প্রিয়তমেষু (১৯৮৮)

প্রিয়তমেষু - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে

কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। নিশাত কী-হোলে চোখ রাখল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। অথচ দরজায় ধাক্কা পড়ছে। নিশাত বলল, কে? কোনো উত্তর নেই। চাপা হাসির মত শব্দ। নিশাত দরজা খুলল। আশ্চর্য কাণ্ড। এইটুকু একটা বাচ্চা। সবে দাঁড়াতে শিখেছে। তাও নিজে নিজে নয়। কিছু একটা ধরে দাঁড়াতে হয়। দরজা...

০২. রাত আটটা বাজতেই পুষ্পর ঘুম পেয়ে যায়

রাত আটটা বাজতেই পুষ্পর ঘুম পেয়ে যায়। নটার দিকে সেই ঘুম এমন হয় যে, সে চোখ মেলে রাখতে পারে না। ঘুম কাটানোর কত চেষ্টা সে করে। কোনোটাই তার বেলায় কাজ করে না। অথচ রকিব রোজ ফিরতে দেরি করে। আজও করছে। এখন বাজছে নটা তেত্রিশ। আজ বোধহয় দশটাই বাজাবে। পুষ্প চোখে পানি দিয়ে। এল। জিভে...

০৩. কলিংবেলটা কী সুন্দর করেই না বাজে

এ-বাড়ির কলিংবেলটা কী সুন্দর করেই না বাজে। যেন একটা পুরনো দেয়াল-ঘড়ি ঢং-ঢং করে বাজছে। প্রথম দু-তিন বার খুব গম্ভীর আওয়াজ, তারপর রিনরিনে আওয়াজ। কলিংবেল বাজলেই এই কারণে পুষ্প অনেকক্ষণ দরজা খোলে না। বাজুক যতক্ষণ ইচ্ছা। কী সুন্দর লাগে শুনতে। পরপর তিন বার বাজার পর পুষ্প উঠল।...

০৪. পুষ্প ঠাণ্ডা মেঝেতে হাত-পা এলিয়ে পড়ে আছে

পুষ্প ঠাণ্ডা মেঝেতে হাত-পা এলিয়ে পড়ে আছে। তার চমৎকার লাগছে। দুপুরবেলার এই সময়টার মধ্যে কোনট-একটা রহস্য আছে। সময়টাকে খুব আপন মনে হয়। সারা শরীরে থাকে ঘুম-ঘুম আলস্য। ঘুমাতে ইচ্ছা করে, আবার জেগে থাকতেও ইচ্ছা করে। বাবু ঘুমাচ্ছে। তার ঘুমবার ভঙ্গিটা খুব বিশ্ৰী। হাঁ করে...

০৫. জহিরের দাড়ি শেভ করবার ব্যাপারটা

জহিরের দাড়ি শেভ করবার ব্যাপারটা দেখার মতো। মোটামুটি একটা রাজকীয় আয়োজন। বারান্দায় ছোট্ট টেবিল আনা হয়, আয়না লাগানো হয়। গরম পানি, ঠাণ্ডা পানি, স্যাভলন, ব্রাশ, সাবান, রেজার, আফটার শেভ। সব নিয়ে আসার পর গালে সাবান লাগানোর পালা। এই দৃশ্যটিও মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। জহির ব্রাশ...

০৬. পুষ্পদের বাড়িওয়ালা আওলাদ সাহেব

পুষ্পদের বাড়িওয়ালা আওলাদ সাহেব একজন স্কুল-টীচার। স্কুল-টীচার হয়েও তিনি শুধুমাত্র নিজের রোজগারে ঢাকায় দুটি বাড়ি করেছেন। একটি সোবহানবাগে, অন্যটি কল্যাণপুরে। কল্যাণপুরের বাড়িতে তিনি নিজে থাকেন। সোবহানবাগের বাড়িটা ভাড়া দেন। বর্তমানে চেষ্টা-তদবির করছেন লোনের জন্যে। লোন...

০৭. নিশাত বলল, ছটফট করছ কেন

নিশাত বলল, ছটফট করছ কেন? চুপ করে বসে থাক। আমি যা বলছি মন দিয়ে শোন। কটা বাজে। পাঁচটা পঁচিশ। ও আসছে না কেন? আসবে। অফিস ছুটি হয় পাঁচটায়, আসতে সময় লাগবে না? আপনি চলে যাবেন না তো? না, আমি আছি। আমি এক সেকেণ্ডের জন্যেও এই ঘর থেকে যাব না। আপা আমি কাঁদতে পারছি না। তোমার কাঁদার...

০৮. মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ

মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ তাকিয়ে আছেন। পুলিশেরা কোনো ব্যাপারেই কৌতূহলী হয় না। কৌতূহল ও বিস্ময় তাদের থাকে না। কিন্তু এই অফিসারটির গলায় খানিকটা আগ্রহ যেন আছে। তিনি নিশাতের চোখে চোখ রেখে বললেন, বলুন। আমি কি একটু নিরিবিলিতে বলতে পারি? থানা হচ্ছে একটা বাজার। মাছের...

০৯. রকিব জেগে আছে

রকিব জেগে আছে। সে উবু হয়ে খাটের উপর বসে আছে। তার পাশেই পল্টু। মেঝেতে সারা গায়ে চাদর জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে পুষ্প শুয়ে আছে। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার। পুষ্প ঘুমিয়ে আছে কি না বুঝতে পারছে না। ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। কিন্তু মাঝে মাঝে নড়াচড়া করছে। যেভাবে সারা গায়ে চাদর জড়িয়েছে, তাতে...

