দেয়াল (২০১৩)

দেয়াল - উপন্যাস - হুমায়ূন আহমেদ

ভয়

ভয় ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার কীভাবে পরিচয় হলো আগে বলে নিই। কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার এগজামিনার হয়ে পাড়াগাঁ ধরনের এক শহরে গিয়েছি (শহর এবং কলেজের নাম বলার প্রয়েজন দেখছি না। মূল গল্পের সঙ্গে এদের সম্পর্ক নেই। নামগুলি প্রকাশ করতেও কিছু অসুবিধা আছে)। এই অঞ্চলে আমি কখনো...

০০. দেয়াল উপন্যাসের ভূমিকা – আনিসুজ্জামান

দেয়াল উপন্যাসে ভূমিকা – আনিসুজ্জামান হুমায়ূন আহমেদের অবর্তমানে তার উপন্যাস দেয়াল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। প্রকাশকের ইচ্ছায় আমি তার ভূমিকা লিখছি। বইটির যে কোনো ভূমিকার প্রয়োজন ছিল, আমার তা মনে হয় না। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগেই দেয়াল নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।...

০১. ভাদ্র মাসের সন্ধ্যা

ভাদ্র মাসের সন্ধ্যা। আকাশে মেঘ আছে। লালচে রঙের মেঘ। যে মেঘে বৃষ্টি হয় না, তবে দেখায় অপূর্ব। এই গাঢ় লাল, এই হালকা হলুদ, আবার চোখের নিমিষে লালের সঙ্গে খয়েরি মিশে সম্পূর্ণ অন্য রঙ। রঙের খেলা যিনি খেলছেন মনে হয় তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। শফিক চা খেতে খেতে আকাশের রঙের...

০২. রাধানাথ বাবুর বয়স পঁয়ষট্টি

রাধানাথ বাবুর বয়স পঁয়ষট্টি। তার মাথাভর্তি ধবধবে সাদা চুলের দিকে তাকালেই শুধু বয়স বোঝা যায়। চুলে কলপ করা হলে বয়স ত্রিশের কোঠায় নেমে আসত। সবল সুঠাম বেঁটেখাটো মানুষ। চোখ বড় বড় বলে মনে হয় তিনি সারাক্ষণ বিস্মিত হয়ে আছেন। তাঁর গাত্রবর্ণ অস্বাভাবিক গৌর। তার মাসি বলতেন, আমার...

০৩. অবন্তির লেখা

অবন্তির লেখা আমার দাদাজান সরফরাজ খান পুলিশের এসপি হয়ে রিটায়ার করেছিলেন। আমি আমার জীবনে তার মতো ভীতু মানুষ দেখি নি। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তিনি অসীম সাহসিকতার জন্য পিপিএম’ পেয়েছিলেন। পিপিএম হলো পাকিস্তান পুলিশ মেডেল। পুলিশ সার্ভিসে সাহসিকতার সর্বোচ্চ পুরস্কার।...

০৪. মার্চ মাস

মার্চ মাস। সে বছর মার্চ মাসে অস্বাভাবিক গরম পড়েছিল। আকাশ থেকে রোদের বদলে আগুন ঝরছে। গাছের কোনো পাতাই নড়ছে না। আসন্ন দুর্যোগে ঝিঁঝিঁপোকা দিনেরবেলা ডাকে। এখন তা-ই ডাকছে। প্রচণ্ড গরমে কালো পোশাক পরা আর্টিলারির প্রধান মেজর ফারুক খুব ঘামছেন। গায়ের কালো শার্ট ভিজে উঠেছে।...

০৫. সরফরাজ খান

সরফরাজ খান দোতলায় জানালার পাশে বসে আছেন। জানালার কাঠের খড়খড়ি খানিকটা নামানো। তিনি খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে বাড়ির বাইরের উঠান খানিকটা দেখতে পাচ্ছেন। সরফরাজ খানের অনেক বিচিত্র অভ্যাসের মধ্যে একটি হলো জানালার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা। এই তাকিয়ে থাকা অর্থহীন। তাঁর...

০৬. হাফেজ জাহাঙ্গীর

হাফেজ জাহাঙ্গীর ফজরের নামাজ শেষ করে দিঘির ঘাটে বসে আছেন। তার হাতে নীল রঙের ঘুটির তসবি। তিনি একমনে তসবি টানছেন। তার বসার জন্যে উলের আসন দেওয়া হয়েছে। তিনি যেখানে বসেছেন তার এক ধাপ নিচে আগরদানে আগরবাতি জ্বলছে। হাফেজ জাহাঙ্গীর আগরবাতির গন্ধ কখনো পছন্দ করেন না। তার নাক...

০৭. বেলা দুটা চল্লিশ

বেলা দুটা চল্লিশ। ভাদ্র মাসের কঠিন ঝাঁঝালো রোদ উঠেছে। ফ্যানের বাতাসও গরম। বঙ্গবন্ধু পাইপ হাতে তাঁর প্রিয় আরামকেদারায় এসে শোয়ামাত্র মাথার ওপরের ফ্যান বন্ধ হয়ে গেল। তিনি বিরক্ত মুখে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ভেবেছিলেন কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবেন। শরীর ক্লান্ত, মনও...

০৮. একটি বিশেষ গুজব

একটি বিশেষ গুজবের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আনন্দময় চাপা উত্তেজনা। স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন উৎসব হতে যাচ্ছে। উৎসবের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোনা যাচ্ছে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয়...

