দূরে কোথাও

০১. আকাশে মেঘ করেছে

আকাশে মেঘ করেছে। ঘন কালো মেঘ। ক্রমেই ফুলে ফোঁপে উঠছে। ওসমান সাহেব আকাশের দিকে তাকালেন। তার কেন জানি মনে হল এই মেঘে বৃষ্টি হবে না। প্রিকগনিশন নাকি? ভবিষ্যতের কথা আগে ভাগে বলে ফেলা। তিনি হাঁটছেন অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে। উদ্দেশ্যহীন মানুষের হাঁটা। গন্তব্যহীন যাত্ৰা। অথচ তার...

০২. ওসমান সাহেব বাড়ি ফিরলেন

ওসমান সাহেব বাড়ি ফিরলেন রাত আটটায়। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাবার সময় বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। তাঁর ধারণা বৃষ্টির ফোঁটা যদি ছোট হয় এবং যদি খুব কাছাকাছি হয় তাহলে বৃষ্টি থামতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফোঁটার ধরন দেখে তার মনে হল সারা রাত বৃষ্টি হবে। এবারে খুব শুকনো ধরনের বর্ষা গেছে।...

০৩. মিলির বয়স তেইশ

মিলির বয়স তেইশ। রূপসী মেয়েদের যা যা থাকতে হয়, সবই মিলির আছে। গায়ের রঙ ফর্সা। গড়পড়তা মেয়েদের তুলনায় অনেকখানি লম্বা। কাটা কাটা চোখ মুখ। বা চোখের নিচে চোখে পড়ার মত কালো তিল। তবু মিলির ধারণা তার চেহারাটা খুবই সাধারণ। সাধারণ এবং বাজে। তা না হলে বিয়ে নিয়ে কোনো মেয়ের এত...

০৪. ওসমান সাহেবের বাবা ফয়সল সাহেব

ওসমান সাহেবের বাবা ফয়সল সাহেবের বয়স তিয়াতুর। এই বয়সেও তিনি বেশ শক্ত। রোজ ভোরে দুমাইল হাঁটেন। বিকেলে ঘড়ি ধরে পনেরো মিনিট ফ্রি হ্যাঁন্ড একসারসাইজ করেন। চোখের দৃষ্টি ঠিক আছে। কিছু দিন আগেও চশমা ছাড়া পড়তে পারতেন। এখন অবশ্যি প্লাস ওয়ান পাওয়ারের চশমা লাগে। লোকটি ছোটখাটো...

০৫. শেষ রাতের দিকে

শেষ রাতের দিকে ওসমান সাহেব একটা দুঃস্বপ্ন দেখলেন, যেন ক্লাস নিতে গিয়েছেন। তিনি পড়াবেন আর্যদের আগমনের ইতিহাস। কিন্তু ক্লাসে ঢুকেই টের পেলেন তাকে পড়াতে হবে জ্যামিতি। দু’টি ত্ৰিভুজকে সর্বসম প্রমাণ করতে হবে। ত্রিভুজ দু’টির দুই বাহু ও অন্তঃস্থ কোণ সমান ম্যাট্রিকে পড়ে...

০৬. মিলি চুপি চুপি

মিলি চুপি চুপি তার স্টিলের আলমারি খুলল। তার ভাবভঙ্গি অনেকটা চোরের মত। দরজা ভেজিয়ে দিয়েছে। সব কটা পর্দা টেনেছে এবং এমনভাবে আলমারির সামনে আছে যাতে চট করে আড়াল করা যায়। তবু তার হাত কাঁপিছে। সে ঘন ঘন তাকাচ্ছে ভেজানো দরজার দিকে। মিলি ভয়ে ভয়ে তার টিনের কৌটা খুলল। ঘুমের...

