রজনী (২০০৩)

রজনী - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. বাবা খকখক করছেন

বাবা খকখক করছেন। এই খকখক অন্যদিনের মতো নয়। আজকেরটা ভয়াবহ যেন তিনি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন ফুসফুসের খানিকটা অংশ কাশির সঙ্গে বের করে ফেলতে পারছেন না। আমি মনে মনে বললাম, আরে যন্ত্রণা! বলেই খানিকটা অনুশোচনা হল। যাকে বলে জন্মদাতা পিতা! বেচারা কাশতে কাশতে ফুসফুস বের করে...

০২. তের বছরের বালিকা বধূ

বাবার সেই তের বছরের বালিকা বধূই আমার মা। বাবার ভাগ্য প্ৰসন্ন ছিল, কারণ বাবার বিয়ের পরপরই দাদাজান মারা যান। দাদাজানের বিশাল সম্পত্তি তাঁর হাতে এসে পড়ে। ধানী জমি, ভাটি অঞ্চলের জমি, নেত্রকোণা শহরে দুটি বাড়ি, ময়মনসিংহ শহরে একটি বাড়ি, একটা রাইস মিল এবং ইটের ভাটা। আমার...

০৩. ডাক্তারের সন্ধানে বের হলাম

ডাক্তারের সন্ধানে বের হলাম। ডাক্তার হচ্ছেন আমাদের ধীরেন কাকু। দীর্ঘদিন এই পাড়ায় আছেন। উনিশ শ পয়ষট্টি সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর দলবল নিয়ে কোলকাতায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। সুবিধা করতে না পেরে আবার ফিরে এসেছেন। এখানেও সুবিধা করতে পারেন নি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদের সমস্ত...

০৪. রিকশা যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত যাবে না

আমার এই রিকশা নিশ্চয়ই যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত যাবে না। তবু একবার জিজ্ঞেস করা যেতে পারে। আমি বললাম, এই, যাত্রাবাড়ি যাবে? না। না কেন? যাত্রাবাড়িতে অসুবিধা কি? যামু না—যামু না। ব্যাস ফুরাইল। এত সহজে ফুরালে তো হবে না। কেন তুমি যাবে না সেটা বল। রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে আমার দিকে...

০৫. হলে মন টিকল না

হলে মন টিকল না। আবার বেরুম। এই সময় কোথাও মন বসে না। যাবার জায়গা ঠিক করা নেই। খানিকক্ষণ হাঁটাহাটি করব। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যদি কোথাও যাবার ইচ্ছা জাগে, তখন দেখা যাবে। কড়া রোদ। আগুন-গরম বাতাস বইছে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে, কারণ রাস্তার পিচ গলে আঠালো হয়ে...

০৬. রোদের তেজ মরে আসছে

রোদের তেজ মরে আসছে। এখন আর হাঁটতে ভালো লাগছে না। ঐ চায়ের দোকানটায় গেলে কেমন হয়? এক কাপ চা এখন নিশ্চয়ই খাওয়া যেতে পারে। আজ সে পয়সা নেবে কি না কে জানে। হয়তো নেবে। এশা সঙ্গে থাকলে নিত না। এই পরীক্ষাটাও হয়ে যাক। এশাবিহীন অবস্থায় কী হয়। চায়ের দোকানির নাম রমজান। গোলগাল মুখ,...

০৭. মাসুমের খোঁজে

মাসুমের খোঁজে গেলে কেমন হয়? ব্যাটা থাকে সব সময় বাইরে-বাইরে, কিন্তু আমি যে কবার তার বাসায় গিয়েছি তাকে পেয়েছি। তার বাসায় যাওয়াও খুব সোজামগবাজারের বাসে উঠে পড়লেই। হয়। টঙ্গি ডাইভারশান রোডে নেমে দক্ষিণ দিকে মিনিট দশেক হাঁটা। যাব নাকি মাসুমের কাছে? নাকি বাসায় ফিরে যাব? নাকি...

০৮. মাসুম মুখ লম্বা করে বসে আছে

মাসুম মুখ লম্বা করে বসে আছে। আমাকে দেখে উঠে এল না। যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে রইল। তার সামনে চায়ের কাপ। চায়ে চুমুক দেয় নি। ভরা কাপে দুতিনটা সিগারেটের টুকরো ভাসছে। আমি তার সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললাম, তুই তো বিখ্যাত হয়ে গেলি! ফ্রন্ট পেইজে ছবি চলে এসেছে। মাসুম ফিক করে...

০৯. নিউমার্কেটে এশার সঙ্গে দেখা হল

নিউমার্কেটে এশার সঙ্গে দেখা হল। কী সুন্দর তাকে লাগছে! এশা হচ্ছে সেই রকম মেয়ে, যাকে যেদিন দেখা যায় সেদিনই মনে হয় সে সাজের নতুন কোনো কায়দা করেছে—যার জন্যে তাকে অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। আজ তাকে লাগছে ইন্দ্রাণীর মতো। হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি। সেই নীলের ছায়া...

১০. কবিতার বই চলছে কেমন

আমি হালকা গলায় বললাম, তোমার কবিতার বই চলছে কেমন? এশা অবাক হয়ে বলল, কি কবিতার বই? মাসুম বলল, কী-একটা বই নাকি বের হয়েছে? জনে-জনে সেই বই জোর করে বিক্রি করছ। এশা তরল গলায় হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, মাসুমটা এত মিথ্যা কথা বলে কেন বল তো? তার লাভটা কী? কী আনন্দ পায়? বই তাহলে...

১১. দাঁড়িয়ে আছি একটা ক্লিনিকের সামনে

আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটা ক্লিনিকের সামনে। এশা আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক সময় কালো মোটা একজন নার্স এসে আমাকে বলল, আমাদের ওয়েটিং রুম আছে। আপনি ভেতরে এসে বসুন। সময় লাগবে। আমি রাত এগারোটা পর্যন্ত বসে রইলাম। রাত এগারটায় এক জন ডাক্তার এসে। বললেন, আপনি এখন চলে...

১২. চুপচাপ বসে আছি

আমি চুপচাপ বসে আছি। আকাশে মেঘ ডাকছে। জানালার পর্দা কাঁপিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। ঝুমঝুম শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। নিশ্চয়ই আজ সারা রাত প্রবল বর্ষণ হবে। আমি বসেই আছি। রাত বাড়ছে। আমি অপেক্ষা করছি। কিসের অপেক্ষা? আমি জানি না। মানুষ হয়ে জন্মানোর সবচে বড় কষ্ট...