পারুল ও তিনটি কুকুর (১৯৯৫)

পারুল ও তিনটি কুকুর (১৯৯৫) – উপন্যাস – হুমায়ূন আহমেদ

০১. টক-টক করে ঘড়ির শব্দ

কিছুক্ষণ আগেও টক-টক করে ঘড়ির শব্দ হচ্ছিল। এখন সেই শব্দও শোনা যাচ্ছে না। পুরো বাড়িটা হঠাৎ করেই যেন শব্দহীন হয়ে গেল। এত বড় একটা বাড়িতে কত রকমের শব্দ হবার কথা–বাতাসের শব্দ, পর্দা নড়ার শব্দ, টিকটিকি ডেকে ওঠার শব্দ। এখন কিছু নেই। এই যে পারুল নিঃশ্বাস ফেলছে সেই...

০২. বাড়ির নাম নীলা হাউস

বাড়ির নাম নীলা হাউস। বিনয় করে নাম রাখা হয়েছে হাউস। প্যালেস হলে মানাত। না, প্যালেস মানাত না। প্যালেসে প্রকাশ্য ব্যাপার থাকে। প্যালেস মানে দর্শনীয় কিছু। লোকজন দেখবে, অভিভূত হবে। এ বাড়ি বাইরে থেকে দেখা যায় না। তের ফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে বাড়ি ঘেরা। পাঁচিলের উপর আরো দুই ফুট...

০৩. পারুল রান্না বসিয়েছে

পারুল রান্না বসিয়েছে। যেহেতু সে স্টোভে রান্না করে তার রান্নাঘর চলমান। একেক সময় একেক জায়গায় থাকে। এখন সে রান্না করছে বারান্দায়। খোলামেলা বারান্দা, একদিকে গ্রীল দেয়া। বাতাস আসছে–স্টোভের আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে। রান্না হতে দেরি হবে। হোক। তার এমন কোন কাজকার্য নেই।...

০৪. এক কেজি টক দৈ

তাহের এক কেজি টক দৈ কিনেছে। পঁয়তাল্লিশ টাকা বের হয়ে গেছে। বুকের ভেতর খচখচ করছে। দৈ না কিনলেও হত। মিষ্টির দোকানের সামনে সিগারেট কিনতে না দাঁড়ালে হয়ত দৈ কেনা হত না। ম্যানিব্যাগে নতুন ৫০ টাকার নোটটা থাকত। এখন আছে একুশ টাকা। দৈ কেনা হয়েছে সিরাজউদ্দিন সাহেবের জন্যে। তাহের...

০৫. ভদ্রতার প্রশ্ন

রহমান সাহেব আজ তাহেরকে দেখামাত্র চিনলেন। হাতের ফাইল বন্ধ করে বললেন, ও তুমি। তাহের বলল, স্যার কেমন আছেন? ভদ্রতার প্রশ্ন। এই প্রশ্ন করার কোন অর্থ হয় না, তবু করতে হয়। সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে একটু উপরে যাদের অবস্থান তারা নিচের অবস্থান থেকে আসা এই প্রশ্নের জবাব দেন না।...

০৬. অসুখ-বিসুখ

রহমান সাহেব বললেন, তোমার কি অসুখ-বিসুখ? তাহের নিচু গলায় বলল, জ্বি-না স্যার। ঠাণ্ডা লেগেছে। চোখ টকটকে লাল, ঠাণ্ডায় চোখ লাল হয় নাকি? তাহের ফ্যাকাসে ভঙ্গিতে হাসল। কিছু একটা বলা উচিত–কি বলবে বুঝতে পারছে না। তার গায়ে জ্বর আছে সে বুঝতে পারছে–সব কেমন হলুদ হলুদ...

০৭. ভদ্র হও নিকি

নিকি, তুমি কিন্তু দুষ্টামি করছ। ভদ্র হও নিকি। অন্যদের খেতে দাও। দেখ, তোমার জন্যে ফিবো খেতে পারছে না। এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। মেয়েদের লক্ষ্মী হতে হয়। তুমি মেয়ে হয়ে ছেলে দুটিকে খেতে দিচ্ছ না, এটা ঠিক হচ্ছে না। আমরা মেয়ে কি করি জান না? পুরুদের খাওয়া হয়ে গেলে তারপর খেতে বসি!...

০৮. ফার্মেসীর নাম উপশম

ফার্মেসীর নাম উপশম। বিশাল হুলুস্থুল কাণ্ডকারখানা। ফার্মেসীর মালিক আলাদা বসেন। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে হয়। ভদ্রলোকের নাম দেলোয়ার হোসেন। তবে দোকানের কর্মচারীরাও তাকে পল্টু নামেই চেনে। তাহেরের পল্টু সাহেবকে খুঁজে বের করতে দেরী হল না। পলু সাহেবের সামনে চার পাঁচটা...

০৯. পা ছুঁয়ে কদমবুসি

টেবিলের নিচে রহমান সাহেবের পা। সেই পা ছুঁয়ে কদমবুসি করতে হলে প্রায় হামাগুড়ির পর্যায়ে যেতে হয়। তাহের তাই করল। নিজেকে এখন তার সত্যি সত্যি কুকুর কুকুর লাগছে। রহমান সাহেব বললেন, থাক এক। সালাম লাগবে না। স্ত্রীকে নিয়ে এসেছো? জ্বি স্যার। গুড। দুজনে মিলে বাড়ি দেখে-শুনে রাখ।...

১০. পল্টু ভাই

গেটের দরজা খুলে পারুল হাসিমুখে বলল, আসুন পল্টু ভাই, আপনি সত্যি সত্যি আসবেন ভাবতেই পারিনি। পল্টু সাহেবের গায়ে সুন্দর একটা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বোতামগুলি সোনার। আলো পড়ে ঝকঝক করছে। তার চোখে সানগ্লাস। তিনি সানগ্লাস খুলে হাতে নিতে নিতে খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, এত বড়...

১১. ঘটনা এবং প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক

নীলা হাউসে তাহের এবং পারুল সুখেই আছে। পারুলের এখন আট মাস চলছে। তার শারীর ভারী হয়েছে। আগের মত পরিশ্রম করতে পারে না। সে বেশীর ভাগ সময় বারান্দার বেতের চেয়ারে বসে থাকে। তাহের এখন দিনরাত ঘরেই থাকে। পারুলের পাশে বসার তার সময় হয় না। তার এখন অনেক কাজ। কুকুরের দেখাশোনা, বাগান।...