছেন। ২০% ক্ষেত্রে চরমপুলক লাভ পর্যন্ত গড়াইয়াছে। যদিও মাঝে মাঝে উহা ছাড়াও স্বপ্নদোষ হইয়াছে। ৪৫% ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ মদনস্বপ্ন দেখিয়াছেন। পুরুষের মত কখনও কখনও নারীরও চরমপুলক লাভের ঠিক পূর্বে ঘুম ভাঙিয়া গিয়াছে।

স্বপ্নদোষের কারণ

ডঃ কিন্‌যেরা বলেন যে মানুষের দেহাংশের স্পর্শন-মর্দনে বা মানসিক উত্তেজনায় মস্তিষ্কের মাধ্যমে যৌনবোধের চেতনা হইলেও প্রধানত মেরুদণ্ডের নিম্নভাগে অবস্থিত স্নায়বিক কেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের মারফতেই সারা শরীরে অনুভুতি ছড়াইয়া পড়ে। ইহাতে মাংসপেশীসমূহের ছন্দে ছন্দে সঙ্কোচন ও প্রসারণ হয় এবং চরমপুলকলাভের সময় সারা দেহে বা দেহাংশবিশেষে প্রচাপ ও প্রকম্পনও হয়। জাগ্রত অবস্থায় বা স্বপ্নাবেশে যৌন-উত্তেজনায় একই অবস্থা দৃষ্ট হয়। পার্থক্যের মধ্যে এই হয় জাগ্রত অবস্থায় মানুষ কতকগুলি অভিজ্ঞতালব্ধ ও তথাকথিত শালীনতাজাত বাধাবিবেচনা মানিয়া চলে–স্বপ্নাবেশে সে বিধিনিষেণের ধার ধারে না। তাই পুরুষেরা জাগ্রতাবস্থায় যে সমস্ত কর্ম করিবে না এরূপ বহু ব্যাপার স্বপ্নাবেশে দেখে। যথা–শিশু সংসর্গ, নিকট আত্মীয়া মৈথুন, দলগত মৈথুন, অস্বাভাবিক বা অসম্ভব প্রক্রিয়ায় সন্তোগ, যৌনাঙ্গ প্রদর্শন ইত্যাদি। একটি বিশেষ কথা এই যে স্বপ্নাবেশে অপেক্ষাকৃত ধীরগামী পুরুষ বা নারীও অতি দ্রুত চরমপুলকলাভ করিতে পারে ও করিয়া থাকে।

স্বপ্নদোষের শারীরিক কারণের মধ্যে রাত্রে গুরুভোজন, পোষাকপরিচ্ছদের প্রচাপ, বিছানায় কোমলতা ও উষ্ণতা, পার্শ্ববর্তী কাহারও শরীরে সংস্পর্শ, গ্রন্থি রসের প্রভাব, স্বাস্থ্যের অবস্থা, ক্লান্তি ইত্যাদি প্রধান। মানসিক কারণই মুখ্য। নিদ্রাবেশে যেন অনুভূতিশীলতা বাড়িয়া যায়, তাই জাগ্রত অবস্থায় যতটুকু যৌন-উত্তেজনা সম্পাদনে অপারগ হইত স্বপ্নে তাহা করিতে পারে।

নর ও নারীর কামস্বপ্ন সম্পর্কে ডঃ কিনযেদের তুলনামুলক তালিকায় লক্ষ্য করিবার বিষয়

উৎপত্তি—————————-নারী———————-নর

দৈহিক উত্তেজনা——————–হ্যাঁ———————-হ্যাঁ
মানসিক উত্তেজনা——————হ্যাঁ———————-হ্যাঁ
নিদ্রায় বিধিনিষেধের হ্রাস————কখনও————–বেশীর ভাগে
গ্রন্থি-প্রচাপ————————-না—————–প্রমান নাই
স্নায়বিক গোলযোগ———— —–বিরল——————বিরল
মানবেতর জন্তু হইতে বিবর্তন——–খুব কম তথ্য————–কম তথ্য
আদিম লোকের মধ্যে প্রমাণ পাওয়া—-খুব কম——————–কম

