লিলুয়া বাতাস (২০০৬)

লিলুয়া বাতাস - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. আমার বড়খালা কিছুদিন হলো ভূত দেখছেন

আমার বড়খালা কিছুদিন হলো ভূত দেখছেন। ঠাট্টা না, সত্যি! ভূতগুলি তাঁর শোবার ঘরের চিপায় চাপায় থাকে। তাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করে। তিনি ধমক দিয়ে তাদের বের করে দেন। এই তো কিছুক্ষণ আগের কথা, আমি আমার ঘরে বসে জুতা ব্রাস করছি (আমার জুতা না, বাবার জুতা। তিনি আয়নার মতো ঝকঝকে জুতা...

০২. দরজার পাশে কলিংবেল আছে

দরজার পাশে কলিংবেল আছে। কলিংবেলের নিচে স্কচ টেপ দিয়ে সাঁটা নোটিশ– হাত দিলে শক খাইবেন বেল নষ্ট আমি দরজার কড়া নাড়লাম। ঢাকা শহর থেকে কড়া বসানো দরজা উঠে গেছে বলেই জানতাম— এখানে আছে। চিপা ধরনের লিফট ছাড়া ফ্ল্যাট বাড়ি। গরিবদের জন্যে আজকাল এক বেডরুমের কিছু ফ্ল্যাট...

০৩. বাসায় ফিরলাম রাত বারোটার দিকে

বাসায় ফিরলাম রাত বারোটার দিকে। বাবা নিউ বিরানি হাউজ পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। গলা নিচু করে বললেন, My son, বাকি রাস্তা একা একা যেতে পারবি না? আমি বললাম, পারব। বাবা বললেন, Thats good. এই মুহূর্তে ওদের সামনে পড়তে চাই না। বিসমিল্লাহ বলে চলে যা। আল্লাহু শাফি। আল্লাহু কাফি।...

০৪. দ্বিতীয় আলো পত্রিকা

দ্বিতীয় আলো পত্রিকায় ‘দি ইমেজ’ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ প্রথম পৃষ্ঠায় লিড নিউজ হয়েছে। সংবাদের শিরোনাম রাজধানীর কেন্দ্রে আবারো নৃশংস খুন। একজন নিজস্ব সংবাদদাতা ঘটনার এমন নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন যা থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। হত্যাকারীর...

০৫. আমার মার নাম আফিয়া বেগম

আমার মার নাম আফিয়া বেগম। এমন কোনো বড় নাম না, তারপরেও এই নামটা ছোট করে বাবা ডাকতেন আফি। ই-কারের টান যখন দীর্ঘ হতো তখন বোঝা যেত বাবার মেজাজ শরিফ। এখানেই শেষ না, নাম নিয়ে বাবার দুটা ছড়াও ছিল। যেমন— ১ আফি আফি করতে হবে মাফি ২ আফি আফি You are কাফি প্রথম ছড়াটা বাবা বেশি...

০৬. আমার নামে কখনো কোনো চিঠি আসে না

আমার নামে কখনো কোনো চিঠি আসে না। কে আমাকে চিঠি লিখবে? যারা লেখার তারা তো আশেপাশেই আছে। তারপরেও আশ্চর্য, পোস্টাপিসের পিওন এসেছে আমার খোঁজে। সে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি নিয়ে এসেছে। রেজিস্ট্রি উইথ অ্যাকনলেজমেন্ট। দস্তখত করে চিঠি নিতে হবে। রেজিস্ট্রি করা চিঠি আমাকে কে লিখবে?...

০৭. মায়ের উকিল তালুকদার সাহেব

মায়ের উকিল তালুকদার সাহেবের পরামর্শে মা বাবার সঙ্গে একান্তে দেখা করতে রাজি হলেন। তবে মা একা কিছুতেই যাবেন না। সঙ্গে কাউকে না কাউকে যেতে হবে। ঠিক হলো আমি মাকে নিয়ে যাব। কোথায় যাব সেই জায়গাও ঠিক হলো। ধানমণ্ডিতে জিংলিং নামের একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। দুপুরবেলা যাওয়া হবে,...

