ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬)

ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬) - কাব্যগ্রন্থ - জীবনানন্দ দাশ

অনেক আকাশ

গানের সুরের মতো বিকালের দিকের বাতাসে পৃথিবীর পথ ছেড়ে — সন্ধ্যার মেঘের রঙ খুঁজে হৃদয় ভাসিয়া যায় — সেখানে সে কারে ভালোবাসে! — পাখির মতন কেঁপে — ডানা মেলে — হিম চোখ বুজে অধীর পাতার মতো পৃথিবীর মাঠের সবুজে উড়ে উড়ে ঘর ছেড়ে কত দিকে গিয়েছে সে...

অবসরের গান

শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার — চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ, তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান, দেহের স্বাদের কথা কয় — বিকালের আলো এসে (হয়তো বা) নষ্ট করে দেবে তার সাধের সময়! চারি দিকে...

কার্তিক মাঠের চাঁদ (মাঠের গল্প)

জেগে ওঠে হৃদয়ে আবেগ — পাহাড়ের মতো অই মেঘ সঙ্গে লয়ে আসে মাঝরাতে কিংবা শেষরাতে আকাশে যখন তোমারে! — মৃত কে পৃথিবী এক আজ রাতে ছেড়ে দিল যারে! ছেঁড়া ছেঁড়া শাদা মেঘ ভয় পেয়ে গেছে সব চলে তরাসে ছেলের মতো– আকাশে নক্ষত্র গেছে জ্ব’লে অনেক সময়– তারপর তুমি...

ক্যাম্পে

এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি; সারারাত দখিনা বাতাসে আকাশের চাঁদের আলোয় এক ঘাইহরিণীর ডাকে শুনি — কাহারে সে ডাকে! কোথাও হরিণ আজ হতেছে শিকার; বনের ভিতরে আজ শিকারীরা আসিয়াছে, আমিও তাদের ঘ্রাণ পাই যেন, এইখানে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুম আর আসে নাকো বসন্তের রাতে।...

কয়েকটি লাইন

কেউ যাহা জানে নাই কোনো একবানী — আমি বহে আনি; একদিন শুনেছ যে সুর — ফুরায়েছে পুরনো তা — কোনো এক নতুন কিছুর আছে প্রয়োজন, তাই আমি আসিয়াছি, আমার মতন আর নাই কেউ! সৃষ্টির সিন্ধুর বুকে আমি এক ঢেউ আজিকার: শেষ মুহুর্তের আমি এক — সকলের পায়ের শব্দের সুর...

জীবন

১ চারি দিকে বেজে ওঠে অন্ধকার সমুদ্রের স্বর — নতুন রাত্রির সাথে পৃথিবীর বিবাহের গান! ফসল উঠিছে ফলে — রসে রসে ভরিছে শিকড়; লক্ষ নক্ষত্রের সাথে কথা কয় পৃথিবীর প্রাণ। সে কোন প্রথম ভোরে পৃথিবীতে ছিল যে সন্তান অঙ্কুরের মতো আজ জেগেছে সে জীবনের বেগে! আমার দেহের...

নির্জন স্বাক্ষর

তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে- আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে! যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে, পথের পাতার মতো তুমিও তখন আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে? অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন সেদিন তোমার! তোমার এ জীবনের ধার ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল? আমার বুকের ’পরে সেই রাতে...

পঁচিশ বছর পরে (মাঠের গল্প)

শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে বলিলাম: ‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি, আসিবার ইচ্ছা যদি হয়!– পঁচিশ বছর পরে!’ এই বলে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে; তারপর কতবার চাঁদ আর তারা, মাঠে মাঠে মরে গেল, ইদুর — পেচাঁরা জোছনায় ধানক্ষেতে খুঁজে এল-গেল।...

পরস্পর

মনে পড়ে গেল এক রূপকথা ঢের আগেকার, কহিলাম, শোনো তবে — শুনিতে লাগিল সবে, শুনিল কুমার; কহিলাম, দেখেছি সে চোখ বুজে আছে, ঘুমানো সে এক মেয়ে — নিঃসাড় পুরীতে এক পাহাড়ের কাছে: সেইখানে আর নাই কেহ — এক ঘরে পালঙ্কের ‘পরে শুধু একখানা দেহ পড়ে আছে —...

পাখিরা

ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে — বসন্তের রাতে বিছানায় শুয়ে আছি; — এখন সে কত রাত! অই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর, স্কাইলাইট মাথার উপর আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর তারপর চলে যায় কোথায় আকাশে? তাদের ডানার ঘ্রাণ চারিদিকে ভাসে। শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে, চোখ আর চায় না...

পিপাসার গান

কোনো এক অন্ধকারে আমি যখন যাইব চলে — আরবার আসিব কি নামি অনেক পিপাসা লয়ে এ মাটির তীরে তোমাদের ভিড়ে! কে আমারে ব্যথা দেছে — কে বা ভালোবাসে — সব ভুলে, শুধু মোর দেহের তালাসে শুধু মোর স্নায়ু শিরা রক্তের তরে এ মাটির পরে আসিব কি নেমে! পথে পথে — থেমে...

পেঁচা (মাঠের গল্প)

প্রথম ফসল গেছে ঘরে, হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল; অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে হিম হয়ে আসে বাঁশপাতা — মরা ঘাস — আকাশের তারা! বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা! ধানক্ষেতে — মাঠে জমিছে ধোঁয়াটে ধারালো কুয়াশা! ঘরে গেছে চাষা, ঝিমায়েছে এ পৃথিবী– তবু...

প্রেম

আমরা ঘুমায়ে থাকি পৃথিবীর গহ্বরের মতো — পাহাড় নদীর পারে অন্ধকারে হয়েছে আহত — একা — হরিণের মতো আমাদের হৃদয় যখন! জীবনের রোমাঞ্চের শেষ হলে ক্লান্তির মতন পান্ডুর পাতার মতো শিশিরে শিশিরে ইতস্তত আমরা ঘুমায়ে থাকি! — ছুটি লয়ে চলে যায় মন! — পায়ের...

বোধ

আলো — অন্ধকারে যাই — মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে! স্বপ্ন নয় — শান্তি নয় — ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়! আমি তারে পারি না এড়াতে সে আমার হাত রাখে হাতে; সব কাছ তুচ্ছ হয়, পন্ড মনে হয়, সব চিন্তা — প্রার্থনার সকল সময়...

মৃত্যুর আগে

আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়, দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার কবেকার পাড়াগার মেয়েদের মতো যেন হায় তারা সব আমরা দেখেছি যারা অন্ধকারে আকন্দ ধুন্দুল জোনাকিতে ভরে, গেছে; যে মাঠে ফসল নাই তাহার শিয়রে চুপে দাঁড়ায়েছে চাঁদ — কোনো সাধ...

মেঠো চাঁদ (মাঠের গল্প)

মেঠো চাঁদ রয়েছে তাকায়ে আমার মুখের দিকে — ডাইনে আর বাঁয়ে পোড়া জমি — খড়-নাড়া — মাঠের ফাটল, শিশিরের জল! মেঠো চাঁদ — কাস্তের মতো বাঁকা, চোখে– চেয়ে আছে — এমনি সে তাকায়েছে কত রাত — নাই লেখাজোখা। মেঠো চাঁদ বলে: আকাশের তলে ক্ষেতে...

শকুন

মাঠ থেকে মাঠে মাঠে — সমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে আকাশে শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁটি বস্তি — নিস্তব্ধ প্রান্তর শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে আরেক আকাশ যেন — সেইখানে শকুনেরা একবার নামে পরস্পর কঠিন মেঘের থেকে —...

সহজ

আমার এ গান কোনোদিন শুনিবে না তুমি এসে– আজ রাত্রে আমার আহ্বান ভেসে যাবে পথের বাতাসে– তবুও হৃদয়ে গান আসে! ডাকিবার ভাষা তবুও ভুলি না আমি– তবু ভালোবাসা জেগে থাকে প্রাণে! পৃথিবীর কানে নক্ষত্রের কানে তবু গাই গান! কোনোদিন শুনিবে না তুমি তাহা, জানি...

স্বপ্নের হাত

পৃথিবীর বাধা — এই দেহের ব্যাঘাতে হৃদয়ে বেদনা জমে — স্বপনের হাতে আমি তাই আমারে তুলিয়া দিতে চাই। যেই সব ছায়া এসে পড়ে দিনের রাতের ঢেউয়ে — তাহাদের তরে জেগে আছে আমার জীবন; সব ছেড়ে আমাদের মন ধরা দিত যদি এই স্বপনের হাতে! পৃথিবীর রাত আর দিনের আঘাতে বেদনা পেত...

১৩৩৩

তোমার শরীর — তাই নিয়ে এসেছিলে একবার — তারপর — মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন্‌ দিকে জানি নি তা — মানুষের ভিড় রাত্রি আর দিন তোমারে নিয়েছে ডেকে কোনদিকে জানি নি তা — হয়েছে মলিন চক্ষু এই — ছিঁড়ে গেছি — ফেঁড়ে গেছি...