০৯. ১৫ আগস্ট, শুক্রবার

১৫ আগস্ট। শুক্রবার। মেজর ফারুকের জন্মবার। তার জন্মের পরপরই ফজরের আজান হয়েছিল। কাজেই এই দিনটি তার জন্যে শুভ। তারচেয়ে বড় কথা, আন্ধা হাফেজ সিগন্যাল পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে। এখন ফারুক ইচ্ছা করলে তার কার্য সমাধা করতে পারেন। আন্ধা হাফেজ তাঁর মঙ্গলের...

১০. হরিদাসের চুল কাটার দোকান

হরিদাসের চুল কাটার দোকান সোবাহানবাগে। তার দোকানের একটু সামনেই ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর রোডের মাথা। সঙ্গতকারণেই হরিদাস তার সেলুনে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছে– শেখের বাড়ি যেই পথে আমার সেলুন সেই পথে। সাইনবোর্ডের লেখা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তবে হরিদাস পথচারীদের জন্যে...

১১. সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার দিন

সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার দিন থেকে পনের দিন— ১৫ আগস্ট – বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত। খন্দকার মোশতাক আহমেদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণ। দেশে সামরিক আইন জারি। বিগত সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ১০ জন মন্ত্রী ও ৬ জন প্রতিমন্ত্রী পুনর্বহাল। বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি...

১২. তারিখ ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫ সন

তারিখ ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫ সন। রাধানাথ বাবু মেঝেতে শীতলপাটির বিছানায় শুয়ে আছেন। তার পাশে শফিক কাগজ-কলম নিয়ে বসেছে। রাধানাথ বাবু জরুরি এক চিঠির ডিকটেশন দেবেন। চিঠি যাবে খন্দকার মোশতাকের হাতে। রাধানাথ বললেন, শচীনকর্তা মারা গেছেন, এই খবর জানো? না। উনি আজ মারা গেছেন।...

১৩. অবন্তির কাছে লেখা ইসাবেলার চিঠি

অবন্তির কাছে লেখা ইসাবেলার নভেম্বর মাসের চিঠি– আমার ছোট্ট পাখি আমার জেসমিন পুষ্প, এই মেয়ে, তোমার নভেম্বর মাসের চিঠি আমি লিখছি অক্টোবরের একুশ তারিখে। তোমার দেশের যে অবস্থা চিঠি পেতে পেতে নভেম্বর চলে আসবে। তোমার জন্যে অতি আনন্দের একটা খবর দিয়ে শুরু করি। তোমার বাবা...

১৪. দুঃস্বপ্ন দেখে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ

দুঃস্বপ্ন দেখে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের ঘুম ভাঙল। ভয়ে এবং উত্তেজনায় তার হাঁপানির মতো হয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্ত করার চেষ্টা করলেন। নিজেকে সামলানো যাচ্ছে না। তার হাত পারকিনসন্স রোগীর মতো কাঁপছে। পিপাসায় বুক শুকিয়ে কাঠ। তাঁর স্বপ্ন...

১৫. নভেম্বরের চার তারিখ

নভেম্বরের চার তারিখ। সকাল সাতটা। চায়ের কাপ হাতে বঙ্গভবনে নিজের ঘর থেকে বারান্দায় এসেছেন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন। মাথায় নেহেরু টুপি, কাঁধে চাদর, এক হাতে পাইপ। (তিনি বঙ্গবন্ধুর মতো পাইপ টানতেন। একই...

১৬. সাতই নভেম্বরের ভোরবেলা

সাতই নভেম্বরের ভোরবেলাটা অবন্তির কাছে অন্যরকম মনে হলো। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি, দমকা হাওয়া। ঢাকা শহর ডুবিয়ে দেবে এমন অবস্থা। হঠাৎ আসা বৃষ্টি হঠাৎ থেমে গিয়ে ঝকঝকে রোদ উঠল। সেই রোদ ভেজা গাছের পাতায় কী সুন্দর করেই না মিশে যাচ্ছে। অবন্তি শব্দ করে বলল, বাহ!...

১৭. রাধানাথ বাবুর আদর্শলিপি প্রেসের সামনে

রাধানাথ বাবুর আদর্শলিপি প্রেসের সামনে শফিক দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক বুঝতে পারছে না—সে কি বাড়িতে ঢুকবে, নাকি গেট থেকে চলে যাবে? যে মানুষটার জন্যে এই বাড়ি তার নিজের মনে হতো, সেই মানুষ তো নেই। আজ আর তাকে কেউ বলবে না, টিসিবির একটা স্লিপ আছে, নিয়ে যাও। একটা প্যান্ট বানাও। এক...

১৮. ক্যান্টনমেন্টের উত্তাপ

ক্যান্টনমেন্টের উত্তাপ ঢাকা শহরে প্রবেশ করল না। শহর তার নিজের নিয়মে চলতে লাগল। শান্ত নিস্তরঙ্গ ঢাকা শহর। মাঠাওয়ালারা মাঠা মাঠা বলে মাঠা বিক্রি করতে লাগল। ধুনুরিরা কাঁধে ধুন নিয়ে লেপ-তোষক সারাইয়ে নেমে গেল। ছুরি-কাঁচি ধার করানোর লোকও নামল। মিষ্টি গলায় বলতে লাগল,...