১০. নিশাত খুব ভোরবেলায় তার মার বাড়িতে

নিশাত খুব ভোরবেলায় তার মার বাড়িতে চলে এল। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাবাকে ধরা। ফরহাদ সাহেব সকাল আটটার আগেই বাড়ি থেকে বের হন। রিটায়ার করার পর বিদেশি এক কোম্পানিতে কনসালটেন্সি করেন। ওদের অফিস শুরু হয় আটটায়। গেট খুলে নিশাত অবাক হয়ে গেল। বারান্দায় তার বোন মীরু। ছবছর পর দেখা।...

১১. রকিব তিন দিন অফিসে এসেছে

রকিব তিন দিন পর আজ প্রথম তার অফিসে এসেছে। চুপচাপ তার চেয়ারে বসে আছে। টেবিলের ফাইলপত্র খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করে রেখে দিল। তার মনে হচ্ছে সবাই তাকে অন্য রকম দৃষ্টিতে দেখছে। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে নি গত তিন দিন সে আসে নি কেন। অথচ এটা জিজ্ঞেস করা খুবই স্বাভাবিক।...

১২. কোনো কারণে জহির রেগে আছে

নিশাতের মনে হল আজ কোনো কারণে জহির রেগে আছে। জহির খুব সহজে রাগ আড়াল করে রাখতে পারে। প্রচণ্ড রাগ নিয়েও সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলতে পারে, হাসতে পারে। বিয়ের প্রথম-প্রথম ব্যাপারটা সে বুঝতে পারে নি। এখন পারে। চেহারা দেখে বলে দিতে পারে জহির রেগে আছে কি রেগে নেই। এখন...

১৩. বিখ্যাত লোকদেরই কি চেহারা খারাপ

সব বিখ্যাত লোকদেরই কি চেহারা খারাপ থাকে? সরদার এ. করিমকে দেখে নিশাতের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। একজন নিতান্তই বেঁটে মানুষ, কুঁজো হয়ে চেয়ারে বসে আছে। চোখ দুটি ব্যাঙের চোখের মতো অনেকখানি বের হয়ে এসেছে। চোখের মণি কটা। সবচেয়ে কুৎসিত দৃশ্য হচ্ছে নাকের ভেতরে বড়-বড় লোম বের হয়ে...

১৪. পুষ্প হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে

পুষ্প হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। এই ব্যাপারটা কি সত্যি-সত্যি ঘটছে না এটা তার অন্যান্য দুঃস্বপ্নের মতো দুঃস্বপ্ন? মিজান বসার ঘরে বসে আছে। চোখে সানগ্লাস। পরনে। চকলেট রঙের একটা শার্ট। মাথার চুলগুলি ছোট্ট-ছোট্ট করে কাটা। মুখ হাসি-হাসি। ভাবি চিনতে পারছেন? অধমের নাম মিজান। দরজা...

১৫. দুপুরের খাবারের বিশাল এক আয়োজন

সুরমা দুপুরের খাবারের বিশাল এক আয়োজন করেছেন। ঢাকার সব আত্মীয়স্বজনদের বলেছেন। মেয়ে-জামাই চলে যাবে এই উপলক্ষে সবাই মিলে একটা উৎসব। আনন্দ-উৎসবের সুর এখানে বাজছে না, মীরু অনবরত কাঁদছে। দেশ থেকে যাবার দিন মীরু সবসময় এরকম করে কেঁদে-কেঁদে ভাসায়। তার কান্নাকাটি দেখে...

১৬. টেলিফোন

স্পেশাল ব্রাঞ্চের এ. আই. জি. আবদুল লতিফ, নুরুদ্দিনকে টেলিফোন করেছেন। নুরুদ্দিন প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে দুবার করে স্যার বলছেন। তার চেয়ারে বসে থাকার মধ্যেও একটা অ্যাটেনশন ভঙ্গি চলে এসেছে। কথা ভালো শোনা যাচ্ছে না। লাইন ভালো না। থানায় হৈচৈও হচ্ছে প্রচুর। লোজন কোথেকে এক পাগল...

১৭. দুটি গোলাপগাছ মরে গেছে

দুটি গোলাপগাছ মরে গেছে। জহির অবাক হয়ে গাছ দুটিকে দেখছে। যে-কদিন বেঁচে ছিল এরা প্রচুর ফুল ফুটিয়েছে। বিরাট বড়-বড় ফুল। হাতের মুঠোয় ধরা যায় না এত বড়। নামও অদ্ভুততাজমহল। গোলাপের তাজমহল নাম কে রেখেছিল কে জানে। যেই রাখুক এ-বাড়িতে তাজমহলের সমাধি হয়ে গেল। জহির রান্নাঘরে ঢুকল।...

১৮. আসামীর ক্রস একজামামিনেশন

আজ আসামীর ক্রস একজামামিনেশন হবে। আসামী কাঠগড়ায় উপস্থিত। সরদার এ. করিম এগিয়ে গেলেন। আপনার নাম মিজানুর রহমান? জ্বি। পুষ্প নামের মেয়েটিকে আপনি চেনেন? জ্বি চিনি। সে যে অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে করেছে সেই সম্পর্কে আপনি কী বলতে চান? অভিযোগ সত্যি নয়। আমার জেরা শেষ হয়েছে। আপনি...

১৯. নিশাত খুব কাঁদছে

নিশাত খুব কাঁদছে। জহির অবাক হয়ে বলল, তুমি এত কাঁদছ কেন? মামলা তো জিতে গেলে একটা লোককে সারা জীবনের জন্যে জেলে পাঠিয়ে দিলে। আজ তো তোমার আনন্দ করার দিন। ব্যাপারটা কি বল তো? ব্যাপারটা নিশাত বলতে পারল না। কারণ তা বলার মতো নয়। একই ঘটনা তার জীবনেও ঘটেছিল। সে তখন মাত্র কলেজের...