০৭. ফয়সল সাহেব ডেনটিস্টের কাছে গিয়েছিলেন

ফয়সল সাহেব ডেনটিস্টের কাছে গিয়েছিলেন। তার মনে হয়েছে উপরের পাটির একটি দাঁত তুলে ফেলতে হবে। মাঝে মাঝেই ব্যথা হচ্ছে। অসহ্য ব্যথা নয়–চিনচিনে ব্যথা। ঠাণ্ডা পানি খেতে পারেন না। দাঁত শির শির করে। অল্প বয়স্ক ডেনটিস্ট তাকে অবাক করল। সে গম্ভীর হয়ে বলল, আপনার দাঁত তো ঠিক...

০৮. টগরকে ভর্তি করা হয়েছে

টগরকে ভর্তি করা হয়েছে একটা ক্লিনিকে। ঝকঝকে তকতকে একটা বাড়ি। হাসপাতাল মনেই হয় না। রুগীটুগীও নেই। তিন নম্বর রুমে একটি মাত্র পেসেন্ট। সেও খুব হাসি খুশি। অল্প বয়সী একজন তরুণী। প্রথম মা হবে। সকালবেলা ব্যথা উঠেছিল, সবাই ব্যস্ত হয়ে নিয়ে এসেছে। ডাক্তার বললেন। ফলস পেইন। স্বামী...

০৯. হাতে একটা কমলালেবু

হাতে একটা কমলালেবু নিয়ে টগর বসে আছে। টগরের গায়ে লাল একটা সোয়েটার। কত দ্রুতই না বড় হয়ে যাচ্ছে ছেলেটি। শিশুরা বোধ হয় সময়কে পেছনে ফেলে এগুতে থাকে। রোদ এসে পড়েছে তার চোখে-মুখে। সে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। গভীর মনোযোগে কী যেন দেখছে সে। দরজার আড়াল থেকে রানু দৃশ্যটি দেখল। এত...

১০. মিলি সেজেগুজে বেরুচ্ছিল

মিলি সেজেগুজে বেরুচ্ছিল। তার শাশুড়ি, সুরমা তাকে ডাকলেন। সুরমাব বয়স প্রায় পঞ্চাশ, কিন্তু এখনো তার মাথার চুল পাকেনি। চামড়ায় ভঁাজ পড়েনি। ভদ্রমহিলা ছোটখাটো। কথা বলেন নিচু গলায় কিন্তু যা বলেন খুব স্পষ্ট করে বলেন। তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায যে তিনি এ...

১১. রাত এগারোটার সময় নবী এসে উপস্থিত

রাত এগারোটার সময় নবী এসে উপস্থিত। তার চোখ রক্তবর্ণ। কথাবার্তা অসংলগ্ন। ঠিকমত দাঁড়াতেও পারছে না। জীতু মিয়া বলল, সায়েব ঘুমাইতেছে। নবী ধমকে উঠল। ডেকে তোল। বল গিয়ে নবী এসেছে। জীতু মিয়া ডেকে বলবে সে রকম ভরসা বোধ হয় তার হল না। নবী গলা উঁচিয়ে ডাকল,–ওসমান। ওসমান সাহেব...

১২. ফয়সল সাহেব পিঠের নিচে

ফয়সল সাহেব পিঠের নিচে দু’টি বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মুখ দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে ভোর বেলাতে তার উপর দিয়ে বড় রকমের একটা ঝড় গিয়েছে। লোকজন তাকে দেখতে আসতে শুরু করেছে। সবাই একই কথা বিভিন্নভাবে বলছে। কী করে ব্যাপারটা হল? ব্যথাটা প্রথম কোথায় শুরু হয়েছিল?...

১৩. রানুর বড় খালা সুরমা

রানুর বড় খালা সুরমা কয়েকদিন ধরে একটি ব্যাপার নিয়ে ভাবছেন। যতই ভাবছেন ততই তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। মেজাজ খারাপ হলে তার কিছু শারীরিক অসুবিধা হয়–ক্ষুধা হয় না, বুকে ধরফর করে। কদিন ধরে তাই হচ্ছে। এসব ঝামেলা থেকে মুক্তির কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। রানুকে এ বাড়ি থেকে...

