রূপার পালঙ্ক (১৯৯৯)

রূপার পালঙ্ক - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. আয়নায় নিজেকে দেখে

আয়নায় নিজেকে দেখে ছেলেরা সাধারণত মুগ্ধ হয় না। অতি বুদ্ধিমান ছেলেকেও আয়নায় খানিকটা বোকা বোকা লাগে। কিন্তু মোবারক মুগ্ধ। তার মনে হচ্ছে সে নিজেকে দেখছে না, অন্য কাউকে দেখছে। তার কোনো জমজ ভাইকে। যে ভাই কলেজে অধ্যাপনা করেন। এবং যে ভাই-এর কলাবাগান টাইপ জায়গায় একটা বাড়ি আছে।...

০২. মাফলার পরার মত শীত পড়েনি

মাফলার পরার মত শীত পড়েনি, কিন্তু মোবারকের গলায় মাফলার। মাথায় পশমি টুপি। গায়ে উলের চাদর। পশমি টুপি এবং চাদরের কারণে তার চেহারা বদলে গেছে। আয়নায় সে তার নতুন চেহারা দেখেনি, না দেখলেও চেহারা যে বদলেছে এটা নিশ্চিত। চায়ের দোকানের মালিক কুদ্দুস মিয়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে...

০৩. তারা তাদের জায়গায় চলে এসেছে

তারা তাদের জায়গায় চলে এসেছে। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পুলিশ ফাঁড়ির একটু পেছনে ঝাকড়া বাদাম গাছের নিচটাই তাদের জায়গা। একদিকে শিশু পার্ক, একদিকে পুলিশ ফাঁড়ি, বাকি দুদিকে ঘন ঘাছপালা। বাগানের এই অংশটা ঠিক বাগান বলে মনে হয় না । মনে হয় জংলা জায়গা। ছাতিম গাছটাকেও জংলা গাছের মতই...

০৪. আজ মোবারকের বসার জায়গা হয়েছে

আজ মোবারকের বসার জায়গা হয়েছে অন্য একটা ঘরে। প্রমোশন না ডিমোশন বোঝা যাচ্ছে না। এই ঘরটা আগেরটার চেয়ে বড়। তবে মেঝেতে কার্পেট নেই, দেয়ালে পেইনটিং নেই। সোফা আছে। সোফার কভার ময়লা। প্রথমবারের ঘরে মোবারক একা বসে ছিল। এই ঘরে আরো লোকজন আছে। সবার মধ্যে এক ধরনের ব্যস্ততা। মোবারক...

০৫. বান্ডেল খুলে টাকা বের করতে মায়া লাগছে

বান্ডেল খুলে টাকা বের করতে মায়া লাগছে। মায়া করে লাভ নেই। টাকা খরচ করতেই হবে। টাকার বান্ডেল দেখিয়েতো আর সওদা করা যাবে না। এক প্যাকেট বেনসন সিগারেট কিনতে গিয়ে মোবারক পুরো কার্টুনই কিনে ফেলল। হঠাৎ এতগুলি টাকা পাওয়া গেছে। বন্ধুবান্ধবকে কিছু না দিলে নিজেকে চশমখোরের মত...

০৬. মোবারক তার থাকার ঘর দেখে মুগ্ধ

মোবারক তার থাকার ঘর দেখে মুগ্ধ। মনে মনে কয়েকবার বলল— খাইছে রে! খাটের উপর বিছানো চাদর দেখে প্রথম যে ইচ্ছাটা হল তা হচ্ছে চাদর গুটিয়ে হ্যান্ড ব্যাগে সামলে ফেলা। বড়ই বাহারী চাদর। খাটের পাশের টেবিলে নগ্নপরী লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। এই পরী কোনোমতে কুদ্দুসের হাতে ধরিয়ে দিতে...

০৭. রাত এমন কিছু না

রাত এমন কিছু না। এগারোটাও বাজে নি। রাত শুরু হয় একটা থেকে। কাজেই রাত এখনো শুরুই হয় নি। বড় সাহেবের সঙ্গে কথা বলা হয়ে গেছে। তিনি নিশ্চয়ই রাত তিনটার সময় আবারো তার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন না। তাঁর কাছে ছুটি নেয়া আছে। দাদিজানকে দেখতে যাবার ছুটি। কাজেই মোবারক এখন ঘর থেকে বের...

০৮. বৃদ্ধা আকলিমা বেগম

বৃদ্ধা আকলিমা বেগম রেলিং দেয়া খাটের মাঝখানে জুবথবু হয়ে বসে আছেন। তাঁর সাজানো জীবন-যাপন এই মুহূর্তে খানিকটা এলোমেলো, কারণ তাঁর গায়ে পাতলা ফিনফিনে একটা গরম চাদর জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নিজেকে তার বউ বউ মনে হচ্ছে। অনেক অনেক কাল আগে বউ সেজে তিনি এই খাটের মাঝখানে ঠিক এই ভাবেই...

০৯. ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে মোবারকের রাত

ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে মোবারকের রাত দশটা বেজে গেল। সে বলে গিয়েছিল রাতে ফিরবে। রাত দশটাও রাত, দুটাও রাত। কাজেই এক্ষুনী যে বড় সাহেবের রাজপ্রাসাদে বন্দি হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রাত দুটার দিকে গেলেই হবে। গেটে দারোয়ান থাকে। দারোয়ান নিশ্চয়ই গেট খুলে দিবে। এবং সে নিশ্চয়ই...