রূপসী বাংলা (১৯৫৭)

রূপসী বাংলা - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাস

অনন্ত জীবন যদি পাই আমি

অনন্ত জীবন যদি পাই আমি—তাহ’লে অনন্তকাল একা পৃথিবীর পথে আমি ফিরি যদি দেখিব সবুজ ঘাস ফুটে উঠে—দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায়—দেখিব আকাশ শাদা হয়ে উঠে ভোরে—ছেঁড়া মুনিয়ার মত রাঙা রক্ত—রেখা লেগে থাকে বুকে তার সন্ধ্যায়—বারবার নক্ষত্রের দেখা পাব আমি; দেখিব অচেনা নারী আলগা খোঁপার ফাঁস...

অশ্বত্থ বটের পথে

অশ্বত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী; ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে; সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে গিয়েছি অনেক দিন, — দেখিয়াছি ধূপ জ্বালো, ধরো সন্ধ্যাবাতি থোড়ের মতন শাদা ভিজে হাতে, — এখুনি আসিবে কিনা রাতি বিনুনি...

অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয় যখন লেগেছে

অশ্বত্থে সন্ধ্যার হাওয় যখন লেগেছে নীল বাংলার বনে মাঠে মাঠে ফিরি একা: মনে হয় বাংলার জীবনে সঙ্কট শেষ হয়ে গেছে আজ; — চেয়ে দেখ কতো শত শতাব্দীর বট হাজার সবুজ পাতা লাল ফল বুকে লয়ে শাখার ব্যজনে আকাঙ্খার গান গায় — অশ্বত্থেরও কি যেন কামনা জাগে মনে : সতীর শীতল শব...

আকাশে চাঁদের আলো

১ আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ বাতাসে ঘুঘুর ডাক—অশত্থে ঘুঘুর ডাক—হৃদয়ে ঘুঘু যে ডাকে—নরম ঘুঘুর ডাক আজ তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার শাড়ির ছায়া ঘাসে আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের...

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে

আকাশে সাতটি তারা যখন উঠেছে ফুটে আমি এই ঘাসে বসে থাকি; কামরাঙা লাল মেঘ যেন মৃত মনিয়ার মতো গঙ্গাসাগরের ঢেউয়ে ডুবে গেছে-আসিয়াছে শান- অনুগত বাংলার নীল সন্ধ্যা-কেশবতী কন্যা যেন এসেছে আকাশে; আমার চোখের পরে আমার মুখের পরে চুল তার ভাসে; পৃথিবীর কোনো পথ এ কন্যারে দেখেনিকো দেখি...

আজ তারা কই সব

আজ তারা কই সব? ওখানে হিজল গাছ ছিল এক — পুকুরের জলে বহুদিন মুখ দেখে গেছে তার; তারপর কি যে তার মনে হল কবে কখন সে ঝরে গেল, কখন ফুরাল, আহা, — চলে গেল কবে যে নীরবে, তাও আর জানি নাকো; ঠোট ভাঙা দাঁড়কাক ঐ বেলগাছটির তলে রোজ ভোরে দেখা দিত — অন্য সব কাক আর...

আবার আসিব ফিরে

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়ির তীরে — এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে; হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঠাঁলছায়ায়; হয়তো বা হাঁস হব — কিশোরীর — ঘুঙুর রহিবে লাল পায়, সারা দিন কেটে যাবে...

আমাদের রূঢ় কথা শুনে

আমাদের রূঢ় কথা শুনে তুমি সরে যাও আরো দূরে বুঝি নীলাকাশ; তোমার অনন্ত নীল সোনালি ভোমরা নিয়ে কোনো দূর শান্তির ভিতরে ডুবে যাবে? কত কাল কেটে গেল, তবু তার কুয়াশার পর্দা না সরে পিরামিড্‌ বেবিলন শেষ হল — ঝরে গেল কতবার প্রান্তরের ঘাস; তবুও লুকায়ে আছে যেই রূপ নক্ষত্রে তা...

এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি

এ-সব কবিতা আমি যখন লিখেছি বসে নিজ মনে একা; চালতার পাতা থেকে টুপ — টুপ জ্যোৎস্নায় ঝরছে শিশির; কুয়াশায় সি’র হয়ে ছিল স্নান ধানসিড়ি নদীটির তীরে; বাদুড় আধাঁর ডানা মেলে হিম জ্যোৎস্নায় কাটিয়াছে রেখা আকাঙ্খার; নিভু দীপ আগলায়ে মনোরমা দিয়ে গেছে দেখা সঙ্গে তার কবেকার...

এই জল ভালো লাগে

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে ধুয়েছে আমার দেহ — বুলায়ে দিয়েছে চুল — চোখের উপরে তার শান — স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, — আবেগের ভরে ঠোঁটে এসে চুমা দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে; এই জল ভালো লাগে; — নীলপাতা মৃদু ঘাস...

