বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)

বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাশ

অনেক নদীর জল

অনেক নদীর জল উবে গেছে — ঘরবাড়ি সাঁকো ভেঙে গেল; সে সব সময় ভেদ করে ফেলে আজ কারা তবু কাছে চলে এল যে সুর্য অয়নে নেই কোনো দিন, — মনে তাকে দেখা যেত যদি — যে নারী দেখে নি কেউ — ছ-সাতটি তারার তিমিরে হৃদয়ে এসেছে সেই নদী। তুমি কথা বল — আমি জীবন-মৃত্যুর শব্দ শুনি:...

অন্ধকার থেকে

গাঢ় অন্ধকার থেকে আমরা এ-পৃথিবীর আজকের মুহূর্তে এসেছি। বীজের ভেতর থেকে কী ক’রে অরণ্য জন্ম নেয়,- জলের কণার থেকে জেগে ওঠে নভোনীল মহান সাগর, কী ক’রে এ-প্রকৃতিতে—পৃথিবীতে, আহা, ছায়াচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে মানব প্রথম এসেছিল, আমরা জেনেছি সব,—অনুভব করেছি সকলই। সূর্য জেলে,—কল্লোল...

অবরোধ

বহুদিন আমার এ-হৃদয়কে অবরোধ ক’রে র’য়ে গেছে; হেমন্তের স্তব্ধতায় পুনরায় ক’রে অধিকার। কোথায় বিদেশে যেন এক তিল অধিক প্রবীণ এক নীলিমায় পারে তাহাকে দেখিনি আমি ভালো ক’রে,- তবু মহিলার মনন-নিবিড় প্রাণ কখন আমার চোখঠারে চোখ রেখে ব’লে গিয়েছিলোঃ ‘সময়ের গ্রন্থি সনাতন, তবু সময়ও তা...

আজকে রাতে

আজকে রাতে তোমায় আমার কাছে পেলে কথা বলা যেত; চারিদিকে হিজল শিরীষ নক্ষত্র ঘাস হাওয়ার প্রান্তর। কিন্তু যেই নিট নিয়মে ভাবনা আবেগ ভাব বিশুদ্ধ হয় বিষয় ও তার যুক্তির ভিতর;- আমিও সেই ফলাফলের ভিতরে থেকে গিয়ে দেখেছি ভারত লন্ডন রোম নিউইয়র্ক চীন আজকে রাতের ইতিহাস ও মৃত ম্যামথ সব...

আমাকে একটি কথা দাও

আমাকে একটি কথা দাও যা আকাশের মতো সহজ মহৎ বিশাল, গভীর - সমস্ত ক্লান্ত হতাহত গৃহবলিভুকদের রক্তে মলিন ইতিহাসের অন্তর ধুয়ে চেনা হাতের মতন: আমি যাকে আবহমান কাল ভালোবেসে এসেছি সেই নারীর। সেই রাত্রির নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাসের মতো; সেই দিনের - আলোর অন্তহীন এঞ্জিন-চঞ্চল...

ইতিহাসযান

সেই শৈশবের থেকে এ-সব আকাশ মাঠ রৌদ্র দেখেছি; এই সব নক্ষত্র দেখেছি। বিস্ময়র চোখে চেয়ে কতবার দেখা গেছে মানুষের বাড়ি রোদের ভিতরে যেন সমুদ্রের পারে পাখিদের বিষণ্ণ শক্তির মতো আয়োজনে নির্মিত হতেছে; কোলাহলে-কেমন নিশীথ উৎসবে গ’ড়ে ওঠে। একদিন শূন্যতায় স্তব্ধতায় ফিরে দেখি তারা...

উত্তরসাময়িকী

আকাশের থেকে আলো নিভে যায় ব’লে মনে হয়। আবার একটি দিন আমাদের মৃগতৃষ্ণার মতো পৃথিবীতে শেষ হয়ে গেল তবে;— শহরের ট্রাম উত্তেজিত হয়ে উঠে সহজেই ভবিতব্যতার যাত্রীদের বুকে নিয়ে কোন্‌ এক নিরুদ্দেশ কুড়োতে চলেছে। এই দিকে পায়দলদের ভিড়—অই দিকে টর্চের মশালে বার—বার যে যার নিজের নামে...

