২.১ বরণবিধানম্‌ ও সম্বন্ধনিশ্চয়ঃ (বিবাহের ধরন)

দ্বিতীয় ভাগ – প্রথম অধ্যায়

চৌষট্টিকলায় বিচক্ষণব্যক্তি কন্যাগনকর্তৃক অনুরাগত বীক্ষমান* হলেসমাগম ব্যতীত সম্প্রয়োগ হয় না; এজন্য তার সমাগমোপায়–আবাপ বলা হচ্ছে। যে উপায় অবলম্বন করলে স্ত্রীসমাগম লাভ করা যায়, তাকে আবাপ বলে। তার মধ্যে কন্যার প্রাধান্যহেতু কন্যাসম্প্রযুক্তনামক অধিকরণ আরম্ভ করা হচ্ছে। তার মধ্যে উদ্বাপ (সমাগম লাভের শ্রুয়মান বৈধ ও অবৈধ উপায়) আটটি বিবাহ– ব্রাহ্ম, দৈব, প্রাজাপত্য, আর্য, গান্ধর্ব, আসুর, পৈশাচ ও রাক্ষস। তার প্রথম চারটি ধর্ম, আর পরে চারটি অধর্ম, সুতরাং আগে চারটি করনার্থ বরণসম্বিধান নামক প্রকরণ প্রথমে বলা হচ্ছে।
‘সমানবর্ণজাতা, মনোবাক্‌কর্ম দ্বারা অন্যে অপ্রদত্তা ও শাস্ত্রানুসারে স্বীকৃত স্ত্রীতে ধর্ম, অর্থ, পুত্র, সম্বন্ধ, পক্ষবৃদ্ধি এবং অকৃত্রিম রতিলাভ করতে পারা যায়।।’১।।

–পত্নীপ্রয়োগাখ্য ধর্ম এবং রত্যাদিপ্রবর্তন। যৌতুকলাভে ও গার্হস্থ্য অনুষ্ঠানে অর্থ। পুত্র দৃষ্টার্থ ও অদৃষ্টার্থ। সম্বন্ধ সহৈকভোজনাদি (এক পঙ্‌ক্তিতে একত্র বসে ভোজন করা) করার কারণ। স্বপক্ষের বৃদ্ধি, পক্ষান্তর লাভে। অকৃত্রিম রতি–অতিরিক্ত বিশ্বাস হওয়ায়।।১।।

যেহেতু এরূপ হয়–
‘সেহেতু অতিজনোপেতা, মাতাপিতৃমতী, নিজ-বয়স অপেক্ষা অন্যুন তিন বছরের ন্যুনবয়স্কা, শ্লাঘ্য আচার, ধন ও পক্ষবত্‌, সম্বন্ধপ্রিয়, সম্বন্ধিজনসমাকুল কুলে প্রসুত এবং যার মাতাপিতৃকুলে পক্ষ প্রভূত পরিমানে আছে, রূপ, শীল, ও লক্ষণসম্পন্না, যার নখ, দন্ত, কর্ণ, কেশ, চক্ষু এবং স্তন–ন্যুন, অধিক বা বিনষ্ট নয়, যার শরীর রোগপ্রকৃতিসম্পন্ন নয়, তাদৃশ কন্যাকে তাদৃশ শ্রুতবান্‌ পুরুষ মনে মনে সমাধান করবে।।’২।।

‘ঘোটকমুখ বলেন- যাকে গ্রহণ করে পুরুষ নিজেকে কৃতী বলে মনে করবে ও সমান জনগনের নিকট নিন্দাভাগী হবে না। তাতেই প্রবর্তিত হওয়া উচিত।।’৩।।

বরণ দ্বিবিধ–পৌরুষ ও দৈব বিধান দ্বারা সম্পন্ন। তার মধ্যে প্রথমবিধ বরণকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে–
‘তার বরণের জন্যে মাতা-পিতা এবং সম্বন্ধিগন প্রযত্ন করবে। যাদের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়, তাদৃশ উভয়ত্র সম্বন্ধযুক্ত মিত্রগনও প্রযত্ন করতে পারেন।।’৪।।