০৮. নীলা ফুপুর চোখ লাল

নীলা ফুপুর চোখ লাল। মুখ ফোলা। তিনি গত দুদিন ধরে ঘরে আছেন। ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। রাতে মনে হয় ঘুমাচ্ছেনও না। কাল রাত তিনটার সময়ও দেখেছি তার ঘরে বাতি জ্বলছে। অসুখ-বিসুখ নিশ্চয়ই না। অসুখ হলে চাদর গায়ে বিছানায় শুয়ে থাকতেন। মাথা টিপে দেবার জন্যে কিংবা মাথায় পানি ঢালার...

০৯. আষাঢ় মাসের উনিশ তারিখ

আষাঢ় মাসের উনিশ তারিখ ফুপু ঘুমের ওষুধ খেলেন। ঘটনাটা বাংলা মাসের হিসাবে লিখলাম। কারণ উনিশ তারিখ ছিল আষাঢ়ি পূর্ণিমা। আকাশ ছিল পরিষ্কার। আগের দিন ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় মেইন গ্রিড ফেইল করেছিল। অন্ধকার শহর জোছনায় ড়ুবে গিয়েছিল। ফুপু ঘুমের ওষুধ খাবার জন্যে বেছে বেছে এই দিনটা বের...

১০. আওয়ামী লীগ হরতাল ডেকেছে

আওয়ামী লীগ হরতাল ডেকেছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। তবে রিকশা চলছে, কিছু প্রাইভেট কার চলছে। এখনকার হরতাল আগের মতো কঠিন হচ্ছে না। কেমন ঢিলেঢালা ভাব। রাস্তায় পুলিশও কম। আমি বাবার সঙ্গে হাঁটছি। ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছি। হরতালের দিনগুলিতেই মূল রাস্তায় হাঁটা যায়। নির্বিঘ্নে যে...

১১. আজ সতেরো তারিখ

আজ সতেরো তারিখ। বাবা কপালে অদৃশ্য ইসমে আযম নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। বারবার কারণে অকারণে জাজ সাহেবের দিকে হাসিমুখে তাকাচ্ছেন। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটায় তিনি বেশ মজা পাচ্ছেন। একবার আমাদের দিকেও তাকালেন। আমরা তিনজন এসেছি। মা, ভাইয়া এবং আমি। মা বসেছেন...

১২. কয়েক দিন ধরে দি ইমেজ তালাবন্ধ

কয়েক দিন ধরে দি ইমেজ তালাবন্ধ। কলাপসেবল গেটে বিরাট তালা ঝুলছে। তালার সঙ্গে নোটিশ অনিবার্য কারণে দোকান বন্ধ। সম্মানিত গ্রাহকদের অসুবিধার জন্য দুঃখিত। দি ইমেজ-এর সম্মানিত গ্রাহকদের একজন আমার বড়খালা। তার চূড়ান্ত রকমের অসুবিধা হচ্ছে। নতুন ছবি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। অন্য...

১৩. কয়েক দিন অনবরত বৃষ্টি হয়েছে

কয়েক দিন অনবরত বৃষ্টি হয়েছে। সব রাস্তায় পানি। এই পানি আরো বাড়বে, কারণ আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। বিকেল থেকে বৃষ্টি শুরু হবে। এ বছরে বৃষ্টি বিকেলের দিকে হচ্ছে। সারাদিন আকাশ থাকে মেঘশূন্য। অফিস আদালত ছুটি হবার আগে আগে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। আমার পকেটে কিছু টাকা আছে।...

১৪. এক বর্ষায় গল্প শুরু করেছিলাম

এক বর্ষায় গল্প শুরু করেছিলাম। এখন আরেক বর্ষা। সেই মেঘকালো আকাশ, সেই বৃষ্টি। ঢাকার গাছগুলিতে নতুন পাতা। টোকাই ছেলেমেয়েগুলির হাতে কদম ফুলের গুচ্ছ। ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামছে, এরা ছুটে ছুটে যাচ্ছে ফুল নিবেন? ফুল? চাইরটা এক টাকা। চাইরটা এক টাকা। এই এক বছরে কী কী...

১৫. একটা ছোট্ট জানালা

একটা ছোট্ট জানালা। জানালার একপাশে বাবা, অন্যপাশে আমি। তিনি ইচ্ছা করলেই হাত বাড়িয়ে আমাকে ধরতে পারেন। তা তিনি করছেন না। মাথা নিচু করে বসে আছেন। মনে হচ্ছে খুব লজ্জা পাচ্ছেন। প্রথম কথা কে বলবে? তিনি বলবেন, না আমি? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমিই প্রথম কথা বললাম। বাবা, কেমন আছ?...