রুমালী (১৯৯৭)

রুমালী - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. বকু তুই রোদে দাঁড়িয়ে আছিস কেন

বকু তুই রোদে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমি পাশ ফিরে মাকে দেখলাম। মা কোন ফাঁকে আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বিড়ালের চেয়েও নিঃশব্দে হাঁটতে পারেন। আশে পাশে কেউ নেই, আমি হয়ত নিজের মনে গল্পের বই পড়ছি। এক সময় হঠাৎ দেখব মায়ের মাথাটা আমার ঘাড়ের পাশে। তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বলবেন, কী...

০২. অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা মিলিয়েছে

অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা মিলিয়েছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখছি—শত শত জোনাকি পোকা, জ্বলছে নিভছে। কী যে আশ্চর্য হচ্ছি। জোনাকি পোকা আগে দেখি নি তা না। অনেক দেখেছি। কিন্তু এত জোনাকি পোকা এক সঙ্গে কখনো দেখি নি। মনে হচ্ছে থোকায় থোকায় আলোর ফুল ফুটেছে। ফুলগুলি...

০৩. রাত কত হয়েছে কে জানে

রাত কত হয়েছে কে জানে? শোবার সময় হাতে ঘড়ি পরে শুই নি বলে বলতে পারছি না। অবশ্যি ঘড়ি থাকলেও ঘড়ি দেখা যেত না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে আছি। ঘুমের ভান যে করছে সে নিশ্চয়ই চট করে এক ফাঁকে ঘড়ি দেখবে না। মা আমার গা ঘেষে শুয়েছেন। জালালের মার খাটটা ফাকা। তাকে আলাদা ঘর দেয়া হয়েছে।...

০৪. মাঝে মাঝে খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে

মাঝে মাঝে খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙ্গে। কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ জেগে উঠে দেখি ঘরের ভেতরের অন্ধকারে নরম একটা ভাব। ঘন অন্ধকারকে কেউ যেন তরল করে দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ঘন করে ফেলবে। ধ্বক করে বুকে ধাক্কা লাগে–হচ্ছে কী? ভয়ংকর কিছু কি হচ্ছে? এটাই কি সেই ভয়ংকর...

০৫. রাজকীয় ব্যাপার

রাজকীয় ব্যাপার। প্রায় শখানেক মানুষ আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আছি। আমার মাথার উপর শুটিং এর বিশাল রঙ বেরঙের ছাতা। আমি মেকাপ নিচ্ছি। মেকাপম্যান সুবীরদা আমার মুখে প্যানকেক ঘষছেন। মেকাপের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার এই হল শুরু। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে শুটিং এর সবচে...

০৬. বিছানায় কুণ্ডুলী পাকিয়ে

আমি বিছানায় কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে আছি। আমার চুল ভেজা অর্থাৎ মাথায় প্রচুর পানি দেয়া হয়েছে। মা পায়ে গরম তেল মালিশ করে দিচ্ছেন। অচেতন রুগীদের ক্ষেত্রে এই কাজটি করা হয়। যা চলছে তার নাম জ্ঞান আনানোর প্রক্রিয়া। আমার জ্ঞান আছে। ভালই আছে। অনেকক্ষণ হল মটকা মেরে পড়ে আছি। ঘটনাটা...

০৭. বসে আছি শিমুল গাছের নীচে

আমি বসে আছি শিমুল গাছের নীচে। আগুনরাঙা ফুলে গাছ ঢেকে আছে। আমার চারদিকেও রাশি রাশি ফুল। আমার হাতে একটা কাগজ এবং কলম। কাগজে আমি একটি চিঠি লিখছি। তিন লাইনের চিঠি। জামিল ভাই, আমি আপনাকে ভালবাসি। ভালবাসি ভালবাসি ভালবাসি। আমার চোখ ভর্তি পানি। চিঠি শেষ হওয়া মাত্র আমার গাল...

০৮. ফরহাদ সাহেব ঢাকা চলে গেছেন

ফরহাদ সাহেব ঢাকা চলে গেছেন। যাবার আগে সবার সঙ্গে খুব ভদ্র ব্যবহার করেছেন। নিজের কাজ কর্মের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন। সেলিম ভাইকে বইয়ের ভাষায়, কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছেন, ছবির ভুবনে তোমার আগমন সুন্দর হোক, শুভ হোক। এখানেই শেষ না, সেলিম ভাইকে পাশে নিয়ে ছবি তুলেছেন। ছবি তোলার সময়...

