পরের দিন সন্ধ্যেরাতেই বেড়িয়ে ফিলে মাল্যবান ঠাকুরের কাছে শুনল যে অমরেশবাবু ওপরে বৌঠাকরুণের ঘরে ঢুকেছেন।

মাল্যবান খেল-দেল, খবরের কাগজ পড়ল, চুরুট টানল; তারপর কথা ভাবল সে; ভাবতে-ভাবতে কথাই ভাবল দু-তিন ঘণ্টা।

রাত বারোটার সময় অমরেশ নিচে নেমে এল।

আপনি এখনও জেগে আছেন চাঁদমোহনবাবু—–মাল্যবানকে একটা হ্যাচকা ডাক দিয়ে লেপের নিচের আড়ষ্ট অবস্থার থেকে জাগিয়ে তুলে বললে অমরেশ। মাল্যবানের নাম চাঁদমোহন নয় তো। অমরেশ একটু জিভ নেড়ে লাট মারতে চাইছে নামটা নিয়ে, সেই নামে মাল্যবানকে ডেকে। তা হোক।

মাল্যবান মুখের থেকে লেপ সরিয়ে নিয়ে বললে, ঘুমিয়ে পড়ছিলুম।

তারপর? সাইকেলের তালা খুলতে খুলতে অমরেশ বললে।

কোথায় যাচ্ছেন?

আহিরিটোলা।

এত রাতে?

আহিরিটোলার গঙ্গায় নামতে হবে।

এত রাতে?

সাঁতার কাটব।

মাল্যবান এবার আর কিছু বললে না। বালিশে শিরদাঁড়াটা ঠেস দিয়ে একটু উঁচু হয়ে বসল।

সে আমাদের একটা দঙ্গল আছে। চার হাত পায়ে নিমকের বস্তার মতো ভুশ করে পড়ে এক-একটা সাঁতারু মুনিষ আহিরিটোলার গঙ্গায়।

মুনিষ কেন বললে অমরেশ মানুষ না বলে ভাবতে-ভাবতে মাল্যবান বললে, এত রাতে গঙ্গায় নাওয়া হবে?

নাওয়া না, মশাই। গঙ্গামৃত্তিকার তেলক কাটবার জন্যে আমাদের জন্ম হয়নি, দাদা। সাঁতার কাটব—দেখি কে কত দূর যেতে পারে, কার আগে যেতে পারে—

ওঃ, মাল্যবান বললে।

ছেলেটি সাইকেলটি খুলে রেখে মাল্যবানের টেবিলের এক কিনারে বসল।

চেয়ারে বসুন।

এই বেশ বসেছি। আমাদের সাঁতার দেখতে যাবেন, চাঁদমোহনবাবু?

এখন? এত রাতে?

আচ্ছা, বেশ, বুড়োমানুষ আপনি, তাহলে বারুণী স্নানের সময় যাবেন। তখন গরম পড়ে যাবে।

মাল্যবান বললে, কিন্তু, সত্যিই কি আহিরিটোলার ঘাটে সাঁতার কাটা হবে আজ।

কী বলছি তবে আপনাকে। মেয়েরা অব্ধি দেখতে যাবে–নিজের ডান পায়ের কড়া পালিশের নিউকাট উঁচিয়ে নিয়ে অমরেশ বললে, এই ভগবতীর চামড়া ছুঁয়ে বলছি ভদ্দরলোকের মেয়েরা যাবে সব গুল বেঁধে আমাদের খেলা দেখতে, বেশ্যেরা যাবে, ওদিককার পাড়ায়-পাড়ায় যেখানে যত বেশ্যে আছে—

মাল্যবান চুরুট জ্বালাল।

রাঁড়েদের সঙ্গে ভদ্রঘরের মেয়েদের কোনো মামলা হবে না, সার, কেউ কাউকে দুর-দুর বলে তাড়িয়ে দেবে না। এরাও যে মানুষ, ওরাও তা অকপটে স্বীকার করবে, সার।

মাল্যবান অবাক হয়ে ভাবছিল, এই সেই সমাবেশ? একে নিয়ে উৎপলার রাত বারোটা বাজে? থুতু না ছিটোলেও—কথা বলতে-বলতে জিভে-দাঁতে থুতু জমে যায় যাদের—সত্যি-সত্যি না অবিশ্যি, রূপক হিসেবে—সেই রকমই অসার, অবুদ্ধিমান, উচ্ছ্বাস-সর্বস্ব তত এই ছেলেটি; চেহারা লম্বা; গড়ন-পেটন ভালো; মুখ সুন্দর পুরুষ মানুষের মতো; এসব বলে ভুশি হীরে হয়ে গেল উৎপলার কাছে। তাই তো হয়। সৃষ্টিটা সংখ্যানবিশ বটে কিন্তু হিসেবতন্ত্রী নয়, কী রকম মারাত্মক ভুল বিষের মতন মিশে রয়েছে নিখিলের রক্তের ভেতর, তার নিরবচ্ছিন্ন মন্ত্রণার প্রবাহের মধ্যে!

কিন্তু, স্বীকার করলেই তো শুধু হবে না, মাল্যবান বললে, ওদের মানুষ করবার পথ বলে দিতে হবে তো।

সে একটা মস্ত সামাজিক সমস্যার কথা হল—

মাল্যবান চুরুট টানতে-টানতে বললে, সবই সব হল। তা বটে, সাঁতার কাটা দেখতে গিয়ে কি আর সামাজিক হেঁয়ালি মেটে। তবে হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন বেশ একটু ভ্রাতৃপ্রেম-ভগ্নাপ্রেম-ভাইব্রাদারি—কিন্তু ওদের তো ঢের খারাপ লোগ আছে।

আছে বটে, কিন্তু মেয়েরা তো মেয়েদের রোগ দিতে পারে না। খুব হৃদ্যতার সঙ্গে মেলামেশা, কিন্তু মেয়েরা তো পুরুষ নয়—

মাল্যবান মুখের থেকে চুরুটটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চর্মচক্ষে এবং মনশ্চক্ষে—চার চোখ মিলিয়ে নিয়ে অমরোশের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর বললে, ওখানে ছোকরাদের দলও তো বেশ ভারি।

তাদের ভেতর দুকানকাটা খুব কম।

শুনে মাল্যবান ঘাড় বাঁকাল; ঘাড় সোজা করে চুরুট টেনে-টেনে ঘাড় বাঁকিয়ে অমরেশের দিকে তাকাল একবার। কিন্তু যে-কথাটি বলবে ভেবেছিলে তা বললে না, বাজে কথা পেড়ে মাল্যবান বললে, এত ঠাণ্ডায় সাঁতার কেটে নিমোনিয়া হবে না তো।

হবে—সেরে যাবে। না হয় মরে যাব।

আরে কী বলে! মরে যাবার কী আছে! তা, আমার স্ত্রীকে কী করে চিনলেন? মাল্যবান বেড়ালের থেকে চিতে বাঘ, চিতে বাঘ থেকে বেড়াল সত্তায় আসা-যাওয়া করতে করতে বললে।

এখন চলি, মাল্যবানবাবু, রাত হয়ে গেছে।

মাল্যবান চুরুটটা নিভে গিয়েছে টের পেল। দেশলাই জ্বালিয়ে চুরুট ধরিয়ে মাল্যবান একটা বড়ো হুড়াড়ের ছানার মতো হঠাৎ উজিয়ে উঠে বললে, সাইকেল এনে সটান যে ওপরে চলে গেলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে কবে কোথায় পরিচয় ছিল আপনার, বলবেন না?

খুব সোজা কথা জিজ্ঞেস করেছে মাল্যবান, সহজ উত্তর, এক্ষুনি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর না দিতে পারে যে অমরেশ তা নয়, কিন্তু তবুও সে বললে, আমি আরও তো আসব আপনাদের এখানে। আর একদিন না হয় বলব। অমরেশ ওভারকোটের পকেট থেকে সিগারেটের টিন বার করল। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে বললে, সেই যে সামাজিক সমস্যার কথা বলছিলেন, সেটার বিশেষ কিছুই করা যাবে না আমাদের সকলের আর্থিক জীবনের সুবিধে না এলে। এদিক দিয়েই প্রথমে চেষ্টা করা দরকার। অবিশ্যি সমাজ-ভাবনা সম্বন্ধেও অন্ধ থাকলে চলবে না।

মাল্যবান নিজের অনুভূতি ও উপলব্ধির নিচে অমরেশের কথাগুলো পুরোনো নোংরা খবরের কাগজের মতো চেপে রেখে দিয়ে বললে, আপনি নিজে তো খুব সচ্ছল—

আপনার স্ত্রীও তো খুব। দেখছি তো। বলে অমরেশ যেন কোনো ইঙ্গিত করেনি, কোনো খারাপ ইঙ্গিত করেই নি এমনই স্নিগ্ধ নির্দোষভাবে হাসল। কিন্তু হাসিটা কেটে গেল, অমরেশের মুখের চেহারা হল আরেক রকম যেন; অনুধাবন করে অস্পষ্টতার ভেতর থেকে তবুও কোনো স্পষ্টতা খুঁজে পেল না মাল্যবান, হাতের চুরুটের আগুন অঙ্গারের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়েছিল। দুজনের চুরুট সিগারেটের ধোঁয়া পরস্পরকে কাটাকাটি করে কথা বলছিল শুধু।

আমার স্ত্রীটি তৃতীয়পক্ষের, আমার চেহারা দেখে তা মনে হয়, মাল্যবানবাবু? অমরেশ বললে, প্রথম পক্ষের স্ত্রীটি এখনো আছে, বাপের বাড়িতে থাকে, আমি তাকে নিয়ে ঘর করব না। দুনম্বরের কাত্যায়নী মরে গেছে। এই তিন নম্বর। এ স্ত্রীর ছেলেপুলে তিনটি। আর একটি এই মাঘে হচ্ছে।

মাল্যবানের মনে হল অমরেশের গলার সুর, শরীরের বাঁধ, সমস্ত, অন্তরাত্মার থেকেই কেমন একটা সুদৃঢ় (কিন্তু) সুলভ আত্মতুষ্টি চুইয়ে পড়ছে। আজকালকার। এই শিশ্নোদরতন্ত্রী এবং যা শিশ্নোদর নয় কিন্তু তবুও উচ্চুঙ্খল—এই সব মূল্যবিশৃঙ্খলার পৃথিবীতে অমরেশের এই কথাগুলো বেশ স্বাভাবিক; স্বাভাবিক অতএব ভালো? ভালো না মন্দ? সে নিজে কী রকম? মাল্যবান নিজের চুরুটের ছাইচাপা আগুনের। এক-আধটা কণিকার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল। মূল্যবিশৃঙ্খলা? বিশৃঙ্খলরা একেই শৃঙ্খলা মনে করে। মূল্যশৃঙ্খলা কী? কী জিনিস মাল্যবানের মতে? সে নিজে যদি মুল্যশঙ্খলা চায়, তাহলে তার নিজের বাড়িতেই সে জিনিস এ-রকম সুসদৃশ ভাবে অনুপস্থিত?

রাত তো কম হয়নি।

বারোটা বেজে গেছে। অমরেশ বললে।

শীতের রাত বারোটা….আমার স্ত্রীর কাছে কী দরকার ছিল আপনার?

কথা বলতে বলতে রাত তো হবেই—

দেখছি তো হচ্ছে। এতদিন তো আপনাকে দেখিনি এখানে।

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার ধোঁয়া ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা নেড়ে চেড়ে নিয়ে অমরেশ বললে, আপনারা যে এখানে আছেন তা তো জানতুম না আমি।

কী করে জানতে পারলেন তবে?

চাঁদমোহনদা, চিনি তো পিঁপড়ের গন্ধ পায় না। পিঁপড়েকেই খুঁজে পেতে বার করতে হয়, অমরেশ খুব উল্লাস বোধ করে বললে, আপনারা বেশ ঝাড়াঝাপটা থাকতে চান, ছোঁয়াছানা বাঁচিয়ে খুব যা হোক; কিন্তু তা নয় না; পিঁপড়েতে চিনিতে ধুল পরিমাণ হয়ে যায়, চিনি পিঁপড়েকে বেছে খায়, দেখেছেন?

মাল্যবানের মনে হচ্ছিল, অমরেশের কথার কোনো ঝাঁজ নেই, যেন দুটো ঠ্যাঙের বদলে আটটা ঠ্যাং অমরেশের, মাকড়সার মতো, কেমন ল্যাং-ল্যাং ল্যাং-ল্যাং করছে সব সময়েই কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো গাঢ় লাল মাকড়সানীদের দেখছে বলে—সমস্ত জীবন ভরে। চেহারার চেকনাই আছে, টাকা আছে বলে বিগড়ে গেছে সে—অনেক মেয়ের হাতেই।

উৎপলাও ইন্ধন দিচ্ছে?

মাল্যবান মুখের থেকে চুরুটটা নামিয়ে আন্দাজ করছিল ইন্ধনটা কত দূর—কী ধরনের–

ভাবতে ভাবতে কেমন যেন সমাধিভূত হচ্ছিল; মুখে সে বলছিল, বসুন, বসুন, অমরেশবাবু, বসুন। কিছু অনেকক্ষণ হল ঠোঁট জিভ নাড়া স্তব্ধ করে দিয়েছিল তার মন; নিমেষনিহত হয়ে ছিল; চুরুট নিভে গেছে–

চলি, মাল্যবানবাবু।

আচ্ছা–

কাল আসব।

আসবেন। আসবেন।

 

দিন সাতেক পরে রাত দশটার কিছু আগেই অমরেশ বেরিয়ে গেলে পরে মাল্যবান খাবার জন্যে ওপরে চলে গেল।

ওপরে উঠে সে দেখল উৎপলা খাবার টেবিলের এক কিনারে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে; টেবিলের ওপর মাথা রেখে মনু ঘুমোচ্ছে।

আজকাল খেতে বড্ড দেরি হয়ে যায়। মাল্যবান বললে।

কটা বেজেছে?

দশটা।

দশটা কি বেশি রাত?

সকলের কাছে বেশি নয়, মাল্যবান বললে, মনু তো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশি রাত হয়েছে বলে ঘুমোয়নি, খুব শীতে কারে ঘুমিয়েছে হয়তো।

উৎপলা বললে, তুমি তো আগে খেলেই পার। রান্নাঘর তত তোমার নিচের ঘরের লাগাও। খাবার সময় মনুকে নিয়েও তো বসতে পার–

হ্যাঁ, কাল থেকে একটা অবস্থা করে নিতে হবে। যে লোকটি তোমার কাছে আজকাল খুব ঘন ঘন আসছেন তার জন্যেই খানিকটা বিশৃঙ্খলা এসে পেড়েছে পরিবারের ভেতর। ও কে?

চিনি না।

মানে যে— উৎপলার কথা কপচাবার ইচ্ছে ছিল না, বললে, চিনি না। এই মানে। মানে—কোচড় ভরে নিয়ে যাও, চিবিয়ে খাও মানে। এই মনু! মনু! বলে ডাক পেড়ে উঠল উৎপলা।

ওকে তুমি জাগিয়ো না, থাক–তুমি জাগিয়ো না ওকে।

খাবে না?

না।

রোজই তো না খেয়ে ঘুমুচ্ছে।

ওকে এখন জাগিয়ে খাওয়াতে গেলে খাবে না কিছু, আমাদেরও খেতে দেবে না। মাল্যবান মনুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় রেখে এল।

উৎপলা একটা তোয়ালে দিয়ে টেবিলটা মুছে নিয়ে দুটো চিনেমাটির ডিশ, কাচের গেলাস, একটা বড়ো পিরিচে নুন লেবু কাঁচালঙ্কা সাজিয়ে নিচ্ছিল। একটা পারুল ফুলের মতো প্রকৃতির থেকেই যেন উৎপন্ন জমিনের তাঁতের শাড়ি সে পরেছিল—চওড়া লাল পাড়ের। আশাতিরিক্ত ভাবে পরিতৃপ্ত কেমন একজন সীতা সরমা দ্রৌপদী চিত্রসেনীর মতন অপরূপ দেখাচ্ছিল তাকে।

এসো—খেতে এসো–উৎপলা বললে।

মাল্যবান চেয়ারে বসে বললে, অমরেশ কখন এসেছিল?

সন্ধ্যের সময়।

আমি অফিস থেকে ফেরবার আগেই?

তুমি কখন ফিরেছ, তাতে আমি জানি না।

হ্যাঁ, অফিস ফিরেই ওর সাইকেলটা আমার ঘরে দেখলাম।

সাইকেলে আসে না কি? উৎপলা বললে, জানি না তো।

আজ রাত দশটার আগেই চলে গেল। একদিন তো দেখলাম এগারোটা বারোটা বাজলে নড়ে-চড়ে না। কে লোকটা?

আমি চিনি না ওকে।

উৎপলা খান-সাতেক লুচি মাল্যবানের পাতে দিল, খান-তিনেক নিজে নিল। দুতিনটে বাটিতে বেগুনভাজা, ছোলার ডাল আর আলুর তরকারী ছিল। একটি সপ্যানে দুধ ছিল—ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সবই মিইয়ে গেছে, লুচি কড়কড় করছে; কারুরই পেটে ক্ষিদে ছিল না যেন, কিন্তু তবুও এ জিনিসের কিনার ভেঙে, ও-জিনিসটা খুঁটে, সে-জিনিসটা টিপে খুব গাফিলতি গড়িমসি করে খেতে হচ্ছিল—খেতে খেতে দু-একটা কথা বলবার জন্যে থেমে পড়েছিল।

চেন না—তাহলে কি করে ও তোমার ঘরের ভেতর ঢোকে?

এটা কি আমার বাড়ি?

মাল্যবান বললে, এতদিন তাই তো জেনে এসেছি। আজ অমরেশ এখানে আসছে যাচ্ছে বলে আমার ঘাড়ে মালিকানার বোঝা ঠেলে তুমি ওর গতিবিধির কৈফিয়ৎ আমার কাছ থেকেই নেবে ঠিক করেছ?

উৎপলা তিনখানা লুচির আধখানা খেয়েছিল এতক্ষণে, বাকি আড়াইটে দিয়ে কী করবে ঠিক করতে না পেরে আপাতত হাত গুটিয়ে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে বললে, আমার বাড়ি হোক, তোমার বাড়ি হোক, তোমার নাকের ওপর দিয়েই তো আমার ঘরে পাত্তা পাচ্ছে রোজ অমরেশ। কী করতে পেরেছ তুমি তার। কী করতে পারবে।

মাল্যবান দুখানা লুচি শেষ করেছিল, কিছু ছোলার ডাল, একখানা বেগুন-ভাজা। জলের গেলাসে চুমুক মেরে ঠোঁট জিভ ভিজিয়ে দাঁত ঠাণ্ডা করে নিয়ে বললে, আমি তো জানতাম না যে ওকে তুমি চেন না।

কী মনে করেছিলে তুমি?

ওকে তুমি চেন না?

চিনি না বলেছি তো।

তোমার বাপের বাড়ির কেউ না?

না।

কলেজে তোমার সঙ্গে পড়েছিল?

আমি তো মেয়েদের কলেজে পড়েছি—সেকেন্ড ইয়ার অব্দি। তুমি দিশে হারিয়ে ফেলছ।

কেউই না-কোনোদিনই দেখনি ওকে এর আগে আর? স্তম্ভিত হয়ে মাল্যবান বললে, তবে?

তবে মানে? ভ্রূকুটি করে উৎপলা মাল্যবানের দিকে তাকাল।

তবে তোমার দিনের পর দিনই খুব খুলছে মনে হচ্ছে, মাল্যবান কোমলকঠিন চোখে উৎপলার দিকে তাকাল; কী একটা দাবি জানিয়ে অথচ তা প্রত্যাহার করে তাকিয়ে রইল অনড়, অক্লান্ত চোখে কিছুক্ষণ। বললে, ও আসার পর থেকেই তোমার চেহারার ভেতর এমন একটা সরম সরসতা—যা আগে আমি দেখিনি বড়ো-একটা। তোমার কথাবার্তা ব্যবহার বিয়ের জল পেয়েছিল কি একদিন? মেঘের জল পাচ্ছে কি আজ? এখনকারটাই তো ভালো মনে হচ্ছে।

গড়িমসি করছিল এতক্ষণ, উৎপলা এবার খেতে শুরু করল। ঠোঁট একটু নড়ল কি নড়ল না, হাসি ফুটে উঠতেই মিলিয়ে গেল মুখে, সে হাসিটা আমোদের–ব্যথার—হয়তো গ্রন্থিমাংসপেশীর কেমন একটা অচেতন আক্ষেপের–

আধখানা লুচি খাওয়া হয়েছিল উৎপলার, বাকি আধখানা খাচ্ছিল।

অমরেশ তত দিন পনেরো হল আমার কাছে আসছে। চার পাঁচ ছ ঘণ্টা রাত কাটিয়ে যায়; বাতি জ্বলে ঘরে; বাতি নিভেও থাকে অনেকক্ষণ; আমরা মাঝে-মাঝে ভাবি তুমি হয়তো ওপরে আসছ; ওপরে এলে একটা কাণ্ডই বাধাতে তুমি—লুচির বাকি টুকরোটুকু খেয়ে ফেলে উৎপলা বললে, তুমি বাধাতে কি না জানি না, তবে মানুষ তো মানুষ, ঝামেলা না হয়ে যায় না; বেধে যেতো এত দিনে; অমরেশও চুপ করে থাকত না।

কেন কী হয় ওপরে?

আমি কেন তা বলব?

তাহলে পরের ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে যাব আমি?

কেন তুমি নিজে ওপরে এসে নিজের চোখে দেখে যেতে পারবে না? পনেরো দিন তো হল। নিচের থেকে তরতর করে লোকটাকে ওপরে উঠে যেতে দেখছ তো রোজই। নিচের ঘরে বসে মাঝে-মাঝে কথাও বলেছে তোমার সঙ্গে। কথাবার্তা শুনে কেমন মনে হয়েছে অমরেশকে তোমার?

মাল্যবান কিছু খেতে গেল না আর। এঁটো হাতে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললে, লুচি খেলে না যে—

ক্ষিদে নেই।

অমরেশ কাল আসবে?

আসবে বৈ-কি, উৎপলা আর একখানা লুচির কিনার ভেঙে ক্ষিদে জাগিয়ে তুলবার সাহসিক চেষ্টায় নিজেকে আলোড়িত করে তুলে বললে।

ওকে এ-বাড়িতে আসতে নিষেধ করে দিতে পারবে তুমি?

উৎপলা উঠে দাঁড়াল।

কী হল?