১৪. একটি চমৎকার দৃশ্য

ওসমান সাহেব দূর থেকে একটি চমৎকার দৃশ্য দেখলেন। গেটের বাইরে অপলা ও টগর। অপালা হাসছে। অপলার কোলে হাসছে টগর। তিনি মুগ্ধ চোখে তাকালেন। কিছু কিছু দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে অন্য রকম করে ফেলে। অন্ধকার দূর করে দেয়। মনের কোনো একটা স্যাঁতস্যাতে জায়গায় হঠাৎ খানিকটা আলো এসে...

১৫. মিলি বাসায় ছিল না

সকাল ন’টা। এ সময় সাধাবণত সবাইকে ঘরে পাওয়া যায। মিলি বাসায় ছিল না। মিলির বর মতিয়ুর রহমান ছিল। এই ছেলেটিকে ওসমান সাহেব পছন্দ কলেন। অথচ সে ঠিক পছন্দ করার মত মানুষ নয়। উদ্ধত প্রকৃতির মানুষ! হিসেবী ও বৈষয়িক। তবু তাকে ভাল লাগে। কেন? চেহারার জন্যে নিশ্চযই নয়। মতিয়ুর...

১৬. ঘুমের রুটিনে অদল-বদল হয়ে গেছে

আজকাল ফয়সল সাহেবের ঘুমের রুটিনে অদল-বদল হয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন। বেশ গাঢ় ঘুম। সেই ঘুমের স্থায়িত্ব কম। জেগে উঠেন মিনিট পাচেকের মধ্যে এবং জেগেই নিজের ওপর রেগে যান। ভয়ঙ্কর রাগ। কেন দীর্ঘদিনের এই ক্রীতদাস শরীর। তার কথা শুনবে না। মৃত্যু কি এসে যাচ্ছে? সে...

১৭. রানু আজ একটু সকাল সকাল

রানু আজ একটু সকাল সকাল অফিস থেকে এসেছে। টগরকে নিয়ে একবার ডাক্তারের কাছে যাবে। দিন দিন এমন রোগা হয়ে যাচ্ছে কেন সে? ভিটামিন টিটামিন কিছু খাওয়ানো দরকার। বাসায় ঢুকতে গিয়ে সে চমকে গেল। বসার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। সিগারেটের গন্ধ আসছে। অথচ তালাবদ্ধ থাকার কথা। অপলা কলেজ...

১৮. মিলি বসে আছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে

মিলি বসে আছে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। মিলির বর এতটা আশা করেনি। তার ধারণা ছিল ডাক্তারের কাছে যাবার কথা শুনে সে রোগে উঠবে। হৈচৈ করবে। ইদানীং সে খুব হৈচৈ করছে। কিন্তু আজ সে বেশ শান্ত। সহজ সুরে পাশে বসা মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। মহিলা পান খাচ্ছেন। তিনি নিশ্চয়ই পেসেন্ট নন। কোন...

১৯. একটা দুঃস্বপ্ন

রাত তিনটায় ফয়সল সাহেব একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন। তার ইদানীং কালের স্বপ্নগুলি অস্পষ্ট কিন্তু আজ রাতের স্বপ্ন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি দেখলেন একটা প্রকাণ্ড নেকড়ের মতো জন্তু তাকে কামড়াচ্ছে। বা পায়ে কামড় দিয়ে একটুকরা মাংস সে ছিঁড়ে নিল। তিনি জেগে উঠলেন বা পায়ে তীব্র ব্যথা...

২০. মিলি একাই কাঁদছে

মিলি একাই কাঁদছে। ওসমান সাহেব লক্ষ্য করলেন বাবার মৃত্যু তাকে তেমন অভিভূত করতে পারছে না। অস্বস্তি লাগছে এই পর্যন্তই। তার মনে হল, এখন যদি কেউ বলে আপনার এখানে থাকার দরকার নেই আপনি চলে যান, তাহলে তিনি খুশিই হবেন। তার প্রচণ্ড চায়ের পিপাসা হচ্ছে। ফয়সল সাহেবের শরীর সাদা চাদর...