মন্দ্রসপ্তক (১৯৯৩)

মন্দ্রসপ্তক - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. সকালবেলাতেই মৃত্যুসংবাদ

সকালবেলাতেই মৃত্যুসংবাদ।   টুথব্রাশে পেস্ট মাখাচ্ছি। অস্বস্তি নিয়েই মাখাচ্ছি—কারণ কার ব্রাশ ঠিক ধরতে পারছি না। এ বাড়িতে তিনটা সাদা রঙের টুথব্রাশ আছে যার একটা আমার। সেই একটা মানে কোনটা, আমি কখনো ধরতে পারি না। বাকি দুটার মালিক আমার দুবোন। এদের চোখের দৃষ্টি ঈগলের মতো...

০২. সেলুনে চুল কাটাতে

সেলুনে চুল কাটাতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি এক জন সন্ন্যাসী বসে আছেন। সোফায় পা তুলে পদ্মসন হয়ে বসে থাকা জলজ্যান্ত সন্ন্যাসী। বাংলাদেশে এই জিনিস দেখাই যায় না। যে দু একটা দেখা যায় তাও স্কুলের এ্যানুয়েল স্পাের্টসে যেমন খুশি সাজো অংশে। কিন্তু যে সন্ন্যাসী বসে আছেন...

০৩. মৃত মানুষকে ভুলে যেতে

এক জন মৃত মানুষকে ভুলে যেতে আমাদের কত দিন লাগে? তীব্র শোক কাটতে লাগে দুদিন, তীব্র শোকের পরের অংশ ভোঁতা শোক কাটতে দশ দিনের মতো লাগে। কোনো রকমে পনের দিন কাটিয়ে দিতে পারলে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত। তখন আর মৃত মানুষদের কথা মনেই থাকে না। মানুষ অতি উন্নত প্রাণী বলেই শোক পনের...

০৪. ঘটনা শেষ পর্যন্ত ঘটেই গেল

ঘটনা শেষ পর্যন্ত ঘটেই গেল। ছোট চাচা এক দুপুরে বাসায় এসে মীরাকে বললেন, মীরা, আমি সমিতাকে আজ বিয়ে করেছি। তুই খবরটা তোর চাচীকে দিয়ে আয়। সমিতা তিনটার দিকে আসবে। মীরা পানির গ্লাস নিয়ে যাচ্ছিল। অবিকল সিনেমার দৃশ্যের মতো এই কথা শুনে তার হাত থেকে পানির গ্লাস পড়ে গেল। ছোট চাচা...

০৫. পরপর তিনটি অদ্ভূত চিঠি

রিমির কাছ থেকে পরপর তিনটি অদ্ভূত চিঠি পেলাম। প্রথম চিঠিটির উপর লেখা—প্ৰথম কবিতা। তার নিচে আট লাইনের এক ইংরেজি কবি। অনেক চেষ্টা করেও সেই কবিতার কোনো অর্থ উদ্ধার করতে। পারলাম না। কবিতার নিচে রিমির নাম লেখা। সে নিজেই কবিতার রচয়িতা কি-না, কে জানে। দ্বিতীয় চিঠির উপরে লেখা...

০৬. আমরা ভয়াবহ যন্ত্রণায় ছিলাম

আমাদের দেখে কে বলবে চার দিন আগেই আমরা ভয়াবহ যন্ত্রণায় ছিলাম? কেউ বলবে না। বলার কথাও নয়। এখন সব স্বাভাবিক। বড় চাচা ব্যাগ বোঝই করে বাজার করছেন। শীতের নতন আনাজ উঠেছে-অবিশ্বাস্য দামে তিনি সেসব কিনে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছেন এবং সবাইকে ধাঁধা ধরার মতো করে বলছেন, বল তো, টমেটো কত...

০৭. এক তোড়া গোলাপ

আজ জাজ সাহেব দুটো গোলাপের জায়গায় এক তোড়া গোলাপ পাঠিয়েছেন। পাঠিয়েছেন বলাটা বোধহয় ঠিক হল না। শুটকো লোকটা সাইকেলে করে গোলাপ নিয়ে এসেছে। তার সঙ্গে তিনিও একই সঙ্গে রিকশা করে উপস্থিত হয়েছেন। গোলাপগুলো তিনি নিজেও আনতে পারতেন, তা আনেন নি। বসার ঘরে ঢোকার মুখে আমার সঙ্গে দেখা।...

০৮. মজার একটা খবর পাওয়া গেল

সকাল দশটায় মজার একটা খবর পাওয়া গেল। খবরটা হল–রিমির মা ফরিদা খালা বিয়ে করেছেন। ভদ্রলোকের নাম সেলিম। বিয়েটা কয়েকদিন আগেই হয়েছে। খবর পাওয়া গেল আজ। বাইরের কারো মুখ থেকে খবর পাওয়া গেলে আমরা চট করে বিশ্বাস করতাম না। খবর দিলেন খালা নিজেই। টেলিফোন করে মাকে বললেন, বড়...

০৯. মানুষের মন বড়ই বিচিত্ৰ

লরেটা ও আমি রিকশা করে যাচ্ছি। আমি বললাম, তোমার কি মন খারাপ? না। আমার তো খুব মন খারাপ লাগছে। তোমার কেন লাগছে না লরেটা? তোমার কি কান্না পাচ্ছে? হ্যাঁ। কই; দেখি? আমি তাকালাম লরেটার দিকে। লরেটা দেখল আমার চোখ জলে ভেজা। সে মমতাময়ী নারীর গলায় বলল, আমি যখন বড় হব তখন তোমাকে...