বনলতা সেন (১৯৪২)

বনলতা সেন (১৯৪২) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাশ

অঘ্রান প্রান্তরে

‘জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ আমাকে খোঁজে না আর পৃথিবীর’ পরে- বলে চুপে থামলাম, কেবলি অশত্থ পাতা পড়ে আছে ঘাসের ভিতরে শুকনো মিয়োনো ছেঁড়া;- অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে; সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে হেমন্ত এসেছে তবু; বললে সে, ‘ঘাসের ওপরে সব বিছানো পাতার মুখে এই...

অন্ধকার

গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার; তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া              গুটিয়ে নিয়েছে যেন কীর্তিনাশার দিকে। ধারসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম পউষের রাতে-              কোনোদিন আর জাগব না জেনে কোনোদিন জাগব না...

অবশেষে

এখানে প্রশান্ত মনে খেলা করে উঁচু উঁচু গাছ। সবুজ পাতার পরে যখন নেমেছে এসে দুপুরের সূর্যের আঁচ নদীতে স্মরণ করে একবার পৃথিবীর সকাল বেলাকে। আবার বিকেল হলে অতিকায় হরিণের মতো শান্ত থাকে। এই সব গাছুগুলো, যেন কোন দূর থেকে অস্পষ্ট বাতাস বাঘের ঘ্রাণের মতো হৃদয়ে জাগায়ে যায়...

আবহমান

পৃথিবী এখন ক্রমে হতেছে নিঝুম। সকলেরই চোখ ক্রমে বিজড়িত হ’য়ে যেন আসে; যদিও আকাশ সিন্ধু ভ’রে গেল অগ্নির উল্লাসে; যেমন যখন বিকেলবেলা কাটা হয় ক্ষেতের গোধূম চিলের কান্নার মতো শব্দ ক’রে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের ঘুম গাঢ় করে দিয়ে যায়।-এইবার কুয়াশায় যাত্রা সকলের। সমূদ্রের রোল...

আমাকে তুমি

আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন; মস্ত বড় ময়দান — দেবদারু পামের নিবিড় মাথা — মাইলের পর মাইল; দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়; জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার; জানালায় জানালায় অনেক ক্ষণ ধরে কথা বলে: পৃথিবীকে...

আমি যদি হতাম

আমি যদি হতাম বনহংস; বনহংসী হতে যদি তুমি; কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে ধানক্ষেতের কাছে ছিপছিপে শরের ভিতর এক নিরালা নীড়ে; তাহলে আজ এই ফাল্পুনের রাতে ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম- তোমার...

কমলালেবু

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে? আবার যেন ফিরে আসি কোনো এক শীতের রাতে একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার...

কুড়ি বছর পরে

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি! আবার বছর কুড়ি পরে- হয়তো ধানের ছড়ার পাশে কার্তিকের মাসে- তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে-তখন হলুদ নদী নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়-মাঠের ভিতরে! অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর, ব্যস্ততা নাইকো আর, হাঁসের নীড়ের থেকে খড় পাখির নীড়ের থেকে খড় ছড়াতেছে;...

ঘাস

কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয় পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা; কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস—তেমনি সুঘ্রাণ— হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে! আমারো ইচ্ছে করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গেলাসে-গেলাসে পান করি, এই ঘাসের শরীর ছানি—চোখে ঘষি, ঘাসের পাখনায় আমার পালক, ঘাসের...

তুমি

নক্ষত্রের চলাফেরা ইশারায় চারি দিকে উজ্জ্বল আকাশ; বাতাসে নীলাভ হয়ে আসে যেন প্রান্তরের ঘাস; কাঁচপোকা ঘুমিয়েছে — গঙ্গাফড়িং সেও ঘুমে; আম নিম হিজলের ব্যাপ্তিতে পড়ে আছ তুমি। ‘মাটির অনেক নীচে চলে গেছ? কিংবা দূর আকাশের পারে তুমি আজ? কোন্‌ কথা ভাবছ আধারে? ওই যে...

তোমাকে

একদিন মনে হতো জলের মতন তুমি। সকালবেলার রোদে তোমার মুখের থেকে বিভা– অথবা দুপুরবেলা — বিকেলের আসন্ন আলোয়– চেয়ে আছে — চলে যায় — জলের প্রতিভা। মনে হতো তীরের উপরে বসে থেকে। আবিষ্ট পুকুর থেকে সিঙাড়ার ফল কেউ কেউ তুলে নিয়ে চলে গেলে — নীচে...

দুজন

আমাকে খোজো না তুমি বহুদিন-কতদিন আমিও তোমাকে খুজি নাকো; এক নক্ষত্রের নিচে তবু-একই আলো পৃথিবীর পারে আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায় নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি? বলে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে; আজ এই মাঠ সূর্য সহমর্মী...

ধান কাটা হয়ে গেছে

ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন — ক্ষেত মাঠে পড়ে আছে খড় পাতা কুটো ভাঙা ডিম — সাপের খোলস নীড় শীত। এই সব উৎরায়ে ঐ খানে মাঠের ভিতর ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ — কেমন নিবিড়। ঐ খানে একজন শুয়ে আছে — দিনরাত দেখা হত কত কত দিন হৃদয়ের খেলা নিয়ে তার কাছে...

নগ্ন নির্জন হাত

আবার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে: আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার। যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে অথচ যার মুখ আমি কোনাদিন দেখিনি, সেই নারীর মতো ফাল্গুন আকাশে অন্ধকার নিবিড় হয়ে উঠেছে। মনে হয় কোনো বিলুপ্ত নগরীর কথা সেই নগরীর এক ধুসর প্রাসাদের রূপ জাগে হৃদয়ে। ভারত...

পথহাঁটা

কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে অনেক হেঁটেছি আমি; অনেক দেখেছি আমি ট্রাম-বাস সব ঠিক চলে; তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে: সারারাত গ্যাস লাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো করে জ্বলে। কেউ ভুল করে নাকো-ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাঁদ সব চুপ...

বনলতা সেন

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো...

বুনো হাঁস

পেঁচার ধূসর পাখা উড়ে যায় নক্ষত্রের পানে- জলা মাঠ ছেড়ে দিয়ে চাঁদের আহবানে বুনো হাঁস পাখা মেলে- শাঁই শাঁই শব্দ শুনি তার; এক-দুই-তিন চার-অজস্র-অপার- রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া এঞ্জিনের মতো শব্দে; ছুটিতেছে-ছুটিতেছে তারা। তারপর পড়ে থাকে, নক্ষত্রের বিশাল...

বেড়াল

সারাদিন একটা বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলই আমার দেখা হয়: গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে; কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর নিজের হৃদয়কে নিয়ে মৌমাছির মতো নিমগ্ন হয়ে আছে দেখি; কিন্তু তবুও তারপর কৃষ্ণচূড়ার গায়ে নখ...

ভিখিরী

একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়, একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুড়বাগানে, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো– তবে আমি হেঁটে চ’লে যাবো মানে মানে। –ব’লে সে বাড়ায়ে দিলো অন্ধকারে হাত। আগাগোড়া শরীরটা নিয়ে এক কানা যেন বুনে যেতে চেয়েছিলো তাঁত; তবুও তা নুলো শাঁখারীর হাতে...

মিতাভাষণ

তোমার সৌন্দর্য নারি, অতীতের দানের মতন। মধ্যসাগরের কালো তরঙ্গের থেকে ধর্মাশোকের স্পষ্ট আহ্বানের মতো আমাদের নিয়ে যায় ডেকে শান্তির সঙ্ঘের দিকে — ধর্মে — নির্বাণে, তোমার মুখের স্নিগ্ধ প্রতিভার পানে। অনেক সমুদ্র ঘুরে ক্ষয়ে অন্ধকারে, দেখেছি মণিকা-আলো হাতে নিয়ে...