দ্বৈরথ (১৯৮৯)

দ্বৈরথ - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

০১. বাথরুমের দরজা খোলা

বাথরুমের দরজা খোলা। লোকা অনেকক্ষণ ধরে বাথরুমে। বিশ্রী রকমের একটা আওয়াজ আসছে। গঁরল-গঁল-গঁরল। একজন মানুষ এমন কুৎসিত শব্দে গার্গল করে কিভাবে? সুন্দর শোভন কিছুই কি মানুষটার নেই? সোমা হাই তুলল। মাত্ৰ নটা বাজে। এর মধ্যে হাই ওঠার কথা না। কিন্তু এই মানুষটি আশেপাশে থাকলে তার...

০২. টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে

টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ মেঘে ঢাকা। মেঘের রঙ ক্রমেই কালো হচ্ছে। মনে হচ্ছে সারা দিনই বৃষ্টি হবে। পর্দা ঢাকা রিকশা, তবু সোমা অনেকখানি ভিজে গেছে। খুব বিরক্ত লাগছে। ভেজা শাড়ি গায়ে লেপ্টে থাকবে আর সে নামবে রিকশা থেকে। রাস্তা ভালো নাখানাখন্দ। একেক বার এমন ঝাঁকুনি...

০৩. লোকটার নাম কামাল

লোকটার নাম কামাল। কামালউদ্দিন। বয়স সাঁইত্রিশ। তবে কানের কাছের সব চুল পেকে যাওয়ায় বয়স খানিকটা বেশিই দেখায়। ঠিক রোগা তাকে বলা যাবে না, তবে কেন জানি রোগা দেখায়। মুখটা গোলগাল। ভালোমানুষি ভাব অনেক কষ্ট করে আনে। নিজের ঘরে যা তাকে করতে হয় না। আজ অবশ্যি কামালের চেহারায়...

০৪. সোমার শোবার জায়গা

সোমার শোবার জায়গা ঠিক হয়েছে ঊর্মির সঙ্গে। এই ঘরে দুটো খাট। একটায় ঘুমায় বিজু, অন্যটায় ঊৰ্মি। ঘরে কোনো ফ্যান নেই। গরমের সময় অসহ্য গুমোট। দক্ষিণের জানালা একটা। ঐ জানালা বিজুর খাটের পাশে। বাতাস যা লাগে বিজুর গায়ে লাগে। ঘরে এখন আছে সোমা এবং ঊর্মি। বিজু বারান্দায় টেবিল পেতে...

০৫. ঊর্মির ঘরে নতুন ফ্যান

ঊর্মির ঘরে নতুন ফ্যান লাগানো হচ্ছে। কড়ই গাছ বিক্রির টাকায় কেনা ফ্যান। বিজুর উৎসাহের সীমা নেই। যদিও নীল গেঞ্জি গায়ে এক জন ইলেকট্রিশিয়ান আনা হয়েছে তবু পুরো কাজটা করল বিজু। কানেকশন দিয়ে সুইচ টিপল। ফ্যান ঘুরল না। ইলেকট্রিশিয়ান টেস্টার দিয়ে দেখে বলল, লাইন তো ভাইজান ঠিক...

০৬. কামালের চোখের অবস্থা খুব খারাপ

কামালের চোখের অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে। আগে মাঝে-মাঝে পানি পড়ত, এখন ক্রমাগত পড়ে। রোদে বের হলে যন্ত্রণা হয়। চিনচিনে ব্যর্থ হয়। ঘন কালো রঙের চশমা একটা সে কিনেছে। সেই চশমা চোখে দিলে দিনে-দুপুরে ঢাকা শহর অন্ধকার হয়ে যায়। কাউকে চেনা যায় না। এও এক যন্ত্ৰণা। ঢাকা শহরে প্রতিটি...

০৭. সোমার কেমন যেন শীত শীত লাগছে

সোমার কেমন যেন শীত শীত লাগছে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। ফ্যানের শো-শোঁ শব্দে কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বিজু ফ্যানটা ভালো কেনে নি। এত শব্দ হবার তো কথা না। সোমা উঠে বসল। পাশের খাটে ঊর্মি। কেমন এলোমেলল ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। ঊর্মির জীবনটা কেমন হবে কে জানে! এই ব্যাপারটা আগেভাগে...

০৮. দোতলা বাড়িটা আগের মতোই আছে

দোতলা বাড়িটা আগের মতোই আছে। নারিকেল গাছ দুটি বড় হয়েছে। আগে যেখানে ফুলের বাগান ছিল সেখানে টিনের ছাদ দেওয়া গ্যারাজ। বাড়ির পাঁচিল ভেঙে আরো উঁচু করা হয়েছে। এছাড়া সব আগের মতো। সোমা গেট দিয়ে ঢুকে একটু ইতস্তত করতে লাগল। সরাসরি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যাওয়া কি ঠিক হবে? শোভন...

