মাল্যবান (উপন্যাস)

মাল্যবান – জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত উপন্যাস। মাল্যবান ১৯৪৮ সালের জুনে লিখিত হলেও প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৭৩ সালে।

০১. সারাদিন মাল্যবানের মনেও ছিল না

সারাদিন মাল্যবানের মনেও ছিল না; কিন্তু রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে অনেক কথার মধ্যে মনে হল বেয়াল্লিশ বছর আগে ঠিক এই দিনেই সে জন্মেছিল—বিশে অঘ্রাণ আজ। জীবনের বেয়াল্লিশটি বছর তাহলে চলে গেল। রাত প্রায় একটা। কলকাতার শহরে বেশ শীত, খেয়ে-দেয়ে কম্বলের নীচে গিয়েছে সে প্রায় গোটা...

০২. ওপরের ঘরটায় পলা আর মনু শোয়

ওপরের ঘরটায় পলা (উৎপলা) আর মনু শোয়। একতলার ঘরে মাল্যবানের বিছানা বৈঠক—সমস্ত। এইখানেই সে থাকে, কথা বলে, কাজ করে, বই পড়ে, লেখে, ঘুমোয়। নিজে ইচ্ছা করে স্ত্রীর কাছ থেকে এ-রকম ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়নি সে। দোতলায় ঐ একটা ঘরেই পলার ভালো করে কুলিয়ে ওঠে তেমন : কাজেই সে স্বামীকে...

০৩. দোতলার ঘরটার লাগাও বাথরুম ছিল

দোতলার ঘরটার লাগাও বাথরুম ছিল। বাথরুমটার থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা ছাদ পাওয়া যায়। সমস্ত ছাদটা বড়ো মন্দ নয়। কিন্তু অন্য ভাড়াটে পরিবারটি ছাদের বেশির ভাগটাই প্রায় নিজেদের জন্য আলাদা করে রেখে দেওয়া দরকার মনে করেছে। কয়েকটা বেশ সুন্দর সবুজ তাণ্ডুলিন টাঙিয়ে চমৎকার একটা...

০৪. মাইনে তো আড়াই শো টাকা হল

তোমার মাইনে তো আড়াই শো টাকা হল—এখন একটা কেলেঙ্কারি ঘোচাও তো। কী করতে হবে? ছাদে পাৎপিঁড়ি পেতে খাওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। উৎপলা বললে। দিব্যি তো গায়ে বাতাস লাগিয়ে আলোয় আলোয় মাছের কাঁটা বেছে খাওয়া হয়, মাল্যবান যেন নাকের আগায় চশমা ঝুলছে তার, এম্নিভাবে, একদৃষ্টে, সনির্বন্ধতায়...

০৫. মেজদারা তো থাকবেন অনেক দিন

দু-তিন দিন পর মাল্যবান বললে, তোমার মেজদারা তো থাকবেন অনেক দিন। হ্যাঁ। বছর খানেক? না, মাস দুয়েক। একটা কথা আমার মনে হয়, মাল্যবান বললে, এ-বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে একটা নতুন বাড়ি দেখলে মন্দ হয় না। দোতলা কিংবা তেতলায় বড়ো বড়ো কয়েকখানা ঘর থাকবে। শুনে উৎপলা নাকে-চোখে খুব খুশি হয়ে...

০৬. পাথুরেঘাটার বাড়িটা

পাথুরেঘাটার বাড়িটা উৎপলা নিজেই একদিন মাল্যবানের সঙ্গে গাড়িতে চড়ে দেখতে গেল। দেখে পছন্দ হল না তার। অন্য কোনো বাড়িও সুবিধেমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। কাজেই ঠিক হল, মেজদার পরিবার এলে মাল্যবান নিজে কিছু কাল মেসে গিয়ে থাকবে। মাল্যবান তার হাতের অবশিষ্ট ঘড়িটা, ককতগুলো সোনার বোতাম...