‘অন্য বরণকারীর প্রত্যক্ষদৃষ্ট ও সামুদ্রিকশাস্ত্রোক্ত দোষ সকল সেই কন্যার মিত্রজনকে শোনাবে এবং এ-নায়কের কুল-শীল, সৌন্দর্য ও দানশৌণ্ডীর্য্যাদি, * পুরুষকার-নিষ্পন্নশাস্ত্রকলাগ্রহনাদি এবং যে সকল গুণের কীর্তন করলে কন্যাদানের অভিপ্রায় বর্ধিত হয়, সে সকল গুণ তার পিতা-মাতাকে শ্রবণ করাবে। আর বিশেষত যে সকল গুণ কন্যার মাতার অনুকূল, তা তাদেরকে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের শুভসম্পত্তিযুক্ত করে দেখাবে।।’৫।।

‘দৈবচিন্তকরূপে শকুন, নিমিত্ত, গ্রহলগ্নবল ও লক্ষণাদি দেখিয়ে নায়কের ভবিষ্যত অর্থ-সম্বন্ধে কল্যাণকর বিষয়ের অনুবর্ণনা করবে।।’৬।।

–শান্তাদিকে শব্দকারী কাকাদি শকুন। নিমিত্ত তজ্জাতাদি। শুভগ্রহ লগ্ন হতে উপচয় স্থানে স্থিত বলে, দিক কাল ও স্বভাব দ্বারা যে বল, তাই। আর লক্ষণ শঙ্খ-চক্রাদি। ভবিষ্যত-অর্থ-সম্বন্ধ সৈনাপত্যাধ্যক্ষ এবং পত্তানাদিলাভ।।৬।।

‘অপর দিক্‌ হতে অন্য দৈবচিন্তককল্প ব্যক্তিবর্গ নায়ক কর্তৃক প্রেরিত হয়ে এসে বিশিষ্টকন্যালাভ শ্রবণ করিয়ে কন্যার মাতাকে উন্মাদ করে তুলবে।।’৭।।

–অমুক সেনাপতির কন্যা যেমন রূপবতী, তেমনই ধনবতী; সেই সেনাপতি তার কন্যা ঐ (পূর্বোক্ত) বরকে দেয়ার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে আমাদেরকে বিগত কল্য লক্ষণসংযোগ জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তা আমরা দেখলাম, সে বরের পক্ষে সে কন্যা নিতান্ত অনুপযুক্ত হবে না–ইত্যাদি বাক্যে কন্যার মাতাকে অনুরঞ্জিত করবে, সে কথায় অনুরক্ত হয়ে তার মাতা তার দুহিতাকে দান করতে অনুরাগ প্রকাশ করে।।৭।।

‘দৈব, নিমিত্ত, শকুন ও উপশ্রুতির আনুকূল্য জেনে কন্যাকে বরণ করবে। কন্যাপক্ষও দান করবে।।’৮।।

–পূর্বজন্মকৃত শুভ ও অশুভ কর্ম দৈবশব্দবাচ্য। তার অতিব্যঞ্জক বলে লক্ষত্রগ্রহাদিও দৈব। তার আনুকূল্য ষট্‌কাষ্টকাদিযোগ (মিত্রষড়ষ্টক, অরিষড়ষ্টক প্রভৃতি জ্যোতিঃশাস্ত্রসিদ্ধ যোগবিশেষ) না থাকা। একে বিয়ে করলে মঙ্গল হবে কিনা? এরূপ শাস্ত্রোক্ত নিমিত্ত এবং শকুনপূচ্ছাও (শাকুনশাস্ত্রোক্ত) করবে। নিশীথ কালে উঠে, তে-মাথা বা চারি-মাথা পথের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান হয়ে প্রশ্ন করবে, তার উত্তরে যে উপশ্রুতি পাবে (তৎকৃত প্রশ্নের উত্তরপ্রায় ধ্বনিবিশেষ) তাও গ্রাহ্য। এই সকলের আনুকূল্য জানতে পারলে, সেই বরকে দেয়ার জন্য ইচ্ছা করবে এবং দান করবে।।৮।।
‘কেবল মানুষের আনুকূল্যে বা নিজের যদৃচ্ছাক্রমে কন্যাদানের ইচ্ছা করবে না। ঘোটকমুখ এ কথা বলেন।।’৯।।

–অন্যের ইচ্ছায় বরণ বা দান করবে না। এটি পরমত হলেও নিজের অভিপ্রেত; সেহেতু প্রতিষেধ করেন নাই।
(নিজের মত পূর্বে দেখিয়ে তারই পুষ্টির জন্য ঘোটকমুখ মত দেখিয়েছেন। এটা আচার্যের অভিপ্রেত মত নয়। আচার্য মানুষের ইচ্ছাও প্রযোজ্য বলে স্বীকার করেছেন)।।৯।।

বরণকালে কন্যাকে দেখে নিমিত্ত জানতে পারবে। এটাই দেখাচ্ছেন–
‘বরণকালে বরয়িতা, অর্থাৎ বিবাহ জন্য বর উপস্থিত হলে, সে সময়ে কন্যাকে সুপ্ত দেখলে, আর তাকে বরণ করবে না; কারণ, শয়ন আল্পায়ুর সূচনা করে। সেরূপ রোদনকারিনী দুঃখভাগিনী হয়; গৃহ হতে নিষ্ক্রমকারিণী গৃহত্যাগিনী হয়; সুতরাং ত্যাজ্যা। আর যার নাম অপ্রশস্ত- যেমন ভঙ্গিকা, বিত্রাটিকা, মাতঙ্গিনী ইত্যাদি; গুপ্তা–অপ্রদর্শিত হলে দোষের আশঙ্কা থাকে; দত্তা–অন্যকে দেয়ার জন্যে প্রতিশ্রুতা; ঘোনা,–কপিলা, পতিঘ্নী; পৃযতা–শুক্লবিন্দুযুক্তা, অর্থহানিকরী ও পতিঘ্নী; ঋষভা–পুরুষাকৃতিসম্পন্না, দুঃখভাগিনী; বিমুক্তা–বৃহন্নলাটা, পতিঘ্নী শুচিদুষিতা–যে পিতার মুখে সৎকারার্থ অগ্নি দিয়েছে; সাঙ্করিকী–পরপুরুষদুষিতা; রাকা–যে রজোদর্শন করেছে; ফলিনী–মূকা; মিত্রা–মিত্র বলে যার গ্রহণ পূর্বে করা হয়েছে; স্বনুজা–নিজবয়স অপেক্ষা যার বয়স তিন বছরেরও ন্যুন–দুই বা এক বছরের ছোট এবং বর্ষকরী–যার হাত-পা ঘামে, সে পতিঘ্নী। এরা অবশ্যপরিহার্যা।।’১০।।

‘নক্ষত্রনামী–যেমন শ্রবণা, বিশাখা, অশ্বিনী ইত্যাদি; নদীনাম্নী–গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী ইত্যাদি; বৃক্ষনাম্নী–জম্বু, পিয়ঙ্গু, মালতী, মল্লিকা, কেতকী, গোলাপ ইত্যাদি এবং লকার ও রেফ যে নামের উপান্ত্য বর্ণ, শেষ স্বরবর্ণের পূর্ববর্ণ। যেমন কমলু, বিমলু, চারু, তারু, হারু ইত্যাদি। সেই সকল কন্যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বরণবিষয়ে তাদেরকে পরিত্যাগ করবে।।’১১।।

‘কেউ কেউ বলেন–যাকে দেখলে মন ও চক্ষুর প্রীতি হয়, সেই কন্যাকে বরণ করলে ও পত্নী বলে পরিগ্রহ করলে ধর্ম, অর্থ ও কাম প্রাপ্তি অবশ্য হয়। অন্য কন্যা যদি লক্ষণযুক্ত হয়, অথচ মন ও চক্ষুর প্রীতিকরী না হয়, তবে তাকে আদর করবে না।। ’১২।।
-দোষ থাকলে তার গুরুলাঘব বিবেচনা করে যাতে মন ও চক্ষুর প্রীতি থাকবে, তাকেই আদর করবে।।১২।।

‘সেই জন্য প্রদান সময় কন্যাপক্ষ কন্যাকে তার বেশভূষা করে সামনে আনবে। আর অন্য সময়ে, অপরাহ্নকাল কর্তব্য নিত্য কেশাদিপ্রসাধন এবং সখীদের সাথে ক্রীড়া করান কর্তব্য। যজ্ঞ ও বিবাহাদি স্থলে যখন জনসঙ্ঘের সম্মিলন হয়, তখন সেখানে প্রযত্ন সহকারে সাজিয়ে দর্শন করান উচিত। তথা উৎসবকালেও; কারণ, কন্যা পণ্যসমানধর্মা- অর্থাৎ বিক্রেতব্যতুল্য। প্রসাধিত হলে আদর করেই দর্শন করে থাকে।।’১৩।।

‘বরনার্থ পূর্বোক্তি সম্বন্ধিসঙ্গত ভদ্রদর্শন (সভ্য-ভব্য) অনুকূলকথামুখে উপগত পুরুষদেরকে দধ্যক্ষতাদিমঙ্গল দ্রব্যের উপহার দিয়ে প্রতিগৃহীত করবে। কন্যাকে বেশ-ভূষায় সজ্জিত করে অন্যচ্ছলে তাদেরকে দেখাবে। যতক্ষণ দৈব ও পরীক্ষণ ব্যাপার সমাহিত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কন্যাকে সম্মুখে রাখিবে। এই ব্যাপার যত দিন প্রদান বিষয়ে স্থির না হয়, ততদিন পর্যন্ত অবশ্য পালনীয়।।’১৪।।

‘বরপক্ষরা কন্যাপক্ষ কর্তৃক স্নানাদিবিষয়ে অনুরুদ্ধ হলে, ‘সবই হবে,’ এই বলে সেই দিনই স্নানাহারাদি করতে সম্মত হবে না।।’১৫।।
-প্রজাপতি অনুকূল হলে সবই হবে। অভ্যুপগম অঙ্গীকার। স্বীকার করবে না।।১৫।।

‘যে দেশের যেরূপ প্রবৃত্তি, সেদেশে সে প্রবৃত্তি অনুসারে ব্রাহ্ম, দৈব, প্রজাপত্য ও আর্য বিধির অন্যতম বিধি অনুসারে যথাশাস্ত্র পরিণয় করবে। ইহা হল বরণ-বিধান।।’১৬।।
–শাস্ত্রোক্ত—স্বগৃহ্যোক্ত বিধান।১৬।।

আভিজন বর্গ পরিশীলন করে সম্বন্ধ নিশ্চিত না করতে পারলে, বরন করা হবে না; সুতরাং সম্বন্ধ নিশ্চয় বলা যাইতেছে—
১। এ বিষয়ে শ্লোক আছে–
‘সমস্যা আদি, সহক্রীড়া, বিবাহ ও সঙ্গম সমান ব্যক্তি সহিত কর্তব্য। উত্তমের বা অধমের সহিত কখনই বিধেয় নহে।।’১৭।।
২। ‘যেখানে নায়ক কন্যাকে গ্রহণ করিয়া ভৃত্যের ন্যায় বর্তিত হয়, সেখানে সে সম্বন্ধকে উচ্চ সম্বন্ধ কহে। মনস্বিগন তাহার পরিত্যাগ করিয়া থাকেন।।’১৮।।
৩। ‘সেখানে স্বীয় বান্ধব, শ্বশুর, শ্যালকাদি কর্তৃক পুরুস্কৃত হইয়া স্বামীর ন্যায় নায়ক বিচরণ করে; সে সম্বন্ধ শ্ল্যাঘ্য নহে বলিয়া হীন সম্বন্ধ। সাধুগন সে সম্বন্ধো নিন্দনীয় মনে করেন।।’১৯।।
৪। ‘সেখানে পরস্পর পরস্পরের সুখের অনুভব করিয়া আনন্দক্রীড়ায় নিমগ্ন হয় এবং পরস্পর পরস্পরকে উচ্চ বলিয়া ব্যবহার করিয়া থাকে, সেখানে সেই সম্বন্ধই প্রশস্ত।।’২০।।
৫। ‘বৈবাহিকসূত্রে উচ্চ সম্বন্ধ করিয়াও পরে জ্ঞাতিগন মধ্যে যদি নত হইয়া থাকিতে হয়, তবে সে সম্বন্ধও পরিত্যাজ্য নহে; কিন্তু হীনসম্বন্ধ কখনই করিবে না, সাধুগন তাহার ভূয়ো-ভুয়ো নিষেধ করিয়াছেন, সে সম্বন্ধ অতীব নিন্দনীয়।।’২১।।
–জ্ঞাতি গৃহে স্বয়ং যাইয়া নিজের ন্যূনতা স্বীকার করিবে; কিন্তু শ্বশুরগৃহে যাইয়া কখনই নিজের ন্যূনতা স্বীকার করিবে না; কারণ পত্নী যদি কখনও স্বামীকে নীচ বলিয়া মনে করে, তবে তাহার গর্ভে সে সন্তান হইবে, সে সন্তান দ্বারা নিজকূলের কখনই উৎকর্ষসাধন সম্ভবপর হইবে না; সুতরাং নিজের ন্যূনতা স্বীকার শ্বশুরালয়ে কখনই কর্তব্য নহে।।২১।।

————————————–
* কোনও স্বার্থসিদ্ধির অনুকূল যে নিপূণতাসহকারে বিশেষ দর্শন, তাকে বীক্ষণ বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *