শ্রাবণমেঘের দিন (১৯৯৪)

শ্রাবণ মেঘের দিন - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. আমার ভয় ভয় লাগছে

নীতু বলল, আপা, আমার ভয় ভয় লাগছে। শাহানার চোখে চশমা, কোলে মোটা একটি ইংরেজি বই–The Psychopathic Mind. দারুণ মজার বই। সে বইয়ের পাতা উল্টাল। নীতুর দিকে একবারও না তাকিয়ে বলল, ভয় লাগার মত কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না। গা জ্বলে যাবার মত কথা। কি রকম...

০২. পায়ের কাছে প্রকাণ্ড জানালা

পায়ের কাছে প্রকাণ্ড জানালা। শহরের গ্রীলদেয়া জানালা না, খোলামেলা জানালা। এত প্রকাণ্ড জানালা যে মনে হয় আকাশটা জানালা গলে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। ঘন নীল আকাশ, যেন কিছুক্ষণ আগে গাদাখানিক নীল রঙ আকাশে লাগানো হয়েছে। রঙ এখনও শুকায়নি। টাটকা রঙের গন্ধ পর্যন্ত পাওয়া...

০৩. সারারাত বৃষ্টিতে ভেজার ফল

সারারাত বৃষ্টিতে ভেজার ফল ফলেছে। মতি জ্বরে অর্ধ-চেতন। শীতে তার শরীর কাপছে। গায়ে পাতলা চাদর ছাড়া কিছু নেই। চাদরে শীত মানছে না। পানির তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। ঘরে পানিও নেই। কলসি ঠনঠন করছে। মতির মনে হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মারা যাবে। জনমানবহীন এই বাড়িতে মতির বাস করা...

০৪. আমার সালাম নিও

বাবা, তুমি আমার সালাম নিও। দাদাজান আমাকে দিয়ে জোর করে চিঠি লেখাচ্ছেন। তোমার কাছে নাকি ঐ চিঠি হাতে হাতে পৌঁছানো হবে। আমরা সুখানপুকুর ঠিকমত পোঁছেছি। পথে কোন অসুবিধা হয়নি। শুধু ঠাকরোকোনা স্টেশনে পায়ে গোবর লেগে গিয়েছিল। তার কি যে কড়া গন্ধ! এখনও যাচ্ছে না। আমি এ বাড়ির...

০৫. আকাশ দেখে কে বলবে

আকাশ দেখে কে বলবে কাল রাতে এত বর্ষণ হয়েছে? শাহানার চোখ বার বার আকাশে চলে যাচ্ছে। রোদ উঠেছে কড়া। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। শাহানা চায়ের কাপ হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বাড়ির সবই বড় বড়, শুধু চায়ের কাপগুলো ছোট। শাহানার অভ্যাস মগভর্তি চা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খাওয়া। শুরুতে মগের চা...

০৬. মতির জ্বর পুরোপুরি সারেনি

মতির জ্বর পুরোপুরি সারেনি। এম্নিতে ভাল, একটু হাঁটাহাঁটি করলেই মাথা ঘুরতে থাকে, গা গরম মনে হয়। সবচে বড় সমস্যা হল গলা বসে গেছে। গলা দিয়ে হাসের মত ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ বের হচ্ছে। ইরতাজুদ্দিন সাহেবের নাতনীকে গান শুনাবার কথা ছিল। গলা না সারলে কিছু করার নেই। পরাণ ঢুলীর ঢোলটা...

০৭. শহরের বাড়িগুলির সুন্দর সুন্দর নাম থাকে

শহরের বাড়িগুলির সুন্দর সুন্দর নাম থাকে–দাদাজানের বাড়িটার কোন নাম নেই। একটা নাম থাকলে সুন্দর হত। শাহানা নীতুকে নিয়ে হাঁটছে আর মনে মনে এই প্রকাণ্ড বাড়িটার একটা নাম ভাবছে। কোন নামই পছন্দ হচ্ছে না–নিদমহল, সুখানপুকুর প্যালেস, কুঠিবাড়ি… ইরতাজুদ্দিন সাহেব...

০৮. পরাণ ঢুলীর বাড়িতে

পরাণ ঢুলীর বাড়িতে মতি বসে আছে। অনুষ্ঠানের ব্যাপারটা ঠিকঠাক করা দরকার। একটু বাদ্য-বাজনাও হোক। মন উদাস লাগছে–বাদ্য-বাজনায় উদাস ভাবটা হয় কাটবে নয় আরও বাড়বে। দুটাই ভাল। উদাস হলে পুরোপুরি উদাস হওয়া দরকার। সাধারণত এই আসর বাড়ির দাওয়ায় মাদুরের উপর বসে। আজ বসেছে একটু...

০৯. মতি ছুটতে ছুটতে যাচ্ছে

মতি ছুটতে ছুটতে যাচ্ছে। তার পেছনে পেছনে একজন মেয়ে যাচ্ছে–সে তার মত ছুটতে পারবে কিনা এদিকে তার খেয়াল নেই। শাহানা অবশ্যি মতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই ছুটছে। একবার শুধু সে আকাশ দেখল–আকাশ ঘন কালো। এরকম কালো আকাশ সচরাচর দেখা যায় না। শাহানা বলল, রোগির অবস্থা কি খুব...

১০. ইরতাজুদ্দিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরে

ইরতাজুদ্দিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মুখ জানালার দিকে। দোতলার জানালা বলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি শাহানাকে ভিজতে ভিজতে হাওড়ের দিকে যেতে দেখলেন–আবার ফিরে আসতেও দেখলেন। তার মধ্যে কোন রকম বাহ্যিক চাঞ্চল্য দেখা গেল না। তিনি যে ভাবে...

১১. পুষ্পকে নতুন শাড়ি কিনে দেয়া হয়েছে

পুষ্পকে নতুন শাড়ি কিনে দেয়া হয়েছে। সবুজ রঙের শাড়ি। কালো শরীরে সবুজ শাড়ি এত সুন্দর মানিয়েছে! নীতুর একটু মন খারাপ লাগছে–কেন তার গায়ের রং এত ফর্সা হল! গায়ের রঙ পুষ্পের মত কুচকুচে কালো হলে সেও অবশ্যি একটা সবুজ শাড়ি কিনত। পুষ্প আজ তার বিছানা-বালিশ নিয়ে এসেছে। এখন...

১২. ইরতাজুদ্দিন সাহেব নীতুকে সঙ্গে নিয়ে

ইরতাজুদ্দিন সাহেব নীতুকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বের হয়েছেন। তাঁর মন বিষণ্ণ। ভুরু কুঁচকে আছে। তিনি দুই নাতনীকে সঙ্গে নিয়েই বেড়াতে বের হতে চেয়েছিলেন। শাহানা আসতে রাজি হয়নি। তার মুখের উপর কেউ না বলবে এতে তিনি এখনো অভ্যস্ত হননি যদিও এই ব্যাপারটি এখন হচ্ছে। শ্রাবণ মাসের সকাল।...

১৩. মতি টাকা ধার করেছে

মতি টাকা ধার করেছে। সুদিতে একশ টাকা। সে জানে এই টাকাটা ফেরত দিতে বিরাট যন্ত্রণা হবে। প্রতি মাসে পঁচিশ টাকা করে দেয়া সহজ কথা না। আসল থেকেই যাবে। আসল আর দেয়া হবে না। কি আর করা–সুন্দর করে একটা গানের আসর করতে টাকা লাগে। আবদুল করিমকে আনতেই একশ টাকা বায়নায় চলে যাবে।...

১৪. গানের আসর বসেছে

গানের আসর বসেছে। মঞ্চ তৈরি হয়েছে। রইসুদ্দিনের বাংলাঘরের দর্মার বেড়া সরিয়ে তৈরী হয়েছে মঞ্চ। চারদিক খোলা, উপরে টিনের ছাদ। দুটা হ্যাজাক বাতি উপর থেকে ঝুলছে। চাটাই পেতে গায়কদের ও বাজনাদারদের বসার ব্যবস্থা। যাত্রার মঞ্চের মত মঞ্চ–চারদিকেই দর্শক। দর্শকদের বসার কোন...

১৫. গান ভোররাত পর্যন্ত হবার কথা

গান ভোররাত পর্যন্ত হবার কথা–বৃষ্টির জন্যে সব এলোমেলো হয়ে গেল। অল্পসল্প বৃষ্টি হলে একটা কথা ছিল–আষাঢ় মাসের মুষল ধারার বৃষ্টি। আসর ভেঙে দেয়া ছাড়া গতি কি? মতি খুব মন খারাপ করে ভিজতে ভিজতে ঘরে ফিরেছে। ঘরে পৌঁছার পর মনে হয়েছে কেরোসিন নেই, হারিকেন জ্বালানো যাবে...

১৬. চিঠি লেখা বন্ধ করে শাহানা উঠে দাঁড়াল

মিতু, তুই কেমন আছিস বল তো? আমি জানি তুই আমার উপর খুব রাগ করে আছিস। তোর কত শখ আমরা তিন বোন মিলে গ্রামে এসে গিয়ে হৈ-চৈ করব। আমার জন্যে তোর শখ মিটল না। মিতু, খুব ছোটবেলা থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম–এ জীবনে কাউকেই কখনো কষ্ট দেব না। দেইও না, শুধু তোর বেলাতেই...

১৭. মনোয়ারার মনে সকাল থেকে কু ডাকছিল

মনোয়ারার মনে সকাল থেকে কু ডাকছিল। মনে হচ্ছিল আজ ভয়ংকর কিছু ঘটবে। কেউ খুব খারাপ কোন খবর নিয়ে আসবে। বিব্রত গলায় সেই খারাপ খবর দিয়ে বলবে–সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। আল্লাহপাক যা করেন মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা কইরা করেন। উনি পরম দয়ালু রাহমানুর রহিম। যদিও মনোয়ারা তার...

১৮. ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেছেন

রাত নটা। ইরতাজুদ্দিন খেতে বসেছেন। তাঁর সামনে শাহানা বসেছে। সহজ ভঙ্গিতেই বসেছে। সে তার দাদাজানের দিকে প্লেট এগিয়ে দিল। ইরতাজুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন, নীতু খাবে না? শাহানা বলল, না। সে কাল রাতে খায়নি। আজ সারাদিনেও না। শাহানাকে তা নিয়ে মোটেও। বিচলিত মনে হচ্ছে না।...

১৯. সুরুজ আলি অনেক রাতে খেতে বসেছে

সুরুজ আলি অনেক রাতে খেতে বসেছে। অন্দরবাড়িতেই তাকে খেতে দেয়া হয়। আজ বাংলাঘরে খাচ্ছে। পুষ্প ভাত-তরকারি এগিয়ে দিচ্ছে। দরজার বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে কুসুম। মনোয়ারার ব্যথা ওঠেছে। ব্যথায় কাটা মুরগির মত ছটফট করছেন। মনোয়ারার বড় বোন আনোয়ারা বোনের পাশে আছেন। আজ তার চলে যাবার...

২০. সুখানপুকুর নামের মানে কি

নীতু বলল, সুখানপুকুর নামের মানে কি আপা? শাহানা বলল, যে পুকুর শুকিয়ে গেছে সেই পুকুরই সুখানপুকুর। তাহলে তো বানান হওয়া উচিত তালিব্য শ দিয়ে… শাহানা বিরক্ত গলায় বলল, তোকে নিয়ে বের হবার প্রধান সমস্যা হল–তুই খুব তুচ্ছ জিনিশ নিয়ে জটিল তর্কে যেতে চাস। নীতু বলল,...