প্রকোপ

চরমপুলকলাভ হউক বা না হউক——-৭০%———প্রায় ১০০%
চরমপুলকলাভসহ (৪৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত)—–৩৭%——-৮৩%
চমকপুলকলাভ ব্যতীত———-৩৩%———–১৭%এর কম
সবচেয়ে বেশী————৪০ এর কোঠায়——–১৩-২৯ বৎসর বয়সে

পৌনঃপুনিকতা

কম বয়সের গড়পড়তা (বৎসরে)———৩-৪ বার———৪-১১ বার
অধিক বয়সের গড়পড়তা (বতসরে)——-ঐ———-৩-৫ বার
(বয়সের পঞ্চবার্ষিক কালগুলিতে নিয়মিত)
বৎসরে ৫ বারের বেশী———৮%——–৪৮%
মাসে ২ বারের বেশী———-৩%——–১৪%
সপ্তাহে ১ বারের বেশী———১%———৫%
তারতম্যের পরিমাণ———-অল্প——–অনেক বেশী

বয়স ও দাম্পত্য অবস্থার সম্পর্ক

(৪০ বৎসর বয়স পর্যন্ত চরম তৃপ্তিসহ)
অবিবাহিতদের————২২%———-৬০%
বিবাহিতদের————–২৮%———-৪৮%
পূর্বে বিবাহিতদের———-৩৮%———৫৪%
চরম তৃপ্তিসহ
পৌনঃপুনিকতা—দাম্পত্য অবস্থার সহিত সম্পর্ক নাই—কুমারদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক

অন্যান্য সম্পর্ক

শিক্ষার স্তরের সঙ্গে সম্পর্কে——-নাই——–কলেজীদলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক পিতামাতার পেশার সহিত সম্পর্ক——নাই———নাই
কৈশোরে পদার্পণ করিবার বয়সের সঙ্গে সম্পর্ক—–নাই——সামান্য
ধর্মভাবের সহিত সম্পর্ক—–ভক্তিমতীদের মধ্যে কম——সম্পর্ক নাই

কামতৃপ্তির অপর উপায়গুলির সঙ্গে সম্পর্ক

কামস্বপ্ন অপর উপায়গুলির অভাব পূরণ করে—–১৪%—–কতক ক্ষেত্রে
ক্ষতিপূরণ হিসাবে যথেষ্ট নয়——–হ্যাঁ———হ্যাঁ
অপর যৌনক্রিয়ার সহিত সম্পর্কে——-৭%——-কতক ক্ষেত্রে
যৌন-ব্যাপারে সাড়া দিবার ক্ষমতার সহিত সম্বন্ধ—–হ্যাঁ—–কতক ক্ষেত্রে
কামস্বপ্ন ও আত্মরতির সম্বন্ধ——কতকটা——-কতক ক্ষেত্রে কামস্বপ্ন ও আত্মরতির সময়
কামকল্পনার সম্বন্ধে———কতকটা——-কতক ক্ষেত্রে

স্বপ্নে দৃষ্ট

কে বা কাহারা মনে না থাকা——১%——-কতক ক্ষেত্রে
অভিজ্ঞতার পুনরাভিনয়——–প্রায়ই——–প্রায়ই
বাঞ্ছিত অভিজ্ঞতা———কখনও——মাঝে মাঝে

