শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪)

শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাস
'শ্রেষ্ঠ কবিতা'র জীবনানন্দ সদ্য লিখিত বারোটি নতুন কবিতা অন্তর্ভূক্ত করেন, তার আটটি সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। 'অনন্দা', 'স্থান থেকে', 'দিনরাত' এবং 'পৃথিবীতে এই'--এই কবিতাগুলি কোনো গ্রন্থে বা সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় নি বলে উল্লেখ করা হয়। --স.

অনন্দা

অনন্দা এই পৃথিবীর এ এক শতচ্ছিদ্র নগরী। দিন ফুরুলে তারার আলো খানিক নেমে আসে। গ্যাসের বাতি দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বাতাসে। দ্রুতগতি নরনারীর ক্ষণিক শরীর থেকে উৎসারিত ছায়ার কালো ভারে আঁধার আলোয় মনে হতে পারে এ-সব দেয়াল যে-কোনো নগরীর; সন্দেহ ভয় অপ্ৰেম দ্বেষ অবক্ষয়ের ভিড় এ-সব...

আছে

আছে এখন চৈত্রের দিন নিভে আসে—আরো নিভে আসে; এখানে মাঠের পরে শুয়ে আছি ঘাসে; এসে শেষ হয়ে যায় মানুষের ইচ্ছা কাজ পৃথিবীর পথে, দু-চারটে–বড়ো জোর একশো শরতে; উর ময় চীন ভারতের গল্প বহিঃপৃথিবীর শর্তে হয়ে গেছে শেষ; জীবনের রূপ আর রক্তের নির্দেশ পৃথিবীর কাম আর বিচ্ছেদের...

এই সব দিনরাত্রি

এই সব দিনরাত্রি মনে হয় এর চেয়ে অন্ধকারে ড়ুবে যাওয়া ভালো। এইখানে পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারা দেশে এখানে আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে। তাদের সম্রাট নেই, সেনাপতি নেই; তাদের হৃদয়ে কোনো সভাপতি নেই; শরীর বিবশ হলে অবশেষে ট্রেড-ইউনিয়নের কংগ্রেসের মতো কোনো আশা-হতাশার কোলাহল...

তবু

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার বছরে বয়সী আমি; বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহানির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে চ’লে যেতে দেখে—তবু—অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা ক’রে এখানে তোমার কাছে দাঁড়ায়ে রয়েছি; আজ ভোরে বাংলার...

দিনরাত

দিনরাত সারা দিন মিছে কেটে গেল; সারা রাত বড্ড খারাপ নিরাশায় ব্যর্থতায় কাটবে; জীবন দিনরাত দিনগতপাপ ক্ষয় করবার মতো ব্যবহার শুধু। ফণীমনসার কাঁটা তবুও তো স্নিগ্ধ শিশিরে মেখে আছে; একটিও পাখি শূন্যে নেই; সব জ্ঞানপাপী পাখি ফিরে গেছে...

পৃথিবীতে

পৃথিবীতে শস্যের ভিতরে রৌদ্রে পৃথিবীর সকালবেলায় কোনো-এক কবি বসে আছে; অথবা সে কারাগারে ক্যাম্পে অন্ধকারে; তবুও সে গ্ৰীত অবহিত হয়ে আছে এই পৃথিবীর রোদে– এখানে রাত্রির গন্ধে–নক্ষত্রের তরে। তাই সে এখানকার ক্লান্ত মানবীয় পরিবেশ সুস্থ করে নিতে চায় পরিচ্ছন্ন...

পৃথিবীতে এই

পৃথিবীতে এই পৃথিবীতে এই জন্মলাভ তবু ভালো; ভূমিষ্ঠ হবার পরে যদিও ক্রমেই মনে হয় কোনো-এক অন্ধকার স্তব্ধ সৈকতের বিন্দুর ভেতর থেকে কোনো অন্য দূর স্থির বলয়ের চিহ্ন লক্ষ্য করে দুই শব্দহীন শেষ সাগরের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত এই সূর্যের আলো। কেন আলো? মাছিদের ওড়াউড়ি? কেবলই ভঙ্গুর...

মানুষের মৃত্যু হলে

মানুষের মৃত্যু হলে মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে। আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিল তারা মরে গেছে; অন্ধকারে হারায়েছে; তবু তারা আজকের আলর ভেতরে সঞ্চারিত হয়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে যখন প্রেমের কথা...

লোকেন বোসের জর্নাল

সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি — এখনো কি ভালোবাসি? সেটা অবসরে ভাববার কথা, অবসর তবু নেই; তবু একদিন হেমন্ত এলে অবকাশ পাওয়া যাবে এখন শেলফে চার্বাক ফ্রয়েড প্লেটো পাভলভ ভাবে সুজাতাকে আমি ভালোবাসি কি না। পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:        সুজাতা লিখেছে আমার কাছে, বারো তেরো কুড়ি...

স্থান থেকে

স্থান থেকে স্থান থেকে স্থানচ্যুত হয়ে চিহ্ন ছেড়ে অন্য চিহ্নে গিয়ে ঘড়ির কাঁটার থেকে সময়ের স্নায়ুর স্পন্দন খসিয়ে বিমুক্ত করে তাকে দেখা যায় অবিরল শাদা-কালো সময়ের ফাঁকে সৈকত কেবলই দূরে সৈকতে ফুরায়; পটভূমি বারবার পটভূমিচ্ছেদ করে ফেলে আঁধারকে আলোর বিলয় আলোককে আঁধারের ক্ষয়...

১৯৪৬-৪৭

১৯৪৬-৪৭ দিনের আলোয় ওই চারি দিকে মানুষের অস্পষ্ট ব্যস্ততা : পথে-ঘাটে ট্রাক ট্রামলাইনে ফুটপাতে; কোথায় পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে—মনে হয়, জলের মতন দামে। সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে সকলের আগে সকলেই তাই। অনেকেরই ঊর্ধ্বশ্বাসে যেতে হয়, তবু নিলেমের ঘরবাড়ি আসবাব—অথবা যা...