০৯. পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টি

পাহাড়ি অঞ্চলের বৃষ্টি না-কি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি–এই নেই–পাহাড়ি বৃষ্টির এটাই না-কি ধরন। অথচ কাল সারারাতই বৃষ্টি হয়েছে। যতবার ঘুম ভেঙ্গেছে ততবারই শুনেছি বৃষ্টির শব্দ। পাকা দালানে বৃষ্টি বোঝা যায় না। এখানে বেশ বোঝা যাচ্ছে। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসও...

১০. ঘুম আসছে না

ঘুম আসছে না। আমি চোখ বন্ধ করে হাত পা এলিয়ে পড়ে আছি। আমার গায়ে মার বিখ্যাত ভালবাসা কম্বল। বাইরের পৃথিবী হিম হয়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে না, তবে আকাশে গুডগুড শব্দ হচ্ছে–হয়ত শেষ রাতের দিকে আবারো বৃষ্টি নামবে। ঘুমুবার জন্যে সুন্দর একটা রাত। ঘুম আসছে না। মা এর মধ্যে দুবার...

১১. সুন্দর ঝকঝকে সকাল

কী সুন্দর ঝকঝকে সকাল! অঞ্চলটাকে যেন আগের রাতে সাবান দিয়ে মাজা হয়েছে। চকচক করছে চারদিক। চারদিক থেকে সবুজ আভা বের হচ্ছে। কেউ যেন প্রতিটি গাছের পাতার আড়ালে সবুজ বাতি জ্বেলে দিয়েছে। আমি একতলায় নেমে দেখিকেমন উৎসব উৎসব ভাব। সবাই এক সঙ্গে কথা বলছে। কেউ কারো কথা শুনছে বলে মনে...

১২. অনেকদিন পর ডাইরি লিখতে বসেছি

অনেকদিন পর ডাইরি লিখতে বসেছি। দোতলার বারান্দায় বসেছিলাম। মা কিছুক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করলেন তাঁর সঙ্গে যাবার জন্যে। কঠিন গলায় তাকে বললাম আমি যাব না। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, শুধু শুধু বারান্দায় বসে থেকে কী করবি? আমি বললাম, প্রকৃতির শোভা দেখব। আমার সঙ্গে চল হাঁটতে হাঁটতে...

১৩. মেকাপ নিচ্ছি

আমি মেকাপ নিচ্ছি। সুবীরদা যন্ত্রের মত হাত চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর মধ্যে চাপা টেনশান। আগের মেকাপের সঙ্গে আজকের মেকাপের মিল থাকতে হবে। মেকাপ কনটিনিউটি অনেক বড় ব্যাপার। মওলানা সাহেব আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আগ্রহ নিয়ে তিনি দৃশ্যটা দেখছেন। মেকাপ নেবার সময় অন্য কেউ দাঁড়িয়ে...

১৪. সেলিম ভাইয়ের একটা দৃশ্য

সেলিম ভাইয়ের একটা দৃশ্য দিয়ে শুটিং শুরু হবে। গাছের নীচে বসে তিনি ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করবেন। গ্রামের একটা ছেলে কৌতূহলী হয়ে দৃশ্যটা দেখবে। ছেলেটির দিকে না তাকিয়েই তিনি বলবেন— ছবি তুলবি? ছেলেটা না সূচক মাথা নাড়বে। তখন দূর থেকে দিলুর গলা শোনা যাবে। দিলু চেঁচিয়ে...

১৫. মওলানা সাহেব আগে আগে যাচ্ছেন

মওলানা সাহেব আগে আগে যাচ্ছেন। আমি তার পেছনে। মওলানা সাহেবের হাতের টর্চে কী যেন সমস্যা হয়েছে— কিছুতেই জ্বলছে না। আমরা পথ চলছি অন্ধকারে। মাঝে মাঝে মওলানা সাহেব থামছেন–হাতের টর্চ ঝাকাঝাকি করছেন। কোন লাভ হচ্ছে না। আম্মাজী! জ্বি। নক্ষত্রের আলোয় নদীপথে যাওয়া যায়...