মেঘের ছায়া (১৯৯৩)

০১. গ্লাসভর্তি তেতুলের সরবত

রেহানা গ্লাসভর্তি তেতুলের সরবত নিয়ে যাচ্ছিলেন, শুভ্রর ঘরের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন। চাপা হাসির শব্দ আসছে। শুভ্ৰ হাসছে। রাত একটা বাজে। শুভ্রের ঘরের বাতি নেভানো। সে অন্ধকারে হাসছে কেন? মানুষ কখনো অন্ধকারে হাসে না। কাঁদতে হয় অন্ধকারে, হাসতে হয় আলোয়। রেহানা ডাকলেন, শুভ্ৰ।...

০২. কান্তা ভিলা

শুভ্রদের বাড়ির নাম কান্তা ভিলা। গেটের কাছে পেতলের নামফলক। রোজ একবার ব্ৰাস ঘসে এই নাম ঝকঝকে করা হয়। গুলশান এলাকার আধুনিক বাড়িঘরগুলির সঙ্গে এর মিল নেই–পুরানো ধরনের বাড়ি। জেলখানা—জেলখানা ভাব আছে। উঁচু দেয়াল। দেয়ালের উপরে কাঁটাতারের বেড়া। বাড়ির গেটটাও নিরেট লোহার।...

০৩. শুভ্র তার চশমা খুঁজে পাচ্ছে না

শুভ্র তার চশমা খুঁজে পাচ্ছে না। বিছানার পাশে রেখে সে বাথরুমে ঢুকেছিল চোখে পানি দিতে। বাথরুম থেকে বের হয়ে সে গেল বারান্দায়। বারান্দায় এ-মাথা থেকে ও—মাথা পর্যন্ত দুবার হাঁটল। ঠিক সন্ধ্যায় চশমা ছাড়া পৃথিবীকে দেখতে তার ভাল লাগে। সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগে। চারদিক অন্ধকার। এই...

০৪. গলির ভেতর গাড়ি ঢোকে না

গলির ভেতর গাড়ি ঢোকে না। শুভ্ৰ গাড়ি রেখে হেঁটে হেঁটে জাহেদের বাসার সামনে এল। জাহেদের বাসায় কোন কলিংবেল নেই। অনেকক্ষণ দরজার কড়া নাড়তে হয়। আজ কড়া নাড়তে হল না। বাড়ির বারান্দায় কাঠের চেয়ারে জাহেদ বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। সে এখনো বাড়...

০৫. কলিংবেলটা নষ্ট

এ বাড়ির কলিংবেলটা নষ্ট। টিপলে কোন শব্দ হয় না। মাঝে মাঝে শক করে। শুভ্ৰ কলিংবেল টিপেই বড় রকমের বাঁকুনি খেল। কলিংবেলে কোন শব্দ হল না, কিন্তু ভেতর থেকে মাহিন সাহেবের গলা শোনা গেল। তিনি উল্লসিত স্বরে বললেন, শুভ্ৰ এসেছে। দরজা খুলে দে। নীতু বাবাকে সকালের নাশতা খাইয়ে দিচ্ছে।...

০৬. দুপুরের খাবার

দুপুরের খাবার ইয়াজউদ্দিন সাহেব অফিসেই খান। খুব হালকা খাবার। এক বাটি সুপ। সামান্য সালাদা। এক টুকরা পাকা পেপে কিংবা অর্ধেকটা কলা। খাবার শেষে মগের মত বড় একটা গ্লাসে এক মগ দুধ-চিনিবিহীন চা। চায়ের সঙ্গে দিনের দ্বিতীয় সিগারেটটি খাওয়া হয়। আজ তাঁর লাঞ্চ ঠিকমত খাওয়া হয়নি। দু...

০৭. মিজান সাহেব বেশ স্বাভাবিক আছেন

মিজান সাহেব বেশ স্বাভাবিক আছেন। তিনি নাপিতের দাকান থেকে চুল কাটিয়েছেন। একেবারে কদমছাট। মাথাটা কালো রঙের কদম ফুলের মতই দেখাচ্ছে। চুল কাটার জন্যেই তাঁকে অন্য রকম দেখাচ্ছে। এ ছাড়া তার মধ্যে আর কোন অস্বাভাবিকতা নেই। কথাবার্তা, চালচলন খুব স্বাভাবিক। হঠাৎ হঠাৎ স্ত্রীর দিকে...