ঘুম পেয়েছে।

বোস, বোস, কথা আছে—

না, না, বসতে পারছি না, দুটো পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা করছে।

কী বলবে বল, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছি—

মাল্যবান সিগারেটটা টানতে গেল না আর। জলের গেলাসের ভেতর সেটা ফেলে দিয়ে বললে, অমরেশের সম্বন্ধে কী ব্যবস্থা করবে বল।

উৎপলা নিজের জলের গেলাসটা মুখে নিয়ে খানিকটা জল খেল, বাকি কুলকুচো করে ছাদের দিকে ফেলে দিল। টেবিলে ছোটো পিরিচে কয়েকটা পান ছিল। দুটো পান মুখে দিয়ে মাল্যবানের দিকে বিলোড়িতক্রমে-ক্রমে শান্তি মণ্ডিত কেমন একটা স্থির মমতায় তাকিয়ে হেসে বললে, কোনো কিছু ব্যবস্থা করবার নেই?

কী বলছ তুমি! উৎপলার দৃষ্টিশক্তির ওপর একটা পাখশাট মেরে যেন মাল্যবান বললে, খেয়াল আছে, কী বলছ তুমি!

যা বলছি, তাই বলছি,  তেমনই দৃষ্টিতৃপ্তিতে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে একটুও ঝক না মেরে উৎপলা বললে, তুমি না হয় কাল ওপরে এসে একটা বিহিত করে যেয়ো—

মাল্যবান উৎপলার মুখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে মনের ঢের বেশি চোখের আলোকপাতের কড়া ঝাঝ দিয়ে সমস্ত ঘরটা ভরে ফেলতে লাগল; ধীরে-ধীরে মনে আলো এল তার; দেখল, আলোটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে; মাল্যবান ভাবছিল, সে নিজে বিহিত কিছু করতে পারবে না; অন্ধকার রাতে পাঁচিল ডিঙিয়ে নিজের গাছেরও ফল চুরি করা বা যে চুরি করেছে তাকে ঠ্যাঙানো তার ধাতে নেই; ভালো হোক মন্দ হোক, কেমন একটা ধাত যেন তার; বন্ধুবান্ধব ডেকে হামলা করবার রুচি নেই; রটে যাবে সব, যেটুকু বা সাংসারিক শান্তি আছে তাও ছটকে ছত্রিশখান হবে। কিন্তু উৎপলা কি তাকে সাহায্য করবে না?

মাল্যবান গেলাসটার জল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নোটার থেকে খানিকটা জল গড়িয়ে নিয়ে ঢক ঢক করে গিলে খেল—হাত মুখ ধুয়ে ফেলল। ভালো লাগল, খানিকটা ঈশার শান্তি সংস্থাপিত হল পৃথিবীতে যেন, কিন্তু তবুও বিজ্ঞানের ঘোড়া ডিঙিয়ে সান্ত্বনার ঘাস খাবার প্রবৃত্তি মাল্যবানের ছিল না, সে ভেবে দেখল, উৎপলা আর অমরেশের সম্পর্ক সম্বন্ধে যা সন্দেহ করেছে স্বামীর চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলে—আজকালকার পৃথিবী যা তাতে আটাশ বছরের রুপসী শঙ্খিনী স্ত্রী সম্পর্কে সে রকম সন্দেহ সে না করতে পারে যে তা নয়। কিন্তু উৎপলা মোটেই সে জাতের মেয়ে নয়, তাকে অবিশ্বাস করা ঠিক নয়। অমরেশ আসে রোজই বটে, কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে যায়, কিন্তু ওরা বোন-ভাইয়ের মতো; বড়ো জোর জামাই-শালীর মতো সম্বন্ধ ওদের, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়—জীবনের সৎ ও অসৎকে নিয়ে মাল্যবানের নিরবচ্ছিন্ন বিশ্লেষণ ঘিরে মাক্রোপোলো সিগারেটের নীল ধূসর ধোঁয়ার নীলাঞ্জন মাল্যবানকে কেমন একটা আশ্চর্য নিশ্চিন্তার ভেতর সমাধিপ্রীত করে রেখে দিল, কোনো কথা.ভাববার দরকার বোধ করল না সে আর।

অমরেশের খুব টাকা আছে?

না। বিশেষ কিছু নেই।

তবে,—আমাদের চেয়ে বড়োলোক?

উৎপলা অত্যন্ত ছাড়া গাছাড়া ভাবে বললে, বলতে পারছি না। তা হতে পারে।

দেখে তো মনে হয় বনেদি ঘরের ছেলে।

উৎপলা টেবিলের ও-কিনারে দাঁড়িয়েছিল, এ-কিনারে এসেছিল, কখন ও-দিককার কিনারে চলে গিয়েছে আবার, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ছিল, বসছিল না, বললে, ও, তুমি কেবল টাকা আর বংশের কথাই ভাবছ। আমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে যাই না। ওদের খুব বড়ো জমিদারি ছিল অনেক শরিক হয়ে পড়েছে। জমিদারিতে ভাঙন ধরেছে—এখন বিশেষ-কিছু নেই

বয়স কত অমরেশের?

এই ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ হবে—

স্ত্রী কেমন?

সেকেলে জমিদারদের যে রকম হয়— যেন বার্তা বহন করছে, আর-কিছু নয়, শান্ত ঠাণ্ডা ভাবলেশহীনতায় উৎপলা বললে, এক আধ ফোঁটা রক্ত কণিকায় তবু নিজেকে নিজের কথাকে চারদিককার শীত রাতের আবহকে কেমন একটা বার্তাতীততা দান করে।

ও তো সেকেলে নয়—ও তো এখনকার—

হ্যাঁ, ও নিজে মনে ভাবে যে ও আগামী যুগের, উৎপলা ঢিলে হাসি হেসে খানিকটা গ্রন্থিমাংসপেশীর আক্ষেপে কেঁপে উঠে অবিশ্বাসে অথচ শিশুকে প্রশ্রয় দেবার মতো একটা হতবল অকপট হাসিতে কাতর হয়ে উঠে বললে, ওর মাথায় অনেক বিদ্যে। কিন্তু ওর পরিবারটা ওকে পিছে টানছে, ওর ছেলেপিলে তিনটে, এই মাঘে আর একটি হবে।

এত কথা তুমি জানতে পেরেছ, অন্ধকারের ভেতর কেউটের মতো নড়ছে একটা মহিষের লেজ, তার মুখোমুখি যেন এসে পড়ে বললে মাল্যবান।

উৎপলা পানের পিরিচের থেকে একটা পান তুলে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে রেখে দিল আবার। পিরিচে মশলা ছিল, আঙুল দিয়ে সেগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘেঁটে একটা লবঙ্গ তুলে নিল। লবঙ্গটা দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে বললে, অমরেশ তো আমার এখানে রোজ আসে। আমার এখানে অনেক রাত অব্দি থেকে। সব কথাই বলে আমাকে। কেন জানতে পারব না সব?

মাল্যবান চিতাবাঘের মতো মুখ খিচোতে গিয়ে গৃহবলিভুকের মতো ক্লান্ত ক্লিষ্ট চোখে বললে, ও কি নিজেই সব বলে—সব করে? তুমিই তো ওকে দিয়ে বলাচ্ছ। রাত বারোটা-একটা অব্দি ও এখানে থাকে—তুমি আছ, তাই, তুমি ওকে থাকতে দিচ্ছ বলে। এর কোনো বিহিত করবে না?

এর কোনো বিহিত নেই।

নেই?

নেই। কোনো নালিশ কোরো না তুমি।

উৎপলা অন্তর্ভেদী অনিমেষ দৃষ্টিতে মাল্যবানের দিকে তাকাল, এমন মমতার সঙ্গে তাকাল সে-ভালোবাসার এমন গভীর আবেশে!-মাল্যবান উৎপলার চোখের দিকে তাকিয়েছিল—তাকাতে-তাকাতে তাকাতে পারল না সে আর।

শোনো।

মাল্যবান উৎপলার চোখের দিকে ফিরে তাকাল আবার। কিন্তু তাকিয়েই রইল সে। উৎপলাও মাল্যবানের চোখে চোখে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেরই খুব ভালো লাগল। কিন্তু এ তো পরলোকের এঁয়োতি নিবিড়তা-জীবন নদীর ওপারে—হয়তো হবে কোনো দিন হয় তো হবে না।

বলো।

বলেছিই তো। বললে উৎপলা।

অমরেশের মতন একটা অচ্ছুৎ—

অচ্ছুৎ মানে? ও তো বামুনের ছেলে—

বেশ্যাটা এখনও আসবে তোমার কাছে?

তুমি বড়ো বিশ্রী কথা বল, কোথাও আগুন নেই যেন ছাই-এর ভেতর, তবুও সর্বব্যাপ্ত আঁচ রয়েছে সেই নিশ্চল উনুনের মতো তাপ ছড়িয়ে উৎপলা বললে। শীতের রাতে তাপটা খারাপ লাগছিল না মাল্যবানের। উৎপলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাপ বিকীরণ করে কোনো-একটা অপরিচিত অন্যতর কুহর থেকে তাপ সঞ্চয় করে নিয়ে বললে, ওতত দশটা-এগারোটা অব্দি থাকে। এখন দুটো। শীতের রাতটা পেকেছে এখন—

পেকেছে? উৎপলার ইচ্ছুক অনুগত শরীরের দিকে তাকিয়ে মাল্যবান নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললে, কাকে বলে পাকা শীত রাত?

এই তো এই সময়টা—

কিন্তু, এই সময়টা তো সব সময় থাকবে না, ভেঙে যাবে তো সব কালকে ভোর বেলা।

ভোর হবে না আর।

কী করে বলছ তুমি?

মাল্যবান উঠে দাঁড়াল। স্লিপারের ভেতর পান গলিয়ে গায়ের চাদর আঁট করে নিয়ে ঘরের চারদিকের অন্ধকারের দিকে চোখ বুলিয়ে নিতেই দেখল উৎপলা তার আরো অনেক কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

দুজনে বিছানায় শুল গিয়ে। উৎপলা মাল্যবানকে বললে, ভোর হবে না আর, জানতে হবে না। দেখো শীতের রাত কী রকম শীত, খড়ের বিছানায় হাঁস-হাঁসিনের মতো কী রকম উম আমাদের দুজনের। আবার দেখবে কী রকম লম্বা এ-সব রাত, শীতের রাত সত্যিই কী যে চমৎকার, লম্বা বলে আরো ভালো। সত্যি, কোনোদিন শেষ হবে না আর।

মাল্যবানের আশ্চর্য লাগছিল। কোনোদিনও যে জেগে উঠতে হবে না আর, শীত যা সবচেয়ে ভালো, এই বিশৃঙ্খল অধঃপতিত সময়ে সমাজে রাতের বিছানা যা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সেই শীত রাতের কোনোদিন শেষ হবে না আর, উৎপলা সব সময়ই মাল্যবানের সময় ঘেঁসে থেকে যাবে অনিঃশেষ শীত ঋতুর ভেতর। এইসব অপরুপ লাগল তার। কিন্তু লুও কী করে তা হয়? ইতিহাস নেই? বিভেদ করে চলে যেতে দিয়েছে মাল্যবানকে নিয়ে উৎপলাকে? সময় তো আছে? সময় নেই? ছেদ করে চলে গেছে তাকে নিয়ে সকল সময়কে উৎপলা? গভীর গভীর এই শীতের রাত। অনির্বচনীয়—যখন নদীর থেকে নয়, শুকনো শক্ত চুনী পান্নার ভেতর থেকে জল ঝরছে; সেই জলদেবীকে নিয়ে এ-রকম শীতের রাতে শুয়ে থাকা।

কোনোদিন শেষ হবে না রাতের?

না।

কোনোদিন শেষ হবে না আমাদের রাতের, উৎপলা?

হবে না। হবে না।

শীতের রাত ফুরুবে না কোনোদিন?

না।

কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?

না, না, ফুরুবে না।

কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত আমাদের ঘুম?

ফুরুবে না। ফুরুবে না।

কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?

না, না, ফুরুবে না।

কোনদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?

ফুরুবে না। ফুরুবে না। কোনোদিন–

আলোড়িত হয়ে কথা বলতে-বলতে কেমন আলো-অন্ধকার, সুর্য, শিকরে রাজ, বড়ো বাতাস, মাতৃগণ, গণিকাগণ, উৎপলার অট্টহাসি, সমুদ্ৰশব্দ, রক্তশব্দ, মৃত্যুশব্দ, অফুরন্তশীত রাতের প্রবাহের রোল শুনতে শুনতে মাল্যবানের ঘুম ভেঙে গেল। টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিল সে। তাকিয়ে দেখল ঘর অন্ধকার; টেবিলের থালা বাসন সমস্ত সরিয়ে এঁটো পরিষ্কার করা হয়েছে কখন যে সে তা টেরও পায়নি; টেবিল ফিটফাট পরিচ্ছন্ন—কালো সরীসৃপের পিঠের মতো চকচক করছে। মাল্যবান বুঝতে পারছিল না কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল। এই যে এইমাত্র উৎপলাকে দেখছিল, বিছানায় শুয়েছিল, কথা শুনছিল—এ সব তাহলে ঘুমের ভেতর দেখা, নির্জ্ঞান পরলোকের কণ্ঠে শোনা? জেগে থেকে তাহলে সে কোন অব্দি শুনেছিল। মাল্যবান ঘাড় হেঁট করে অন্ধকারে বুঝে নিতে চেষ্টা করছিল।…

মনে পড়ল তার। মনটা তার বড় খারাপ হয়ে গেল। কিছু হবে না, কিছু সে করতে পারবে না বলে উৎপলা তারপর মাল্যবানকে এঁটো টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তে দেখল; এঁটো পরিষ্কার করল; মশারী ফেলল; বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ল;—কিন্তু মাল্যবানকে জাগিয়ে দেওয়াও উচিত মনে করল না?

Share This