ফেরা (১৯৮৩)

ফেরা - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. মতি মিয়া দ্রুত পায়ে হাঁটছিল

ফেরার গল্প ভাটি অঞ্চল নিয়ে। আমার নানার বাড়ির দেশ, যেখানে শৈশবের বর্ণাঢ্য দিনগুলি কাটিয়েছি। গল্পের মূল চরিত্রের কেউ আর বেঁচে নেই। তাদের কথা আজ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে করছি। গল্পে বেশ কিছু আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করেছি। কৌতূহলী পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে অপ্রচলিত আঞ্চলিক...

০২. গয়নার নৌকায়

মতি মিয়া পাঁচ দিন পর গয়নার নৌকায় ফিরে এল। সঙ্গে নুরুদ্দিন। নিখল সাব ডাক্তার (রিচার্ড এ্যালেন নিকলসন) বলেছেন সারতে সময় নেবে। অবস্থা ভালো নয়, কাটাকুটি করতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে মাসখানেক লেগে যাওয়া বিচিত্র নয়। আমিন ডাক্তারের নাকি তেমন কাজকর্ম নেই। সে নিজেই দায়িত্ব...

০৩. রহিমা তার পুঁটলি গুটিয়ে মেয়ের হাত ধরে

রহিমা তার পুঁটলি গুটিয়ে মেয়ের হাত ধরে চৌধুরীবাড়ি চলে গেল। তার নিজের বাড়ি-ঘর কিছু নেই। চৌধুরীদের দালানের শেষ মাথায় একটি অন্ধকার কুঠরিতে সে মাঝেমধ্যে এসে থাকে। চৌধুরীরা কিছু বলে না। যত দিন এখানে থাকে, তত দিন যন্ত্রের মতো এ বাড়ির কাজকর্ম করে। যেন এটিই তার বাড়ি-ঘর।...

০৪. শরিফার কিছুই ভালো লাগে না

শরিফার কিছুই ভালো লাগে না। এটি যেন তার নিজের বাড়ি নয়। যেন সে বেড়াতে এসেছে। পাড়া-প্রতিবেশী বৌ-ঝিরাও কেমন যেন সমীহ করে কথা বলে। একটু দূরত্ব রেখে বসে। নানান কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে, কাটা পাওড়া কই ফালাইয়া আসছ? শরিফার অসহ্য বোধ হয়। সরু গলায় বলে, হাসপাতালেই...

০৫. গোটা জ্যৈষ্ঠ্যমাসে এক ফোঁটা বৃষ্টি হয় নি

গোটা জ্যৈষ্ঠ্যমাসে এক ফোঁটা বৃষ্টি হয় নি। বৃষ্টি-বাদলা না হলে জ্বরজারি হয় না। রুগীপত্র নেই, আমিন ডাক্তার মহা বিপদে পড়ে গেল। হাত একেবারে খালি। চৌধুরীবাড়িতে ত্রিশ টাকা কর্জ হয়েছে। গত বিশ দিনে রুগী এসেছে মাত্র একটি। সুখানপুকুরের অছিমুদ্দিনের মেজ ছেলে। ভিজিটের টাকা দূরে...

০৬. কাল সারা রাত শরিফার ঘুম হয় নি

কাল সারা রাত শরিফার ঘুম হয় নি। ইদানীং প্রায়ই এরকম হচ্ছে। সারা রাত এ-পাশ ও-পাশ করে কাটে। পাশেই মতি মিয়া গাছের মতো ঘুমায়। শরিফার অসহ্য বোধ হয়। কাল রাতে বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত গায়ে ধাক্কা দিয়ে মতি মিয়ার ঘুম ভাঙাল। মতি মিয়া ঘুম জড়ান স্বরে বলল, কী হইছে? বাংলাঘরে কী যেন...

০৭. মাছ মারার জায়গা

নুরুদ্দিন খুঁজে খুঁজে চমৎকার একটি মাছ মারার জায়গা বের করেছে। বাড়ি থেকে সোয়া মাইল দূরে জংলা ভিটার ভাঙা ঘাট। জায়গাটি বড়ো নির্জন। দু পাশ অন্ধকার করে আছে ঘন কাঁটাবন। ভাঙা ঘাটের ফাঁকেফুঁকে সাপের আড্ডা। সে জন্যেই বড়ো কেউ আসে না এ-দিকটায়। ঘাটের লাগোয়া প্ৰকাণ্ড একটা ডেফল গাছে...

০৮. উত্তর বন্দের সমস্ত ধান

উত্তর বন্দের সমস্ত ধান কাটা হওয়ার পরপরই ফিরাইল সাব চলে গেলেন। যাবার পর দিন প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হল। তা তো হবেই, মাঠ-বন্ধন নেই। শিল আটকাবার আসল লোকই নেই। কালাচান খবর নিয়ে এল–ফিরাইল সাবের জন্যে উত্তর বলে যে খড়ের ছাউনি করা হয়েছিল, তার চিহ্নমাত্র নেই। শিলাবৃষ্টিতে সব...