একটি কবিতা

আমার আকাশ কালো হতে চায় সময়ের নির্মম আঘাতে; জানি, তবু ভোরে রাত্রে, এই মহাসময়েরই কাছে নদী ক্ষেত বনানীর ঝাউয়ে ঝরা সোনার মতন সূর্যতারাবীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে। হে সুবর্ণ, হে গভীর গতির প্রবাহ, আমি মন সচেতন;—আমার শরীর ভেঙে ফেলে নতুন শরীর কর—নারীকে যে উজ্জ্বল প্রাণনে...

গভীর এরিয়েলে

ডুবলো সূর্য; অন্ধকারের অন্তরালে হারিয়ে গেছে দেশ। এমনতর আঁধার ভালো আজকে কঠিন রুক্ষ শতাব্দীতে। রক্ত-ব্যথা ধনিকতার উষ্ণতা এই নীরব স্নীগ্ধ অন্ধকারের শীতে নক্ষত্রদের স্থির সমাসীন পরিষদের থেকে উপদেশ পায় না নব; তবুও উত্তেজনাও যেন পায় না এখন আর; চারদিকেতে সার্থবাহের ফ্যাক্টার...

চারিদিকে প্রকৃতির

চারিদিকে প্রকৃতির ক্ষমতা নিজের মতো ছড়ায়ে রয়েছে। সূর্য আর সূর্যের বনিতা তপতী— মনে হয় ইহাদের প্রেম মনে ক’রে নিতে গেলে, চুপে তিমিরবিদারী রীতি হয়ে এরা আসে আজ নয়,—কোনো এক আগামী আকাশে। অন্নের ঋণ,বিমলিন স্মৃতি সব বন্দ্র বস্তির পথে কোনো এক দিন নিমেষের রহস্যের মতো ভুলে গিয়ে...

জয়জয়ন্তী সূর্য

কোনো দিন নগরীর শীতের প্রথম কুয়াশায় কোনো দিন হেমন্তের শালিখের রঙে ম্লান মাঠের বিকেলে হয়তো বা চৈত্রের বাতাসে চিন্তার সংবেগ এসে মানুষের প্রাণে হাত রাখেঃ তাহাকে থামায়ে রাখে। সে-চিন্তার প্রাণ সাম্রাজ্যের উত্থানের পতনের বিবর্ণ সন্তান হয়েও যা কিছু শুভ্র র’য়ে গেছে আজ- সেই...

তার স্থির প্রেমিকের নিকট

বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই,- -আমি বলিনাতো। কারো লাভ আছে;– সকলেরই;– হয়তো বা ঢের। ভাদ্রের জ্বলন্ত রৌদ্রে তবু আমি দূরতর সমুদ্রের জলে পেয়েছি ধবল শব্দ– বাতাসতাড়িত পাখিদের। মোমের প্রদীপ বড়ো ধীরে জ্ব’লে– ধীরে জ্বলে আমার টেবিলে; মনীষার বইগুলো আরো...

তোমাকে

মাঠের ভিড়ে গাছের ফাঁকে দিনের রৌদ্র অই: কুলবধুর বহিরাশ্রয়িতার মতন অনেক উড়ে হিজল গাছে জামের বনে হলুদ পাখির মতো রূপসাগরের পার থেকে কি পাখনা বাড়িয়ে বাস্তবিকই রৌদ্র এখন? সত্যিকারের পাখি? কে যে কোথায় কার হৃদয়ে কখন আঘাত করে। রৌদ্রবরণ দেখেছিলাম কঠিন সময় পরিক্রমার পথে- নারীর,...