০৭. পরদিন সিনেমায়

পরদিন উৎপলা আগ বাড়িয়ে বললে, সিনেমায় চল। অফিস ছুটি ছিল সে-দিনও তিনটের শো-তে গেল তারা। ট্রাম থেকে নেমে উৎপলা বললে, বক্সে বসবে তো? না, সে ঢের খরচ। তাহলে কোথায় যাবে আবার। ছবিতে বক্সে না বসলে ভালো লাগে না। কেন, নিচের গদিতে বসেও তো বেশ আরাম। আরামের জন্যে বলছি না আমি— তবে?...

০৮. বড় বৌঠানের সংবাদ

চার-পাঁচ দিন পরে উৎপলা পিওনের হাত থেকে একটা কার্ড নিয়ে পড়তে-পড়তে উৎফুল্ল হয়ে বললে, বড় বৌঠানের সংবাদ লিখেছে। মাল্যবান সর্ষের তেল গায়ে মাখছিল, এই বয়েসে আবার সংবাদ— বলে নিরেস চোখে-মুখে তেল মাখতে লাগল আবার। তা হবে তো। কেন হবে না? বড় বৌঠানের বয়স না কত? চুয়ান্ন। এ-রকম বুড়ো...

০৯. সেলাইয়ের কল

উৎপলার সেলাইয়ের কলটা অনেক দিন ধরে পড়ে ছিল-অবিশ্যি অযত্নে নয়—জিনিসের যত্ন করে সে কিন্তু অব্যবহারে। কলটার ঢাকনি সাফ করা, ঢাকনি খুলে ঝেড়েপুছে ঝকঝক করে রাখা—হাতে কাজ না থাকলে এটা তার খুবই সোহাগের কাজ। এক দিন সকালবেলা পাশের ভাড়াটেদের একটি ছোট্ট মেয়ে এসে বললে, পলা মাসিমা,...

১০. পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি

পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি আঁতুড়েই মারা গেল। আমি তো তখনই বলেছিলাম, এই রকম হবে— দুতিন দিন উৎপলা কেমন একটা শোকগ্রাহিতায় আচ্ছন্ন (না, বিমুগ্ধ?) হয়ে কাটাল। বললে, আমি একটু দেখতেও পারলাম না, আমাকে একটু ডেকে দেখালও না। কী করতে তুমি দেখে? এই তো পাশাপাশি বাড়ি-মানুষ জন্মায়—মরে...

১১. স্ত্রী সন্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে

মাল্যবান যা-ই মনে করুক না কেন, স্ত্রী সন্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে একা-একা আইবুড়ো থেকে জীবন কাটানো খুব শক্ত হত তার পক্ষে! গোল-দীঘিতে ঘুরে-ঘুরে বারো-চৌদ্দ বছর সে অনেক হাওয়াই ফসল ফলিয়ে গেছে; সমাজসেবা, দেশস্বাধীনতার জন্যে চেষ্টা, বিপ্লবের তাড়না-তেজ, নিবৈপ্লবিক মনের চারণা,...

১২. কিছুই ভালো লাগছিল না

চার-পাঁচ দিন কেটে গেছে। মাল্যবানের কেমন যেন—কেন যেন কিছুই ভালো লাগছিল না। চলো, আজ একটু বেড়িয়ে আসি— কোথায়? চলো আজ একটু গড়ের মাঠের দিকে যাই—মাল্যবান বললে। থাক। চলো, ভরসাঁঝে এ-রকম একা-একা বসে থাকলে মন খারাপ লাগবে— উৎপলা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বড় বাতাসে ফুল ধরা বাবলার মতো...

১৩. রাত দুটোর সময়

রাত দুটোর সময় খুবই কাছাকাছি কোন্ একটা বাড়ির ভেতর বড় কান্নাকাটি পড়ে গেল; মাল্যবানের ঘুম গেল ভেঙে। তাড়াতাড়ি বিছানার থেকে উঠে কম্বল গায়ে দিয়ে সে দরজা খুলে রাস্তায় নামল। তাকিয়ে দেখল ধীরেনবাবুদের সদর দরজার কাছে ভিড় জমে গেছে। ঢুকে দেখল, একটি মেয়েমানুষের শব নিচে নামানো...

১৪. মড়া পুড়িয়ে বেলা দুটোর সময়ে

মড়া পুড়িয়ে বেলা দুটোর সময়ে বাড়িতে ফিরে এলে উৎপলা বললে, আজকে অফিসটা বাদ দিলে তাহলে? কী করব, পাড়াপড়শী যদি মরে যায়। কী করলে শ্মশানে গিয়ে। যাই, চৌবাচ্চায় চান করে আসি–বলে, মাল্যবান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিঠে গামছা ঘষতে লাগল। সত্যেনবাবু গিয়েছিলেন শ্মশানে? ও মা, তিনি যাবেন...

১৫. মৃত্যু ও দাহের স্বপ্ন

রমা মারা যাওয়ার পর থেকেই মাল্যবান মাঝে-মাঝে কেমন সব মৃত্যু ও দাহের স্বপ্ন দেখত রাতের বেলা। একদিন সে দেখল, নিজে মরে গেছে, তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল: সেখানে সে খুব অমায়িক ভাবে সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, সকলকে নমস্কার জানাচ্ছে, বিদায় নিচ্ছে, বলছে; আপনাদের সঙ্গে আর তো...

১৬. চা-জলখাবার খেয়ে

পরদিন সন্ধ্যের সময় আফিস থেকে ফিরে চা-জলখাবার খেয়ে মাল্যবান ওপরে এল। সে-দিন সেই পরোটাগুলো কাকে দিয়েছিলে? কোন দিন? ঐ যে-দিন বৌঠানের জন্যে বেনারসী কিনতে গেলাম? ওঃ, লোনার মাকে। লোনার মা এসেছিল আর? না। তার ছেলের কী হয়েছে যেন? কুষ্ঠ। উৎপলা বললে, কেন জিজ্ঞেস করছ?...

১৭. প্রাণধারণের ব্যাপারে খারিজ

মাল্যবান প্রাণধারণের ব্যাপারে কেমন যেন খারিজ হয়ে নিচে নেমে গেল। কিছুই ভালো লাগছিল না তার। স্ত্রীর গরজের কথা হচ্ছিল এতক্ষণ—মাল্যবান নিজের ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখল, বাস্তবিক, বাড়ির গিন্নির স্পৃহার সম্পূর্ণ অভাবের জন্যেই এই ঘরটা একেবারে হতচ্ছাড়া হয়ে রয়েছে—ওপরের ঘরের...

১৮. ব্যবস্থা আবার আগের মতন

মাল্যবানের ঘরের জিনিসপত্র ব্যবস্থা আবার আগের মতন দাঁত খিচিয়ে উঠল; নোংরা হলদে কাগজের স্তুপ চার দিকে, জানালার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত রাস্তার ধুলো ধোঁয়, অঝোর গোলাপায়রার বাসা, মেঝের চার দিকে চুরুটের টুকরো খাতলানো চরুট তামাকপাতা ছাই দেশলাইয়ের কাঠি, পাখির পালক বিষ্ঠা, পুরোনো...

১৯. মেজদার পরিবার এল

পৌঁষ মাসের শেষাশেষি মেজদার পরিবার এল। মাল্যবান একটা মেসে গিয়ে উঠল। মেস ঠিক নয়-মাঝারি-গোছের একটা বোর্ডিং। একটা আলাদা কামরা বেশ গুছিয়ে নিল সে। মেজদা আর বৌঠান কিছুতেই ছাড়তে চায়নি মাল্যাবনকে, কিন্তু তবুও সব দিক ভেবে সুবিবেচনা করে মেসেই যেতে হল তাকে। মেসের লোকজনের সঙ্গে...

২০. সরস্বতী পূজোর দিন

সরস্বতী পূজোর দিন মাল্যবানের ঘরের পাশেই বোর্ডিং-এর কয়েকজন জনে মিলে খুব মদ খেল। বোর্ডিং-এর একটা হলের মতো ঘরে বাঈনাচ হয়। বোর্ডিং-এর ঝি বাবুদের সঙ্গে পাশা-পাশি চেয়ারে বসে নাচগান দেখল-শুনল; মাল্যবান অবাক হয়ে দেখছিল, ঝি একটুও সঙ্কোচ বোধ করছে না—এ যেন তার পাকাপাকি অভ্যাস;...