সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)

সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাশ

অনুসূর্যের গান

কোনা এক বিপদের গভীর বিস্ময় আমাদের ডাকে। পিছে পিছে ঢের লোক আসে। আমরা সবের সাথে ভিড়ে চাপা প'ড়ে--তবু-- বেঁচে নিতে গিয়ে জেনে বা না জেনে ঢের জনতাকে পিষে--ভিড় ক'রে করুণার ছোট-বড় উপকন্ঠে--সাহসিক নগরে বন্দরে সর্বদাই কোনো এক সমুদ্রের দিকে সাগরের প্রায়াণে চলেছি। সে সমুদ্র--...

অভিভাবিকা

তবুও যখন মৃত্যু হবে উপস্থিত আর-একটি প্রভাতের হয়তো বা অন্যতর বিস্তীর্ণতায়– মনে হবে অনেক প্রতীক্ষা মোরা করে গেছি পৃথিবীতে চোয়ালের মাংস ক্রমে ক্ষীণ ক’রে কোনো এক বিশীর্ণ কাকের অক্ষিগোলকের সাথে আখিতারকার সব সমাহার এক দেখে; তবু লঘু হাস্যে–সন্তানের জন্ম...

আকাশলীনা

সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়ো নাকে তুমি, বোলো নাকো কথা অই যুবকের সাথে; ফিরে এসো সুরঞ্জনা: নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে; ফিরে এসো এই মাঠে ঢেউয়ে; ফিরে এসো হৃদয়ে আমার; দূর থেকে দূরে–আরো দূরে যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকে আর। কী কথা তাহার সাথে?–তার সাথে! আকাশের আড়ালে...

উত্তরপ্রবেশ

পুরনো সময় সুর ঢের কেটে গেল। যদি বলা যেত: সমুদ্রের পারে কেটে গেছে সোনার বলের মতো সুর্য ছিল পুবের আকাশে– সেই পটভূমিকায় ঢের ফেনশীর্ষ ঢেউ, উড়ন্ত ফেনার মতো অগণন পাখি। পুরনো বছর দেশ ঢের কেটে গেল রোদের ভিতরে ঘাসে শুয়ে; পুকুরের জল থেকে কিশোরের মতো তৃপ্ত হাতে ঠান্ডা...

উন্মেষ

কোথাও নদীর পারে সময়ের বুকে-- দাঁড়ায়ে রয়েছে আজও সাবেককালের এক স্তিমিত প্রাসাদ; দেয়ালে একটি ছবি : বিচারসাপেক্ষ ভাবে নৃসিংহ উঠেছে; কোথাও মঙ্গল সংঘটন হয়ে যাবে অচিরাৎ। নিবিড় রমণী তার জ্ঞানময় প্রেমিকের খোজে। অনেক মলিন যুগ--অনেক রক্তাক্ত যুগ সমুক্তীর্ণ ক'রে, আজ এই সময়ের পারে...

একটি কবিতা

পৃথিবী প্রবীণ আরো হয়ে যায় মিরুজিন নদীটির তীরে; বিবর্ণ প্রাসাদ তার ছায়া ফেলে জলে। ও প্রাসাদে কারা থাকে? -- কেউ নেই -- সোনালি আগুন চুপে জলের শরীরে নড়িতেছে -- জ্বলিতেছে -- মায়াবীর মতো জাদুবলে। সে আগুন জ্বলে যায় -- দহেনাকো কিছু। সে আগুন জ্বলে যায় সে আগুন জ্বলে যায়...

কবিতা

আমাদের হাড়ে এক নির্ধূম আনন্দ আছে জেনে পঙ্কিল সময়স্রোতে চলিতেছি ভেসে; তা না হলে সকলই হারায়ে যেত ক্ষামাহীন রক্তে--নিরুদ্দেশে। হে আকাশ, একদিন ছিলে তুমি প্রভাতের তটিনীর; তারপর হয়ে গেছ দুর মেরুনিশীথের স্তব্ধ সমুদ্রের। ভোরবেলা পাখিদের গানে তাই ভ্রান্তি নেই, নেই কোনো...

ক্ষেতে প্রান্তরে

ঢের সম্রাটের রাজ্যে বাস ক'রে জীব অবশেষে একদিন দেখেছে দু-তিন ধনু দূরে কোথাও সম্রাট নেই, তবুও বিপ্লবী নেই, চাষা বলদের নিঃশব্দতা ক্ষেতের দুপুরে। বাংলার প্রান্তরের অপরাহ্ন এসে নদীর খাড়িতে মিশে ধীরে বেবিলন লণ্ডনের জন্ম, মৃত্যু হলে-- তবুও রয়েছে পিছু ফিরে। বিকেল এমন ব'লে...

গোধূলিসন্ধির নৃত্য

দরদালানের ভিড়–পৃথিবীর শেষে যেইখানে পড়ে আছে–শব্দহীন–ভাঙ্গা– সেইখানে উঁচু উঁচু হরীতকী গাছের পিছনে হেমন্তের বিকেলের সূর্য গোল–রাঙা– চুপে-চুপে ডুবে যায়–জ্যোৎস্নায়। পিপুলের গাছে ব’সে পেঁচা শুধু একা চেয়ে দ্যাখে; সোনার...

ঘোড়া

আমরা যাই নি মরে আজও--তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়: মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জোছনার প্রান্তরে, প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন--এখনও ঘাসের লোভে চরে পৃথিবীর কিমাবার ডাইনামোর 'পরে। আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়; বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝ'রে পড়ে ইস্পাতের...