০৯. খাটের নিচে মিউ-মিউ শব্দ

খাটের নিচে মিউ-মিউ শব্দ হচ্ছে। রাতে কামালের ঘুম সচরাচর ভাঙে না। আজ মিউ-মিউ শুনে ঘুম ভাঙল। বিড়াল নিৰ্ঘাত বাচ্চা দিয়ে দিয়েছে। শালি তা হলে খালাস হয়েছে। কামাল খাট থেকে নেমে বাতি জ্বালালউঁচু সুরে ডাকল, মিনু ও মিনু। কেউ সাড়া দিল না। কারণ মিনু বাড়িতে নেই। আজ সন্ধ্যায় তাকে...

১০. সন্ধ্যাবেলা সোমা চা বানাচ্ছিল

সন্ধ্যাবেলা সোমা চা বানাচ্ছিল। ঊর্মি এসে বলল, আপা একটু বাইরে যাও তো। সোমা বলল, কেন? কে যেন এসেছে। তোমাকে চাচ্ছে। সোমা পাংশু মুখে উঠে দাঁড়াল। আচমকা বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। উনি কি এসেছেন? বসতে বলেছিস? না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বসতে বললি না কেন? বসতে বলা ঠিক হবে কিনা...

১১. ছদরুদ্দিন সাহেব খাটে আধশোয়া হয়ে বসা

ছদরুদ্দিন সাহেব খাটে আধশোয়া হয়ে বসা। তাঁর সামনের চেয়ারে বিজু। বিজুর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। হাত মুঠি করা। ঘরে আর কেউ নেই তবে তিথি মাঝে-মাঝে দরজার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে। তিথির চোখে ভয়। ছদরুদ্দিন সাহেব কঠিন গলায় বললেন, তুই আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছিস? বিজু...

১২. প্যাকেট করা নতুন ক্যাসেট

প্যাকেট করা নতুন ক্যাসেট ডেক জোগাড় করতে কামালের বেশ ঝামেলা হয়েছে। তিন ঘন্টার জন্যে নিয়ে যাবে, প্যাকেট খোলা যাবে না-এই কথার পরও কোনো দোকানদার রাজি হয় না। এই তিন ঘন্টার জন্যে পাঁচ শ টাকা দিতে সে রাজি, তাতেও কাজ হয় না। শেষ পর্যন্ত সাত শ টাকায় রফা হল। ঠিক হল দোকানের এক জন...

১৩. বিজু মুরাদকে ধরে এনেছে

বিজু মুরাদকে ধরে এনেছে। কলেজে যাওয়ার পথে সে মুরাদকে প্রথম এক ঝলক দেখতে পায়। সে আমজাদের চায়ের দোকানে বসেছিল। বিজুকে দেখেই চট করে সরে পড়ল। বেশি দূর যেতে পারল না। বিজু ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল, পর মুহূর্তেই প্রচণ্ড এক চড় বসাল। এমন প্ৰচণ্ড চড় যে, মুরাদ উলটে পড়ে মাথায় চোট খেল।...

১৪. বড় চাচাকে নিয়ে যেতে

বড় চাচাকে নিয়ে যেতে মিথির দুই মামা এসেছেন। বাড়ির সামনে একটা পিকআপ এবং একটা ডাইহাট গাড়ি দাঁড়িয়ে। পিকআপে জিনিসপত্র ভোলা হচ্ছে। ব্যাপারটা ঊর্মি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখল। তার খুব খারাপ লাগল। সে ভেতরে এসে বিজুকে বলল, ওরা সবকিছু নিয়ে চলে যাচ্ছে। বিজু বলল, যাক না। তোর এত...

১৫. সোমা নতুন বই নিতে এসেছে

সোমা নতুন বই নিতে এসেছে। তিনি বই বেছে দিচ্ছেন। সোমা দেখল একটা কুচকুচে কালো বিড়াল তাঁর পায়ে গা ঘষছে। সোমা বলল, এই বিড়ালটা কি আপনার? না। বেড়াল আমার পছন্দের প্রাণী না। তবে আমার স্ত্রী পছন্দ করত। বেড়ালকে খেতেটেতে দিত। এই কালো বেড়ালটা হচ্ছে আমার স্ত্রীর পোষা বেড়ালগুলোর...

১৬. সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে

সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। কামাল এখনো বিছানায়। দুপুরে ঘুমিয়েছিল, বিকেলে ঘুম ভেঙেছে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। এই সময়টা তার খুব খারাপ যায়। গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে। আজও কাঁদতে ইচ্ছা করছে। বিড়ালের বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটেছে। সব কটা এখন বিছানায়। বালিশ নিয়ে...