আমরা পূর্বেই বলিয়াছি যে, নিদ্রাবস্থায় পুরুষের শুক্রস্খলন এবং নারীর চরমপুলকলাভ স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। যদি উহা অতিমাত্রায় এবং রাত্রির মত দিনের বেলায়ও হইতে থাকে তবুও বিশেষ ভয়ের কারণ নাই। আমরা নিম্নে প্রতিকারের কথা বলিতেছি। একটু পূর্বেই যে তালিকা দেওয়া হইয়াছে উহা হইতেই বুঝা যাইবে যে, নারীদের ৭০% এবং পুরুষদের মধ্যে প্রায় ১০০% ক্ষেত্রে স্বপ্নদোষ হয়। কাহারও কাহারও জীবনে মাত্র কয়েকবার হইতে কাহারও কাহারও প্রায় প্রত্যেক নিদ্রাবেশে উহা হয়। তাই এ সম্পর্কে অযথা শঙ্কিত হইতে নাই। বিবাহের পূর্বেই স্বপ্নদোষ বেশী হয়। আয়ুর্বেদ ও ইউনানী শাস্ত্রের মতে এই ধরনের স্বপ্নদোষের অর্থ এই যে, শুক্রতারল্য ব্যতীত ঐরূপ ঘটিতে পারে না! ঘন ঘন স্বপ্নদোষ হইলেই বুঝিতে হইবে—শুক্রতারল্য ঘটিয়াছে, এই ধারণা ভুল।

প্রতিকার

নানা কারণ বা শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন অবস্থার ফলে সুপ্তিস্থলনের তারতম্য হইতে পারে। যথা—

(১) অতিরিক্ত মদ্যপান। ইহা ছাড়া অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ, বিশেষত ডিম, সস, ঝিনুক, শেলফিস, যকৃৎ, গরম মসলা ইত্যাদি উত্তেজক খাদ্য গ্রহণ। (সকল প্রকার স্বপ্নদর্শনের অন্যতম কারণ রাত্রির আহার ভাল হজম না হওয়ায় পেট গরম হওয়া)।

(২) অতিরিক্ত কামচিন্তা। প্রেমাত্মক নাটক ও গল্পের বই পড়িয়া উত্তেজনার সৃষ্টি করিলে উহা হস্তমৈথুন বা অন্য কোন প্রতিক্রিয়ায় প্রশমিত না হইলে স্বপ্নদোষ হইয়া যাইতে পারে।

(৩) জাগ্রত অবস্থায় অতিমাত্রায় শৃঙ্গার। কামপাত্রের সহিত যৌনবিষয়ক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা বা ছোঁয়াছুঁয়ি অথবা পাশ্চাত্য প্রথায় নৃত্য বা আমোদজনক ক্রীড়াকৌতুকজনিত উত্তেজনার নিবৃত্তি প্রায়ই, স্বাভাবিকভাবে না হইলে, স্বপ্নদোষ হইয়া থাকে।

(৪) গরম বা কোমল শষ্যায় শয়ন।

(৫) শয্যায় চিত হইয়া শয়ন। (এই অভ্যাস দূর করিতে হইলে একটি গামছায় দুইটি গেরো দিয়া একটি পেটের ও অপরটি পিঠের উপর রাখিয়া গামছা শরীরে বাঁধিয়া শুইবেন)।

(৬) যৌনপ্রদেশে গরম কাপড় বা লেপের দরুন উষ্ণতা সঞ্চার।

(৭) মূত্রাধারের পরিপূর্ণ অবস্থা। মূত্ৰাধার পূর্ণ হইলে শুক্রকোষে চাপ লাগে। এই জন্য শেষরাত্রে সচরাচরই লিঙ্গোদ্রেক হইয়া থাকে। (শুইবার পূর্বে এবং মধ্যরাত্রে উঠিয়া প্রস্রাব করা ভাল) ।

(৮) শুক্রকোষের উত্তেজনা (Irritation)।

(৯) রাত্রে বেশী দেরিতে খাওয়া, উত্তেজক জিনিস খাওয়া।

(১০) লিঙ্গমুণ্ড বা যোনিদেশ অপরিষ্কার রাখা। (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করার জন্য নিয়মিতভাবে ঐ সকল ধৌত করা উচিত। ত্বক-ছেদ (circumcision) করিলে বালকদের লিঙ্গমুণ্ড পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে)।