এই ডাঙা ছেড়ে হায়

এই ডাঙা ছেড়ে হায় রূপ কে খুঁজিতে যায় পৃথিবীর পথে। বটের শুকনো পাতা যেন এক যুগান্তের গল্প ডেকে আনে: ছড়ায়ে রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রানে;— তাদের উপেক্ষা ক’রে কে যাবে বিদেশে বলো—আমি কোনো-মতে বাসমতী ধানক্ষেত ছেড়ে দিয়ে মালাবারে—উটির পর্বতে যাব নাকো, দেখিব না...

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি

এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি — আমি হৃষ্ট কবি আমি এক; — ধুয়েছি আমার দেহ অন্ধকারে একা একা সমুদ্রের জলে; ভালোবাসিয়াছি আমি রাঙা রোদ, ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে — ঘাসের আঁচলে ফড়িঙের মতো আমি বেড়ায়েছি — দেখেছি কিশোরী এস হলুদ করবী ছিঁড়ে নেয়...

এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে

এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে—সবচেয়ে সুন্দর করুণ : সেখানে সবুজ ডাঙা ভ’রে আছে মধুকূপী ঘাসে অবিরল; সেখানে গাছের নামঃ কাঁঠাল, অশ্বত্থ, বট, জারুল, হিজল; সেখানে ভোরের মেঘে নাটার র’ঙের মতো জাগিছে অরুণ; সেখানে বারুণী থাকে গঙ্গাসাগরের বুকে,—সেখানে বরুণ কর্ণফুলী ধলেশ্বরী পদ্মা...

এই সব ভালো লাগে

(এই সব ভালো লাগে) : জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের সোনালি রোদ এসে আমারে ঘুমাতে দেখে বিছানায়, — আমার কাতর চোখ, আমার বিমর্ষ ম্লান চুল — এই নিয়ে খেলা করে: জানে সে যে বহুদিন আগে আমি করেছি কি ভুল পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমাহীন গাঢ় এক রূপসীর মুখ ভালোবেসে, পউষের শেষ রাতে আজো...

একদিন এই দেহ ঘাস

একদিন এই দেহ ঘাস থেকে ধানের আঘ্রাণ থেকে এই বাংলায় জেগেছিল; বাঙালী নারীর মুখ দেখে রূপ চিনেছিলো দেহ একদিন; বাংলার পথে পথে হেঁটেছিলো গাংচিল শালিখের মতন স্বাধীন; বাংলার জল দিয়ে ধূয়েছিল ঘাসের মতন স্ফুট দেহখানি তার; একদিন দেখেছিল ধূসর বকের সাথে ঘরে চলে আসে অন্ধকার বাংলার;...

একদিন কুয়াশার এই মাঠে

একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি; হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন — গিয়েছে যে শান — হিম ঘরে, অথবা সান্ত্বনা পেতে দেরি হবে কিছু কাল — পৃথিবীর এই মাঠখানি ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছু দিন, এ মাঠের কয়েকটি শালিকের তরে আশ্চর্য আর বিস্ময়ে আমি...

একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে

একদিন জলসিড়ি নদীটির পারে এই বাংলার মাঠে বিশীর্ণ বটের নিচে শুয়ে রবো-পশমের মতো লাল ফুল ঝরিবে বিজন ঘাসে, বাঁকা চাঁদ জেগে রবে,-নদীটির জল বাঙারি মেয়ের মতো বিশালাক্ষ্মী মন্দিরের ধূসর কঁপাটে আঘাত করিয়া যাবে ভয়ে-ভয়ে- তারপর সে ভাঙা ঘাটে রূপসীরা আজ আর আসে নাকো পাট শুধু পচে...

একদিন পৃথিবীর পথে

একদিন পৃথিবীর পথে আমি ফেলিয়াছি, আমার শরীর নরম ঘাসেন পথে হাঁটিয়াছে; বসিয়াছে ঘাসে দেখিয়াছে নক্ষত্রের জোনাকিপোকার মতো কৌতুকের অমেয় আকাশে খেলা করে; নদীর জলের গন্ধে ভরে যায় ভিজে স্নিগ্ধ তীর অন্ধকারে; পথে পথে শব্দ পাই কাহাদের নরম শাড়ির, স্লান চুল দেখা যায়; সান্ত্বনার কথা...

একদিন যদি আমি

একদিন যদি আমি কোনো দূর বিদেশের সমুদ্রের জলে ফেনার মতন ভাসি শীত রাতে — আসি নাকো তোমাদের মাঝে ফিরে আর — লিচুর পাতার ‘পরে বহুদিন সাঁঝে যেই পথে আসা-যাওয়া করিয়াছি, — একদিন নক্ষত্রের তলে কয়েকটা নাটাফল তুলে নিয়ে আনারসী শাড়ির আচঁলে ফিঙার মতন তুমি লঘু...

এখানে আকাশ নীল

এখানে আকাশ নীল—নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল ফুটে থাকে হিম শাদা—রং তার আশ্বিনের আলোর মতন; আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ রৌদ্রের দুপুর ভ’রে;—বারবার রোদ তার সুচিক্বণ চুল কাঁঠাল জামের বুকে নিঙড়ায়ে;—দহে বিলে চঞ্চল আঙুল বুলায়ে বুলায়ে ফেরে এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের...