অন্যান্য কবিতা

অদ্ভুত আঁধার এক

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া। যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে...

অন্য এক প্রেমিককে

মাথার উপর দিয়ে কার্তিকের মেঘ ভেসে যায়; দুই পা স্নিগ্ধ করে প্রান্তরের ঘাস; উঁচু-উঁচু গাছের অস্পষ্ট কথা কী যেন অন্তিম সূত্র নিয়ে, বাকিটুকু অবিরল গাছের বাতাস। চিলের ডানার থেকে ঠিকরিয়ে রোদ চুমোর মতন চুপে মানুষের চোখে এসে পড়ে; শত টুকরোর মতো ভেঙে সূর্য ক্রমে আরও স্থির-...

অন্য প্রেমিককে

মাছরাঙা চ’লে গেছে — আজ নয় কবেকার কথা; তারপর বারবার ফিরে এসে দৃশ্যে উজ্জল। দিতে চেয়ে মানুষের অবহেলা উপেক্ষায় হ’য়ে গেছে ক্ষয়; বেদনা পেয়েছে তবু মানুষের নিজেরও হৃদয় প্রকৃতির অনির্বচনীয় সব চিহ্ন থেকে দু’ চোখ ফিরিয়ে; বুদ্ধি আর লালসার সাধনাকে...

অলকা

অলকা (মেঘদূত) ওগো জলধর, তোমারই মতো সে কাম্য অলকাপুরী, বিদ্যুৎসম ললিত ললনা শোভে তার বুক জুড়ি! ইন্দ্রচাপের মতো বিরাজিছে চিত্ৰসৌধরাশি, মেঘবারিসীম স্বচ্ছ মানিক ওঠে। সেথা পরকাশি! প্রাসাদকক্ষে সংগীতধ্বনি মেঘমৃদঙ্গসম, আকাশচুম্বী অভ্রেরই মতো সে পুরী তুঙ্গতম! সেথা, নারীর হন্তে...

আঁধারের যাত্রী

আঁধারের যাত্রী চারি দিকে ধু ধু রাতি—সৃজনের অন্ধকাররাশি, জোনাকির মতো প্ৰাণ তার মাঝে চলিছে উদাসী! পত্রগুচ্ছে যেটুকু নিশীথ, যে খণ্ড আঁধারটুকু, যে তুষার শীত, তারই বুকে ঢালি তাপ, জ্বলি আমি শিখা, অনন্ত শর্বরী দূরে ছড়ায়েছে ব্যথা-বিভীষিকা! স্পন্দহীন প্ৰেতপুরে–শোকের...

আদিম

আদিম প্রথম মানুষ কবে এসেছিল এই সবুজ মাঠের ফসলের উৎসবে! দেহ তাহাদের এই শস্যের মতো উঠেছিল। ফলে, এই পৃথিবীর ক্ষেতের কিনারে, সবজির কোলে কোলে এসেছিল তারা ভোরের বেলায় রৌদ্র পোহাবে ব’লে— এসেছিল তারা পথ ধরে এই জলের গানের রবে! এই পৃথিবীর ভাষা ভালোবেসেছিল, ভালো লেগেছিল এ মাটির...

একটি নক্ষত্র আসে

একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ’লে ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে সে আসবে মনে হয়; – আমার দুয়ার অন্ধকারে কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে! হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে সকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে সে এসে...

কবি

কবি বীণা হাতে আমি তব সিংহাসনতলে কালে কালে আসি কবি–কভু পরি গলে জয়মালা, কভু হিংস্র নির্দয় বিদ্রূপ তুলে লই অকুণ্ঠিতে, খুঁজে ফিরি রূপ সৃজনের ছায়াধূপে, আকাশে আলোকে, ধরণী, ড়ুকারি ওঠে যে ব্যর্থতা-শোকে, তারও মাঝে স্বপ্ন খুঁজি, বীণাতারে বুনি তারও সুর,–আনুমনে গান...

কোহিনূর

কোহিনূর তোমারে ঘেরিয়া জাগে কত স্বপ্ন–স্মৃতির শ্মশান, ভুলুণ্ঠিত লুব্ধ অভিযান; সাম্রাজ্যের অশ্রু, রক্ত, সমাধি, পতন হে হীরক, একে একে করেছ চুম্বন! স্পর্শে তব অনাদি অতীত যেন নিরন্তর মর্মে ওঠে ধ্বনি! মাধবের বক্ষে তুমি ছিলে কি গো স্যমন্তক মণি! শ্ৰীহরির বনমালা চুমি...

ঝরা ফসলের গান

ঝরা ফসলের গান আঁধারে শিশির ঝরে ঘুমোনো মাঠের পানে চেয়ে চেয়ে চোখদুটো ঘুমে ভরে। আজিকে বাতাসে ভাসিয়া আসিছে। হলুদ পাতার ঘ্রাণ, কাশের গুচ্ছ ঝরে পড়ে হায়, খসে পড়ে যায় ধান বিদায় জানাই–গেয়ে যাই আমি ঝরা ফসলের গান— নিভায়ে ফেলিয়ো দেয়ালি আমার খেয়ালের খেলাঘরে! ওগো পাখি, ওগো...

তোমায় আমি

তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লে তুমি আমার পদ্মপাতা হলে; শিশির কণার মতন শূন্যে ঘুরে শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে। নদী সাগর কোথায় চলে ব’য়ে পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়ে জানি না কিছু-দেখি না কিছু আর এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার পদ্মপাতার বুকের ভিতর...

নিবেদন

নিবেদন কবিযশ চাহি না মা, তোমার দুয়ারে আসিয়াছি মুগ্ধ প্ৰাণে পূজিতে তোমারে! বিগত শৈশবে কবে অরুণের সনে ছন্দোময়ী উদেছিলে মোর বাতায়নে! এসেছিলে চিত্তে মোর পুলক সঞ্চারি নিখিল কবির কাব্যে ঝঙ্কারি ঝঙ্কারি মানসে জাগলে মম অপরূপ জ্যোতি! দিবাকর জিনি—তব গরিমা ভারতী আমারে নিয়েছে...

পরবাসী

পরবাসী যাহাদের পায়ে পায়ে চলে চলে জাগিয়াছে আঁকাবাঁকা চেনা পথগুলি দিকে দিকে পড়ে আছে যাহাদের দেহমাটি—করোটির ধূলি, যাহারা ভেনেছে ধান গান গেয়ে—খুঁটেছে পাখির মতো মিঠে খুদকুঁড়া, যাহাদের কামনায় ইশারায় মাটি হল পানপাত্র, শষ্প হল সুরা! ছুঁয়ে ছেনে বারবার এ ভাঁড়ার করে গেছে...

পলাতক

পলাতক কারা অশ্বারোহী কবে ঊষাকালে এসে হারায়ে গিয়েছে দূর সাঁঝে–নিরুদ্দেশে না জানি কিসের খোঁজে কতকাল ধরি! যৌবনের রক্ত মোর উঠিছে শিহরি তাহাদেরই মতো আজ—তাই পলাতক আসিয়াছি চুপে চুপে—আলোর পলক নিভে যায় যেইখানে পশ্চিমের মেঘে, যেইখানে মায়াবীর ইশারার বেগে এলোমেলো ঢেউগুলো...

পলাতকা

পলাতকা পাড়ার মাঝারে সব চেয়ে সেই কুঁদুলি মেয়েটি কই! কত দিন পরে পল্লীর পথে ফিরিয়া এসেছি ফের— সারাদিনমান মুখখানি জুড়ে ফুটিত যাহার খই কই, কই বালা আজিকে তোমার পাই না কেন গো টের! তোমার নখের আঁচড় আজিও লুকায়ে যায় নি বুকে, কাঁকন-কাঁদানো কণ্ঠ তোমার আজিও বাজিছে কানে! যেই গান...

বর্ষ-আবাহন

বর্ষ-আবাহন ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে প্রভাত রবি উঠল জেগে দিব্য পরশ পেয়ে, নাই গগনে মেঘের ছায়া যেন স্বচ্ছ স্বৰ্গকায়া ভুবন ভরা মুক্ত মায়া মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে। অতীত নিশি গেছে চলে চিরবিদায় বার্তা ব’লে, কোন্‌ আঁধারের গভীর তলে রেখে স্মৃতিলেখা, এসো এসো ওগো নবীন,...

বেদূইন

বেদূইন ধবল কঙ্কাল যেথা দিকে দিকে রয়েছে ছড়ায়ে অন্তহীন বালুকা জড়ায়ে, দিবানিশি জুলিতেছে লক্ষ চুল্লিশিখা পথে পথে দৈন্য যেথা, গ্লানি বিভীষিকা, নিঃসহায় প্ৰাণ, মরুভূ-ঝটিকা গর্জে দিকে দিকে ক্ষিপ্ত, বহ্নিমান! কোটি কোটি বিষতীব্র ভুজঙ্গম ফণার ঘূর্ণনে মরীচিকা জাগে ক্ষণে ক্ষণে—...

ভারতবর্ষ

ভারতবর্ষ জাগিয়াছে শুভ্ৰ ঊষা–পুণ্য বেদবতী প্রাচীমঞ্চে, ভারতের উদয়গগনে। কোন্‌ এক আদি মহাতপস্যার ক্ষণে বাজিয়াছে আমাদের মঙ্গল আরতি! মধুমান সূর্য সোম ঢালিয়াছে জ্যোতি আমাদের নদী গিরি নির্ঝর কাননে, অৰ্পিয়াছে শান্তি স্বস্তি নিখিলের মনে আমাদের কাব্য কলা–মোদের...

মোর আঁখিজল

মোর আঁখিজল মোর আঁখিজল কাহাদের লাগি আজি উচ্ছ্বসিয়া উঠিতেছে আকুল, চঞ্চল! জীবনে পায় নি। যারা স্নেহ, প্ৰেম, ক্ষমা, যাহাদের মঙ্গলেতে উষাহীন অমা জাগিতেছে দুশ্চর দুস্তর, যাহাদের মৌন চোখ–অশ্রু সকান্তর তুচ্ছতম আলোর সন্ধানে –আঁধারের আবর্তের তলে প্রেতিসম যাহাদের...

যুবা অশ্বারোহী

যুবা অশ্বারোহী যুবা অশ্বারোহী, রাঙা কঙ্করের পথে কোন ব্যথা বহি ফিরিতেছ একা একা নদীতীরে–সাঁঝে। তোমারে চিনি না মোরা, আমাদের মাঝে তোমারে পাই নি খুঁজে, দুপুরের রূঢ় কলরবে নগরীর পথে মোরা নামিয়াছি যবে, বন্দরের কোলাহলে–বেসাতির ফাঁদে আধো হর্ষে—আধেক বিষাদে বিকিকিনি...