০৮. শুভ্ৰ সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমালো

শুভ্ৰ সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমালো। রেহানা কয়েকবার খোঁজ নিয়ে গেলেন। এতক্ষণ তো শুভ্ৰ ঘুমায় না। জ্বর-টর হয়নি তো? তিনি একবার কপালে হাত দিলেন। গা গরম লাগছে। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরলে জ্বর তো আসবেই। সন্ধ্যায় রেহানা শুভ্রকে ডেকে তুললেন। সন্ধ্যাবেলা ঘুমুতে নেই। সন্ধ্যায় ঘুমুলে আয়ু...

০৯. ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কে যেন কাঁদছে

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কে যেন কাঁদছে। মাহিন সাহেব কান্নার শব্দ শুনছেন। সব শব্দ তাঁর চেনা। এই কান্নার শব্দ অপরিচিত। অবশ্যি তিনি জানেন কে কঁদছে। এ বাসায় তিনি ছাড়া আর একজন মানুষই বাস করে–নীতু। নীতুই কাঁদছে। নীতু ছাড়া আর কে হবে? কিন্তু এরকমভাবে কাঁদছে কেন? মাহিন সাহেব...

১০. শুভ্ৰ শুয়েছিল

শুভ্ৰ শুয়েছিল। মাঝে মাঝে কিছুই ভাল লাগে না। শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। আজ মনে হয় সে রকম একটা দিন। আকাশে মেঘলা। বিছানা থেকে আকাশের মেঘ দেখা যায়। এই মেঘ সে আর কতদিন দেখতে পারবো? শুভ্ৰ ছাট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। রেহানা ঘরে ঢুকে বললেন, একটা মেয়ে তোকে টেলিফোন করেছে। বলেছে। নীতু...

১১. জাহেদ মহাবিপদে পড়েছে

জাহেদ মহাবিপদে পড়েছে। মিজান সাহেব দেশের বাড়িতে পৌঁছে ঘোষণা দিয়েছেন–এখানেই থাকবেন–আর শহরে ফিরবেন না। গ্রামে থাকার ব্যবস্থা নেই বললেই হয়। টিনের ঘর দুটির ভগ্নদশা। ভিটের ভেতর মানুষ সমান ঘাস গজিয়েছে। বাড়ির দরজা জানালা লোকজনে খুলে নিয়েছে। খাট-চৌকি কিছুই নেই।...

১২. ইয়াজউদ্দিন সাহেবের শরীর খারাপ

ইয়াজউদ্দিন সাহেবের শরীর খারাপ লাগছে। সন্ধ্যাবেলা ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। বলেছেন প্রেসার হাই। সিডেটিভ খেতে দিয়েছেন। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে বলেছেন। তিনি ঘর অন্ধকার করেই শুয়ে আছেন। রেহানা তেতুলের সরবত নিয়ে এসেছেন। তিনি বাধ্য শিশুর মত সরবত খেলেন। গ্লাস নামিয়ে রেখে...

১৩. নীতুদের বাসার সামনে শুভ্র

নীতুদের বাসার সামনে শুভ্র অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। কলিংবেলে হাত দেবার সাহস পাচ্ছে না। কলিংবেলটাও ভাল না। হাত দিলেই শ ক লাগে। শুভ্ৰ বেলে হাত রাখল। আশ্চর্য আজ শক করল না। দরজা খুলে দিল নীতু। সহজ গলায় বলল, এসো শুভ্ৰ। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি। অফিসেও যাই নি। বেছে বেছে তোমার...

১৪. সেই প্রিয় মুখ নেই

ইয়াজউদ্দিন সাহেবের মেসিভ হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। রেহানা স্বামীর হাত ধরে বসে আছেন। তিনি থরথর করে কাঁপছেন। এ্যাম্বুলেন্স খবর দেয়া হয়েছে–এখনো আসছে না। শুভ্র বাড়িতে নেই। রেহানা অস্থির হয়ে পড়েছেন। মনে হচ্ছে তিনি অচেতন হয়ে পড়বেন। ইয়াজউদ্দিন সাহেব স্ত্রীর অস্থিরতা দেখে...