দেশ কাল সন্ততি

কোথাও পাবে না শান্তি—যাবে তুমি এক দেশ থেকে দূরদেশে? এ-মাঠ পুরানো লাগে—দেয়ালে নোনার গন্ধ—পায়রা শালিখ সব চেনা? এক ছাঁদ ছেড়ে দিয়ে অন্য সূর্যে যায় তারা-লক্ষ্যের উদ্দেশে তবুও অশোকস্তম্ভ কোনো দিকে সান্তনা দেবে না। কেন লোভে উদ্‌যাপনা? মুখ ম্লান—চোখে তবু উত্তেজনা সাধ? জীবনের...

নারীসবিতা

আমরা যদি রাতের কপাট খুলে ফেলে এই পৃথিবীর নীল সাগরের বারে প্রেমের শরীর চিনে নিতাম চারিদিকের রোদের হাহাকারে,– হাওয়ায় তুমি ভেসে যেতে দখিণ দিকে– যেই খানেতে যমের দুয়ার আছে; অভিচারী বাতাসে বুক লবণ– বিলুন্ঠিত হলে আবার মার কাছে উৎরে এসে জানিয়ে দিতে পাখিদেরও...

পটভূমির

পটভূমির ভিতরে গিয়ে কবে তোমার দেখেছিলাম আমি দশ-পনেরো বছর আগে;—সময় তখন তোমার চুলে কালো মেঘের ভিতর লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালালো তোমার নিশিত নারীমুখের;—জানো তো অন্তর্যামী। তোমার মুখঃ চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলহল, কোথাও কোনো বেলাভূমির নিয়ন্তা নেই,—গভীর বাতাসে তবুও সব...

পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে

পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরে গেলে দিন আলোকিত হয়ে ওঠে—রাত্রি অন্ধকার হয়ে আসে; সর্বদাই, পৃথিবীর আহ্নিক গতির একান্ত নিয়ম, এই সব; কোথাও লঙ্ঘন নেই তিলের মতন আজো; অথবা তা হতে হলে আমাদের জ্ঞাতকুলশীল মানবীয় সময়কে রূপান্তরিত হয়ে যেতে হয় কোনো দ্বিতীয় সময়ে; সে-সময় আমাদের জন্যে নয়...

পৃথিবীর রৌদ্রে

কেমন আশার মতো মনে হয় রোদের পৃথিবী, যতদূর মানুষের ছায়া গিয়ে পড়ে মৃত্যু আর নিরুৎসাহের থেকে ভয় আর নেই এ-রকম ভোরের ভিতরে। যতদূর মানুষের চোখ চ’লে যায় ঊর ময় হরপ্পা আথেন্‌স্‌ রোম কলকাতা রোদের সাগরে অগণন মানুষের শরীরের ভিতরে বন্দিনী মানবিকতার মতোঃ তবুও তো উৎসাহিত করে? সে অনেক...

প্রিয়দের প্রাণে

অনেক পুরোনো দিন থেকে উঠে নতুন শহরে আমি আজ দাঁড়ালাম এসে। চোখের পলকে তবউ বোঝা গেল জনতাগভীর তিথি আজ; কোনো ব্যতিক্রম নেই মানুষবিশেষে। এখানে রয়েছে ভোর,- নদীর সমস্ত প্রীত জল;- কবের মনের ব্যবহারে তবু হাত বাড়াতেই দেখা গেল স্বাভাবিক ধারণার মতন সকাল- অথবা তোমার মতন নারী আর নেই।...

প্রয়াণপটভূমি

বিকেলবেলার আলো ক্রমে নিভেছে আকাশ থেকে। মেঘের শরীর বিভেদ ক’রে বর্শাফলার মতো সূর্যকিরণ উঠে গেছে নেমে গেছে দিকে–দিগন্তরে; সকলি ছুপ কী এক নিবিদ প্রণয়বশত। কমলা হলুদ রঙের আলো– আকাশ নদী নগরী পৃথিবীকে সূর্য থেকে লুপ্ত হয়ে অন্ধকারে ডুবে যাবার আগে ধীরে–ধীরে...