০৯. বর্ষার প্রধান প্রস্তুতি শেষ

বর্ষার প্রধান প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। সোহাগীর চারপাশে বাঁশ পুঁতে চইল্যা গাছ ঢুকিয়ে মাটি শক্ত করা হয়েছে। প্রবল হাওয়ায় যখন হাওড়ের পানি এসে আছড়ে পড়বে, সোহাগীতে তখন যেন মাটি ভেঙে না পড়ে। উত্তর বন্দ সবচেয়ে নিচু। সেটি ড়ুবল সবার আগে। তারপর এক দিন সকালে সোহাগীর লোকজন দেখল যেন...

১০. জংলা ভিটায়

জংলা ভিটায় এখন আর যাওয়া যায় না। নাবাল জায়গা। আষাঢ় মাসের গোড়াতেই পানি উঠে গেছে। দক্ষিণ কান্দা দিয়ে খুব সাবধানে হেঁটে জলমগ্ন ভিটার আশেপাশে যাওয়া গেলেও এখন আর কেউ যায় না। দক্ষিণ কান্দায় খুব সাপের উপদ্রব হয়েছে। সিরাজ মিয়ার একটি বকনা বাছুর সাপের হাতে মারা পড়েছে। তবু...

১১. সোহাগীতে পানি ঢুকছে

সোহাগীতে পানি ঢুকছে, এই ভয়াবহ খবরটি চৌধুরীদের পাগল ছেলে প্রথম টের পেল। তার রাতে ঘুম হয় না। বাংলাঘরের বেঞ্চিতে বসে সিগারেট টানে এবং কোনো রকম শব্দ হলেই চেঁচায়, কেডা? চোর নাকি? এই চোর, এই চোর। এ্যাইও। তার চেঁচামেচি চলে ভোের পর্যন্ত। ফজরের আজানের পর সে ঘুমাতে যায়। দুপুর...

১২. ভাত না খেয়ে বাঁচার রহস্য

ভাত না খেয়ে বাঁচার রহস্য সোহাগীর লোকজনের জানা নেই। চৈত্র মাসের দারুণ অভাবের সময়ও এরা ফেলে-ছড়িয়ে তিন বেলা ভাত খায়। এবার কার্তিক মাসেই কারো ঘরে এক দানা চাল নেই। জমি ঠিকঠাক করার সময় এসে গেছে। বীজধান দরকার। হালের গরু দরকার। সিরাজ মিয়ার মতো সম্ৰান্ত চাষীও তার কিনে রাখা...

১৩. ভাতের কষ্ট বড় কষ্ট

ভাতের কষ্ট বড় কষ্ট। নুরুদ্দিনের পেটে সারাক্ষণ ভাতের খিদে লেগে থাকে। শরিফা রোজই বলে, আজরফ টেকাপয়সা লইয়া আসুক, দুই বেলা ভাত রানমু। কোন দিন আইব? কবে যে আসবে, তা শরিফাও ভাবে। কোনোই খোঁজ নেই। নুরুদ্দিন গয়নার নৌকায় রোজ দু বেলা খোঁজ করে। মাঝে মাঝে চলে যায় লালচাচীর বাড়ি।...

১৪. সরকারবাড়ির জলমহালে

সরকারবাড়ির জলমহালে মাছ মারবার জন্য এক দিন সকালে একদল কৈবর্ত এসে হাজির। সর্বমোট সাতটি নৌকার বিরাট একটা বহর। স্থানীয় কৈবর্ত ধারণাও করতে পারে নি, বাইরের জেলেদের মাছ-মারার ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে। খবর পেয়ে স্থানীয় কৈবর্তদের প্রধান নরহরি দাস ছুটে এল। নিজাম সরকার গম্ভীর হয়ে...

১৫. নুরুদ্দিনের লার বড়শি

নুরুদ্দিনের লার বড়শিতে প্রকাণ্ড একটি রুই মাছ ধরা পড়েছে। লার বড়শিগুলিতে বোয়াল মাছ ছাড়া অন্য কিছু ধরা পড়ে না। এই রুই মাছটার মরণদশা হয়েছিল। খালের পাশে প্রচণ্ড দাপাদাপি শুনে পরী এগিয়ে গিয়ে দেখে এই কাণ্ড। দু জনে মিলে মাছ টেনে তুলতে পারে না। আর বড়শির টুইন সূতা ছিঁড়ে যাচ্ছে...

১৬. নিজাম সরকার কল্পনাও করেন নি

নিজাম সরকার কল্পনাও করেন নি ব্যাপারটা এত দূর গড়াবে। একটা আধাপাগলা লোক বাড়ির সামনে ছাতা মাথায় দিয়ে বসে থাকলে, কার কী যায় আসে? কিন্তু নিজাম সরকার ফজরের নামাজ শেষ করে বারান্দায় এসে দেখেন, আমবাগানে দশ-বার জন লোক জটলা পাকাচ্ছে। আমিন ডাক্তারের গা ঘেঁষে বসে আছে নইম মাঝি। নইম...

১৭. আবার কতকাল পরে ফেরা

আবার কতকাল পরে ফেরা। সব কিছু কেমন অচেনা লাগে। কিছুই যেন আগের মতো নেই। নতুন নতুন রাস্তাঘাট নতুন নতুন বাড়িঘর। মোহনগঞ্জ স্টেশনে নেমে আমিন ডাক্তারের চোখ ভিজে উঠল। কত পুরনো জায়গা, অথচ কত অচেনা লাগছে। মোহনগঞ্জ থেকে এখন লঞ্চ যায় নিমতলি, সুখানপুকুর, ঘাসপোতা। গয়নার নৌকা নাকি...