চক্ষুস্থির

ক্লান্ত জনসাধারণ আমি আজ–চিরকাল; আমার হৃদয়ে পৃথিবীর দণ্ডীদের মত পরিমিত ভাষা নেই। রাত্রিবেলা বহুক্ষণ মোমের আলোর দিকে চেয়ে, তারপর ভোরবেলা যদি আমি হাত পেতে দিই সূর্যের আলো দিকে–তবুও আমার সেই একটি ভাবনা অতীব সহজ ভাষা খুঁজে নিতে গিয়ে হৃদয়ঙ্গম করে সব আড়ষ্ট, কঠিন...

জনান্তিকে

তোমাকে দেখার মতো চোখ নেই–তবু, গভীর বিস্ময়ে আমি টের পাই–তুমি আজও এই পৃথিবীতে রয়ে গেছ। কোথাও সান্ত্বনা নেই পৃথিবীতে আজ; বহুদিন থেকে শান্তি নেই। নীড় নেই পাখিরো মতন কোনো হৃদয়ের তরে! পাখি নেই। মানুষের হৃদয়কে না জাগালে তাকে ভোর, পাখি, অথবা বসন্তকাল ব’লে আজ তার...

জুহু

সান্টা ক্রুজ্‌ থেকে নেমে অপরাহ্নে জহুর সমুদ্রপারে গিয়ে কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিলো সূর্যের নিকটে থেমে সোমেন পালিত; বাংলার থেকে এত দূরে এসে–সমাজ, দর্শন, তত্ত্ব, বিজ্ঞান হারিয়ে, প্রেমকেও যৌবনের কামাখ্যার দিকে ফেলে পশ্চিমের সমুদ্রের তীরে ভেবেছিলো বালির উপর দিয়ে...

তিমির হননের গান

কোনো হ্রদে কোথাও নদীর ঢেউয়ে কোনো এক সমুদ্রের জলে পরস্পরের সাথে দু দণ্ড জলের মতো মিশে সেই এক ভোরবেলা শতাব্দীর সূর্যের নিকটে আমাদের জীবনের আলোড়ন– হয়তো বা জোবনকে শিখে নিতে চেয়েছিলো। অন্য এক আকাশের মতো চোখ নিয়ে আমরা হেসেছি, আমরা খেলেছি; স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো...

দীপ্তি

তোমার নিকট থেকে যত দুর দেশে আমি চলে যাই তত ভালো। সময় কেবলই নিজ নিয়মের মতো--তবু কেউ সময়স্রোতের 'পরে সাঁকো বেঁধে দিতে চায়; ভেঙে যায়, যত ভাঙে তত ভালো যত স্রোত বয়ে যায় সময়ের সময়ের মতন নদীর জলসিঁড়ি, নীপার, ওডার, রাইন, রেবা, কাবেরীর তুমি তত বহে যা্‌ আমি তত বলে চলি, তবুও...

নাবিক

কোথাও তরণী আজ চলে গেছে আকাশ রেখায়–তবে–এই কথা ভেবে নিদ্রায় আসক্ত হতে গিয়ে তবু বেদনায় জেগে ওঠে পরাস্ত নাবিক; সূর্য যেন পরস্পরাক্রম আরো–অইদিকে–সৈকতের পিছে বন্দরের কোলাহল–পাম সারি–তবু তার পরে স্বাভাবিক স্বর্গীয় পাখির ডিম সূর্য যেন...

নাবিকী

হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে এ রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে সময়ের কুয়াশায়, মাঠের ফসলগুলো বারবার ঘরে তোলা হতে গিয়ে তবু সমুদ্রের পারের বন্দরে পরিচ্ছন্নভাবে চলে গেছে। মৃত্তিকার ওই দিক আকাশের মুখোমুখি যেন শাদা মেঘের প্রতিভা; এই দিকে ঋণ, রক্ত, লোকসান, ইতর, খাতক;...

নিরঙ্কুশ

মালয় সমুদ্র পারে সে এক বন্দর আছে শ্বেতাঙ্গিনীদের। যদিও সমুদ্র আমি পৃথিবীতে দেখে গেছি ঢের: নীলাভ জলের রোদে কুয়ালালুম্পুর, জাভা, সুমাত্রা ও ইন্দোচীন, বালি অনেক ঘুরেছি আমি—তারপর এখানে বাদামী মলয়ালী সমুদ্রের নীল মরুভূমি দেখে কাঁদে সারাদিন। শাদা-শাদা ছোটো ঘর নারকেলখেতের...

প্রতীতি

বাতাবীলেবুর পাতা উড়ে যায় হাওয়ায়–প্রান্তরে– সার্সিতে ধীরে-ধীরে জলতরঙ্গের শব্দ বাজে; একমুঠো উড়ন্ত ধূলোয় আজ সময়ের আস্ফোট রয়েছে; না হলে কিছুই নেই লবেজান লড়ায়ে জাহাজে। বাইরে রৌদ্রের ঋতু বছরের মতো আজ ফুরায়ে গিয়েছে; হোক না তা; প্রকৃতি নিজের মনোভাব নিয়ে অতীব...

বিভিন্ন কোরাস

১ পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থাকে আমাদের আয়ু এখন মৃত্যুর শব্দ শোনে দিনমান। হৃদয়কে চোখঠার দিয়ে ঘুমে রেখে হয়তো দুর্যোগে তৃপ্তি পেতে পারে কান; এ রকম একদিন মনে হয়েছিলো– অনেক নিকটে তবু সেই ঘোর ঘনায়েছে আজ; আমাদের উঁচু-নিচু দেয়ালের ভিতরে খোড়লে ততোধিক গুনাগার আপনার কাজ...