পাখি আমার একলা পাখি (১৯৯২)

পাখি আমার একলা পাখি - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. আমি একটা খুন করব

আমি একটা খুন করব এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নিয়ে ফেললাম। কদিন খুব অস্থির–অস্থির লাগছিল। সিদ্ধান্তটা নেয়ার পর অস্থির ভাব পুরোপুরি কেটে গেল। এক ধরনের আরামদায়ক আলস্যে মন ভরে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে টেবিল ঘড়ির দিকে তাকালাম। ভোর নটা পঁয়ত্রিশ মিনিটের লাল কাঁটা সাতের ঘরে।...

০২. রূপার সঙ্গে কি করে পরিচয় হল

রূপার সঙ্গে কি করে পরিচয় হল সেটা বলি। আমার ছেলেবেলার বন্ধু সফিক। ভুল বললাম, বন্ধু বলে আমার কেউ নেই। যাদের আমি খানিকটা সহ্য করতে পারি তাদেরই বন্ধু বলার চেষ্টা করি। স্কুলে এবং কলেজে যাদের সঙ্গে আমি পড়েছি তাদের মধ্যে একমাত্র সফিককেই খানিকটা সহ্য করতে পারি। তাও সব সময় নয়,...

০৩. আমাদের বারান্দায় দুটি ইজিচেয়ার ছিল

আমাদের বারান্দায় দুটি ইজিচেয়ার ছিল। দুটি ইজিচেয়ারের একটি আমি আমার ঘরে নিয়ে এসেছি। বিয়ের পর আমার শোবার ঘরের পরিবর্তনের মধ্যে এই পরিবর্তনটা হয়েছে। ও আচ্ছা, আরেকটা পরিবর্তন হয়েছে ইজিচেয়ারের পাশে বড় একটা টেবিল ল্যাম্প। এই টেবিল ল্যাম্প রূপাদের বাড়ি থেকে এসেছে। রূপার বাবা...

০৪. রূপাদের বাড়ি থেকে একটা মাছ এসেছে

রূপাদের বাড়ি থেকে একটা মাছ এসেছে। তার আকৃতি হুলস্থূল ধরনের। মাছ বললে এই জলজ প্রাণীটির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয় না। মৎস্য বললে কিছুটা হয়। সেই মৎস্য দুজন ধরাধরি করে বারান্দায় এনে রাখল। আমাদের বাসার সবারই হতভম্ব হয়ে যাওয়া উচিত ছিল—কেউ হতভম্ব হলাম না। বরং সবাই এমন ভাব...

০৫. সেগুনবাগিচায় নামিয়ে দিতে পারবে

রূপা বলল, তুমি কি আমাকে সেগুনবাগিচায় নামিয়ে দিতে পারবে? কিছু জিজ্ঞেস করার সময় রূপা কখনো চোখের দিকে তাকায় না। প্রশ্নটা করছে আমাকে, অথচ সে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। শুরুতে খুব বিরক্তি লাগত। এখন লাগে না। বরং মনে হয় এটাই স্বাভাবিক। আমি রূপার প্রশ্নের জবাব দিইনি। গভীর...

০৬. বাবার ঘরে ডাক পড়েছে

বাবার ঘরে ডাক পড়েছে। জজীয়তীয়ের অভ্যাস তিনি এখনো ছাড়তে পারেননি। কিছু দিন পর পর তিনি জাজ সাহেবের ভূমিকায় নামেন। অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে হলেও পুরো বিষয়টির নেপথ্যে যে রূপা আছে তা বুঝতে পারছি। তবে কোন্ কোন্ বিষয় আলোচনা হবে তা বুঝতে পারছি না। এ জাতীয় বিচার সভা এর আগেও হয়েছে।...

০৭. লাব্যণকে তার বাবা নিয়ে গেছে

লাব্যণকে তার বাবা নিয়ে গেছে। এক ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দিয়ে যাবার কথা। ফেরত দেয়নি। চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। দুপুর একটার সময় নিয়েছে–এখন বাজছে পাঁচটা। শীতের সময় পাঁচটাতেই চারদিক অন্ধকার। মুনিয়ার মাথা খারাপের মত হয়ে গেছে। আমি বললাম, চোর ডাকাত তো মেয়েকে নেয়নি। মেয়ের বাবা...

০৮. আজ মাসের প্রথম শুক্রবার

আজ মাসের প্রথম শুক্রবার। মাসের প্রথম শুক্রবারে মা কিছু এতিম খাওয়ান। বেজোড় সংখ্যক এতিম–তিন, পাঁচ, কিংবা সাত। কোন হাদিসে তিনি পড়েছেন আল্লাহ নিজে যেহেতু বেজোড় তিনি বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন। বেজোড় সংখ্যার উপর আল্লাহর খাস রহমত। কাজের ছেলে মাখন গিযেছে এতিমের সন্ধানে।...

০৯. মুনিয়ার স্বামী আজহার সাহেব

মুনিয়ার স্বামী আজহার সাহেব আমাকে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। দীর্ঘ ভনিতার পর যা বললেন তা হচ্ছে–তিনি ভুল করেছেন। ভুল সংশোধন করতে চান। মুনিয়া এবং লাবণ্যকে নিয়ে আবার সংসার শুরু করতে চান। আমি বললাম, যে মেয়েটিকে বিয়ে করেছেন তার কি হবে? তিনি বিরক্ত মুখে...

১০. যে ডাক্তারের কাছে আমাকে সফিক নিয়ে গেল

যে ডাক্তারের কাছে আমাকে সফিক নিয়ে গেল, আমি তার বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাব দিলাম না। অবশ্যি ভদ্রলোকে বলে দিয়েছিলেন কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে না চাইলে দেবেন না। আমার দিকে তাকিয়ে হাসবেন। আমি বুঝবো আপনি জবাব দিতে চাচ্ছেন না। ডাক্তারের সঙ্গে নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল। ডাক্তার :...

১১. আমরা একটা সাইকেল কিনেছি

আমরা একটা সাইকেল কিনেছি। গভীর রাতে সাইকেলে করে দুজন ঘুরে বেড়াই। সফিক প্যাডেল করে, আমি বসে থাকি পেছনের ক্যারিয়ারে। মাঝে মাঝে রূপাদের বাড়ির সামনে থামি। বাড়ি তালাবন্ধ। অনেকদিন ধরেই নোটিশ ঝুলছে, বাড়ি বিক্রয় হইবে। নোটিশটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার সাইকেলে চড়ে বসি।...