উপরোক্ত কারণসমূহ জানা থাকিলে অনেকে নিজে নিজেই স্বপ্নদোষ নিয়ন্ত্রিত করিতে পারিবেন। নিজের বেলায় উপরোক্ত কারণসমূহের কোনটি বা কোন্‌গুলি ক্রিয়া করিতেছে, তাহা সম্যক্ বুঝিতে পারিলেই ঐ কারণ বা কারণসমূহের প্রতিরোধ করিতে পারা যাইবে। যথা

খাদ্য বা মদ্যপানজনিত উত্তেজনার প্রতিষেধক হইবে মিতাহার, লঘুপাক হাল্কা জিনিস খাওয়া। রতিচিন্তার প্রতিষেধক হইবে প্রেমাত্মক পুস্তক, সিনেমা, সঙ্গীত প্রভৃতি বর্জন এবং কোন গুরুতর বিষয়ে মনকে নিবিষ্ট রাখা ও সংসঙ্গ করা। একজন বেশ্যা রুসোকে (Rousseau) উপদেশ দিয়াছিল—“আপনি মেয়েদের সংস্রব ছেড়ে অঙ্কশাস্ত্রে মনোনিবেশ করুন।”

রাত্রে শুইতে যাইবার পূর্বে কনুই অবধি হাত, হাঁটু অববি পা, মুখ, চোখ, ঘাড়, কান প্রভৃতি (মুসলমানদের ওজু করার মত) ঠাণ্ডা জলে ধোওয়া-মোছা এবং লিঙ্গদেশ বা যোনিপ্রদেশে ঠাণ্ডা জল কিছুক্ষণ ঢালা ভাল। শুইবার পূর্বে কোনও সং, মহৎ ইষ্ট ব্যক্তি বা বস্তু সম্বন্ধে চিন্তা করা ভাল।

বিবাহিত জীবনের পরিমিত দাম্পত্য সংসর্গে স্বপ্নদোষ আপনা হইতেই কমিয়া যাইবে, ইহা একরূপ অবধারিত সত্য। সুতরাং এ সম্পর্কে অষথা ভয় পাইবার কিছু নাই। নারীজীবনের স্বপ্নদোষের একটি প্রধান বিশেষত্ব এই যে, সঙ্গমক্রিয়ায় বিশেষ অভিজ্ঞ ও অভ্যস্ত না হইলে তাহারা সম্ভোগের স্বপ্ন দেখে না।

স্বকাম বা আত্মপ্রেম (Narcissism)

গ্রীক বীর Narcissus নাকি তাহার নিজের চেহারা নদীর জলে প্রতিফলিত দেখিয়া উহার প্রেমে পড়েন। তাই স্বকামের নাম Narcissism রাখা হইয়াছে। এইরূপ প্রবৃত্তিবিশিষ্ট নর বা নারী নিজেদের শরীরের প্রতিচ্ছবি এবং বুদ্ধির দিকে একরকম প্রবল আকর্ষণ অনুভব করে। ইহারা আয়নায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখিয়া আরাম বোধ করে, এমন কি আদরসোহাগ ও প্রেম-নিবেদন পর্যন্ত করে। নানারকম সাজ-পরিচ্ছদে সজ্জিত নিজেদের দেহ-সৌষ্ঠবের প্রতিচ্ছবি উপভোগ করে, কখনও নগ্ন দেহ পর্যবেক্ষণ করিয়া আনন্দ পায়। নিজেদের ফটো দেখিয়া আত্মহারা হয়। পুরুষদের মধ্যে অনেকে স্বকামেই বেশী আমোদ পায়।

নর্তক-নর্তকী, গায়ক-গায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মধ্যে আত্মপ্রেমের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আত্মপ্রেম অল্পবিস্তর সকলেরই আছে কিন্তু উহা বিকৃতির আকার ধারণ করে তখনই যখন বিপরীত লিঙ্গ সংসর্গের চেয়েও আত্মপ্রেম মধুর মনে হয়। এই অবস্থায় প্রতিষেধক বিপবীত-লিঙ্গ ব্যক্তিদের সাহচর্য। তাহাদের প্রতি প্রেমই স্বকামের সংশোধক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *