যৌনবোধের উন্মেষ

শৈশবে দৈহিক অনুভূতি

যৌনবিজ্ঞানী, মনোবিশ্লেষক ও শিশুমনোবিজ্ঞানবিদগণের অনেক বাদবিতণ্ডা ও গবেষণার। ফলে বর্তমানে ইহা প্ৰায় সর্ববাদিসন্মতরূপে স্বীকৃত হইয়াছে যে, মানুষের অন্যান্য বৃত্তির ন্যায় যৌনবৃত্তিও তাহার মধ্যে শৈশবেই সুপ্ত থাকে, ব্যাস ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্ৰিয়চেতনাব ফলে উহা ক্ৰমবিকাশ লাভ করে মাত্র। ফ্রয়েড বলেন–In reality the new-born infant brings sexuality with it into the world, sexual sensations accompany it through the days of lactation and childhood, and very few children can fall to experience sexual activities and feeling before the period to puberty. অর্থাৎ সদ্যপ্রসূত সন্তান যৌনবোধ লইয়াই জন্মগ্রহণ করে। সে দুগ্ধপান করিবার কালে এবং শৈশবে যৌন-অনুভূতি বোধ করে এবং প্রায় সকল ছেলেমেয়েই বন্যপ্ৰাপ্তির পূর্বেই যৌন-অনুভূতি লাভ করে এবং ঐ ধরনের কার্যকলাপে লিপ্ত হয়।

পূর্বে অনেকের মত ছিল, শৈশবে মানুষের মধ্যে যৌনবোধ বিদ্যমান থাকার জাজ্বল্যমান প্ৰমাণ এই যে, অতি শৈশবেই শিশুকেই স্বীয় জননেন্দ্ৰিয় লইয়া খেলা করিতে দেখা যায়। ফ্রয়েড ও এলিস শিশুচরিত্রের এই দিকটা উপেক্ষা করেন নাই, তবে তাঁহারা বলিয়াছেন যে, অনেক শিশুকে জননেন্দ্ৰিয় লইয়া খেলা করিতে দেখিয়াই উহাকে যৌনবোধের লক্ষণ বলিয়া সিদ্ধান্ত করা ভুল হইবে; কারণ, অনেক শিশুকে তাহাদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ বা তর্জনী লইয়া খেলা করিতেও দেখা যায়। এ সম্বন্ধে যে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাইতে পারে। তাহা এই যে, জননেন্দ্ৰিয়, হস্তাঙ্গুলি বা পদাঙ্গুলি-এ সমস্তই শিশুর নিকট কৌতূহলোদ্দীপক ক্রীড়নক মাত্র। এই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লইয়া উদ্দেশ্যহীনভাবে ক্রীড়া করিতে করিতে শিশু ক্ৰমে একপ্রকার পুলক অনুভব করে। এই পুলকানুভূতি হইতেই তাহার মানসিক চেতনা সর্বাপেক্ষা পুলকপ্ৰদ প্রত্যঙ্গে কেন্দ্রীভূত হয়। ইহাই যৌনবোধের প্রথম প্ৰকাশ।

যে সমস্ত অঙ্গের স্পর্শনে বা ঘর্ষণে এই পুলকানুভূতির সৃষ্টি হয়, তন্মধ্যে জননেন্দ্ৰিয়, মুখ ও গুহ্যদ্বারই প্ৰধান।

আমরা শিশুকে মাতৃস্তন্যের অভাবে অনেক সময় নিজের হস্তাঙ্গুলি চুষিতে দেখিয়া থাকি। শিশুজীবনে ইহা প্রাত্যহিক ঘটনা। মাতৃস্তন্য পানে শিশুর সর্বপ্রথম পুলকানুভূতি ঘটিয়া থাকে। এই অনুভূতি হইতেই শিশু মায়ের স্তনের অভাবে নিজের হস্তাঙ্গুলি চুধিয়া থাকে। বহু যৌনবিজ্ঞানীর অভিমত এই যে, এই অনুভূতিই শিশুদিগকে পববর্তী জীবনে আত্মরতি শিক্ষা দিয়া থাকে।

গুহ্যদ্বার সম্বন্ধেও এই কথা। যতদিন মল সবল ও স্বাভাবিক হইতে থাকে, ততদিন শিশু খুবসম্ভব নিজের গুহ্যদ্বারের অস্তিত্বই বুঝিতে পারে না। কিন্তু কোষ্ঠকাঠিন্য হইলে কিংবা কোনও চর্মরোগের আবির্ভাবে অথবা কৃমির প্রকোপে গুহ্যদ্বাবে চুলকানি হইলেই শিশু নিজের গুহ্যদ্বারের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয় এবং কোষ্ঠ পরিষ্কার হইবার এবং চুলকাইবার পারে সে গুহ্যদ্বারে যে পুলক অনুভব করে, উহাই ক্ৰমে যৌনানুভূতিতে পর্যবসিত হয়।

বালক শিশুর গুহ্যদ্বারের সম্বন্ধে যে কথা সত্য, বালিক শিশুর উহা ব্যতীত বৃহদোষ্ঠ, ভগাঙ্কুর, যোনিনালী ও মূত্রনালীর সম্বন্ধেও সেই কথাই সত্য। এই সকল স্থানের সহিত অঙ্গুলি প্ৰভৃতি ঘর্ষণে যে পুলকানুভূতির সৃষ্টি হয়, উহা হইতেই বালিকা হস্তমৈথুন শিক্ষা করিয়া থাকে। ডাঃ হামিণ্টন সুদীর্ঘকালের গবেষণার। ফলে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, শতকরা ২১ জন পুরুষ ও শতকরা ১৬ জন স্ত্রীলোক শৈশবে মলমূত্র নিষ্কাশনের সময়েই গুহ্যদ্বার ও জননেন্দ্ৰিয় হইয়া খেলা করিয়া থাকে।

মানসিক অনুভূতির ক্রমবিকাশ

এই সমস্ত দৈহিক অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মধ্যে একটা মানসিক ক্ৰমবিকাশও লক্ষিত হইয়া থাকে। শিশুমনে এই সময়ে চুম্বন ও আলিঙ্গন করিবার প্রবৃত্তি জাগ্রত হয়। বিস্ময়ের বিষয় হইলেও ইহা সত্য যে, ভালবাসা আদর-যত্ব ও প্ৰযোজন সিদ্ধিব মাপকাঠিতে শিশু নিজের প্রিয় ও অপ্রিয়জন নির্ধারিত করিয়া ফেলে।

ফ্রয়েডের বিচিত্ৰ মতবাদ-শিশুর আত্মীয়সম্ভোগ-লিপ্সা

শিশুমনে যৌনচেতনার উন্মেষের একটি প্রধান পথ যে আত্মীয়সম্ভোগ-লিপ্সা (Incestuous love), ইহা ফ্রয়েডের অভিনব মত। এই মতবাদ  লইয়া ফ্রয়েড একদিক্রমে অনেক পুস্তিকা রচনা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, শিশুমনে এই আত্মীয়সম্ভোগ-বৃত্তি এত প্ৰবল ও সুস্পষ্ট যে, ধালিকাশিত মায়ের প্রতি ও বালিকাশিশু পিতার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ অনুভব করিয়া থাকে। মালিনোস্কিও ফ্রয়েডের মত সমর্থন করিয়াছেন। ডাঃ হামিণ্টন দীর্ঘদিনের গবেষণার। ফলে এই সিদ্ধান্তে আসিয়াছেন যে, শতকরা ১৪ জন বাল্যকশিশুই আত্মীয়সম্ভোগ-বাসনার পরিচয় দিয়া থাকে। ইহার মধ্যে শতকরা ১০ জন মায়ের প্ৰতি এবং ২৮ জন ভগিনীর প্রতি তীব্র আকর্ষণের পরিচয় দিয়াছে। পক্ষান্তরে আবার ওয়েস্টারমার্কের অভিমত এই যে, অতি ঘনিষ্ঠতার জন্য আত্মীয়সম্ভোগের প্রতি উদাসীনতা মানুষেরা পক্ষে স্বাভাবিক।

এলিস এই সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী দুই মতবাদের সামঞ্জস্য বিধান করিতে গিয়া বলিয়াছেন যে, আত্মীয়স্বজনের প্রতি শিশুরা যে যৌন-আকর্ষণ হয়, তাহা যে আত্মীয় বলিয়াই হয় তাহা নহে, তাহাদের ছাড়া অন্য কোন সংসৰ্গ সে পায় না বলিয়া। শিশু যাহাদের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মিশিবার সুযোগ পায়, তাহাদের প্রতিই তাহার ঐ রূপ আকর্ষণ দৃষ্ট হয়। সুতরাং এলিসের মতে, বিশেষ করিয়া আত্মীয়সম্ভোগ করিবার বৃত্তি বলিয়া কোনও বৃত্তি নাই; এ সমস্তই সংসর্গের ফল, অন্য কোনও বিশেষ বৃত্তির বহিঃপ্রকাশ নয়। ফ্রয়েডেব মতবাদ সম্বন্ধে আমরা সুদীর্ঘ আলোচনা একটু পরেই করিতেছি।

শৈশবের যৌন-আচরণ

শিশুদের যৌনবোধের ক্ষুবণ কখন হয় এই প্রশ্নের উত্তবে বলিতে হয় যে, আতি শৈশবেই কখনও কখনও যৌনতৃপ্তিলাভের চেষ্টা বালক-বালিকাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।

জার্মান পণ্ডিত ষ্টেকেল বলেন যে, সাধারণতঃ শিশুরা স্বীয় জননেন্দ্ৰিয় স্পর্শ বা ঘর্ষণ করে। ইহা ছাড়া ঊরু বা পদদ্বয়ের সঙ্কোচন হইতেও অনেকটা অনুমান করিয়া লওয়া যায় যে, শিশু আত্মরতির প্রাথমিক পুলক লাভ করিতেছে।

পিতামাতার সঙ্গে এক বিছানায় বা এক ঘরে শয়নকালে পিতামাতার মিলন লক্ষ্য করিয়া শিশুরা নানাভাবে প্রভাবান্বিত হয়। কাহার মনে বিরক্তি,  কাহারও মনে ঈর্ষা, কাহারও বা উত্তেজনা হইয়া থাকে। শিশুদের অনুকরণপ্রিয়তা আবার উহাদিগকে অনেক ক্ষেত্রে সমবয়সীদের সঙ্গে ঐরূপ ব্যবহার করিতে প্ৰলুব্ধ করে। শেষোক্তভাবেই ইউরোপ আমেরিকায় ‘বাপ-মা’ এবং বাংলাদেশে ‘বৌ বৌ’ খেলা করিবার কৌতূহল শিশুরা অনুভব করিয়া থাকে। এই ধরনের খেলা সাধারণতঃ সমবয়সীদের সঙ্গে, এমন কি ভাই-বোন, ভাই-ভাই, বোন-বোনের ক্ষেত্রেও আপোসে হইয়া থাকে।

‘বাপ-মা’ খেলায় একজন বাবা ও অপরজন মা সাজিয়া পিতামাতার দাম্পত্য ব্যবহারের অনেকটা পুনরাভিনয় করিয়া থাকে। পিতামাতার বা অপর কাহাদেরও যৌন-কাৰ্যবিধি, পশুপক্ষীর মিলনপ্রক্রিয়া বা বয়স্ক ছেলেমেয়েদের উদাহরণ প্ৰত্যক্ষ করিয়াই ছেলেমেয়েরা এই অভিনয় করিয়া থাকে। নিছক অনুকরণপ্রিয়তায় প্রণোদিত হইয়া ঐ রূপ করিলেও পুলক লাভে সমর্থ হইলে অদূর ভবিষ্যতে ইহারা আরও ঘনিষ্ঠতর কার্যকলাপে ব্ৰতী হইতে পারে।

ডাঃ গ্রাসেল বলেন : ‘ছেলেমেয়েদের যৌনজীবন পাড়াগাঁয়ে খুব সকাল সকালই আরম্ভ হয়, সাধারণত: বৎসর তিনেকের সময় হইতে। এক জোড়া পক্ষীর দৈহিক মিলন ছেলেমেয়েদের কৌতূহল উদ্দীপিত করিয়া বসিতে পারে। কুকুর, গরু ইত্যাদির মিলনের উদাহরণ উহাদের আরও প্ররোচিত করে। ইহার উপরে স্মানের বা অন্য সময়ে খেলার সাখীর বা ছোট বোনের উলঙ্গ শরীর দর্শন উহাদের আরও চিন্তার ও উত্তেজনার কারণ হয়। পাড়াগায়ের ছেলেমেয়েরা, তাহা ভদ্র পরিবারের হইলেও তিন-চার বৎসর বয়সেই অনেক সময় দেখা যায় ‘বাপ-মা’ খেলা করিয়া থাকে।

লিপিম্যান আর একটি ছাত্রের উক্তি হইতে উদ্ধৃত করেন :

‘আমরা পাঁচ ভাইবোন ছিলাম। বোনটিই সকলের ছোট। আমি দ্বিতীয় সন্তান। আমার বড় ভাই আমার দুই বৎসরের বড় ছিলেন। আমরা এই দুই ভাই শৈশবে প্ৰায় স্বাধীনভাবেই বাড়িয়া উঠি। মায়ের সময় অপর তিন জনের দেখাশুনা করিতেই কাটিয়া যাইত। আমার নয়। বৎসর বয়স পৰ্যন্ত আমাদের বিশেষ কোনও শাসনাধীনে থাকিতে হইত না। কেবল সন্ধ্যা ৮টার পূর্বে বাড়ী ফিরিলেই হইত। রবিবারে সারাদিন রাস্তাঘাটে খেলা করিয়া রাত্ৰি ৯টা পৰ্যন্ত বাহিরে থাকিতে পারিতাম।

‘আমার চার বৎসর বয়সে প্রথম যৌন-অভিজ্ঞতার সুযোগ লাভ করি। বড় ভাই তখন ছয় বৎসরের। তিনি প্ৰতিবেশিনী একটি ছয় বৎসর বয়স্ক মেয়ের যৌন-অঙ্গসমূহ স্পর্শ করিতেন। এইরূপ কাৰ্যকলাপ অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মধ্যেও খুবই প্ৰচলিত ছিল। আমরা ইহাকে ‘বাবা-মা’ খেলা বলিতাম। ঐ মেয়েটির ইহাতে সম্মতি ছিল—এমন কি উহার যেন সুখবোধ হইত বলিয়াই আমাদের মনে হইত।

‘ব্যাপারটি এক সন্ধ্যায় মেয়েটির মাতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কারণ সে নিজের ফ্রকের বোতাম খুলিতে বা বন্ধ করিতে পারিত না। মেয়েটির মাতা সন্দেহ কারিয়া উহার কাছে অনুসন্ধান করেন এবং ব্যাপারটি জানিতে পারিয়া আমাদের মায়ের নিকট আসিয়া নালিশ করবেন। আমাদের প্রচণ্ড শাস্তি দেওয়া হয়। ইহাতে আমরা মেয়েটির উপর খুব রাগান্বিত হই। ইহার পরে আমার বড় ভাই অন্যান্য মেয়ের সঙ্গে ঐ রূপ খেলা করিতে থাকেন এবং মাত্র চৌদ্দ কি পনের বৎসর বয়সে প্ৰকৃত যৌনক্রিয়া সম্পাদন করেন।

‘আমাদের মাতাপিতা এ সম্পর্কে জানিতে পাবিলেই আমাদের খুব শাস্তি দিতেন। কিন্তু ব্যাপারটি বন্ধ হইল না। আমি শাস্তির ভয়ে ঐ কাৰ্য হইতে বিরত হইলাম। উহাতে আমাদের স্পর্শসুখ ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না—অঙ্গুলীতে খুব আরাম বোধ করিতাম। অন্যেরাও এই রকম প্রায়ই করে বলিয়া আমরাও করিতাম।

‘আমি বলিতে বাধ্য যে, এই রকম যৌনখেলা পাড়াগাঁয়ে খুবই প্ৰচলিত। কয়েকদিন পূর্বে আমি একজন সাত বৎসরের ছেলে ও পাঁচ বৎসরের মেয়েকে গুদামের সিড়িতে ঐ রূপ করিতে দেখি। আমি জিজ্ঞাসা করিতে তাঁহারা বলে তাঁহারা শুধু খেলা করিতেছে। এইরূপ করা অন্যায় এবং তাহাদের পিতামাতা জানিলে ভয়ানক শাস্তি দিবেন-আমি এই কথা বলিলে ছেলেটি খুব সাহসের সঙ্গে উত্তর দেয় যে, তাহার পিতা ইহার জন্য কিছু মনে করিতে পারেন না, কারণ তিনি নিজে তাহার মাতার সহিত ঐরূপ করেন। তাহার পিতা একজন শ্রমিক ও কড়া লোক, আমার মনে হয় না যে তিনি ছেলেটির সম্মুখে অত খোলাখুলিভাবে দাম্পত্য ব্যবহার করেন।’

সাধারণতঃ ইহাতে যৌনবোধ বা ভালবাসা না থাকিলেও অনেকক্ষেত্রে কামভাব বা প্রেমের ক্ষুদ্রণ হইতে দেখা যায়। বালসুলভ প্রেমের অভিব্যক্তি হইয়া থাকে সাধারণতঃ আলিঙ্গন, চুম্বন, পরস্পবের কাছাকাছি বসা, প্ৰেমসম্ভাষণ, কোলে রাখা, বিরহে কাতরতা, উপহার আদানপ্ৰদান ইত্যাদির ভিতর দিয়া। মেয়েরা বরং ছেলেদের চেয়ে এ সব বিষয়ে অগ্রগামী হয়, কিন্তু ৭-৮ বৎসর বয়স পার হইলেই তাহাদের মধ্যে ধরা পড়ার ভয় ও গোপনতার আগ্ৰহ আসিয়া পড়ে।

কলেজের একটি সতর বৎসরের ছেলে অকপটে যে বিবৃতি দিয়াছে তাহা খুব শিক্ষাপ্রদ। আমি ছেলেটির নাম দিলাম সুকুমার। পাঠক-পাঠিকার স্মরণ রাখিতে সুবিধা হইবে। সে লিখিয়াছে :

‘এখন আমার বয়স ১৭ বৎসর, আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। যখন আমার বয়স ১০ বৎসর, তখন একদিন কোন এক উপায়ে (এখন মনে নাই) হস্তমৈথুন শিক্ষা করি। তখন আমার বীর্য নির্গত হইত না, কিন্তু বেশ পুলক অনুভব করিতাম। প্ৰথম প্ৰথম প্ৰত্যহই এইরূপ করিতাম। তার মাস খানেক পর হইতে আমার এ অভ্যাস আপনিই প্রশমিত হইতে লাগিল। তখন কোন সপ্তাহে দুইদিন বা একদিনই যথেষ্ট ছিল। তখন কিন্তু যৌনব্যাপার সম্বন্ধে আমার কোন ধারণাই ছিল না।

‘বৎসর খানেক পরে যৌনতত্ত্ব সম্বন্ধে কিছু কিছু জ্ঞানলাভ করিতে লাগিলাম। সম্ভবত তাহা স্কুলেব সহপাঠীদের কথোপকথনে। কিন্তু এ সম্বন্ধে তখন একরূপ উদাসীন ছিলাম।

‘ইহার দুইমাস পরে মাই আমার মাতুলালয়ে যাই। আমার নিজের কোন ভাই বা ভগ্নী নাই। আমার তিনজন মামাত বোন (প্রায় আমার সমবয়সী) আমাকে অত্যন্ত ভালবাসিত। আমরা প্ৰত্যহ দ্বিপ্রহরে ‘স্বামী-স্ত্রী’ খেলা করিতাম। এইরূপ কয়েকদিন করার পর আমার মন তাহাদের প্রতি আকৃষ্ট হইতে লাগিল, কিন্তু সাহস করিয়া কিছু বলিতে পারিতাম না।

‘আরও কয়েকদিন পরে দুপুরে বাড়ীর সকলে ঘুমাইলে আমার ভগ্নী তিনজনের একজন আমাকে সহবাসে প্ৰরোচিত করে। প্ৰথমত খেলার ছলে তাঁহারা বলে, ‘রাত হয়েছে, শোবে চল’। অতঃপর সকলে শুইলে একজন আমাকে যৌনকার্যে লিপ্ত হইতে বলে। আমিও বিনা দ্বিধায় তাহা সম্পাদনা করি। এইরূপে একাদিক্ৰমে তিনজনের সঙ্গে আমাকে এইরূপ করিতে হয়। এইরূপ প্ৰত্যহই করিতাম। তাঁহারা বিশেষ আনন্দবোধ করিত, কিন্তু আমার মানসিক অবস্থা তন্মুহুর্তের জন্য অত্যন্ত খারাপ হইত। আবার ঠিক হইয়া যাইত। কিন্তু ইহাতে আমার শারীরিক কোন অনিষ্ট হয় নাই। তখন আমার বীর্ঘ নির্গত হইত কিনা বুঝিতে পারিতাম না। কিন্তু তার তিনমাস পরেও হস্তমৈথুনে বীৰ্য নিৰ্গত হইত না। এখন বুঝিতে পারিতেছি না উপগত হইলে কিরূপে পুলক লাভ হইত।’

ইহা হইতে বুঝা উচিত যে, ছেলেদের ও মেয়েদের গুরুজনের অসাক্ষাতে একত্রে খেলা করিতে দিলে শৈশবসুলভ নিঃসঙ্কোচভাবে তাঁহারা যৌনখেলায় ব্ৰতী হইতে পারে। বিশেষ করিয়া অসাবধান পিতামাতা উহাদের দেখিবার সুযোগ দিয়া দাম্পত্য ব্যবহার করিলে উহারা অনুরূপ কাৰ্যে প্রেরণা পাইয়া থাকে। যত ছোটই হউক না কেন, ছেলেমেয়েদের ভিন্ন ভিন্ন বিছানায় শুইবার ব্যবস্থা করা উচিত।

অল্পবয়সে সাধারণতঃ যৌন-অঙ্গসমূহে উত্তেজনা তত অধিক হয় না, যতটা হয় মনে ও স্নায়ুমণ্ডলে। তৃপ্তিও আবার হইয়া থাকে বেশীর ভাগে মানসিক ও স্নায়ুবিক।

হ্যাভলক্ এলিস যৌনবৃত্তির স্বতঃস্ফুরণ শীর্ষক আলোচনায় বহু তথ্য আহরণ করিয়াছেন। অন্যান্য বহু যৌনতত্ত্ববিদ পণ্ডিতও এই রহস্যময় ব্যাপারের ব্যাখ্যা করিয়াছেন।

যৌন-উত্তেজনা-শৈশবে

পূর্বকার যৌনবিজ্ঞানীদের, বিশেষ করিয়া, ফ্রয়েডেব মতবাদে শিশুদেব যৌন-চেতনা ও তৃপ্তি সম্বন্ধে উক্তি সাধারণ লোকেরা যে সন্দেহের চোখে দেখিত ড: কিনযে ও তাহার সহকর্মীদের তথ্যানুসন্ধানের ফলে সে সন্দেহের অবসান ঘটিয়াছে। ইহাদের মূল্যবান দুইটি গবেষণা-পুস্তকেই (Sexual Behaviour. In The Human Male ও Sexual Behaviour  In The Human Female) শৈশবে যৌন-চেতনা ও তৃপ্তির প্রমাণ পাইয়াছেন বলিয়া ইহারা উল্লেখ করিয়াছেন।

প্রতিটি শিশুই দৈহিক কতগুলি অনুভূতিশীলতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে। তাই জন্মের পাব হইতেই সংস্পৰ্শ, শব্দ, আলো, উত্তাপ প্ৰভৃতির প্ৰতিক্রিয়া প্ৰত্যেক শিশুতেই দেখা যায়। এই সকল প্ৰতিক্রিয়ার মধ্যে যৌন-উদ্দীপনাও এক প্ৰকার।

যৌন-উদ্দীপিত মানবে দৈহিক ও মানসিক যে সকল পরিবর্তন দেখা যায় সে সম্পর্কে আমরা পূর্ব পূর্ব অধ্যায়ে আলোচনা করিয়াছি। এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই হইবে যে যৌন-উদ্দীপিত মানবের শবীরে ও মনে যে সকল অনুভূতি দেখা যায় তাহার প্রায় সকলগুলিই শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়। যৌনবোধের উন্মেষ, সুখানুভূতি, উত্তেজনা ও পরিশেষে তৃপ্তি পৰ্যায়ক্রমে শিশুদের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়

কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতীদের মধ্যে যে রকম অনুভূতিশীলতার ব্যতিক্রম দেখা যায়, শিশুদেব মধ্যেও অনেকটা সেইরকম। কোনও কোনও শিশু (উভয় লিঙ্গেরই) খুব দ্রুত উত্তেজিত হয়, কোনও কোনও শিশুর হয় ধীরে। বালকদের অবশ্য শুক্র না থাকায় স্খলন হয় না কিন্তু বালক বালিকার উভয়েরই উত্তেজনা চরমে উঠিয়া সহসা স্তিমিত হয়।

ডঃ কিনযে ও তাহার সহকর্মীদের অনুসন্ধানে মাত্র কয়েকমাসের শিশুদেরও যৌন-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গিয়েছে এবং কতক বয়স্থ নর ও নারী অকপটে ৩-৪ বৎসর বয়সে তাহাদের যৌন-চেতনার কথা স্বীকার করিয়াছেন।

এইরূপ অনুভূতি শিশু নিজেই উপলব্ধি করিতে পারে আবার বয়স্কদের দেখাদেখি বা হাতে-কলমে শিক্ষার দরুনও হইতে পারে। যেভাই হউক এইরূপ আনন্দানুভূতিই আস্তে আস্তে যৌন-অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

আমার একাধিক বন্ধু ছোটকালে কোলে উঠিয়া অপরের শরীরের সংস্পর্শে যৌন-চেতনা বোধ করিয়াছিলেন বলিয়া স্বীকার করেন, কেহ কেহ আবার অপরের দ্বারা উত্তেজিত হইয়া অপরের দ্বারা উত্তেজিত হইয়া পুলকলাভ করিয়াছিলেন।*

————-
* ডঃ কিনযেদের অনুসন্ধানের ফল : In pre-adolescent and early adolescent boys, erection and orgasm are easily aroused. They are more easily aroused than in older males. Erection may occur immediately after birth, and, as many observant mothers (and few scientist) know, it is practically a daily matter for all small boys, from earliest Infancy and up in age (Halverson 1940). Slight physical stimulaiton of the genitaha, general body tensions, and generalised emotional situations bring immediate erection, even when there is no specifically sexual situation involved’

যৌনবোধের প্রকাশ

শৈশব হইতে বাৰ্ধক্যকাল পর্যন্ত নর ও নারীর যৌনবোধের প্ৰকাশ নানাভাবে হয়, ইহাদের মধ্যে কয়েকটি প্রধান :

(১) হস্তমৈথুন; (২) স্বপ্নদোষ, (৩) বিপরীতলিঙ্গের সাহিত ক্রীড়া কৌতুক শৃঙ্গাবাদি, (৪) বতিক্রিয়, (৫) সমলৈঙ্গিক যৌনক্রিয়, (৬) পশু মৈথুন। এই সকল প্রক্রিয়ায় উত্তেজনার পরিসমাপ্তি পর্যন্ত ঘটে। ইহা ছাড়া শুধু খানিকটা উত্তেজনা বহু প্রকারেই সাধিত হইয়া থাকে।

এই কয় প্রকারের এক বা একাধিক প্ৰধান উপায়ে নর ও নারী যৌন-আনন্দ লাভ করিয়া থাকে। সময, সুযোগ, রুচি ও পাত্ৰভেদে-উপায়ের ব্যতিক্রম হয়। কখনও কখনও একই ব্যক্তি একই প্রকারের উপারের পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অভিনবত্বের দরুন অন্য বা অন্যান্য উপায়ে আনন্দলাভ করিয়া থাকে।

Share This